কী লিখি কেন লিখি
সুজন বড়ুয়া
কী লিখি কেন লিখি
সুজন বড়ুয়া
কবি-শিশুসাহিত্যিক, বাংলাদেশ
আমি জন্মেছিলাম শ্যামল কোমল এক নিঝুম গ্রামে। তবে গ্রামটি ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে উজ্জ্বল। পাহাড় নদী বন বনানীময় সমতল ভূমির সম্মিলনে কবিতা-উপম একটি গ্রাম। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার সিলোনীয়া গ্রাম। এই উজ্জ্বল গ্রামটির একটি আলোকিত পরিবারে আমার জন্ম। আমার পিতামহ ছিলেন স্কুলশিক্ষক। তাঁর হাতেই আমার বিদ্যাশিক্ষার হাতেখড়ি হয়। আমার জীবনের আঠারো বছর কেটেছে গ্রামে। গ্রামের অবারিত সবুজ পাহাড়-নদী, রোদ-বৃষ্টি, অমাবশ্যা পূর্ণিমা, পশু-পাখি, প্রাণি বৈচিত্র্যসহ যাবতীয় অনাবিল ও অকৃত্রিম সৌন্দর্য আমি আকণ্ঠ পান করেছি।
কবিতার সব রতœ মাণিক্য আমার গ্রামে ছড়ানো। এই সৌন্দর্য-সুধা দু’চোখ ভরে পান করতে করতে আর নির্মল আলো হাওযায় ভাসতে ভাসতে আমি বড়ো হয়ে উঠছিলাম। আলুথালু শৈশব ছাড়িয়ে যখন আমি টলোমলো কৈশোরে তখন নৈসর্গিক সৌন্দর্য মুগ্ধতার আবেশে আমাকে আবেগপ্রবণ করে তুলতে থাকে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের চারিত্রিক সৌন্দর্য ও কর্ম-বৈশিষ্ট্যও আমার চোখে ধরা পড়তে শুরু করে। এ সময় আমি আমার ঘনিষ্ঠ-জ্ঞাতি জ্যাঠতুত দাদা সুব্রত বড়ুয়ার কথা জানতে পারি। তিনি তখন তুখোড় লিখিয়ে। ১৯৬৯ সালে মানুষের চাঁদে পদার্পণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘চাঁদে প্রথম মানুষ’ নামে একটি বই লিখে তিনি চারদিকে আলোড়ন তুলেছেন। পত্রপত্রিকায় বড়োদের গল্প লিখছেন নিয়মিত। ‘জোনাকী শহর’ নামে তার গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তখন ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে কর্মরত।
তো, সাহিত্যে আমার প্রথম প্রেরণা এই বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞানলেখক সুব্রত বড়ুয়া। তবে এখানে আমি আরেকজন শ্রদ্ধেয় মানুষকে স্মরণ করতে চাই। তিনি আমার কাকা রথীন্দ্র বিজয় বড়ুয়া। সুব্রত বড়ুয়া ছিলেন সেই কাকার ছাত্র। কাকার ছিল অসম্ভব সাহিত্য-প্রীতি। প্রচুর পড়াশোনা করতেন আর অল্প বিস্তর গল্প-প্রবন্ধ লিখতেন। পাকিস্তান পোস্টাল ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন কাকা। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর কাকা ভারতে চলে যান। পরবর্তীকালে কলকাতার দেশ পত্রিকায় তিনি সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ে নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। সেই কাকা পাকিস্তানে থাকাকালে তার ছাত্র তরুণ সুব্রত বড়ুয়ার মধ্যে সাহিত্য প্রীতি সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুব্রত বড়ুয়া নিজে এভাবে স্মৃতিচারণ করে থাকেন। তার মানে আমার পারিবারিক রক্ত-ধারায় সহিত্য চর্চার প্রবাহ ছিল। আমার এখনো মনে পড়ে, শৈশবের গোড়ায় কাকা আমাকে রঙিন ছড়া-ছবি ও গল্পের বই কিনে দিয়েছিলেন। দাদু আমাকে যতœ করে সেসব বই পড়াতেন।
গ্রামে পাঠ্য বইয়ের বাইরে সৃজনশীল গল্প-কবিতার বই ও পত্র পত্রিকার খোঁজ খবর আমরা খুব বেশি পেতাম না। শ্রেণি পাঠ্য তালিকার বাংলা বইয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ বোধের ফলে প্রথমদিকে মনে করতাম লেখালেখি মামুলি অক্ষর বুননের কাজ। মানুষ যা দেখে বা ভাবে তা লিখলেই লেখা হয়ে যায়। অক্ষর বুনন ছাড়াও যে লেখায় হৃদয় বুনন, কল্পনা ও স্বপ্ন বুনন করে লেখাকে আদেনময় শিল্পে উন্নীত করতে হয়, তা জানতে ও বুঝতে পারি অনেক পরে।
কৈশোর পেরিয়ে আসতে আসতে আমার সহায় হলেন সুব্রত বড়ুয়ার অনুজ কবি ছড়াকার নাট্যজন সনজীব বড়ুয়া। হাতেকলমে সাহিত্যে প্রথম পাঠ আমি পাই সনজীব বড়ুয়ার কাছে। তিনিও আমার অগ্রজ, বয়সে আমার একটু বড়ো। আমি তাঁকে ডাকি সনজুদা। দাদা সুব্রত বড়ুয়ার দেখাদেখি তিনিও লেখালেখি করেন। পত্র-পত্রিকায় তখন তার লেখা ছড়া-গল্প নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তবে তিনি থাকেন চট্টগ্রাম শহরে আর আমি গ্রামে। মাসে একবার, দুবার দাদা গ্রামে আসেন। আসলেই দেখা হয়ে যায়, বাড়ি যে আমাদের কাছাকাছি। বাড়ি ও আত্মীয়তার নৈকট্যের চেয়েও লেখালেখির ঝোঁকের নৈকট্য আমাদের বেশি ঘনিষ্ঠ করে দেয়। আমার ঝোঁক তখনো সুপ্ত। বাইরের আলো বাতাসের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য ঘরের ভেতরের মানিপ্ল্যান্টের আলুথালু ডগার মতো আকুলিবিকুলি করছে। আমি তখন সনজুদার মুগ্ধ শ্রোতা। যা শোনান তা-ই নতুন মনে হয়। অসামান্য চমকপ্রদ মনে হয়। আমার বিস্ময় আর ধরে না। ভাবি, সাহিত্য এমন! আর দাদাকে দেখে অবাক মানি, শহুরে মানুষ, কত কিছু জানেন!
সনজীব বড়ুয়ার দেখাদেখি আমার মাথায়ও তখন পুরোদমে লেখার ঝোঁক চেপে বসেছে। আমিও কিছু লিখি না কেন? আপন মনে যাচ্ছেতাই লিখে খাতা ভরিয়ে তুললাম। তবে কাউকে দেখালাম না। শুধু এই অপকর্ম চেপে রাখতে পারলাম না সনজুদার কাছে। এক ঘোর লাগা দুপুরে আমার লেখালেখির ঝোঁক পাপড়ি খুলতে শুরু করে। আমি সসংকোচে আমার ছন্দের অনাসৃষ্টি সনজুদার হাতে তুলে দিই। তিনি গম্ভীর মুখে লেখাগুলোর ওপর চোখ বুলোন। আমাকে নিরাশ না করেই বলেন, তোমার একটু ছন্দ-অন্ত্যমিল সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। বলতে বলতে তিনি চার মাত্রার স্ববৃত্তের চালটা আমাকে ধরিয়ে দিলেন। আমাকে কবিতা-ছড়ার ছন্দ তাল লয় ইত্যাদি বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান দিলেন। তারপর আমার একটি ছড়া কাটাকুটি করে বারো লাইন দাঁড় করালেন। সে ছড়াটি সুবিধা মতো কোনো পত্রিকায় ছাপাবেন বলে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন শহরে।
এদিকে গ্রামে আশা নিরাশায় দিন কাটে আমার, মুদ্রিত হরফে পত্রিকায় কখন নিজের নাম দেখতে পাব। আদৌ কি আমার সে ছড়াটি ছাপা হবে। এমনি দোলাচলের মধ্যে যখন সময় কাটছে তখন শহর থেকে আমার বাবা বাড়ি এলেন একদিন। বাবা চট্টগ্রাম শহরের কর্মস্থলেই থাকতেন। সেদিন বাড়ি ফিরে বাবা একটি পত্রিকা আমার হাতে দিয়ে বললেন, পত্রিকাটা সনজু দিয়েছে, এতে নাকি তোর লেখা ছাপা হয়েছে, দেখ তো।
তখন ১৯৭৩ সাল, জুন মাসের শেষ দিক। দিনটি ছিল বর্ষণমুখর। তারও কদিন আগে থেকে টানা বৃষ্টি হচ্ছিল গ্রামে। বৃষ্টির পানি জমে গ্রাম থইথই। পথঘাট উঠোন জলে ডোবা। মনে আছে, বাবা সেদিন বাড়ি এসেছিলেন নৌকোয় চেপে। নৌকো থেকে বাবা সোজা নেমেছিলেন আমাদের বারান্দায়। সেই দুর্যোগপূর্ণ দিনে সবাই যখন দুশ্চিন্তায় ভারাক্রন্ত আমি তখন সুখী রাজপুত্র। পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়েছে, আমাকে আর পায় কে? আমি তখন আকাশে উড়ছি। কোমর সমান বন্যার জল মাড়িয়ে এ বাড়ি ও বাড়ির বন্ধুদের পত্রিকাটা দেখিয়ে বেড়ালাম। সে কি আনন্দ, আর কোনো কিছুর সঙ্গে এর তুলনা হয় না।
আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সেই গ্রাম থেকে আমার শুরু। গ্রাম হলেও শহরের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল ভালো। ঢাকার দৈনিক পত্রিকা আমরা দিনে দিনেই পেতাম। আমি সনজুদার সূত্রে ঢাকার সব বড়ো বড়ো পত্রিকার ছোটোদের বিভাগের কথা ও ঠিকানা জেনে যাই। তার নির্দেশিত কায়দায় আমি গ্রামে বসেই লেখা পাঠাতে থাকি ঢাকার পত্র-পত্রিকায়। সে লেখা কখনো ছাপা হয়, কখনো হয় না। তবু আমার আগ্রহ উদ্যমে ঘাটতি নেই। আমি স্কুল শেষে বাজারে গিয়ে বসে থাকি হকারের অপেক্ষায়। কখন হকার আসবে পত্রিকার বোঝা নিয়ে আর আমি বেছে বেছে দেখব ছোটোদের পাতাগুলো। যে দিন স্কুল ছুটি থাকত সেদিন বাড়ি থেকে দুই মাইল পথ হেঁটে বাজারে আসতাম শুধু পত্রিকা দেখার জন্য। শহর থেকে গ্রামে এলে কখনো সনজুদাকেও পেতাম পত্রিকা দেখার সঙ্গী হিসেবে। আমার চেয়ে তার আগ্রহ থাকত আরো বেশি। তার সঙ্গে পত্রিকা দেখার মজাই ছিল আলাদা। প্রাসঙ্গিক নানা খবর বলে অবাক করে দিতেন আমাকে। এভাবে স্বজনে বিজনে, আলাপে প্রলাপে দিন একরকম ভালোই কাটছিল আমার। মেঘের ফাঁকে এক চিলতে রোদের মতো হঠাৎ আমার দু’একটি লেখা ছাপা হয়। পত্রিকার পাতায় লেখার সঙ্গে নিজের নাম দেখে আমি আরো মোহে পড়ে যাই। এ মোহ আর কাটে না। বরং দিন দিন বাড়তে থাকে।
যাত্রা শুরু করেছিলাম ছড়া দিয়ে। ক্রমেই সাহিত্যের অনেক অলিগলির হাতছানিতে বিমুগ্ধ বিহ্বল হয়ে উঠি আমি। আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে সাহিত্যের সব শাখার প্রতি, বাড়তে থাকে পাঠ পরিধি। কবিতা থেকে প্রবন্ধে, প্রবন্ধ থেকে গল্প-উপন্যাসে ছড়িয়ে গেল আমার ভালোলাগা, ভালোবাসা। শিশুসাহিত্য ছাড়িয়ে বয়স্কজন পাঠ্য সাহিত্যেও আমার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
এর মধ্যে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি বাবার কর্মস্থল চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে বাণিজ্য বিভাগে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করি। তারপর ভাগ্য অন্বেষণে যাত্রা করি রাজধানী ঢাকা। এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের ইতি টানি, তখন ১৯৮৩ সাল।
তার আগে ১৯৮২ সালে আমি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। যোগ দিয়েছি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রকাশনা বিভাগে। বিভাগ প্রকাশনা হলেও আমার দায়িত্ব প্রকাশিত বইগুলোর বিক্রয় তত্ত্বাবধান। এই বিভাগের কর্মাধ্যক্ষ কথাসাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার। এটিই আমার পরম আনন্দ, আকর্ষণ ও উৎসাহের বিষয়। আমার পেশাগত জ্ঞান ও নেশাগত জ্ঞান দুটোই পরিপক্বতা পায় তার নিবিড় পরিচর্যায়। কর্মজীবনের সূচনায় বিপ্রদাশ বড়ুয়ার মতো মহৎ উদার মানুষের ¯েœহ সান্নিধ্য শিক্ষা আমার সারা জীবনের পাথেয়। পা-ুলিপি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও মুদ্রণ কাজ তদারকি সবই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন হাতেকলমে। এখানেই জীবনের সঙ্গে জীবিকার যোগ হয়েছিল আমার। তাই আর কোনো পদের প্রলোভনে বিচলিত হইনি। এখান থেকেই আমি সম্প্রতি কর্মজীবনেরও ইতি টেনেছি।
লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার প্রথম ভালো লাগার সুখ ছড়া, কিন্তু আমার প্রাণের ভালোবাসা কবিতা। আমার অন্তর্গত সহজাত আবেগ ও মানস প্রবণতা আমাকে কবিতামুখী করে দিয়েছে। ১৯৮৫ সালে দেখলাম, আমার সমসাময়িক সব লেখকরই বই বেরিয়ে গেছে। প্রায় সবারই প্রথম বই ছড়ার। আমি আর চুপ থাকি কী করে? আমারও খুব ইচ্ছে একটি বই বের করি। লেখা বাছাই করতে গিয়ে দেখি, আমার ভালোলাগা সব লেখাই কবিতা, ছড়া তেমন নেই। কিশোর কবিতাধর্মী লেখাগুলো নিয়েই পা-ুলিপি তৈরি করলাম, নাম দিলাম ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’। তখন বই পড়ার সূত্রে সপ্তাহে দু’একবার বিকেলে আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাওয়া-আসা করি। আহমাদ মাযহার তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরি বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। তিনিও ছড়া-কবিতা-গল্প লেখেন। এক বিকেলে তাকে বললাম, পা-ুলিপি তৈরি করছি, বই বের করব। মাযহার উৎফুল্ল, খুশি হয়ে বললেন, করেন, আমিও বই বের করব। জানলাম, মাযহার ছড়ার পা-ুলিপি তৈরি করছেন।
বেশ, দুজনের প্রথম বই প্রকাশের কাজ শুরু হলো, শুরু হলো বই প্রকাশের জন্য আমাদের উন্মাদনা। বইয়ের চূড়ান্ত লেখা নির্বাচন, ছবি অংকন, মুদ্রণ-বাঁধাই মান ইত্যাদি নিয়ে চলল অবিরাম জল্পনা কল্পনা। এসব কাজে তখন দু’জনের সময় কাটত প্রায় একসঙ্গে। আহমাদ মাযহারের একটি সাইকেল ছিল। বাসা ছিল যাত্রাবাড়ি। আমার বাসা শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি। মাযহারের সাইকেলের পেছনে চড়ে দু’জন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম সারা শহর। কখনো শিশু একাডেমি, কখনোবা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, হয় আমার বাসা শাহজাহানপুর, নয়তো মাযহারের বাসা যাত্রাবাড়ি। তখন রাতদিন এই ছিল আমাদের জীবনের চৌহদ্দি। কোনো কোনো রাতে মাযহারের বাসায় থেকে গিয়েছি, ওর বিছানায় একসঙ্গে ঘুমিয়েছি। সেইসব উন্মাদনার স্মৃতি আমার জীবনের এক উজ্জ্বল অংশ। মনে পড়লে এখনো রোমাঞ্চিত হই। দুটি বইয়ের জন্যই আামাদের দুজনের ছিল সমান উদ্বেগময় ভালোবাসা।
এদিকে আমার প্রথম বই প্রকাশের কথা শুনে শ্রদ্ধেয় চিত্রশিল্পী হাশেম খান নিজে থেকেই বললেন, তোমার বইয়ের প্রচ্ছদ আমি এঁকে দেব। ভেতরের ছবি অন্য কাউকে দিয়ে আঁকিয়ে নাও। ভেতরের ইলাস্ট্রেশন করতে দিলাম শিল্পী মামুন কায়সারকে। মাযহারের ছড়ার বইয়ের নাম ‘ঘুমের বাড়ি’। বইয়ের ছবি আঁকতে দিলেন শেখ তোফাজ্জলকে। ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’ ও ‘ঘুমের বাড়ি’ বই দুটি প্রকাশের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকের দ্বারস্থ হলাম না আমরা। এমনিতেই প্রকাশকরা ছড়া-কবিতার বই প্রকাশে বিমুখ। তার ওপর আমরা অখ্যাত অতি তরুণ, আমাদের মতো লেখকের বই প্রকাশ করবে কোন বাহাদুর প্রকাশক? সুতরাং নিজের টাকাতেই বই প্রকাশ করব আমরা। প্রকাশক হিসেবে একটি নাম দিতে হয়, তাই মাযহার নাম ঠিক করলেন, গ্রন্থায়ন।
বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে আমরা বই প্রকাশের অভিযানে নেমেছিলাম। মনে আছে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ আমার প্রথম বই ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’ প্রকাশিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ কিশোর কবিতার বই। মাযহারের বইটা বেরিয়েছিল আমারটার দুদিন আগে। যা হোক, বই বেরুবার পর বইমেলার বিভিন্ন পরিচিত স্টলে বিক্রয় ও প্রদর্শনের জন্য বিতরণ করে দিলাম। দুদিন পরের কথা। আমি বইমেলায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির স্টলে বসে আছি। সন্ধ্যার পর পর ঝড়ের গতিতে আমাদের স্টলে অগ্রজ শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন এসে উপস্থিত। স্টলের বাইরে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মধ্য থেকে উচ্ছ্বাস ভরা গলায় বললেন, সুজন, আমি আপনার বইটা এক স্টলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ফেলেছি। বছরের সেরা বই।
আমি হেসে বললাম, আপনাকে আমি বই দেব। আখতার ভাই বললেন, আমি বড়ো একটি আলোচনা লিখব। তিনি আলোচনা লিখেছিলেন। সে আলোচনাটা ছিল আমার জন্য অনেক বড়ো আশীর্বাদ। তার উচ্ছ্বাস সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আমার প্রথম বই ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’ সে বছর ছড়া-কবিতা-গান বিভাগে সেরা বই হিসেবে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।
আমি সব সময়ই কবিতা সুবোধ্য ও সহজ করার পক্ষে। কবিতায় আধুনিক উত্তরাধুনিক দার্শনিকত্ব বিমূর্ত পরাবাস্তব ইত্যাদি ধারা ও চেতনার বহুমুখী টানাপড়েনের যুগে আমার সহজ করে কবিতা লেখার প্রবণতার জন্য আমি ছোটোদের কবি হিসেবে সীমিত গ-িতে আবদ্ধ। আমার সেসব কবিতাকে বলা হয় ছোটোদের কবিতা বা কিশোর কবিতা। গত শতকের সত্তরের দশকের শেষদিকেও কবিতার এমন বিভাজন ছিল না। এতে আমার রাগ বা বিরাগ নেই। আমার কাজ আমার মতো করে কবিতা লেখা। আমি তা-ই করে গিয়েছি। আমার একান্ত চেষ্টা ও চাওয়া কবিতার ধ্রুপদী শক্তিকে জাগিয়ে তুলে তা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আমার দেখাদেখি অনেকেই এই ধারায় ছোটোদের কবিতা লিখেছেন এবং লিখছেন। এখন এই ধারার কবিতা কিশোর কবিতা অভিধায় অভিষিক্ত, স্বীকৃত।
সেই যে পথ চলা শুরু আর থামাথামি নেই, আমি হেঁটেই চলেছি অবিরাম সাহিত্যের দিগন্ত রেখার দিকে। মাঝখানে কতজনের সঙ্গে দেখা হলো, কত চড়াই-উৎরাই, খানা-খন্দ, নিন্দা-মন্দ, কাঁটা-ফুল পেলাম। সবই আপন ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছি, পরম প্রাপ্তি হিসেবে গ্রহণ করেছি।
কবিতা লিখতে লিখতে আমার মনে হয়েছে আমার কবিতায় সাবলীলভাবে অনেক গল্পের উপাদান ঢুকে যাচ্ছে। তাই কবিতাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য কিছু গল্প-উপন্যাসও লিখেছি, প্রবন্ধ-নিবন্ধও কিছু লেখা হয়েছে। ছোটোদের পাশাপাশি একইসঙ্গে বড়োদের জন্যও। তারপরও গদ্য-পদ্য মিলিয়ে আমার গ্রন্থসংখ্যা অন্যদের তুলনায় তেমন বাড়েনি, আমার এখন ১০০টির মতো গ্রন্থ। মান বাঁচাতে গিয়ে পরিমাণ বাড়ানো হয়নি। এর মধ্যে আমি হয়তো অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছি। পুরস্কারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, এম. নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আনন শিশুসাহিত্য পুরস্কার, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি। এর প্রথম উল্লিখিত দুটি পুরস্কার আমি একাধিক বার অর্জন করেছি। ইতোমধ্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও আমি লাভ করেছি। তবু মাঝে মাঝে আত্মজিজ্ঞাসা জাগে, এই পরিমাণ লিখে কি আমার শেষরক্ষা বা মানরক্ষা হবে?
0 মন্তব্যসমূহ