কী লিখি কেন লিখি তমা বর্মণ



কী লিখি কেন লিখি
তমা বর্মণ 

কী লিখি কেন লিখি
তমা বর্মণ 

মনে হয় না এর স্পষ্ট জবাব আছে বলে। আসলে যেকোনো শুরু একটা কিছু তাড়না থেকে জন্মায়। লেখালেখিও তাই। নিজেকে আবিস্কার করাটাই বোধহয় মুখ্য এখানে।  কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখকের নিজস্ব অনুভূতির ফসল। তবে কবিতা লিখতে নিশ্চিত মাথায় থাকে না আমি লিখছি। এ সম্পূর্ণ ঘোরে পড়ে লেখা হয়ে ওঠার ব্যাপার। অবশ্যই ভাবের প্রকাশ। 

লেখক মাত্রই বোধহয় কমবেশি বলা যায়, চারপাশে চলমান যা তার নির্যাসটুকু যখন কেউ রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করেন অথচ মৌখিকভাবে ব্যক্ত করতে হয়তো অক্ষম থাকেন, সেখানেই কলম ধরেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস কবি বা লেখকের এক গভীর দৃষ্টিকোণের কথা বলে। দর্শন থাকা স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত এই ব্যাপারটাই একসময় তাড়না হয়ে যায় হয়তো। গল্প, কবিতা, উপন্যাসে তাকেই দেখাতে চান সৃষ্টিকার। বৃহত্তরভাবে মানুষ যখন সেই ভাবনা বা দর্শনের সঙ্গে এক হয়ে যায় লেখকের তখনই সার্থক তৃপ্তি। আমিও তার বাইরে নই। সমাজের উত্থান পতন, তথাকথিত নানা দিক নিয়ে যে নিজস্ব বিচারবোধ, এটাই আমাকে কাগজ-কলম বা লেখার টেবিলে টেনে আনে। প্রয়োজনের তাগিদটা অবশ্যই আলাদা আলাদা কারণ থেকে হতে পারে।

গল্পের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধি ভীষণ দরকার। উপন্যাসও একই। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা কখন আমাকে অক্ষরের সঙ্গে সহবাস করতে শিখিয়েছে তার দিনক্ষণ ঠিক বলতে পারব না। হয়তো ছোটবেলার ডায়েরি লেখার অভ্যাসটা পুরোপুরি এর সূত্রপাত ঘটার একটা ধাপ। এগিয়ে গেছি যত ধীরে ধীরে অনেকরকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। একসময় মনে হয়েছে লেখার পরিসর আরও বিস্তৃত হোক। এও এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!  খুব সাধারণ ভাবনা থেকে যা শুরু, একসময় আবেগ পেরিয়ে তা-ই হয়ে দাঁড়াল প্রতিদিনের কাজ। লিখতে পারলে অভাবনীয় আনন্দ। না লিখলে মগজ ভার। অতএব লেখা চাই। লেখা ছাড়া তেমন কাজ আর পারিও তো না। আর একটা বিষয়ও দারুণ আনন্দ দেয়। যখন আমি লিখি সেখানে শাসন শোষণ উৎপীড়নের সমস্ত প্রতিবাদ, মানুষের অন্তর্নিহিত খেলাধুলাগুলো সমস্তটাই আমি আমার মতো করে ঘটাতে পারি। সুন্দর আগামীটাকে আমি আমার হাতের মুঠোয় ধরতে পারি। আহা, এ যেন বিশ্বজয় করে ফেলার আনন্দ! এর চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে পাই না বলেই লিখি।  

জীবন তো বহুমাত্রিক বাস্তবতা। যেসব বাস্তবতা আমাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে তার কথা অক্ষরে লিখতে মন চায়। লিখি। আবার ব্যক্তিগত আপোষের বাইরে যা তাও লিখি। একজন কলম শিল্পী হিসেবে লেখার চেষ্টা করি জীবন এবং মানুষের সুখ-দুঃখ,  সীমাবদ্ধতা গুলি। 

প্রতিদিন ব্রহ্মতালুতে কিছু না কিছু বিষয় ঘটনা ফুটকি কাটে। অনেক কিছু বদলে ফেলতেও ইচ্ছে হয়। বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলার যোগ্যতা নেই বলেই হয়তো ভিতরের কাটাছেঁড়া গুলো অক্ষরে তুলে আনার চেষ্টা করি। সামাজিক মূল্যবোধের ফাঁকফোকড় যা দেখি লিখতে ইচ্ছে হয়। লিখি। অনেক লেখা বাকি রয়ে গেছে। দেখা যাক। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এমন হয়েছে, গল্প পড়ে দূরের অচেনা কেউ জানিয়েছেন, আরে! এটা তো আমারই ঘটে যাওয়া জীবন! আপনি জানলেন কী করে?  হয়তো খুব সাধারণ ছোট্ট বিষয় এটা, কিন্তু সে মুহূর্তে যে আনন্দ পাই তা সত্যিই তুলনাহীন। মনে হয়, এই-তো মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে পারলাম সামান্য হলেও। 

নিজেকে প্রকাশ করার স্পষ্ট মাধ্যম লেখার মতো আর কিছুতে নেই। লেখার প্রধান কারণ এটাই। জীবন সম্পৃক্ত তেমন লেখার স্বপ্ন দেখি। কলম ধরে তাই বসে আছি। সমাজ এবং সিস্টেম, মানুষের বহুমুখী সম্পর্ক নাড়া দেয়। চেতন অবচেতনের প্রক্রিয়াগুলি পেরিয়ে যেতে যেতে একসময় নিজেই চাপ অনুভব করি। লেখা ছাড়া উপায় জানা নেই বলেই বোধহয় হালকা হতে লিখি। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকতে হয়। কাগজ কলমের মতো নির্ভর করার শক্তি আর আছে?  আঁচড় কাটলেও উফ বেরুবে না। তাই বোধহয় এর সঙ্গে প্রেম ক্রমাগত আমার বেড়েই চলেছে। 

এই যেমন লিখলাম, আমি সমস্ত মহামারির বুকে পা তুলে নৃত্য করি---। 

আহ্। উচ্চারণ মুহূর্তেই কোথায় আজকের এত এত মৃত্যুর জ্বালা আর রইল? লেখার এই জাদু যেদিন থেকে আবিস্কার করেছি নিজের ভিতর সেদিন থেকেই সমস্ত অবসাদ শেষ হতে দেখেছি। 

ভালো থাকতে আমি লিখি। নিজেকে লিখি। লেখার তো শেষ নেই? অন্তত আমার বলার থাকবে যতদিন ততদিন লিখতে তো হবেই। বইয়ের সংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামান আমার হয় না। যেদিন বুঝব বলার কথা ফুরিয়েছে, লিখতে না পারলে যে অস্থিরতা টের পাই সবসময়, ভিতর শান্ত না হওয়া পর্যন্ত লিখতে তো হবেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ