কী লিখি কেন লিখি মুহম্মদ নূরুল হুদা

কী লিখি কেন লিখি 

মুহম্মদ নূরুল হুদা


মুহম্মদ নূরুল হুদা
জন্ম : ৩০শে সেপ্টেম্বর ১৯৪৯

এটিকে যদি একটি প্রশ্ন ধরা হয়, তাহলে আমি পুরোপুরি নিরুত্তর। এই ষাটোর্ধ জীবনেও এ নিয়ে কোনো মীমাংসায় পৌছুতে পারিনি। বাকি জীবনে যে পারবো, এমনটিও আশা করি না। তবে দায় সারার জন্যে দিতে পারি এক বৈপরীত্যমূলক উত্তর। আর সেটি হচ্ছে, কারণেও লিখি, অকারণেও লিখি। 
কারণে লিখি বললে কারণগুলো অন্ততপক্ষে তালিকায়িত করার প্রশ্ন আসে। আর অকারণে লিখি বললে তার কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। প্রায় চার যুগ আগে একবারে কবিতাকারে এই কারণগুলো বিবৃত করার চেষ্টা করেছিলাম। আজ তার কোনো কপি আমার হাতে নেই। থাকলে ভালো হতো এই যে, তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আরো কিছু কথা যোগ করা যেতো। এখন তার কোনো সুযোগ নেই। বরং এখন হয়তো এমন কথা বলতে পারি যা আগে ঠিক ভিন্নরূপ বলেছিলাম। অবশ্য তার জন্যেও কৈফিয়ৎ আছে। বয়স ও দিনযাপনের বাঁকে বাঁকে একজন ব্যক্তি ও লেখকের মত তো পাল্টে যেতেই পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটা স্বাভাবিক। 
আমিও এখানে কারণগুলো তালিকায়ন না করে যতদূর সম্ভব অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংক্ষেপে বর্ণনা করার চেষ্টা করবো। আর তার পুরোটাই যে স্মৃতিনির্ভর, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 
গ্রামের পাঠশালা, যাকে আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয় বলি, তাতে ভর্তি হয়ে বছর দুই যেতে না যেতেই পরিচিত হই ছন্দোবদ্ধ বাণীর সঙ্গে। তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বা আমাদের ছোটনদী এঁকেবেঁকে চলার কথা। শিশুমন আনন্দে নেচে উঠলো, আর একপায়ে তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যেস শুরু। কিংবা স্কুল ছুটির পরপরই সামনের ক্ষীণস্রোতা নদীতে নেমে তোলপাড় করা শুরু করলাম। সেই ফাঁকে কখন আমজাম, খালবিল, নদীনালা, চড়ুই, শামুক, লাটিমসহ প্রতিদিনের দেখা বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় খেলাচ্ছলে পদ মিলাতে শুরু করেছিলাম টের পাইনি। আমার ছোট্ট খাতার নানান পাতায় এসব পদ লিখিত হলো। আর বিপদ হলো তাতেই। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একদিন সেই খাতা আগাগোড়া উল্টেপাল্টে দেখলেন। জানি, এর পরেই সেই প্রিয় শাস্তি আসবে। আমাকে হয়তো স্যারের নির্দেশে একপায়ে তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ঘণ্টাখানেক। আর তাতে তো আমার আপত্তি নেই। এ-তো আমাদের এক প্রিয় খেলা। 
কিন্তু স্যর আমার পিঠে স্নেহের থাপ্পড় দিতে দিতে বললেন, ‘সাবাস, তুই তো দেখি এক ক্ষুদে কবি রে।’ বলেই তিনি আমার ‘মিথ্যা বলার ফল’ শীর্ষক বাঘ-রাখালের কাহিনীনির্ভর লেখাটি পাঠ করে শুনালেন সবাইকে। বললেন, মিল-টিল মোটামুটি চলে, তবে কবিতার ভিতর ছন্দ প্রয়োগটা ভালো করে শিখে নিতে হবে। তবে তুই যে একদিন কবি হবি, আমি নিশ্চিত। বলে রাখা ভালো, স্যার নিজেও কবিতা চর্চা করতেন। স্যারের এই মোহন প্রশ্রয় আমার লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। 
নিজের ভেতরে যে কারণটি ছিল সেটি অবশ্যই এক ধরনের সৃষ্টিশীল অনুকারিতার। যে গাছ দেখছি তুলির বদলে কথা দিয়ে তাকে আঁকাতেই আমার আনন্দ। অর্থাৎ যা কিছু দেখছি বা অনুভব করছি তার কথাচিত্র, বাণীচিত্র বা ছন্দচিত্র তৈরি করা। এ যেন এক অন্তহীন খেলা। খেলা আর লেখা, লেখা আর খেলা। তাই বলতে হচ্ছে করে, খেলি বলেই লিখি, লিখি বলেই খেলি। 
এভাবে চলতে চলতে আরো কিছু কারণ সামনে এস দাঁড়ায়। একসময়ে বুঝতে পারি আমার লেখাটি ভালো হোক মন্দ হোক, আমার মতোই হতে হবে। অর্থাৎ থাকতে হবে আমি-মুদ্রার ছাপ। এ-বড় কঠিন ব্যাপার। তবু সেই চেষ্টা থেকে বিচ্যুত হওয়ার উপায় নেই। তার পর আসে ব্যক্তি-আমার কারণের পথ ধরে সমষ্টি-আমার কারণ। সমষ্টি আমি মানে আমার সংশ্লিষ্টতা অন্যের সঙ্গে। অন্য ব্যক্তি, অন্য গোষ্ঠি, অন্য জাতি আর সবশেষে গোটা মানবগোত্রের সঙ্গে। তখন আমার লেখার প্রকরণের পাশাপাশি বিষয়টাও গ্রাহ্য হযে ওঠে। রচনায় নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত হয় মানবিকতা। আমার রচনার অন্বিষ্ট হয়ে ওঠে ব্যক্তিমানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্বমানুষ। মানুষের দুঃখকষ্ট, অপূর্ণতা, বিত্তবৈভব বা চিত্তসৌন্দর্য দেশকাল ও সীমানা পেরিয়ে আমার লেখার নিরীক্ষাপ্রবণ কারণ হয়ে ওঠে। এই নান্দনিক ও মানবিক সৌন্দর্যের অন্বেষণই আমার এইসময়ের লেখালেখির মুখ্য উৎস। আমি যেমন চলছি একলা, তেমনি চলছি সকলের সঙ্গেও। যে ডাক শোনে তার সঙ্গে আমি তো অবশ্যই আছি, যে ডাক শোনেনি তার সঙ্গেও আমি বিযুক্ত নই। আসলে এই যুক্ততাই আমার লেখালেখির আসল মুক্ততা। 
==============
মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ১৮তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৩) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ