কী লিখি, কেন লিখি
অরিন্দম নাথ
অরিন্দম নাথ
আমার লেখালেখির শুরু হঠাৎ করে । ডিসেম্বর ২০০৮ সাল । আমি তখন আগরতলায় পুলিশ সদরে পোস্টেড । সহকারী আই জি, সদর । মূলতঃ করণিকের কাজ । পুলিশ প্রশাসনের বাজেট এবং খরচপাতি দেখা । বিভিন্ন চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়া । মিটিং এটেন্ড করা । এমনি সব ছকবাধা কাজ । বড় অফিসাররা চলে গেলে একাকী কাজ করি । দিনের ফাইল, দিনে শেষ করি । তারপর আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ পুরাতন আর এম এস চৌমুহনীতে যাই । সেখানে মানিকের দোকান বা মানিক প্লাযায় বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিই । তারপর অরুন্ধতী নগরে কোয়ার্টারে ফিরে যাই । শীতের আগমনেই হোক কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার দরুন আড্ডা সবদিন জমে না । তখন বামপন্থীরা ইউ পি এ সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছে । অগত্যা আমি অফিস থেকে ঘরে ফিরে যাই । নিঃশব্দে সময় কাটাই । পড়াশোনা বলতে বিভিন্ন লেখকের মহাভারত পড়তাম । তখন আমার একটি পেট-প্রজেক্ট ছিল । মহাভারতের সময়কার অপরাধমূলক ঘটনাবলীকে বর্তমান আইনের নিরিখে বিচার করা । তখনই আবিষ্কার করলাম, কিছু লেখার জন্য মন আনচান করছে । একটি পুরানো ডায়রিতে প্রতিদিন একটি করে আখ্যান লিখতে শুরু করলাম । একদিন আবিষ্কার করলাম বারো চৌদ্দটি লেখা হয়ে গেছে । একেকটি লেখা, একপাতা দুপাতা । কোনওটি একটু বড় । আরও দু একটি লেখা এদিক সেদিক ছিল । বিভিন্ন স্মরণিকায় প্রকাশ পেয়েছিল । একদিন জ্ঞান-বিচিত্রার কর্ণধার দেবানন্দ দামকে ফোন করলাম । লেখাগুলো ছাপাতে চাই । দেবানন্দদা এককথায় রাজি । পরদিনই নিয়ে আসতে বললেন । টাইপে দিয়ে দেবেন । ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা । এর আগেই প্রকাশ করতে হবে । আমি মহা উৎসাহে লেখাগুলো নিয়ে গেলাম । তিনি দেখে বললেন, চার ফর্মার বই হবে । তবে আরও কিছু লেখা দিতে হবে । আমিও কথা দিলাম । খুব দ্রুততার সঙ্গে লেখা সমাপ্ত করলাম । প্রকাশ পেল আমার প্রথম বই 'তরমুজ পাগলা ও অন্যন্য গল্প' ।
নৈঃশব্দের মধ্যে রচনা । তাই হয়তো শব্দের মধ্যে খেয়ালিপনা । সবাই প্রশংসা করলো । আবার বললো কিছুটা আলাদালিটি আছে । লেখক একটা জায়গায় নিয়ে লেখাগুলো ছেড়ে দিয়েছেন । সমাজ এবং পাঠককেই যেন উত্তর খুঁজতে উদ্ভুদ্ধ করেন । নীরবতার জগত প্রায়শই অসামাপ্ত থাকে । মন এলোমেলো ছুটে । মনজ শব্দও তখন প্রচলিত নিয়ম মানে না । কেমন যেন এলোমেলো হয়ে পড়ে । তাই বইটি গল্প না হয়ে স্মৃতির কোলাজ হয়ে গেছে । সেই লেখার শুরু । তারপর লিখে যাচ্ছি । এখন আমি বারটি বইয়ের গর্বিত পিতা । প্রথমে 'আজকের ফরিয়াদ' পত্রিকায় লিখতাম । অতিথি কলামে । এরপর লিখতে শুরু করলাম ত্রিপুরা ইনফোডটকমে । মূলতঃ ইংরেজিতে । পাশাপাশি দ্বিতীয় বই লেখায় মন দিলাম । মহাভারতের উপর গবেষণাধর্মী উপন্যাস, 'Bridging Souls, a Journey from Mahabharata to Bharata' ইংরেজিতে । মনে আছে অফিস থেকে বিশ দিনের ছুটি নিয়েছিলাম । কারণ দেখিয়েছিলাম ছেলের পরীক্ষা । কি করে জানি বড় সাহেবের কানে গেল আমি বই লিখছি । একদিন ফোন এলো, 'শুনা হ্যা, তু কীতাব লিখনে কে লিয়ে ছুটি লিয়া?'
আমি বললাম, 'জি স্যার, কৌশিশ কররহা হু।'
ওনার কথার মধ্যে কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্য ভাব ছিল । সেটা আমাকে আঘাত করলো । আমি ছুটির মধ্যেই বইটি লিখে শেষ করলাম । পরে সেই সাহেবও আমার বইটির খুব প্রশংসা করেছেন । বেশ কয়েকটি কপি গিফ্ট হিসেবে ভারতের বাইরে পাঠিয়েছেন । এরপর মুখবইতে লিখতে শুরু করলাম । প্রতিদিনই কিছুনা কিছু লিখতাম । একেক সময় অবাক হই আমার মধ্যে এতো লেখা ছিল ! বইয়ের আকারে যা বেরিয়েছে তার বাইরেওতো প্রচুর অপ্রকাশিত এদিক সেদিক ছড়িয়ে আছে । কিছু অসমাপ্ত । কেন লিখি ? অর্থের পেছনে জীবনে কখনও ছুটিনি । এরজন্য আমি ঋণী পারিবারিক শিক্ষার কাছে । আমি যথেষ্ট স্বচ্ছল । যখন স্বচ্ছল ছিলাম না তখনও নিজেকে কখনও অসহায় মনে হয়নি । বরঞ্চ, 'মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোই, সমাজের আসল রূপ দেখতে পায়', হুমায়ুন আহমেদের এই উক্তিটি মনে আসে । নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয় । সুযোগ পেলেই অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করার প্রয়াস নেই । লেখালেখির জন্য কাচামাল ।
আমি বিজ্ঞানের ছাত্র । হায়ার সেকেন্ডারির পর বাংলা কিংবা ইংরেজি নিয়ে পড়িনি । আমাদের পারিবারিক পরিবেশ হয়তো সেই দীনতা ঘুচিয়ে দিয়েছে । ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে বাংলা এবং ইংরেজির অর্থ বই নিষিদ্ধ । রেফারেন্স বই যতখুশি সংগ্রহ কর । পড়ার বইয়ের বাইরে গল্পের বই পড়লেও সেরকম বকুনি মিলতো না । বাড়িতে জন্মদিন পালন হত । অনারম্বর ভাবে । পছন্দসই মিষ্টির কোন পদ । পিড়িতে বসিয়ে বড়রা আশীর্বাদ করতেন । উপহার হিসেবে গল্পের বই মিলতো । হয়তো সেদিনই অবচেতনে নিজের নাম একদিন ছাপার অক্ষরে দেখার বাসনা প্রোথিত হয়েছিল । এর সঙ্গে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে দুইজন শিক্ষকের উপস্থিতি । প্রদীপ চৌধুরী । স্যার এখন না ফেরার দেশে । তিনি ছিলেন হাঙ্গরি জেনারেশনের কবি । আমার অ্যালমামেটর বি বি আই-তে আমাদের ইংরেজি পড়াতেন । তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ব্রাউনিং, টেনিসনদের কবিতার একাধিক ভাবার্থ তুলে ধরতেন । আবার সবগুলো মনে হতো বাস্তব কল্পনা । প্রচলিত রেফারেন্স বইয়ে এইসব খুঁজেও পাওয়া যেত না । স্যার খুব দ্রুত কথা বলতেন । ঠিক করে নোটস নেওয়া যেত না । তবে যতটুকু গ্রহন করতে পারতাম, তা পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট থাকতো । ভীষণই মুডি মানুষ ছিলেন ।
প্রদীপ স্যারের পরিপূরক ছিলেন পীযূষ রাউত স্যার । তখনই প্রতিষ্ঠিত কবি । তিনি আমাদের বাংলা পড়াতেন । প্রথমেই জোর দিতেন গদ্য বা পদ্যটিকে আদ্যপান্তো পড়ার উপর । তারপর বোর্ডের প্রশ্নের ধারা অনুযায়ী বাস্তবমুখী শিক্ষা দিতেন । স্যারের ক্লাসের একটি অংশ থাকতো সাহিত্যের আলোচনা । একদিন স্যারকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি পড়িয়ে শুনিয়েছিলেন । বুদ্ধদেব গুহ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বনফুলের মত সাহিত্যিকদের সম্পর্কে অনেক কথা স্যারের কাছ থেকে শুনতাম । বনফুল আমার প্রিয় সাহিত্যিক । বনফুলের লেখার প্রতি আগ্রহ সম্ভবতঃ স্যারই আমার মধ্যে জাগ্রত করেছিলেন । প্রিয় লেখকদের লিখনশৈলী এবং বিষয়বস্তু আমাদের প্রভাবিত করে ।
লেখালেখি আমাদের যশ এনে দেয় । যশের জন্য লেখক লেখেন । কথাটি হয়তো অনেকাংশে সত্যি । বছর তিনেক আগে আমার লেখা 'নাম রেখেছি বনলতা' সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন স্মৃতি পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয় । শেষ পর্যন্ত আমি পুরস্কারটি পাইনি । কারণ লেখালেখির জন্য আমি দপ্তরের অনুমতি নেইনি । সেবছর কেউই ওই পুরস্কার পায়নি । আমি তখন একটি প্রশিক্ষণে ছিলাম । কিছুদিন লেখালেখি বন্ধ করে বইটির ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেছিলাম । সেই অনুবাদ অর্ধসমাপ্ত । আমি নিশ্চিত যে এই বই ইংরেজিতে যখন বেরুবে তখন বড় কোনও পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে । ত্রিপুরার গ্রাম-পাহাড় ঘুরে দেখার সুযোগ হয়তো অনেকে পাবে । আমি যা লিখে গিয়েছি, তা ঘটমান অতীত । ফিরে দেখার সুযোগ নেই ।
পুলিশ অফিসার হিসেবে লিখতে গিয়ে স্বামী বিবেকান্দের একটি বাণীতে প্রেরণা পাই, "এই পৃথিবীতে যখন জন্মগ্রহণ করেছ, তখন কিছু স্থায়ী কীর্তি রেখে যাও। অন্যথা প্রস্তর ও বৃক্ষসমূহ থেকে তোমার পার্থক্য কোথায়!..বস্তুতঃ তাদেরও অস্তিত্ব আছে, তারাও ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং তাদেরও বিনাশ ঘটে।"
কি লিখি? পুলিশের কাজের অভিজ্ঞতা লেখালেখির রসদ যোগায় । সাথে কাজের সুবাদে প্রচুর লোকজনের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে । বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কল্পবিজ্ঞানের প্রতি আমার বরাবরই আগ্রহ । তাই অনেক লেখায় বিজ্ঞানের ছাপ থাকে । আমার অজান্তেই মহাভারত এবং পুরাণ আমার মনের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে । পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ থেকে শুরু করে সমসাময়িক কবিদের কবিতাও পড়ি । লোক সঙ্গীত আমার ভালো লাগে । তাই আমার লেখায় ঘুরেফিরে এইগুলির ছাপ পড়ে । ভূত আমি নিজে কখনও চাক্ষুস করিনি । ভূতের গল্প কয়েকটি লিখেছি । তবে গুনমান সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী নই । মান্নাদের কথায় 'প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রেম আসে'। আমার জীবনেও প্রেম এসেছিল । আবার চলেও গেছে । অনেকটা বিবর্ণ । 'দেখি তার বিরহী মূর্তি বেহাগের তানে, সকরুণ নত নয়ানে ।' প্রেমের গল্পও লিখি । তবে বৈচিত্র্য নিয়ে নিজেই সন্দীহান । তুলনায় ভ্রমণ কাহিনী সহজেই উৎরে যায় । সবশেষে এবারের আমার অসুস্থতা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে । প্রায় দেড়মাস বাইপাস সার্জারি এবং এর পরবর্তী সমস্যার জন্য ব্যাঙ্গালুরুর নারায়ণ হৃদয়ালয়ে কাটিয়ছি । মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি । আধুনিকতার পাশাপাশি দায়বদ্ধতার অভাব নজরে এসেছে । এইসবকে পূজী করে আগামী দিনে একটি উপন্যাস লেখার ইচ্ছে রয়েছে ।
(Yet to be edited)
0 মন্তব্যসমূহ