কী লিখি কেন লিখি
সর্বাণী দত্ত
কী লিখি কেন লিখি
সর্বাণী দত্ত
কবি-সংগীতশিল্পী। কৃষ্ণনগর, ভারত
বাবা শ্রী শীতাংশু কুমার পোদ্দার এবং মা আরতি পোদ্দারের তৃতীয় সন্তান আমি, আমার উপরে দুই দাদা, নিচে বোন আর ছোট ভাই। বোন বেঁচে নেই শশুর বাড়ির অবহেলাতেই সে পৃথিবী ছেড়েছে। বাকি আমরা এখন চার ভাইবোন।
লেখক হিসাবে একটা মনোভাব ছিল বটে, স্কুল ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম একটি ছোট গল্প তখন ক্লাস টেন। লেখাটি ম্যাগাজিনে স্থান পেয়েছিলো কিনা জানিনা
গানটা বরাবর আমার সাথেই ছিল, এছাড়াও নৃত্যনাট্য, নাচ, যোগব্যায়াম এ ও আমার ভালো দক্ষতা ছিল সেইসময় স্কুলে। কলেজেও করেছি তবে যোগব্যায়াম কলেজে করিনি বাড়িতে চর্চা করতাম এগুলো সবটাই ভালোবাসা থেকেই করতাম। ভাই বোন সকলকে সাথে নিয়েই থাকতাম সবসময় সাথে সঙ্গীত চর্চা এবং পড়াশুনা.
বাকি সময় মায়ের সাথে সাহায্য করাটাও আমার একটা রেওয়াজ বলতে পারেন। কিন্তু সেই সময় গুরুত্ব দিয়ে লেখার কথা কখনো ভাবিনি, লজ্জা করতো তাই কেও জানতো না। শুধু মাথায় ছিল জীবনে কিছু করি বা না করি নিজের জীবনের কথা লিখে যাবো এটা ছিল সংকল্প। কারণ প্রচুর ঝড় ঝাপটা র মধ্যে দিয়েই ছোট থেকে বড় হওয়া তারপর স্কুল- কলেজ বিয়ে সবটাই যেন দমকা হাওয়ার মতো ঘটেছে, সুস্থ ভাবে কিছুই ঘটেনি। বিবাহিত জীবনে এসে চড়াই উৎরাই এর মধ্যেই দুটি কন্যা সন্তানের মা হওয়া এবং তাদের সামাজিক ভাবে বড় করে তোলা এই মানসিকতা সাথে নিজের ভালোলাগা বা ভালো থাকার জন্য একটু অবসর সময়ে কাজের ফাঁকেই গানের চর্চা।
শান্তি নেই মনের সাথে জীবনের যুদ্ধ চলছে অবিরত!রাতে ঘুম নেই দিনে শান্তি নেই। ভীষণ মনকষ্ট যন্ত্রনা আর লুকিয়ে কান্না এমতাবস্থায় ছোট মেয়ে জন্মানোর পর একদিন আমার ভাই একটি লেখা এনে দিয়ে বললো সুর কর দেখি কেমন শিখেছিস!কথা টা ছিল "আজি এ রাতে আনন্দেতে হয়েছি তন্দ্রাহারা, আমায় নিয়ে জেগে আছে মধ্য রাতের তারা "। ভালো লেগে গেলো তখনি সুর করে দিলাম, কিন্তু কোনো আর্টিস্ট এখনও গায়নি। আমার কাছেই থেকে গেলো গানটা। রেওয়াজে ছিলাম তখন, কাজটা করে খুব খুশি হয়েছিলাম কিন্তু ভয় ও করছিলো কারণ কে কি বলবে সেই ভয়। এই ভাবে বেশ কিছুদিন কাটার পর যখন ছোট মেয়ের বয়স প্রায় দশ বছর, বড় মেয়ে বড় কলেজে ভর্তি হয়েছে। একটি ছবির কাজের গান নিয়ে আমার কাছে আসেন বললেন সুর করুন নায়ক-নায়িকার লিপে যাবে। বললাম এতো ছোট গান!তাছাড়া আমি পারবো কিনা জানিনা. কিন্তু আমার ছোট থেকে হারতে শিখিনি
যে কোনো কাজ যদি আমার মনের মতো একবার পাই তো চেষ্টা করবো তারপর যা হয় হবে
বললেন বাকিটা আমায় বসিয়ে নিতে কোথাও অসুবিধা হলে। সুর করতে গিয়ে যেখানে আটকেছে দুটো করে লাইন বসিয়ে
চারটে লাইন যুক্ত করলাম। সুর কমপ্লিট হলো উনি ভীষণ খুশি আমাকে দিয়ে রেকর্ড ও করিয়েছিলেন কিন্তু ছবি করা আর হয়ে ওঠেনি ওনার কোনো সমস্যা র কারণে।
আমি একটা কম্পিউটার সেন্টার এ কাজ নিয়েছিলাম, সেখানে অবসর সময়ে আমি বাংলা টাইপ শিখে প্রাকটিস করতাম বিভিন্ন রকম অভিব্যক্তি/প্রতিবেদন মূলক কিছু লিখে। বাড়ি থেকে খাতা নিয়ে গিয়ে সে গুলো তুলে আনতাম, কিন্তু ওখানকার কেও টের পেতো না। উল্লিখিত ব্যক্তি আবার একদিন বললেন আকাশ বাণীতে প্রত্যহিকী তে আপনার লেখা দিন ওরা নেবে যদি মনোনীত হয়। ওরা টপিকের শিরোনাম দিয়ে দিতো তার উপরে লিখতে হবে। রাজি হলাম "হে সখা মম হৃদয়ে রহ "। পড়ে বললেন লেখা চালিয়ে যান। কোনো কোনো জায়গাতে উনি ওই লেখাটা নিজের বলে চালিয়েছেন সেটা উনি স্বীকার করেছেন আমার কাছে। কেন করেছেন জানিনা। আমার আস্থা ছিল নিজের উপরে যে যেকোনো লেখা আমি আমার কাছে রেখে তারপর দিতাম তাই ওসব নিয়ে ভাবতাম না। কিছুদিন পরে সেই সেন্টার ও বন্ধ হয়ে গেলো, অগত্যা কি করি!খুব মন খারাপ হলো। লেখা বন্ধ হলো, বাড়িতে কেও জানতো না যে আমি এগুলো করি, আমি জানাই নি কারণ কখনো আমার এগিয়ে চলার কোনো ব্যাপারে আমি আন্তরিক সহযোগিতা বা সহমত কেও দেখায় নি উল্টে নানারকম উপহাস করতো এটা আমার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক,সেকারণে সম্পূর্ণ গোপনেই আমি এগুলো করেছি. কিন্তু এখন!আবার অবসাদ যন্ত্রনা কাটিয়ে উঠবো কিভাবে!তবুও আমাকে এগোতে হবেই. কিছু কিছু সময় ভীষণ ভেঙে পরতাম
মনে হতো আর বাঁচবোনা
কিভাবে এই যন্ত্রনা দূর করবো!অহরহ কেঁদে চলেছি সেই খবর ও কেও রাখেনি। মনে হলো আমার একজন পরম বন্ধু চাই কিন্তু কোথায় পাবো? যাকে আমার কষ্টের কথা বলে হালকা হতে পারি। কিন্তু নাঃ!এর জন্য যদি কেও সুযোগ নেই জীবন আরো বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবে
কোথায় পাবো আমার সেই বন্ধু!যার সাথে শেয়ার করতে পারবো আমার এই যন্ত্রনা কে হবে আমার দুঃখের অংশীদার!দিনটা মনে নেই রান্না করছিলাম খুব কাঁদতে কাঁদতে মুহূর্তে মনে হলো আমি লিখবো, লেখায় আমার পরম বন্ধু কারণ এই মনুষ্য জগতে মান আর হুঁশ বহির্ভুত মানব দেহধারী সব কঙ্কাল আছে যারা আমার এই দুঃখের কথা জানতে পারলে আমার জীবনকে আরো বিষময় করে তুলবে ঘরে খাতা ছিল আমার কাছেই বের করলাম গ্যাস কমিয়ে চলে এলাম ঘরে কলম ধরলাম এই আমার লেখার শুরু বলতে পারেন আমার লেখার অনুপ্রেরণা আমার দুঃখের দিন আমার অভিজ্ঞতা আমার প্রেরণা আমার বন্ধু আমার খাতা কলম। চোখের জল আর বিবেক আমার গুরু।
এইভাবেই দিনের পরে দিন লিখেছি আর বালিশ চাপা দিয়ে রেখেছি কেও টের পায় নি। গুটি পায়ে এগিয়েছি। বেশ লেখা জমে গেলো, কর্ম সংস্থান দেখতে গিয়ে লেখা প্রকাশের একটি বিজ্ঞাপন চোখে পরলো হাওড়া বঙ্গপ্রদেশ পত্রিকা, ফোন করলাম বললেন ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে। অল্প কিছু টাকা লাগবে বই কিনতে রাজি হলাম বললাম অনুষ্ঠানে যাবো তখন টাকা দিয়ে বই কিনে আনবো সহমত জানালেন সম্পাদক শ্রী অংশুমান ফাঁদিকার। উনি সাংবাদিক এবং আইনজীবী ওনার নিজস্ব পত্রিকা।সময়ে বই হাতে পেলাম বারবার দেখছি কত গুণী জনের লেখার মধ্যে আমার মতো পরে থাকা ঘরকুনো একজন নগন্য মানুষের লেখা স্থান পেয়েছে। খুশিতে ভরে গেলাম কিন্তু সেটাও অপ্রকাশিত। উৎসাহ পেলাম আমার গানের দিদি মাননীয়া শ্রীমতি মহুয়া গুহর আন্তরিক স্বীকৃতি ও আশীর্বাদ, আমার থেকেও উনি বেশি খুশি হলেন, কিন্তু আবেগ আনন্দ সবটাই গোপন রয়ে গেলো। আমাকে লক্ষে পৌঁছুতে হবে সেই অপেক্ষা কেবল!
বই মেলায় গেছি একটি লালনের বই দরকার অডিশন এর জন্য পাচ্ছিনা। অনেক ঘুরে বেরোনোর মুখে একজন বললেন দিদি বই নিন. জিজ্ঞাসা করলাম লালনের বই আছে? ওরা সম্মতি জানিয়ে একটি বই আমার হাতে তুলে দিলেন প্রকাশক নিজে। কত দাম জিজ্ঞাসা করাতে বললেন একশো টাকা, আশাহত হলাম, বললাম এইমাত্র খুঁজে না পেয়ে গীতাঞ্জলি কিনলাম দাদা। আমার কাছে মাত্র আশি টাকা আছে, অথচ আজকেই মেলার শেষ দিন। লেখক পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন উনি বললেন দিদিকে বইটি দিন, নিলাম মনে হলো স্বীকৃতি পেলাম বোধহয়। ওরা আমাকে ফোন নাম্বার দিয়ে বললেন আগামী মাসে ওনাদের পত্রিকা র অনুষ্ঠান হবে আমি যেন অবশ্যই যাই। ভালো লাগল আমন্ত্রণ পেয়ে। কথা দিলাম থাকবো। "কথা সাহিত্য পত্রিকা "র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম। ওরা আমাকে মঞ্চ দিলেন প্রথমেই, মনে হলো পূর্ণ হলাম। কবিতা পাঠ করে যখন নেমে এলাম কয়েকজন এসে বললেন ম্যাডাম নাম্বার টা দিন, ডাকলে আসবেন তো আমাদের অনুষ্ঠানে? সম্মতি জানালাম, এই আমার পথ চলার শুরু লেখার জীবনে। সঙ্গীত আমার জন্মলগ্ন থেকেই বলতে পারেন কিন্তু ডাক আদর এবং সম্মান পেয়েছি লেখাতে একথা বলতে বাধা নেই, গানের জীবনে অনেক বাধা এসেছে। বন্ধুর মতো সাথে আছে। এরপর কলকাতা বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ হয়ে সাহিত্যানুষ্ঠান গুলোতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। গুটি গুটি পায়ে প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করার একটা সাংঘাতিক সংগ্রাম আমার মধ্যেই এখনও চলছে।
কিছুদিনের মধ্যেই এন্ড্রয়েড ফোন হাতে পাওয়াতে আমার লেখার বিস্তৃতি ঘটে বাংলাদেশ মাগুরার মাননীয় তপন কুমার তপু এবং ঢাকার বিশিষ্ট কবি-গবেষক মাননীয় ডঃ তপন বাগচী মহাশয়ের আমন্ত্রণে কাটাখাল এবং ঢাকা শিশুপার্কে গানের অনুষ্ঠানে সম্বর্ধিত হওয়া এ আমার জীবনের পরম পাওয়া।
বর্তমানে প্রায় সারাবছর ধরেই আমার লেখা বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়া মিলে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় যায়। এখন আমি আমার অবসাদ জীবন অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। সূর্য মধ্য গগনে, কিন্তু এই সময়ের দীর্ঘ যাত্রা পথের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া সম্ভব নয়, সংক্ষিপ্ত ই থাকুক।
আমি প্রথম সম্মাননা পুরস্কার পাই 2017ই বিশ্ববঙ্গ বাংলা সাহিত্য একাডেমি কর্তৃক যুথিকা পত্রিকার মাধ্যমে উপাধি সম্মাননা(কাব্যসুধাকর সর্বমঙ্গলা দত্ত)আমার পুরো নাম। সর্বাণী আমার ডাকনাম। এরপর হ্যালো কলকাতা, বঙ্গরত্ন, মেদিনীপুর থেকে স্মরক সম্মান, কবি সম্মান স্মরক, ত্রিনয়নী পত্রিকা থেকে সম্বর্ধনা ও স্মরক সম্মান লাভ, শুভেচ্ছা স্মরক, নলেজ সিটি থেকে কবি সম্মাননা, পূর্ব ভারত বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ থেকে সংবর্ধনা ও স্মরক সম্মান, ঢাকা বাংলাদেশ থেকে ঋষিজ স্মরক সম্মাননা, জোডিয়াক মিউজিক থেকে অমিতাভ বচ্চনের উপরে পাঁচশত শব্দের উপরে লিখে অনারেবল স্মরক সম্মাননা। এগুলো আমার জীবনের বিভিন্ন দিক প্রসারিত ঘটায়। ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানায় তাদেরকে যাঁরা আমাকে এই জায়গাতে যাওয়ার এবং অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ভবিষ্য তেও আশা রাখছি। আগে আমাকে যারা জানতেন না মিডিয়ার মাধ্যমে এখনআমার লেখক হওয়ার বিষয় টি সকলেই প্রায় জানেন।
বর্তমানে আমার দুটি কাব্যগ্রন্থ... ১/সিদ্ধা, ২/অনন্যা এবং একটি যৌথ সংকলন চোদ্দ জন লেখকের সমন্বয়ে প্রকাশিত সেখানে আমার লেখা স্থান পেয়েছে। আশা রাখি আগামীতে পাঠক বৃন্দের আশীর্বাদে আবারো প্রকাশ করার সুযোগ পাবো বলেই আশাবাদী।
" কলম জানে লিখতে ভালো
চলে আপন ছন্দে
ভালো মন্দ বুক উঁচিয়ে
আপন আলোর গন্ধে।।"
"চলতে চলে পথ দীর্ঘ হবে যেই
অনন্ত দিগন্তে মিশে যাবে নিমেষেই
স্থূল আর সুক্ষ সব ই বোঝা ভার
সুক্ষ যদি কখনো নেই
স্থূলের আকার।। "
0 মন্তব্যসমূহ