কী লিখি কেন লিখি সুভাষ দাস

কী লিখি কেন লিখি 
সুভাষ দাস
 

কী লিখি, কেন লিখি, কবে কখন কী নিয়ে লিখতে শুরু করেছি, কিভাবে লিখি, কেন এখনও লিখে যাচ্ছি  --- এসকল প্রশ্ন সমূহের উত্তর এক কথায় দেওয়া মুশকিল, অন্তত আমার ক্ষেত্রে। প্রত্যেক মানুষেরই এবিষয়ে একান্ত নিজস্ব একটা ন্যারেটিভ বা বিশ্লেষণ আছে। কারণ প্রত্যেক শিল্পী বা লেখক, ছবি আঁকেন বা লেখেন, তাঁর  ভিতরের তাগিদ থেকে। 
এ প্রসঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'লেখকের কথা' বইটির 'কেন লিখি' পরিচ্ছদটির প্রথম লাইনটি এখানে উল্লেখ করতে চাই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে বলেছেন -- "লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে যে-সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানাবার জন্যই আমি লিখি "। কথাটি শুধু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, আমার মত একজন অতি নগন্যের ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনি অন্য অনেকের ক্ষেত্রেও একটি সাধারণ সত্য বলে আমার বিশ্বাস। 
খুব ছোট বেলায় বাড়িতে মা, বাবা, ঠাকুরদা বা গ্রামের বড়দের মুখে রামায়ণ, মহাভারতের নানা কাহিনি শুনতাম। সে-সব কাহিনি শুনে শুনে আমার শিশু মনে এক ধরনের স্বপ্ন-তরঙ্গ সৃষ্টি হতো, কল্পলোকের ভাবনা তৈরি হতো। সে-সবের প্রকাশ ঘটতো ছবিতে। রঙিন পেন্সিল দিয়ে সাদা কাগজের উপর আঁকতাম গৌর নিতাই, বংশীবাদনরত শ্রীকৃষ্ণ, যুগল রাধাকৃষ্ণ ইত্যাদি নানা দেবদেবীর ছবি। সেগুলো ঘরের বেড়ায় ঝুলিয়ে দিয়ে, অন্যকে দেখিয়ে, খুব আনন্দ পেতাম। আর একটু বড় হয়ে আঁকতে লাগলাম নদী, আকাশ, চাঁদ, গাছগাছালি, পাখপাখালি, ফসলের ক্ষেত --  নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য। তারপর আরও বড় হয়ে কলেজে এসে আঁকতে ভালো লাগতো জনজীবনের নানা ছবি -- মাঠে কাজ করা কৃষক, কোদাল চালানো মজুর  -- এ-সব। দেবদেবী থেকে প্রকৃতি, প্রকৃতি থেকে জীবন --- - ছবি আঁকার ক্ষেত্রে অজান্তেই এই যে বিবর্তন আমার মধ্যে ঘটে গেল --- আমার বিশ্বাস এটা ঘটেছে আমার কল্পনা তরঙ্গের মধ্যে বস্তু জীবনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলে। 
আমার লেখার ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা সত্য। স্কুল জীবনে অলস বিকেলে বাড়ির পাশে গোমতী নদীর পাড়ে বসে কবিতা লেখা, বর্ষণমুখর দুপুরে কলেজ লেকের অনিন্দ্য সৌন্দর্যের রূপ রচনা অথবা শিক্ষক জীবনে 'যজ্ঞেশ্বরের ঘরে ফেরা'র মত গল্প লেখার মধ্য দিয়ে লেখার ক্ষেত্রে আমার মনোজগতের ভাবনা ধারাটি বিবর্তিত হয়েছে, পরিক্রমিত হয়েছে। লেখার কাজটাও ভ্রমণের মতোই। এ-পথে উত্থান আছে, পতন আছে, বাঁক আছে। শিল্পী বা লেখকের ভিতরে যে শৈল্পিক সত্তাটি থাকে, যে নন্দন চেতনাটি থাকে -- বস্তুবাদী দর্শন বলে  -- সেই 'aesthetic sense is not inborn, but a socially acquired quality.' 'চিন্তার আশ্রয় মানসিক অভিজ্ঞতা ' ---  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কথাতেও ---  সেই একই কথার প্রতিধ্বনি দেখতে পাই। এ-প্রসঙ্গে মার্ক্সীয় ভাবনাটি স্মরণ করি, যেখানে যথার্থই বলা হয়েছে যে -- " মানুষের চেতনা তাদের সত্তাকে নির্ধারণ করে না বরং উল্টো তাদের সামাজিক সত্তাই তাদের চেতনাকে নির্ধারণ করে।"
আজকে পরিনত বয়সকালে এসে এটুকু সত্যকে অনুধাবন করতে পারছি যে আমি যা লিখছি বা লেখার চেষ্টা করছি ---- কবিতা, ছড়া, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ -- যা কিছু --- সব কিছুর মধ্যেই আমি আমার অন্তর -আত্মা, আমার সৃজনী-আত্মাকে নিয়োজিত করছি এবং আমার সকল সৃষ্টিই আমার আপন অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সূত্রবদ্ধ। 
সর্বশেষে আবারও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণ নিয়ে বলতে চাই যে -- "জীবনকে আমি যেভাবে ও যত ভাবে উপলব্ধি করেছি অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ভাগ দেওয়ার তাগিদে আমি লিখি।"
          ------------------

পরিচিতি
------------
জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৮ নভেম্বর। অধুনা বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার আলিয়ারা গ্রামে। বাবা ও মা যথাক্রমে প্রয়াত হরেন্দ্র কুমার দাস ও চপলা রাণী দাস। 
প্রাথমিক পড়াশোনা বাংলাদেশে নিজ গ্রামের স্কুলে। সম্পত্তি বিনিময় করে এদেশে আগমন। মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা ত্রিপুরার অমরপুরে। এমবিবি কলেজ থেকে ষান্মানিক স্নাতক। বিএড এবং সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা লাভ। কর্মজীবনের শুরুতে সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা। ১৯৮২ সনে টিসিএসে যোগদান। অতিরিক্ত জেলা শাসকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ। পরবর্তীকালে তথ্য সংস্কৃতি পর্যটন দপ্তরের অধিকর্তা এবং ত্রিপুরা ক্ষুদ্র শিল্প নিগমের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন। 
লেখা ছাড়া প্রিয় বিষয় নাটক, ভ্রমণ, লোক গান, আড্ডা। এছাড়া 'আরশিনগর' লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ