কী লিখি কেন লিখি মহসিন আহমেদ

কী লিখি কেন লিখি 

মহসিন আহমেদ

কী লিখি কেন লিখি 

মহসিন আহমেদ

কবি-গীতিকবি
বস্তুবাদকে অতিক্রম করে কল্পলোকে অবগাহন করি অহর্নিশি মহসিন আহমেদ মানুষ মাত্রই অতৃপ্ত। এই অতৃপ্তিই মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, নতুন নতুন স্বপ্ন দেখায়, বোধের সঞ্চার ঘটায়। ভালো থেকে ভালো কিছু করার প্রেরণা যোগায়। এমনই এক অতৃপ্ত মানুষ আমি। কী লিখি তা জানি না। তবে, যা লিখছি তার থেকে প্রতিনিয়ত ভালো করার আরাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত রাখি। জাগতিক বস্তুবাদকে অতিক্রম করে কল্পলোকে অবগাহন করি অহর্নিশি। বিচিত্র এই পৃথিবীতে একেকজন একেকভাবে আত্মতৃপ্তি খোঁজে। আমি সেই তৃপ্তি খুঁজি অজানাকে জানার মধ্যে, নশ্বর পৃথিবীর জাগতিক উপকরণ নিয়ে মনোজগতের অদৃশ্য আলো দিয়ে নতুন কিছু নির্মাণ করার মধ্যে। একদিন কবি খ্যাতি পাবো এই ভেবে লিখি না। শুরুটা ছিল শুধুই ভালো লাগা থেকে। শৈশবে পাঠ্য বইয়ে আহসান হাবীবের "স্বদেশ" বন্দে আলী মিয়ার "আমাদের গ্রাম" আল মাহমুদের "নোলক" পড়ে কবিতায় চিত্রিত দৃশ্যের সন্ধানে একেরপর এক গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। "এই যে নদী/ নদীর জোয়ার/নৌকা সারে সারে,/একলা বসে /আপন মনে/বসে নদীর ধারে/এই ছবিটি চেনা।/" এই দৃশ্য খুঁজতে নদীর কাছে গিয়ে মনে হয়েছিল কবি আমার গ্রামের ছেলে ছিলেন। তিনি এখানে বসেই হয়ত এই কবিতা লিখেছেন। তিনি আমার কত আপন! বন্দে আলী মিয়ার "আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর / থাকি সেথা সবই মিলে নাহি কেহ পর/ পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই/ একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই / মনে হয়েছিল তখন এই কথাগুলো কবি হয়ত আমাদেরকে দেখেই রচনা করেছেন। আল মাহমুদের "নোলক " পড়ে মনে হয়েছিল আমি যেন সেই ছেলে যার মায়ের নোলক হারিয়ে গেছে, আর আমি সেই নোলক খুঁজতে কল্পনায় কতই না জায়গায় গিয়েছি। এমন আরও অনেক কবিতা আমাকে গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। সেই থেকেই কবিতার প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্ম হয়। পাঠ্য বইয়ের বাইরে প্রথম যে বইটি পড়েছিলাম সে বইটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের "রিক্তের বেদন "। বইটি সংগ্রহ করেছিলাম বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে। বইটি পড়ে রীতিমত বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার প্রথম প্রেরণা নজরুল। নজরুলের জীবন ও কর্ম পাঠ করে উজ্জীবিত হয়েছিলাম। নজরুল যদি এত ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে বিশ্বজয় করতে পারে, তাহলে আমি কেন সে পথের একজন সাধারণ পথিক হতে পারব না। এই ভাবনা থেকেই লেখালেখি শুরু। খুব করে ভেবেছি নশ্বর পৃথিবী থেকে কেউ কিছু নিয়ে যেতে পারে না। কিছু দিয়ে যেতে পারলে মানুষ মনে রাখবে। আর তা না পারলে মানবজীবন অর্থহীন। হৃদয়ের শুদ্ধতম ঐশ্বর্য লিখে দিয়ে যেতে পারলে হয়ত মানুষ মনে রাখবে। এই উপলব্ধি আমাকে জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দেবার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সেই থেকে ভালো ভালো বইয়ের সন্ধানে ছুটেছি প্রতিনিয়ত। কিন্তু, লিখতে গিয়েই ভয়ানক ভাবনায় পড়ে গেলাম। ভাবতে থাকলাম কবিতার প্রতিটি লাইন কীভাবে সমান হয়। একদিন সাহস করে বাংলার শিক্ষককে প্রশ্ন করলাম, স্যার, কবিতার প্রতিটি লাইন কীভাবে সমান হয়? তিনি আমাকে ঠিকঠাক বুঝিয়ে বলতে পারলেন না। তখন আমি নিয়মিত বাংলাদেশ বেতার শুনতাম ও মাঝেমাঝে পত্র লিখতাম। শুক্রবারে কলকাকলি অনুষ্ঠানে রানারের ঝুলিতে ছড়া পাঠাতো অনেকে। আমিও ওসব শুনে শুনে ছড়া লিখে পাঠাতাম। খুব প্রশংসা পেতাম। তখন ছন্দটা ভালো করে শেখা হয়নি। একদিন বেতারে "বেতার বাংলা " পত্রিকায় লেখা দিতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক খালেক বিন জয়েনউদদীনের সাথে পরিচয় হয়। তিনি রানারের ঝুলি সম্পাদনা করতেন। তিনি পরিচয় জেনে আমার লেখার খুব প্রশংসা করলেন ও এ-ও জানালেন তিনি ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরও সম্পাদনা করেন। ইত্তেফাকে যেতে ও ছড়া পাঠাতে বললেন। তারপর থেকে আমি ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরের নিয়মিত ছড়াকার। আমার ছড়া লেখার পেছনে প্রথমে খালেক বিন জয়েনউদদীন ও পরে ফারুক নওয়াজের অবদান সবচেয়ে বেশি। আর তখনও ভাবিনি লেখালেখি করে এইটুকু পথ পাড়ি দিতে পারব। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে সম্ভবত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ বেতারের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে "বিনিময়" অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত গীতিকবি শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের কণ্ঠ শুনতে পাই। তারপরে ধীরেধীরে গানের কবিতা রচনার দিকে ঝুকে যাই। পরের বছর আমার মত অনেক তরুণ লেখকের আগ্রহে ২০০৮ সালে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান "বাংলা গান রচনা কৌশল" নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেই বইটি পড়ে গানের কবিতার শুদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করলাম। তখনও নিয়মিত পত্র পত্রিকায় ছড়া লিখি, মাঝেমাঝে গানের কবিতা। এরই মাঝে একদিন শাহবাগ বেতার গানের কবিতার পাণ্ডুলিপি নিয়ে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের কাছে গেলাম। সেদিন শব্দসৈনিক শ্রদ্ধেয় আশরাফুল আলম তাঁর সাথে ছিলেন। দুজনেই গানের কবিতাগুলো দেখলেন ও বেশ উৎসাহ দিলেন। তারপর থেকে ছড়া লেখা কমিয়ে দিয়ে গানের কবিতার দিকে একটু বেশি ঝুকে গেলাম। অবশ্য, তখন ছড়াকার হিসেবে অনেকটা পরিচিত হয়ে উঠেছি। এদিকে শ্রীপুর থেকে বেশকয়েকজন লেখককে নিয়ে মাসিক "আগন্তুক" নামে একটি ম্যাগাজিন বের করতে শুরু করলাম। যার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম আমি। পরবর্তীতে কবি রানা মাসুদকে সভাপতি করে শ্রীপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করে দেশের অর্ধশতাধিক শুদ্ধতম লেখককে এই পুরস্কার প্রদান করেছি, যা এখন চলমান। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছি। আমি কখনো আয়োজন করে লিখতে বসি না। কর্মস্থলে , চলার পথে যখন যেখানে ভাবনা এসে ঘিরে ধরে, তখন সেখানেই লিখে ফেলি। আমার প্রতিটি লেখাই গুনগুন সুর তুলে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। কখনো কখনো পুরো লেখাই মনে মনে সাজিয়ে রাখি, যা পরে লিখি। আমার অনেক সময় ভুলেও যাই, যা খুব কষ্ট দেয়। আমি কখনো জোড় করে লিখি না। ভেতরে গুনগুন করে প্রসবিত হলেই লিখি। একটি লেখাকে যতক্ষণ পর্যন্ত পরিমার্জন করা যায়, ততক্ষণ পরিমার্জন করি। আমি অনেক বেশি লেখায় বিশ্বাসী নই, ভালো লেখায় বিশ্বাসী। আমার সৌভাগ্য আমি লেখালেখির শুরুতেই শুদ্ধতম বেশকয়েকজন বরেণ্য লেখককে পেয়েছি। তাদের মাঝে শুরুর দিকে বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক খালেক বিন জয়েনউদদীন ও ফারুক নওয়াজ তারপরে বরেণ্য গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, কবি আবিদ আনোয়ার, কবি নাসির আহমেদ ও কবি ও গবেষক তপন বাগচীসহ আরও অনেককেই। তাদের মত শুদ্ধতম গুরু না পেলে হয়ত আমার চলা। পথ এতটা মসৃণ হতো না। একটা সময় অগ্রজদের প্রশংসামুখর মন্তব্য আমাকে গানের কবিতা লিখতে দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হই অনেকটা অল্পবয়সে। একাধারে ৩বার ডেইলি স্টার-স্ট্যান্ডার্ড চ্যার্টার্ড ব্যাংক লিরিক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। যা আমার চাওয়ার অধিক। এছাড়া এর আগেই পেয়েছি ছড়া লেখার স্বীকৃতিস্বরূপ "নক্ষত্র সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার " ইকবাল সিদ্দিকী কলেজ সম্মাননা। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা ইত্যাদি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ