কী লিখি কেন লিখি
আসলাম সানী
জন্ম : ৫ই জানুয়ারি ১৯৫৮
মানব সভ্যতার ইতিহাসের ধাপে ধাপে মানুষ তার মনের কথা স্বপ্ন-আশা, প্রেম-দ্রোহ তার সময় কালের সফলতা--কিংবা ব্যর্থতাকে তার আগামী-ভবিষ্যতের কাছে রেখে যাবার সেই আকাক্সক্ষা-দৃঢ় প্রতিজ্ঞা-অঙ্গীকার কিভাবে জানাবে? তাই পাহাড়ের গাত্রে-পাথরে-কাষ্ঠে নানাভাবে এঁকে যেতে-লিখে রেখে যেতে নানা চিত্রের সাহায্য নেয়--নানা চিহ্ন-অক্ষর-বর্ণের মাধ্যমে খুঁজে নেয়-- সেই আদিম গুহা মানব থেকে আজঅব্দি সে মহান মহৎ প্রচেষ্টাতে অগ্রগামী-সাধক-অন্বেষক। স্বপ্নদ্রষ্টা-লেখক-চিন্তক বাগবৈস্বক।
কি ধর্মগ্রন্থ-ওহি বা ঐশি বাণী মহান স্র্রষ্টা-প্রভু-ঈশ্বর-দেব-দেবী-নবী-পয়গম্বর, কি কুরআন- পুরান- বেদ- বাইবেল- ত্রিপিটক- রামায়ণ- জাবুর- তৌরাত-- এই সবই মানবমঙ্গল-কল্যাণের জীবনাচার-আনন্দ-বেদনা-প্রেম-দ্রোহের স্বপ্নবহ বার্তা-বাণী কী চর্যাপদ কী বাল্মীকি- ভুষুকু- কালীদাস- মাইকেল- রবীন্দ্রনাথ- নজরুল- জীবনানন্দ- সুকান্ত--কী জসীমউদ্দীন-বুদ্ধদেব-সুধীন্দ্র-শামসুর রাহমান--কী বিদ্যাসাগর-রামমোহন-তর্কলঙ্কার-নেতাজী-বঙ্গবন্ধু--হা এই মুিন ঋষি মহাকালজয়ী স্বাপ্নিক মানুষ লেখক-কবি কালদর্শীদের নানা উপাখ্যান-মহাকাব্যই আমার মননে মেধায় চিন্তকে-স্বপ্নে আমাকে উদ্দীপ্ত-অনুপ্রাণিত আগ্রহী-উজ্জীবিত করে। আলেড়িত-আন্দোলিত করেন আমার শুভ স্বপ্ন মানবমঙ্গলের কল্পনাকে ভাব-ভাষা-শব্দ-বর্ণ-অক্ষরে আগামীর কালে মহাকালে রেখে যেতে ভবিষ্যত প্রজন্মকে-কালকে জানিয়ে যেতে আমি অতি ক্ষুদ্র সামান্য চেষ্টা করে যাই।
যেমন সৃষ্টির সেই আদিকালে পিরামিড মমি-ইলোরা-অজন্তা- খাজুরাহ-হরপ্পা-মহেনজেদারো- বেবিলনের শূন্যউদ্যান-কর্মকীর্তি-প্রতœ-মহাস্থানগড়-মসজিদ-মন্দির-চার্চ-প্যাগোডা-গীর্জা-মঠ মাইকেল এ্যাঞ্জেলো-গগা- অবনঠাকুর-রায় যামিনী-জয়নাল-সুলতান-কামরুল আমি আমার কাব্যকথা ছড়া-পদ্যে সহজ সাবলীল কল্পজগৎ স্বপ্নজীবনযাত্রার কথামালা-বাক্য পঙ্ক্তিতে সাজিয়ে যেতে চাই যেভাবে আমার অগ্রজ-গুরুজনেরা রেখে গেছেন। পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন বিবেকবোধ সংবেদনশীলতায় ধ্রƒপদ-শিল্পসম্ভারে রেখে গেছেন-- এঁকে গেছেন লিখে গেছেন-- আমিও এভাবেই বলি-লিখে চলি-আবার জ্বলি--মুছে দিতে চাই আঁধার-অন্ধ-বাধার পাহাড় ভাঙি পূর্বসুরিদের পূণ্য বাংলাভাষায়--শহীদ সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের পবিত্র রক্তস্নাত বাংলা ভাষায়: ‘বাংলা আমার বাঙালি আমি, মহাকালের সন্তান, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, আমার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, ত্রিশলক্ষ শহীদ আমার চিরকালের শ্রদ্ধা, বাংলা ভাষায় কথা বলি আমি মুক্তিযোদ্ধা’।
এইতো এই মাটি মানুষ দেশ-কালের জন্যই লিখি-- প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কাল থেকে কালান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে, আমি শব্দ বুনে যেতে চাই আগামীর বাণী বচন-কাব্যকলা স্থাপত্য আমার ছোট্ট অনাগত পৃথিবীকে আলোকিত-উচ্চকিত করতে চাই-- ‘বীজ থেকে চারা হয়-চারা থেকে গাছ-ডিম থেকে ছানা হয়- পোনা থেকে মাছ, কুঁড়ি থেকে ফল হয়-ফুল থেকে ফল, বায়ু থেকে মেঘ হয়- মেঘ থেকে জল, শিশুরা কিশোর হয়-কিশোরই যুবক, বড়ো হয়ে পৃথিবীকে করে ঝকমক।
আমি আমার সময়ের কথা-আগামীর কাছে বলতে চাই। আমার সফলতা-ব্যর্থতা- গৌরব-অহংকার বা আমার ক্ষোভ-ঘৃণা- দ্রোহকে আমার কান্নার ধ্বনি-যন্ত্রণার অনুরণন, আমি আমার পরবর্তীকালকে মানুষ-মনন- চেতনাকে বলতে চাই--সহজ-সরল ভাষায় সুরে-স্বরে-শব্দে-গদ্যে কি পদ্যে--এইতো আমার লেখা-- আমার পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করা বা বিনিময় ঘটানো অথবা নিভৃতে একান্তে নিরন্তর বলে যাওয়ার চেষ্টাই আমার লেখা হোক সে ক্ষুদ্র-তুচ্ছ তাই কম কি। আমার এমনি ‘সাধনা’ রবীন্দ্রনাথ প্রিয় কবি-লিখবো তাঁরই মতো আমার মাথায় ঢোকে না যে কাব্যকথা এতো নজরুল আর জীবনানন্দ আমার শেখায় সুর ও ছন্দ তাই সুকুমার রায়ের মতোই লিখতে গেলাম ছড়া-- কলম আমার ভোঁতা হলো তখন কি আর করা? জয়নুলেরই মতো আবার আঁকতে গেলাম ছবি- তুলির টানে যাই আঁকি তাই এলোমেলো। সবই-সব সাধনায় ব্যর্থ হয়ে বুঝতে পারি আমি- পড়ার চেয়ে জানার চেয়ে আর কিছু নেই দামী।
আমি পড়তে চাই- শেক্সপীয়রকে-- আমি জানতে চাই প্লেটোকে- জানতে চাই আমার স্বর্ণালী অতীত আমার গৌরবান্বিত জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে-আর জানতে চাই আমার সকল অর্জন-ত্যাগ আর সম্ভাবনাকে। লিখে-ছবি এঁকে-ভাস্কর্য গড়ে-কর্মে-কীর্তিতে। তাই আমার সকল সাধনা-আরাধনা-অর্চনা-চর্চা-চর্যা-জীবন যেনো জমিন তাতে চাষ করেছি ফুলের মাটির দোষে লতাগুল্ম ব্যর্থতা আর ভুলের। আমি ফুল চাইলে ভুল হয়ে যায় কাঁটার আঘাত পাই, তোমার কাছে চাইলে পড়ে দেখি তুমি অন্য ঘরে এই হৃদয়ে নাই। আমি বলতে চাই আমার হৃৎ গভীরের কথা-মনের আবেগ-অনুভূতি আর না পারা সব নীরবতা-- লিখেই তো বলে যেতে চাই-সুখ পেতে চাই-বুক ভরে গাই সেই গান সেই বাণী। মাগো আমি তোমার ছেলে অন্ধকারে আঁধার জ্বেলে দৈত্য তাড়িয়েছি, পারি কি কও মা হারাতে? তোমার ঘরের পাহারাতে ঠিকতো দাঁড়িয়েছি একাত্তরে পিতা-মাতা-পতীœ-শিশু-ভগ্নি-ভ্রাতা-দাদু হারিয়েছি--তবু আমি বীর দর্পে বুকটা বাড়িয়েছি, পাকহানাদার-খুনী-ঘাতক-দস্যু মাড়িয়েছি। রণাঙ্গনে লড়াই করে শক্ত হাতে অস্ত্র ধরে বিশ্ব নাড়িয়েছি। মাগো তোমার মান রাখতে শ্রেষ্ঠ অবদান রাখতে লাল সবুজের পতাকাটা জগৎ ছাড়িয়েছি। এইসব সত্য বাণী তথা কথা জগৎকাল মানুষকে জানাতে চাই বলেই লিখি। যদি একটি পঙ্ক্তি বা বাক্য বা লাইন মানবকাল জানে- বোঝে-ধরে রাখে মহাকাল তাতে তাতেই আমি ধন্য--এই জন্মের জন্য এই কর্মে অনন্যা। আবার এক কথায় বলা যায় আমি এক ব্যর্থ মানুষ আর কিছু পারি না বলেই হয়তো লিখি। হোক তা অহেতুক তবু আর কিছুতো করি না মন্দ করি না, পাপ করিনা, ভুল কি ঠিক জানি-- তাও তো লিখি।
অরণি’র ২৪তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৯) প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ