সুকুমার দত্তের কড়চা ও অন্যান্য রচনা সুকুমার দত্ত

 
সুকুমার দত্তের কড়চা ও অন্যান্য রচনা
সুকুমার দত্ত 


সুকুমার দত্তের কড়চা ও অন্যান্য রচনা
সুকুমার দত্ত 

সুকুমার দত্তের কড়চা (১)

জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে, এখন অতীত দিনের নানা স্মৃতি আমার মনকে ভারাক্রান্ত করে, আবার কখনও কিছু সুখস্মৃতি মনে আনন্দ নিয়ে আসে। তবে বয়সের ভারে বেশির ভাগ স্মৃতি আবছা হয়ে গেছে। তবু আমি খানিকটা হলেও চেষ্টা করেছি
বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া ঘটনাবলি সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে।

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে পুরোদমে । হিটলারের ঝটিকা বাহিনী প্রায় সমগ্র ইউরোপ দখল করে নিয়েছে। ভারতের মুখ্য রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেস ইংরেজ দের বিরুদ্ধে বিশ্ব যুদ্ধ বয়কট করেছে । ৪২এর ভারত ছাড় আন্দোলনের ডাকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের মূখ্য নেতৃত্ব জেলে আটক ।যুবা নেত্রী অরুণা আসফ আলি জেলের বাইরে থেকে দলের হাল ধরেছেন এই পটভূমিতে মৌলভীবাজারে আমার পড়তে আসা ।
মৌলভীবাজার বর্তমান বাঙলা দেশের একটি জেলা সদর ।
গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের কথা । 
মৌলভীবাজার ছিল
ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের 
সিলেট জেলার 
একটি মহকুমা শহর । 
সেই সময় আমকে ছয় থেকে সাত বছর পড়াশুনার জন্য বাসা ভাড়া করে মৌলভীবাজারে থাকতে হয়েছিল ক্লাস ফোর থেকে দশম ক্লাস পর্যন্ত মৌলভীবাজার গভর্নমেন্ট স্কুলের ছাত্র ছিলাম । বাসা থেকে প্রায় দুই ফার্লঙ দূরে বড় রাস্তার ওপর আমার বন্ধু নুরুল হোসেন খানদের বাড়ি ছিল।
ওই বাড়িটি ছিল আমাদের স্কুলের বন্ধুদের অবসরের আড্ডা স্থল । ছোট বেলা থেকেই নুরুল কবি ,লেখক ও বাচিক শিল্পী তার অবর্তমানে শহরে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অকল্পনীয় ছিল। প্রথমে তার আবৃত্তি দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হতো।উদ্দাত্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের পুরাতনভৃত্য, দুইবিঘা জমি, এবার ফিরাও মোরে প্রভৃতি কবিতা আবৃত্তি করে হলসুদ্ধ লোকের হাততালি কুড়াতো । তার পিতা ছিলেন আসাম সরকারের ডাক সাইটে পুলিশের অফিসার । নুরুলদের বাড়িতে তাদের নিজস্ব একটি লাইব্রেরী ছিল । সেখানে অনেক মূল্যবান বইয়ের সংগ্রহ থাকতো। প্রতিমাসে নতুন দুই  খানা বইকেনা ছিল ওই পরিবারের একটি ঐতিহ্য । ছোট্ট ক্লাসে পড়ার সময় গুরুগম্ভীর ব ই পড়ার প্রশ্ন ই
আসেনা । তখনকার দিনে বাঙলা ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যিক রা প্রায় সকলেই ছোটদের উপযোগী ডিটেকটিভ উপন্যাস লিখতেন। কাঞ্চনজঙ্ঘা রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ নামে প্রকাশনী সংস্থা থেকে বই গুলো বেরোত ওই সিরিজ থেকে শতাধিক বইবাজারে এসেছিল। এছাড়া ছিল শশধর দত্তের শতাধিক মোহন সিরিজের বই। নুরুলের দৌলতে ওই সমগ্র বই গোগ্রাসে অতি অল্পদিনে গলাধঃকরণ করেছিলাম । আমার মৌলভীবাজারে আসার আর একটা কারণ ছিল সিলেট জেলায় পাঁচটি মহকূমা শহরে
কেবলমাত্র পাঁচ টি গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ছিল। বাকিরা সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত বেসরকারি নড়বড়ে  স্কুল সীমিত সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে কোনমতে চলতো। সেই সমস্ত স্কুলে পড়াশুনার কথা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা । ঐ সব স্কুলকে পাবলিক এইডেড স্কুল বলা হত তবে সারা জেলায় সংখ্যাটি ছিল খুবই সীমিত ।

সুকুমার দত্তের কড়চা (২)

জাপানি বোমাতঙ্কে ব্রহ্মদেশ থেকে পায়ে হেঁটে দলে দলে সব বয়সের মানুষেরা ভারত ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে লাগলো।
বিশ্ব যুদ্ধের আঁচ লেগে অখণ্ড ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়লো। তার থেকে আমাদের ক্ষুদ্র শহরটি ও বাদ পড়লো না। যুদ্ধের ডামাডোলে দেশ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উধাও হয়ে গেল । সবচেয়ে বেশি অভাব দেখা দিল কেরোসিন ও লবণের ক্ষেত্রে । বাজারে জিনিসপত্রের অভাব, দাম আক্রা। ।
সেই সময় নতুন কিছু শব্দাবলী লোকমুখে চালু হয়েছিল। ওই গুলোর মধ্যে কতক ছিল ফুড কন্ট্রোল, ব্ল্যাক মার্কেট, ব্ল্যাক আউট,রেশনশপ, রেশন কার্ড , ষ্ট্যান্ডার্ড ক্লথ,পোড়া মাটি নীতি, মিত্রবাহিনী,এক্সিস পাওয়ার, পঞ্চম বাহিনী বা কুইসলিঙ, ঝটিকাবাহিনী, নন এগ্রেশন প্যাক্ট, পো বা প্রিজনার ওব ওয়ার, গেষ্টাপো, ডেজার্ট ফক্স, মাইন , টর্পেডো ,ইউ বোট, এয়ারপোর্ট, হেলিকপ্টার, হ্যালিপ্যাড, ওয়রসিপ, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট,এ আর পি, ফাইটার, বোম্বার, এটম বোমা, ট্যাঙ্ক, ব্ল্যাক মানি,পঞমবাহিনী, লেফ্ট হ্যাণ্ড ড্রাইভ জিপ, বুলডোজার, ট্রেঞ্চ, হিটলার, মুসোলিনি, তেজো, চার্চিল, লেলিন, স্ট্যালিন, রুজভেল্ট এবং দীগ্যাল ইত্যাদি ।
বেশ কিছু অতি লোভি ব্যবসায়ী দোকান থেকে পণ্য সরিয়ে গুপ্ত স্থানে রেখে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে রাতের অন্ধকারে ওই পণ্য তিন চার গুণ বেশি দামে বিক্রি করে রাতারাতি ধনীদের খাতায় নাম লিখিয়েছিল।
এদের দৌলতে ব্লেকার বা ব্ল্যাক মার্কেট কথাটির উৎপত্তি ।কেউ কেউ কালোবাজার শব্দটি ও ব্যবহার করতো । স্থানীয় প্রশাসনিক আমলাদের সহযোগে ওইসব কালোবাজারি ব্যবসা চলতো ।

দেশের সিংহভাগ পণ্য ফৌজিদের ভাণ্ডারে গুদামজাত হয়ে গিয়েছিল । সাধারণ মানুষের দুর্দশা র অন্ত ছিলনা।
সীমিত রেশন দ্রব্য দিয়ে না অন্ন
না বস্ত্র হয়ে কোন প্রকারে দিন গুজরান চলছিল। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া র মত দূর্ভিক্ষ পীড়িত হয়ে নোয়াখালী থেকে ট্রেনে করে প্রতিদিন শয়ে শয়ে লোকজন এসে সিলেট জেলার গ্রামে গঞ্জে শহরের আনাচে কানাচে ঘাঁটি গেড়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা পাত্র নিয়ে দু মুঠো অন্নের জন্য সোরগোল তুলে দিয়েছিল। এতে স্থানীয় মানুষের দুর্দশা চৌগুণ বেড়ে গিয়েছিল। মিলিটারি কনভয়ের দাপটে সদর রাস্তা দিয়ে লোকজন এর চলাফেরা বিঘ্নিত হচ্ছিল। মিলিটারি দের দৌরাত্ম্যে ট্রেনে চাপা মুশকিল ছিল। শহরের প্রতিটি বাড়িতে এল প্যাটার্ন ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছিল।
আকাশে বিমানের শব্দ হলে সবাই কে ট্রেঞ্চে আশ্রয় নিতে হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলো বর্তমান এর করোনা অতিমারী থেকে কোন অংশেই কম ভয়ঙ্কর ছিলনা বলে আমার বিশ্বাস। পেট্রোল ডিজেলের অভাবে যানবাহনের চলাচল সীমিত হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও যুদ্ধের বাজারে কিছু লোক ঠিকাদারি,দালালি ইত্যাদি বিষয় মারফত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিনীত হয়ে ধরাকে
সরা জ্ঞান করত লাগলো। ওদের টাকার গরমে সাধারণ মানুষের বাজারে গিয়ে কেনাকাটা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। 
অল্প দামের জিনিস বেশি দামে কিনে বাজার কে একচেটিয়া করে নিয়েছিল। বাজারে সাধারণ মানুষের মাথা গলাবার
উপায় ছিলনা।
যুদ্ধের দিন গুলোতে আকাশে চিল শকূনের মতো সামরিক বিমান ওড়াওড়ি করতো। প্লেনের কান ফাটা আওয়াজ আর বোমাতঙ্কে মানুষ ট্রেঞ্চে আশ্রয় নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করে প্লেনের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে গেলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতো। প্রথম প্রথম প্লেন মানুষের কাছে এতোটা ভয়ঙ্কর ছিলনা বরং নতুন কিছু দেখার আনন্দে আত্মহারা হতো ।কটি স্থান বিধ্বংসী বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে প্লেনের প্রতি মানুষের আগ্রহ ভয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল।
সেই সময় বিমানের দৌরাত্ম্যে পাখিদের আকাশ বিহার খুব একটা চোখে পড়তো না । 
              


সুকুমার দত্তের কড়চা (৩ )

নুরুল দের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে বড় রাস্তার ওপারে স্বনামধন্য সুলেখক ও পণ্ডিত ড:
মুজতবা আলীদের বাড়ি ছিল। নুরুল দের বাড়ি থেকে লক্ষ্য করতাম ছোট ছিমছাম বাড়িটি সর্বদা পরিপাটি করে রাখা থাকে।
বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঘেরা। ফুলের বাগান দেশি বিদেশি রকমারি ফুলের মেলায় ভ্রমরের গুঞ্জনে মুখরিত থাকতো।আম কাঁঠাল, লিচু ও পেয়ারার বাগানে
ঋতুভেদে নানারকমের ডাঁসা ফল
গাছে গাছে ঝুলতো। কাঠবেড়ালি রা মনের আনন্দে আশ মিটিয়ে ভুরি ভোজন চালাতো।দূর থেকে
মনোহরণ দৃশ্য গুলো দেখে খুব আনন্দ পেতাম ।
পরবর্তী সময়ে নুরুলের কাছ থেকে শুনেছিলাম বাড়িটিতে আলী পরিবারের কেউ থাকেন না
কিছু সদস্য গ্রামের বাড়ি ঢেউপাশাতে থাকেন বাকিরা সব কোলকাতা, ইউরোপ,আমেরিকায় স্থায়ী ভাবে বাস করেন। কালেভদ্রে শহরে এলে বাড়িতে ওঠে, কদিন থেকে আবার বিদেশে পাড়ি জমান। সবসময়ের জন্য একজন কেয়ারটেকার রয়েছেন যিনি বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করেন ।
নুরুলরা সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার স্থায়ী গ্রাহক ছিল । বৈঠকখানা
ঘরে টেবিলের ওপর রাখা দেশ পত্রিকার সঙ্গে সেইসময় আমার প্রথম পরিচয় । সেই সময়ে আলী সাহেবের ধারাবাহিক 'দেশে বিদেশে ' প্রকাশিত হচ্ছিল।দেশ পত্রিকা খুঁজে খুঁজে ধারাবাহিক লেখাটি পড়ে এতোখানি আপ্লুত হয়ে পড়ে ছিলাম যে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে আলী সাহেবকে স্বচক্ষে দেখবার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলাম। দূর্ভাগ্য ই বলতে হবে ,আমার পাঠদ্দশায় আলী সাহেবের দেখা পাইনি।ওই সময়ে একবারের জন্য হলেও আলী সাহেবের নিজ শহরে আসার সুযোগ হয়নি।
আমাদের আড্ডা স্থলে বসে তখনকার দিনে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার, যুগান্তর, মোহাম্মদী , স্বাধীনতা, বসুমতী , Statesman প্রভৃতি দৈনিক সংবাদ পত্র, সজনীকান্ত দাশের শনিবারের চিঠি, দেশ সাপ্তাহিকী ও বসুমতী Reader'Digest আদি মাসিক পত্র পত্রিকা উল্টে পাল্টে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল । এছাড়া আরো অনেক অনেক মূল্যবান সঙগ্রহের সন্ধান পেয়েছিলাম সব গুলোর নাম মনে পড়ছে না।
ওই সময়ে চার পৃষ্ঠার আনন্দবাজারের দাম ছিল মাত্র 
এক আনা না ছয় পয়সা ঠিক মনে নাই তবে এক আনা ছিল যুগান্তর পত্রিকার দাম ,সম্পাদক ছিলেন দুঁদে সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় ।স্মৃতি শক্তির সীমাবদ্ধতা হেতু অনেক জানা কথা পর্দা র আড়ালে হারিয়ে গেছে।

সুকুমার দত্তের কড়চা ( ৪ )

দেশ বিভাগের বছর দুয়েক আগে ছাত্র দের মধ্যে বিভাজনের সূত্রপাত। হিন্দু ছাত্ররা মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরু প্রভৃতি নেতাদের নেতৃত্বে মিছিল মিটিং এ তেরঙ্গা ঝাণ্ডা উড়িয়ে বন্দেমাতরম ধ্বনি দিতে শুরু করে দিল। অপর পক্ষে মুসলিম ছাত্ররা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ র নেতৃত্বে মিছিল মিটিং এ চাঁদ তারা সহ সবুজ পতাকা উড়িয়ে নারায়ে তকবীর ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মাতিয়ে তুললো।
এর মধ্যে অবশ্য কিছুটা ব্যতিক্রম ও ছিল। মুসলিম ছাত্র দের একটি অংশ জাতীয় কংগ্রেস দলের সমর্থক ছিল । দুই দলের মিছিল মিটিং পিকেটিং পুরোদমে চলতে থাকলো। মাঝে মাঝে দুই দলের সদস্য দের মধ্যে মিছিল মিটিং এর জায়গা নিয়ে বিবাদের সূত্রে হাতাহাতিও চলতো। তার ওপর ছিল বৃটিশ সরকারের পুলিশী অত্যাচার,পিকেটিং করে পাবলিক সহ শত শত ছাত্রকে জেল খাটতে হয়েছিল সেই সময় আমার এক দাদা ক্লাস টেনের ছাত্র চব্বিশ ঘণ্টা জেলে ছিলেন।
ওই সময় নুরুল ও অন্যান্য মুসলিম ছাত্র দের থেকে আমাদের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। বিশ্বাসে চিড় ধরলো।
মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল।
কালক্রমে ভারত বিভাগ হলে মৌলভীবাজার পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেলে আমরা সপরিবারে উদ্বাস্তু হয়ে নতুন সৃষ্ট ভারত রাষ্ট্রে চলে এলাম। বন্ধু বান্ধবরাকে কোথায় হারিয়ে গেল খোঁজ নেওয়ার অবসর ই পেলামনা । সবাই নিজ নিজ ধান্ধায় ব্যস্ত থেকে গেলাম।
অনেক দিন পর জানতে পেরেছিলাম নুরুল ডক্টরেট ডিগ্রী
নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে খুব সুনাম অর্জন করেছিল।ওর দাদা আলী হায়দার খান পিসিএস করে চট্টগ্রাম এর জেলাশাসক হয়েছিলেন । ওরা এখন কে কোথায় আছেন জানিনা যেখানেই থাকুন সুখে শান্তিতে থাকুন সবাই। তবে ওদের থেকে যে ভালবাসা ও সহায়তা পেয়েছি তার জন্য চিরজীবন আমাকে ঋণী থাকতে হবে । ব্রিটিশ সরকারের ' ডিভাইড এন্ড রুল 'পলিসির ফসল সাম্প্রদায়িকতার অনল আমাদের চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। আজ ও সেই অনলের অঙ্গার হতে থেকে থেকে জ্বলে ওঠা অগ্নি স্ফুলিঙ্গের ধ্বংস লীলা ঘটে চলেছে সমানে।
গান্ধীজি একদা বলেছিলেন দেশ বিভাগ হবেনা হলে তার শব দেহের ওপর দিয়ে হতে হবে ।তা স্বত্ত্বেও দেশ বিভাগ হয়েছিল ।পাঞ্জাব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে লোক বিনিময় হয়েছিল কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে অজ্ঞাত কোন রাজনৈতিক কারণে ভারতে লোক বিনিময় হয়নি এতে পূর্ব পাকিস্তানের সঙখ্যালঘু হিন্দু অধিবাসীদের চরম মূল্য দিতে হয় । আমরা ও এর থেকে অব্যাহতি পাইনি । সীমানা অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশের প্রাক মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানের রাজাকার বাহিনী স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের প্রায় উলঙ্গ করে সমগ্র মূল্যবান সামগ্রী অর্থ স্বর্ণালঙ্কার প্রভৃতি লুট করে আমাদের এক্কেবারে নি:স্ব করে দিয়েছিল । এতে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি আমলাদের পুরো মদত ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী
ছিলাম। আইন কানুনের কোন বালাই ছিলনা । ওখানে মাৎস্যন্যায় বিরাজ করছিলো। ভারতে এসেও ওই ক্ষতি পূরণ করতে অনেক বছর লেগেছিল। তবে সব কিছু কি আগের মতো ফিরে পাওয়া যায় ? বোধহয় না ।
পরে শুনেছিলাম সঙখ্যালঘু হিন্দু যারা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিল তাদের চরম লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছে ।সঙখ্যাগুরুরা ভয়ভীতি দেখিয়ে ভূসম্পত্তি সহ সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাদের ভূমিদাসে পরিণত করেছিল। হায়রে স্বাধীনতা তুমি কার ?খানসেনা ও স্থানীয় আনসার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি বুদ্ধি জীবিরা তখন আণ্ডার গ্রাউন্ডে ছিলেন। ঘাতকের বুলেটে অনেকের জীবন দীপ নিভে গিয়েছিল ।
আরেকটি কথা উল্লেখ না করলে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দেবে। এর জন্য খোলসা করে বলছি আমি কোন ইতিহাস বিদ ন ই হতেও চাইনা । তথন আমার কিশোর কাল বয়স বার কি তেরো । একজন কিশোরের দৃষ্টি কোণ থেকে যা স্বচক্ষে দেখেছি তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি । তবে কালের কপোলতলে অনেক দৃশ্য লীন হয়ে গেছে।
ভারতের স্বাধীনতা লগ্নে সমগ্র সিলেট জেলা আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময় ভারত ও পাকিস্তানের সহমতে সিলেট জেলা ভারতে থাকবে না পাকিস্তানে যাবে এই নিয়ে রেফারেণ্ডাম হয় । এই নিয়ে কঙগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ভোট হয় । মুসলিম লীগ ও তাদের রাজাকার বাহিনী র দৌরাত্ম্যে রেফারেণ্ডাম প্রহসনে পরিণত হলে কঙগ্রেস ভোটৈ হেরে যায় ও সমগ্র সিলেট জেলা পাকিস্তানে চলে যায় । পরে সীমানা নির্ধারণ কালে রেডক্লিফ সাহেবের মধ্যস্থতায় করিমগঞ্জ মহকুমা র একটা অংশ ভারতের সঙ্গে জুড়ে যায়।
ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক মুহূর্তে ইঙরেজদের বকলমে গোপীনাথ
বরদুলৈ মহাশয়ের মুখ্যমন্ত্রীত্বে কঙগ্রেসের হাতে ছিল আসামের প্রাদেশিক সরকারের শাসনভার । বিষ্ণু রাম মেদী ছিলেন অর্থ দপ্তরে এবং সম্ভবত সিলেট বাসী বসন্ত দাসের হাতে ছিল স্বরাষ্ট্র দফতর ।সে সব কঙগ্রেসী মন্ত্রীরা একটুকু সচেতনার সহিত রেফারেণ্ডামের সময় আইন শৃংখলারপ্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন ও ভোটদান অবাধ এবং নিরপেক্ষ হতো তাহলে হয়তো সমগ্র সিলেট জেলা ভা্রতের অংশ হতে পারত । কোন এক অজ্ঞাত কারণে ওই সব রাজনীতি বিদরা স্বেচ্ছায় সিলেটজেলাকে পাকিস্তানের হাতে যৌতুক হিসেবে তুলে দিয়ে সিলেটের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপর্যয় ডেকে এনেছিলেন এই অশীতিপর বয়সে আজ পর্যন্ত তার হিসেব মেলাতে পারিনি। রাজনীতির খেলা বড়ই রহস্যময়।
যে বাঙালি জাতি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রণী বাহিনী ছিল স্বাধীনতাত্তোর কালে আসামের বাঙালি উদ্বাস্তু দের বর্তমান অবস্থা অবলোকন করলে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবে কী অসহনীয় দুর্দশা র মধ্যে কালাতিপাত করতে হচ্ছে তাদের । অনেকে বিনা দোষে সাজা পাচ্ছে ট্রাইব্যুনাল এর কৃপায় । লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্যে রাষ্ট্রহীন তকমা জুটেছে ।মনে হয় ওদের শাশে দাঁড়ানোর মত জগতে কেউ নেই । বোধ হয় একেই বলে রাজনীতির পরিহাস।



সুকুমার দত্তের কড়চা (৫ )

ফের একবার আলী সাহেবের প্রসঙ্গে আসছি । ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার একটি মহকুমা শহর মৌলভীবাজার থেকে অনতি দূরে ঢেউপাশা নামক স্থানে একটি বনেদি মুসলিম পরিবারে ড: সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মেছিলেন । গোটা জেলা জুড়ে পরিবারটির সুনাম
ছড়িয়ে পড়েছিল । শিক্ষা দীক্ষায় সমাজ সেবা মূলক কাজে বিশিষ্ট স্থান অর্জন করেছিল । আলী সাহেবের শিক্ষা প্রথমে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে শান্তি নিকেতন তারপর বার্লিনে গিয়ে ভাষা বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রী নিয়ে ছিলেন। কিছুদিন শান্তি নিকেতনে অধ্যাপনা করেছেন।
তারপর ভারত সরকারের অধীনে বিভিন্ন দপ্তরে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন ।এক সময়ে অল ইন্ডিয়া রেডিও তে ষ্টেশন ডিরেক্টর ও ছিলেন ।
বিভিন্ন ভাষায় পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ । দেশ পত্রিকাতে নিয়মিত ধারা বাহিক লিখেছেন। ওইগুলো থেকে পরবর্তী কালে ব ই আকারে তার ' দেশে-বিদেশে ' 'পঞ্চতন্ত্র ' ' শবনম 'গ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়। রসিক ব্যক্তি পাশাপাশি ভোজনরসিক ও ছিলেন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের বিশিষ্ট খাদ্য দ্রব্য চেখে দেখার অভ্যাস ছিল এবং ওইসব নাম তার কন্ঠস্থ ছিল।আর তার রসবোধের কথা সর্বজনবিদিত।
রসিক ব্যক্তি না হলে কী লিখতে পারতেন ; (উপমা কালিদাসস্য না বলে বলা উচিত উপমা ঠাকুরস্য ।) শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে উদ্দেশ করে বলা। মৃত্যুর প্রাক মুহূর্তে আলী সাহেব ঢাকাতে ওর স্ত্রীর কাছে চলে গিয়েছিলেন।ঢাকাতেই শেষ কৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল ।
শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব সম্পর্কে আলী সাহেবের উক্তি টি নিতান্ত হালকা ধরনের রসিকতা ছিলনা। তিনি ঠাকুরের উপমা গুলো গভীরভাবে আত্মকরণ করে শ্রদ্ধার সহিত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করেছিলেন । সহজাত বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা ও উপস্থাপনায় মুন্সিয়ানা র ছাপ থাকায় তার প্রতিটি রচনা থেকে প্রকারান্তরে পাঠকেরা মজাদার কিছু পাওয়ার আশা করতো । ঠাকুরের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অগাধ এবং যে কোন সমালোচনার ঊর্ধ্বে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। 
:

সুকুমার দত্তের কড়চা (৬ )

আলী সাহেবের ব্যঙ্গমিশ্রিত রসিকতার দুটি নিদর্শন নিজ ভাষায় তুলে ধরছি ।

কোলকাতার কোন এক সবজি বাজারে এক সিলেটি ভদ্রলোক বেগুন কিনতে গিয়ে দোকানিকে বলছেন; ' দাদা আপনার বাইগুনের কিলো কত করে ' ?
ভদ্রলোকের কথা শুনে দোকানিও আশপাশের কিছু খদ্দের একেবারে হতবাক ?
একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি শুরু করে দিলো। যেন জন্মেও 
ওই নাম শুনেননি । দুজনে রীতিমত বচসা বেঁধে গেল। তখন খদ্দের ভদ্রলোক আঙ্গুল দিয়ে বেগুন দেখিয়ে উত্তেজিত স্বরে দোকানিকে বললেন ; ' বাইগুন চিনেন্ না তাহলে ওইগুলো বোধ হয় আপনার প্রাণনাথ এখন বলুনতো আপনার প্রাণনাথের দর কত করে ' ?
দোকানি ও আশপাশের খদ্দেররা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে
সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো । 'প্রাণনাথ 'কথাটি তখন থেকে ওই এলাকায় লোকের মুখে খুব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল ।

জনৈক ইংরেজ পুঙ্গব প্রথমবার প্যারিসে গেছেন। সেখানে এক রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করতে গিয়ে ওয়েটারের কাছে তাদের মেনু কার্ড চাইলেন। ওয়েটার ফরাসি ভাষায় লেখা একখানা মেনু কার্ড নিয়ে এল। ইংরেজ পুঙ্গব ফ্যাসাদে পড়লেন কারণ তিনি ফরাসি ভাষায় একদম আনাড়ি ছিলেন। তাহলে কি হবে ইঙরেজরা ভাঙবে তবু মচকাবেনা । তিনি মেনু কার্ডের প্রথম নম্বর টি ও মাঝখান থেকে অন্য একটি নম্বরও একদম শেষের নম্বরটি তে আঙ্গুল রেখে ইশারায় ওয়েটারকে লাঞ্চের অর্ডার করলেন। ভদ্রলোক ভেবেছিলেন প্রথম টি কোন রকম স্যুপ হতে পারে দ্বিতীয় মেইন কোর্সের পদ হবে আর শেষের টা নিশ্চয়ই ডেজার্ট জাতীয় কোন কিছু ,সব ই ছিল তাঁর অনুমান নির্ভর। ওয়েটার টেবিলে এসে সার্ভ করলো দুরকমের স্যুপ আর ছোট একটি পাত্রে করে কিছু টুথপিক । ইংরেজ পুঙ্গবের জানা ছিলনা ফরাসি দেশের রেস্তোরাঁয় ম্যানুকারডে পঞ্চাশ রকমের স্যুপের নাম লেখা থাকে শেষ পর্যন্ত ইংরেজ পুঙ্গব নিজের জেদ বজায় রাখতে গিয়ে আধ পেটা খেয়ে মুখ মুছতে মুছতে রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে এলো। বেচারার লাঞ্চ খাওয়া মাঠে মারা গেল । অনেক টা চোরের ওপরে রাগ করে মাটিতে ভাত খাবার মত অবস্থা ।
এ জাতীয় অনেক সরস চুটকি আলী সাহেবের লেখা থেকে পাওয়া যায় ।
আলী সাহেবের একটি লেখা থেকে জানতে পেরেছিলাম কলকাতার জ্যাকারিয়া ষ্ট্রীটের মাটন নাকি জগৎ বিখ্যাত । কলকাতায় থাকা কালীন অনেক বার পরখ করে দেখেছি কথাটি একশত শতাংশ খাঁটি ।সে অনেক দিন আগেকার কথা । কলকাতা ছেড়ে আসার পর ওই জাতীয় সুস্বাদু মাংসের পদ আজ পর্যন্ত পাতে পড়েনি । এই নব্বই বছর বয়সে ওই সব পদ তো আমার জন্য বিষবৎ খাওয়ার প্রশ্ন ই ওঠেনা । আফশোস ও হয়না ।
ড: সৈয়দ মুজতবা আলী ওমর খৈয়াম ও সত্যপীর এই দুই ছদ্মনামে কখনো কখনো রম্যরচনা লিখেছেন ।


*রবীন্দ্র-আলোকে সিলেট
*মুরারিচাঁদ কলেজ--অতীত থেকে বর্তমান

সুলেখক ও প্রবন্ধকার শ্রীপূর্নেন্দুকান্তি দাশ মহাশয়ের লিখিত -"সিলেট--প্রবন্ধ দুটির আধারে লিখিত বই টি পাঠ করে একজন সিলেটী ও মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সমৃদ্ধ হয়েছি। লেখক ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফসল এই গবেষণা ধর্মী রচনা টি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট ভ্রমনের কথা আমরা অনেকেই জানি কিন্তু সেই ভ্রমণ বৃত্তান্তের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য ও মূল্যবান আলোকচিত্র লেখক নিজে সিলেটে গিয়ে সংগ্রহ করে এনেছেন এবং সেই মূল্যবান আলোকচিত্র গুলো পাঠক দের আরো আগ্রহী করে তুলেছে।
সিলেট বা শ্রীহট্টের মুরারিচাঁদ কলেজ অতীতে ভারত উপমহাদেশের একটি শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসাবে পরিচিত ছিল আমি নিজে ও সেই কলেজ থেকে-1949-51 সালে আই এস সি পাশ করেছি। সেই আমার প্রিয় কলেজের স্থাপনের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের অবস্থা পর্যন্ত যাবতীয় তথ্য লেখক অত্যন্ত সুচারুভাবে বইটিতে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের যারা সিলেটের গৌরব গাঁথা সম্পর্কে ততটা ওয়াকিবহাল নন তারা এই রচনাটি পাঠ করে অবশ্যই সমৃদ্ধ হবেন এবং তৎকালীন সময়ে উচ্চশিক্ষার প্রসারে মুরারিচাঁদ কলেজের ভূমিকা কতখানি ছিল সেই বিষয়ে ও ওয়াকিবহাল হতে পারবেন। এই কলেজের কৃতী ছাত্র ছাত্রী রা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন এবং সিলেট তথা মুরারি চাঁদ কলেজের নাম উজ্জ্বল করেছেন তারা অনেকেই হয়তো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন সেসব কৃতী সন্তানদের পরিচয়ও লেখক তুলে ধরেছেন এই বিষয়টিও আমার অত্যন্ত ভালো লেগেছে। লেখক নিজেও এই কলেজের একজন কৃতী ছাত্র, উনার জন্য আমার অফুরন্ত শুভেচ্ছা রইল আশা করি পরবর্তী সময়ে সিলেট সম্পর্কিত আরও তথ্যবহূল রচনা তিনি আমাদের উপহার দেবেন।


অদ্য ১৯ মে ২০২১ আসামের কাছাড়ের ভাষা আন্দোলন দিবসের ৬১তম বর্ষ 

১৯৬১ সালের ১৯ মে
আসাম পুলিশের বর্বরোচিত গুলি চালনায় শিলচর রেল চত্বরে বাঙলা ভাষার জন্য আন্দোলন রত এগারজন নিরস্ত্র সত্যাগ্রহী তরতাজা তরুণ তরুণী মৃত্যু বরণ করেছিল।
এরা হলেন:-
কমলা ভট্টাচার্য,কানাই নিয়োগি, চণ্ডী চরণ সূত্রধর, শচীন পাল, 
কুমুদ রঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্র দেব, সুকোমল, সুনিল সরকার,হিতেশ বিশ্বাস,তরণী দেবনাথ ও বীরেন্দ্র সূত্রধর ।
ভাষা আন্দোলনের সকল শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।


বাহান্ন 'একুশ ' থেকে কৃষক আন্দোলন ২০২১ 

মৃত্যু সতত দু:খের কারক।
মহান 'একুশ' 
আজ আর বেদনার নয়, প্রতিবাদের হাতিয়ার ।
শত শহিদের রক্তে রাঙা
মহান সঙ্কল্প গাঁথা 
ইতিহাসের পাতায় 
স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ ।দৃঢ় প্রতিজ্ঞা সমৃদ্ধ 
মহান ত্যাগের প্রতিচ্ছবি ।
ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ 
প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ,
অভিষ্ট লক্ষ্য সাধনে দূর্বার ক্ষমতার অধিশ্বর ,
স্মরণ করার লগ্ন আজ ।
স্মৃতি চারণ পর্যাপ্ত নয় ,
পু্ঞ্জীভূত অন্যায় 
উৎপীড়ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ মোকাবেলায় 'একুশের ' ইস্পাত 
দৃঢ় সংকল্প আত্মীকরণ 
ঠিক সময়ে সঠিক 
প্রয়োগ 
বীর শহীদদের 
স্মৃতি তর্পনে 
অনন্য পন্থা
দেশে প্রতিষ্ঠান বিরোধী সদ্য জাগ্রত 
কৃষক আন্দোলন 
মহান ' একুশের ' 
যথার্থ উত্তরাধিকার।

শরৎচন্দ্র বসু

আজ ২০.০২.২১ শনিবার, ভারতবর্ষের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামি প্রখ্যাত ব্যারিস্টার এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসুর ৭২তম মৃত্যু বার্ষিকীতে প্রয়াতর  স্মৃতির উদ্দেশে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শরৎচন্দ্র বসু। স্বাধীনতার পর ইঙরাজ সরকারের নিকট থেকে প্রাপ্ত দলিল পত্র যেগুলো ইদানিং প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো থেকে জানা যায় নেতাজীর পরিবারের সকল সদস্যদের নামে পৃথক পৃথক ফাইলে তাদের গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি চলতো। শরৎচন্দ্র সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ  ভীষণ চাপের মধ্যে থাকতো।তার গতিবিধির ওপর সব সময় গোয়েন্দা পুলিশের তৎপরতা জারি ছিল। পুলিশের খাতায় উনার নাম ছিল 'serpent of the grass'
শরৎচন্দ্র বসু ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর উড়িষ্যার কটকে জন্ম গ্রহণ করেন।কটকের স্বনামধন্য আইনজীবী জানকী নাথ বসু তার পিতা ও মাতা প্রভাবতী বসু । তাদের পৈতৃক বাড়ি ছিল ২৪ পরগণার জেলার কোদালিয়া গ্রামে ।
 তারা ৮ ভাই ৬ বোন ছিলেন । ভাইদের মধ্যে  জ্যেষ্ঠ সতীশচন্দ্র তারপর ক্রমানুসারে শরৎচন্দ্র, সুরেশচন্দ্র, 
সুধীর চন্দ্র,সুনিলচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র,শৈলেশচন্দ্র, সন্তোষ চন্দ্র ।
বোনদের মধ্যে জ্যৈষ্ঠা প্রমিলা বালা
মিত্র ও সরলাবালা দে
কনিষ্ঠা বোনদের মধ্যে তরুবালা দে, মলিনা দত্ত, প্রতিভা মিত্র ও কনকলতা মিত্র ।
শরৎচন্দ্র স্কটিশ চার্চ কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজে কলিকাতায় পাঠ শেষে ১৯১১ তে ইঙলণ্ড যান ও সেখানে লিনক্লন ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে  দেশে ফিরে কলিকাতায় আইন ব্যবসা শুরু করেন তার কিছুদিন পর দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে আইন ব্যবসা থেকে অব্যাহতি নেন।
১৯৩৬ সালে বাঙলা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হন।১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এআইসিসির সদস্য ছিলেন।
বাংলয় ফজলুল হক মন্ত্রী সভায় সদস্য হ ওয়ার আগের দিন সুভাষচন্দ্র বসুর হঠাৎ অন্তর্ধানের কারণে শরৎচন্দ্রেকে 
কারারুদ্ধ করে প্রথমে মার্কার জেলে ও পরে কুক্কুর জেলে বন্দী করে রাখা হয়। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়াতে  চার বছর পর ১৯৪৫ সালে তাকে কারাবাস মুক্ত করা হয়।
১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত শরৎবসু কেন্দ্রীয় আইন সভায় বঙ্গীয় কঙগ্রেস প্রতিনিধী দের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর আইএন একে দৃঢ়তার সহিত সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিলেন।১৯৪৫ সালে  দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত  
হলে শরৎবাবু  ডিফেন্স ও রিলিফ কমিটির মাধ্যমে আইএন এ সৈনিক পরিবারবর্গের মধ্যে ত্রাণ ও সাহায্য বিতরণে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন । তিনি ১৯৪৬ সালে জহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে গঠিত অন্তবর্তী সরকারের খনি ও শক্তি দপ্তরের মন্ত্রী হয়েছিলেন।
ঐ সময় কেবিনেট মিশন  ভারতে  এসে  গরিষ্ঠহিন্দূ অধ্যুষিত এলাকা ও গরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে বাঙলা প্রদেশ কে দুভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে শরৎবাবু এআইসিসি থেকে পদত্যাগ করেন।
মুসলিম লীগের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও হোসেন সোহরাওয়ার্দী সহায়তায় শরৎবাবু উত্তর পূর্ব ভারত সহ স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন । ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের কিছু সংখ্যক  বাঙালি হিন্দু সদস্য প্রস্তাবটির বিরোধীতা করাতে তার মত বদলাতে বাধ্য হন।
স্বাধীনতা লাভের পর সুভাষচন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লক পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন পরবর্তীতে সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি গঠন করেন ।
১৯৫০ খ‌ষ্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি ৬০ বছর বয়সে কলিকাতায় তার মৃত্যু হয় ।
অক্ষয় কুমার দে মহাশয়ের কন্যা বিভাবরী দের সাথে ১৯০৯ সালে তার বিবাহ হয়। তাদের আটটি সন্তান।
পুত্র অশোক নাথ জার্মান ফেরৎ কেমেষ্ট্রিতে ডক্টরেট ও প্রখ্যাত ইন্জিনিয়ার ।অমিয় নাথ বসু স্বাধীনতা সঙগ্রামি ও এমপি পরে বার্মায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ।শিশির বসু নেতাজীর অন্তর্ধানের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়েছিলেন বিশিষ্ট শিশু চিকিৎসক ওএম এল এছিলেন।সুব্রত বসু ইলেকট্রিক ইন্জিনিয়ার ও এম পি ছিলেন।তার কনিষ্ঠা কন্যা ড: চিত্রা ঘোষ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ সেবিকা। তার নাতি সুমন্ত বসু লণ্ডন স্কুল ওব ইকনমিকস ও পলিটিক্যাল সায়েন্স এর 
অধ্যাপক ।


অমলের একদিন

রায় বাড়িতে আজ মহা ধুন্ধুমার, সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে,কারো কথা বলার সময় নেই,কেউ রান্না ঘরে অমলের প্রিয় খাবার তৈরি করছে, তো কেউ ছুটছে বাজারে। কেউ আবার নানা মজার মজার কথা বলে হাসাতে চেষ্টা করছে অমলকে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
অমল রায়বাড়ীর সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দিনভর চলে অমলের হুটোপুটি।আর চলে তার প্রশ্নবাণ,যার জন্য জেরবার হতে হয় সবাইকে। এটা কি?ওটা কেন হল? কিভাবে হল এসব নানা প্রশ্নের উত্তর তাকে তক্ষুনি দিতেই হবে না হলে রক্ষে নেই। এককথায় চার বছরের অমল মাতিয়ে রাখে সারা বাড়ী। এহেন অমল কিনা কাল থেকে কথাই বলছে না! দাদুভাই, ঠাম্মা,জেঠু, জেম্মা,কাকাই,পিপি সবাই মিলে কত চেষ্টা করছে কিন্তু অমলবাবু স্পীকটিনট্। অমলের মা যেহেতু চাকরি করেন তাই ঠাম্মার কাছেই বেশীরভাগ সময় থাকে অমল, ঠাম্মার কাছেই যত প্রশ্রয় পায় সে। কিন্তু ঠাম্মাও প্রচুর সাধ্যসাধনা করে অমলের পেট থেকে কথা বের করতে পারেন নি।
অমলের বাবার ড্রাইভার পুলকের সাথে আমলের বেশ ভাব, কারণ সে অমলকে স্কুলে নিয়ে যায়, আসার সময় টফি কিংবা আইসক্রিম কিনে দেয়। মাঝে মাঝে বেড়াতে ও নিয়ে যায়। সবচাইতে বড় কথা যেটা সেটা হলো পুলক মাঝেমধ্যে ওকে গাড়ীর স্টিয়ারিংয়ে ধরতে দেয়,তাই ওর সাথে একটু আলাদা রকমের ভাব অমলের।
পুলক এসে যখন এই কান্ড শুনলে, সে তখন বলল-ঠিক আছে আমি যাচ্ছি ছোট বাবুর কাছে।
'কিন্তু ও আমাদের সাথেই কথা বলছে না, আর তুমি কথা বলবে?'
ঝাঁঝিয়ে উঠে কাকাই।
'দেখিনা দাদা একটু চেষ্টা করে।'
মিন্ মিন্ করে বলে পুলক।
যাইহোক একটু পরে অমলকে কোলে নিয়ে নেমে এলো পুলক।
'আমরা একটু ঘুরে আসি।'
বলে অমলকে নিয়ে বেরিয়ে গেল ।
ঘন্টা খানেক পর যখন দুজনে ফিরে এলো তখন অমলের হাসিমুখে গাড়ি থেকে নেমে ছুটে আসা দেখে সকলে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল।যাক্ বাবা মেঘ তাহলে কেটে গেছে। পুলক গাড়ি গ্যারেজে রেখে যখন এলো তখন আসল কথা শোনার জন্য সবাই উদ্গ্রীব হয়ে ড্রয়িং রুমে বসে। পুলক হাসতে হাসতে যে গল্পটা বললো তা শুনে তো সকলের আক্কেল গুড়ুম!
কাল স্কুলে এক বন্ধুর কাছ থেকে লিচু খেতে খেতে একটা বীজ অমল গিলে ফেলেছিল। সেসময় ওর আরেকটি বন্ধু ওকে বলে এখন সেই বীজ টি পেটের ভেতর গাছ হয়ে ওর মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে।আর এই কথা শুনে আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবেই সে মনমরা হয়ে গিয়েছিল। পুলক কে গল্পটা বলার সময় অবশ্য অমল জানিয়েছে মরে যেতে ও মোটে ভয় পায় না কিন্তু ও মরে গেলে বাড়ীর সবাই কতটা কষ্ট পাবে সেকথা ভেবেই ওর মনখারাপ করছিল।পরে যখন পুলক ওকে আশ্বস্ত করে বলে যে ওসব একদম বাজে কথা। তারপরে ই হাসি ফুটে অমলের মুখে। এইটুকু একটা শিশুর এমন মর্মস্পর্শী কথা শুনে
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো পিপি।
উপরের ঘরে তখন ঠাম্মার কোলে বসে পায়েস খাচ্ছে অমল।
সুকুমার দত্ত।
২৩.১.১৪২৭


পরিচিতি

জন্ম ১০ শে সেপ্টেম্বর ১৯৩১ সালে। মুরারি চাঁদ কলেজ থেকে আই এস সি পাশ করে।, পরবর্তী সময়ে কোলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বি এস সি পাশ করে  অটোমোবাইল ও রেডিও টেকনিশিয়ান এ ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন জর্জ টেলিগ্রাফ কোলকাতা থেকে। তারপর ১৯৬৫ সালে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে ICAT ডিপার্টমেন্টে চাকরিতে যোগদান করে ১৯৯১সালে অবসর গ্রহণ করেছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ