কী লিখি কেন লিখি হাবীবুল্লাহ সিরাজী

কী লিখি কেন লিখি 
হাবীবুল্লাহ সিরাজী

(৩১শে ডিসেম্বর ১৯৪৮-২৪ মে ২০২১)



হাবীবুল্লাহ সিরাজী
(৩১শে ডিসেম্বর ১৯৪৮-২৪ মে ২০২১)

‘কেন লিখি’--এই প্রশ্নের উত্তর কি দেয়া যায়, না হয়! তবু কেন জানিনা এর মুখোমুখি হওয়া থেকে নিস্তার নেই। এই কেন লিখি-র সঙ্গে এসে পড়ে--কি লিখি? লিখি তো অনেক কিছু, আবার কিছুই না। আসমান লিখি, জমিন লিখি, আবহাওয়া লিখি, তল-অতল লিখি....লেখার বিষয়ের শেষ নেই, আবার প্রকারেরও প্রান্ত নেই। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনি, ছড়া থেকে মায়জীবনচিত্র পর্যন্ত লিখি। দীর্ঘ পাঁচ দশক কর্মটির সঙ্গে যুক্ত থেকেও কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিকড়টি ধ’রতে পারলামনা--এই বৃক্ষ কেন বাঁচো? শুধু বৃক্ষ কেন, প্রাণিকূল কেন বাঁচে? বাঁচার অর্থ কি? হ্যাঁ, সৃষ্টির যদি কোনো মানে হয়, তবে লেখালেখিরও একটা কার্যকারণ দাঁড়িয়ে যায়। এবং সামষ্টিকভাবে যদি কোনো ফল লাভ হয়, তবে ব্যক্তি-পর্যায়ের অভিঘাত তো তাতে থাকেই! জগত যেহেতু জীবনকে স্কন্ধে নিয়ে চলছে, কিংবা জীবন জগতকে ঘাড়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে--যা-ই হোক না কেন, গতির মধ্যে প্রকৃতি বিরাজ করে। ধ্বংসের অভ্যন্তরে যেভাবে সৃষ্টি নিহিত, তেমনি জড়ের বিপরীতে চৈতন্য জানান দেয়। যোগ ও বিয়োগের নিত্যনতুন মায়াজালে আহরিত মৎস্যসমূহও পর্যায়ক্রমে গুণ ও ভাগের ছায়াশেকলে বন্দি হয়। বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর সকল উপাদান ও প্রাণ একে-অন্যে দায়বদ্ধ। সরল ও জটিল--গোত্র এবং সূত্রের অনুগামী হয়ে যদি বলি আমার লেখা মানে--সাহিত্য সৃষ্টি, তবে বেশি বলা হলেও কম বলা হয় না। দ্বন্দ্ব ও সংশয় ঘিরে চিত্তের যে চাঞ্চল্য ও বৈকল্য--তাকে প্রশমিত করার জন্য এইসব লেখালেখি!
ব্যক্তির লেখালেখিই সামগ্রিকভাবে যখন অবস্থান ও সময়কে ধারণ করে--তখন গুণ বিশেষে সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়। সংস্কৃতি তার অন্যতম অনুঘটক হলেও,--লেখার বিষয়টি লেখককে নিয়ে, লেখকের জন্য এবং লেখকের তাগিদে ঘটতে থাকে। বিষয় ও প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখক মঙ্গল ও কল্যাণের সূত্রটিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

আমি কেন লিখি? একদিন লিখতে শুরু করেছিলাম--তাই এখনো লিখে চলেছি। সেই গত শতাব্দীর ষাটের দশকে কি খেয়ালে পাঠ্যপুস্তকের কবিতা পড়তে-পড়তে নিজেই আগ্রহী হয়ে পড়ি লেখার জন্য--তারপর তো আর থামতে পারিনি। ইতোমধ্যে নিজের পরিপাশর্^ নিয়ে তৈরি হবার আয়োজন করেছি, পাঠে ও দর্শনে বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছি নিজস্ব যুক্ততার। কবিতা দিয়ে শুরু করলেও নানা বিষয়ে গদ্য লিখেছি। অনুবাদ করেছি অন্য ভাষার রচনা। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, যে বিশ্বাসে বিন্দু স্থাপন করেছিলাম--তাতে তো আর স্থির থাকা যায়নি। বারবার সরে গেছি, নানাভাবে ভিন্ন রথে অন্য পথে চলে গেছি। ভাষা সেখানে যেমন তার গা-গতর খুলেছে, তেমনি ঘোরও পর্যায়ক্রমে বেঘোরে পরিণত হয়েছে। এই যে লেখালেখি--তা কি জন্য, কেন?
এক কথায় উত্তর: আমার জন্য। খ্যাতি।
দুই কথায় উত্তর: আপনার জন্য। অমরত্ব।
সর্বকথায় উত্তর: আপনাদের জন্য। বেঁচে থাকা আকাক্সক্ষার অংশ আর সৃষ্টি একটি মায়া, মোহতাকে প্রভাবিত করে। ‘আমি’কে‘আমরা’য় প্রকাশ করাই সৃষ্টি ধর্ম। 

মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ২৪তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৯) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ