কী লিখি কেন লিখি শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ

কী লিখি কেন লিখি 
শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ


কী লিখি কেন লিখি 
শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ
কবি-গীতিকার। সম্পাদক, ‘তিতলি’, নদিয়া

কী লিখি, কেন লিখি--এ বিষয়ে যাবার আগে দেখে নিই --লেখা এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কী বলেছেন --" যাকে উপলব্ধি করোনি, সত্যানুভূতিতে যাকে আপন করে পাওনি, তাকে ঘটা করে ভাষার আড়ম্বরে ঢেকে পাঠক ঠকিয়ে বড়ো হতে চেয়ো না। " তাই আমি সেটুকুই লিখি যা সত্য বিশ্বাস করে। তা নিয়ে লিখি না যা আমার চোখ আর মন বিশ্বাস করে না। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলতেন --" আমার অত কল্পনা নেই, কল্পনালতা নেই, আমি যা দেখি তার থেকে তুলে নিই।"   আর বিশ্বাস করি সংযমে। ওই যে নীরেনদা কবিতায় বলেছেন না --" আমার সামনে ছিল লোভ / আমার পিছনে ছিল ভয়/  আমি ভেবেছিলুম / একে একে আমি তাদের মোকাবিলা করব / কিন্তু তার দরকার হলো না / একজনকে আক্রমণ করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেলুম / অন্যজনও ফতুর হয়ে গেছে "  ( জোড়া খুন )। আমিও বিশ্বাস করি যে প্রকৃত লেখক হতে গেলে এই দুই ক্ষতিকর শক্তিকে খুন করতেই হবে।
       পাবলো নেরুদার মতো আমিও বলি --আই লিভ ইন মাই টাইম। আবার এটাও মনে করি শুধু বর্তমান সময়কে, দেখলেই হবে না, দেখতে হবে ভবিষ্যৎ সময়কেও। কারণ " কবি হবেন ঋষি, সত্যদ্রষ্টা" (রবীন্দ্রনাথ)। শুধু কবি নয়--গল্পলেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক--সকলকেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। আর এই দৃষ্টিই আমাকে বলবে --আমি কী লিখব, আর কী লিখব না।
      কেন লিখি --এ প্রশ্নও আসবে স্বাভাবিকভাবে। উত্তরে --সৃষ্টির আনন্দ পাবার জন্যে বা নিজেকে জানানো-চেনানোর জন্যে বললেই সবটুকু বলা হবে না , সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাটাও বলতে হবে। এটাও বলতে হবে যে --আমার লেখা সুকান্তের মতো সমাজের আবর্জনা পরিষ্কার করুক। আমার লেখা চাক মানবপ্রাণে ভালোবাসা তৈরি করতে --আরো চাক সেই ভালবাসা স্ট্যাটিক না হয়ে ডায়নামিক হোক। পরিবার থেকে প্রতিবেশে -- প্রতিবেশ থেকে  দেশে ছড়িয়ে গিয়ে বিবেকানন্দের মতো বলুক "এই ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ"। বলুক এই বিশ্বের সবাই আমার ভাই।
     প্রাসঙ্গিকভাবে --কীভাবে লিখি এ প্রশ্নও আসে। উত্তরে বলি --যাই লিখি না কেন প্রথমে আইডিয়াটা মাথায় আসে । আইডিয়া বুঝে ঠিক করতে হয় ফর্ম। তারপর গদ্য পদ্য নাটক --যাই লিখি না কেন, নামি ভাববিস্তারের খেলায়। ভাষার সাহায্যে এই ভাববিস্তার এমনভাবে ঘটাতে হয় --যাতে থাকে রস, আবেগ, মাধুর্য,   অলংকার, বিশ্লেষণ, নাটকীয়তা ( প্রয়োজনবোধে ) এবং সর্বোপরি সারল্য।
      এবার আসি, প্রথম বই প্রসঙ্গে। আমার প্রথম বই 'কাশফুলের বালিশ' ( ছোটদের গল্প সংকলন )। প্রকাশনায় -- কলকাতার পাবলিকেশন 'ছোটোদের কচিপাতা' । এই  বই প্রকাশে সহযোগিতা করেছিলেন সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক কার্তিক ঘোষ। বইটি তাকেই উৎসর্গ করেছিলাম। ঠিক এর পরেই সৃষ্টি প্রকাশন থেকে বেরিয়েছিল 'ছোটদের আবৃত্তিযোগ্য কবিতা'। এই বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন শিক্ষাবিদ ও শিশু সাহিত্যিক পবিত্র সরকার।তিনি প্রুফও দেখে দিয়েছিলেন। বইটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। এঁদের প্রেরনা আমাকে উদ্দীপ্ত করেছিল।  
     তাঁরও আগে -- কৈশোর বেলাতেই সাহিত্য-মনস্ক করে তুলেছিলেন --গ্রামেরই স্বনামধন্য সাহিত্যিক সুনীতি মুখোপাধ্যায়।
প্রথম প্রেরণাদাতা তিনিই। অবশ্য আমার মধ্যে একটা সাহিত্য-পাঠের খিদে বোধহয়  সহজাত ছিল। সেই বালক থেকে কৈশোর-তারুণ্যে এত গল্পের বই পড়েছি যে তার সংখ্যা বলা শক্ত। এও বোধহয় একটা জন্মগত প্রেরণা। যদিও আমার বাড়িতে এসবের কোনো চল ছিল না। আমার বাবা কৃষক ছিলেন এবং আমার বারো বছর বয়সের সময় মারা যান।তবে আমার কাকা প্রধানশিক্ষক ও সংস্কৃতিমনস্ক ছিলেন। তাঁর লেখা গানও গ্রামে গাওয়া হত। তিনি নাটক থিয়েটারও করতেন। তবে আমি সুনীতি মুখোপাধ্যায়কেই আমার সাহিত্যজীবনের গুরু বলে মানি।
      ২০ বছর বয়সে আমার প্রথম লেখা একটি কবিতা ' কিশোর ভারতী' পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়েছিল আর আজ তার ৫০ বছর পরে কলকাতার দেশ, আনন্দবাজার ,বর্তমান, নন্দন, সন্দেশ, শুকতারা সহ সমস্ত নামী পত্রিকা এবং মফস্বলের সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়।
        আকাশবাণীতে নিয়মিত নাটক সম্প্রচারিত হয়। বেতারনাটক লিখে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পেয়েছি।মোট ১২ টি নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে। আকাশবাণী অনুমোদিত গীতিকার হয়েছি।  নামী সুরকারগণ আমার গানে সুর করেন। খ্যাতনামা শিল্পীরা আমার গান করেন।
৩০ এর বেশি গান এখনো পর্যন্ত সম্প্রচারিত হয়েছে আকাশবাণী কলকাতা থেকে। দুরদর্শন কেন্দ্র থেকে প্রোগ্রাম করেছি কবি হিসেবে।বিভিন্ন সংস্থা দ্বারা পুরস্কৃত ও সম্বর্ধিত হয়েছি। বেশ কয়েকবার সাহিত্যসূত্রে বাংলাদেশ গেছি ও সম্মানিত-সম্বর্ধিত হয়েছি। রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সেমিনার এটেন্ড করেছি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে কবি-সাহিত্যিক সম্মেলনে  যোগদান করেছি।
        এখনো পর্যন্ত আমার লেখা বইয়ের সংখ্যা ২৪ পেরিয়েছে। তার মধ্যে ছোটদের কবিতা,গল্প,উপন্যাস,নাটক মিলে মোট গ্রন্থ ১৬ টি। বড়োদের কাব্যগ্রন্থ ৫ টি।প্রবন্ধের বই ৩ টি।এছাড়াও সম্পাদিত প্রবন্ধের বই ১ টি। সম্পাদিত কবিতা সংকলন ২টি।
     আমার কবিতা নিয়ে দুটি আবৃত্তির এলবাম প্রকাশ করেছে প্রিয়ম ক্যাসেটস নামে একটি সংস্থা। তাতে প্রখ্যাত বাচিকশিল্পীরা আমার কবিতা আবৃত্তি করেছেন এবং কবিতাগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।
   এ সবই আমার পঞ্চাশ বছরের সাহিত্য জীবনের অর্জন। এখনো কল সচল আছে --প্রিন্ট মিডিয়ায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার লেখার একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফেসবুকে, হোয়াটস আপে, মেসেঞ্জারে বিষয়ভিত্তিক কবিতা পাঠাবার অনুরোধ আসে। বাচিকশিল্পীরা সে সব কবিতা আবৃত্তি করে পোস্ট করেন। দেখে শুনে মন ভালো হয়। এই ভালো লাগাটুকু থাকলে হয়তো আরো কিছুদিন লিখে যেতে পারব। আর লিখলে আপনাদের ভালোবাসা তো আমার জন্য রইলই।

ধুবুলিয়া, নদিয়া, প.ব. ,ভারত পিন- 741139 / 9434342679 email
syamaprasadghosh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. ভালো হয়েছে। কিন্তু কী করে লিখতে লাগলাম-ের ব্যাপারটা বেশি এসেছে।

    উত্তরমুছুন