কী লিখি কেন লিখি
শ্যামল বৈদ্য
দু’টি শব্দ, কঠিন প্রশ্ন। আমি কখনও নিজেকে এমন প্রশ্ন করিনি, তা নয়। তবে খুব সচেতন ভাবে জিজ্ঞেস করা হয়নি আজও।
মানুষ যেমন কখনওই বুঝতে পারে না সে কোথায় যেতে চায়। না বুঝেই আমরা চলতে থাকি, লড়তে থাকি, বইতে থাকি। চলতে-চলতেই কেউ কেউ দাঁড়ায়, আবার অনেকেই হারায়। অনেকটা সে ভাবেই আসা। আমি গুছিয়ে কিছু ভেবে লেখালেখিতে আসিনি। প্রথমত আমার পেশা এই কাজের পরিপন্থী। তার পরও লেগে আছি কিছুটা হুজুগে। কিছুই তো পারি না, দেখি লিখতে পারি কিনা। অনেকেই যেমন বলেন, আমার সময় নেই, না হলে এমন দু’চারটে বই আমিও লিখতে পারতাম। যাদের লেখালেখি সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই তারাই এমন বলেন। তাই গ্রন্থ রচনা এবং প্রকাশ এখন মোটেই বড় কাজ নয়।
কৈশোর ও যৌবনে মন ছিল নরম। পলিমাটি। ভাল-ভাল কাজ করতে ইচ্ছে হত। ক্ষুদিরামের মতো শহিদ হতে চাইতাম। অন্যায়-অবিচার দেখলেই মাথা গরম। উলটে-পালটে দেবার ইচ্ছে হত। অচিরেই বুঝতে পারলাম, চাইলেই সব কিছু বদলে দেওয়া যায় না। সিস্টেম। আমরা সিস্টেমের ভেতর দিয়ে যাওয়া অবজেক্ট মাত্র। সিস্টেম বদলে ফেলার ক্ষমতা নেই। এ লড়াই আমি পারব না। রক্ত দেওয়ার মতো সাহসও নেই। কাউকে এক ছটাক রক্ত কোনওদিন দেইনি। যাদের জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হত, তাদের কথা এবং নিজের কথাই ক্রমশ লিখতে শুরু করি। প্রথমে কবিতায়, তার পর নাটক এবং এখন গল্প-উপন্যাসে। লিখতে-লিখতে ক্রমশ বুঝতে পারি, আজ এই কাজটা আমার কাছে আর স্রেফ হুজুগ নয়। মজা করতে-করতে আমি কখন প্রেমে পড়ে গেছি। ‘বুনোগাঙের চর’ – ‘ইতরবিম্ব’ থেকে সব উপন্যাসে আমি ব্রাত্যজীবনের কথা বলেছি। ত্রিপুরার নিজস্ব গল্প এবং ঘরানা তৈরি করার চেষ্টা করছি। আমাদের ইতিহাস, জীবন এবং সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়াও চাহিদা বটে। আমরা আমাদের কথা না লিখলে আর কে লিখবে? কে যেন সারাক্ষণ বলে, ‘পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে পথ চেনা’। পথ চলতে-চলতেই যে পথ দু’হাত বাড়িয়ে আমার সামনে এসেছে, তাকে আর উপেক্ষা করতে পারি না। এক বিশ্বজনীন আহ্বান আমার ক্ষুদ্র জীবনে আলোড়ন তোলে।
ইদানীং নতুন এক লোভ বাসা বেঁধেছে। অমরত্ব চাই। সুন্দর এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে চাই না। আমার নশ্বর দেহ চলে গেলেও যেন আমি বেঁচে থাকি আমার সাহিত্যে।
1 মন্তব্যসমূহ
স্পষ্ট বক্তব্য। ভালো লাগলো
উত্তরমুছুন