কী লিখি কেন লিখি স্বরোচিষ সরকার

কী লিখি কেন লিখি 
স্বরোচিষ সরকার

কী লিখি কেন লিখি 
স্বরোচিষ সরকার
প্রাবন্ধিক-গবেষক। বাংলাদেশ

আমার প্রথম প্রকাশিত লেখার নাম ‘মুক্তিযুদ্ধে আমি’। এটি একটি কবিতা। প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে গোপালগঞ্জ থেকে প্রকাশিত মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস সম্পাদিত ‘দীপ্তি’ পত্রিকায়। তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। একজন নৌকমান্ডো মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে হাঙ্গরের আক্রমণের মুখেও শত্রুর জাহাজের কাছে গিয়ে মাইন পেতে আসে, সেই কাহিনি নিয়ে লেখা কবিতা। আমার প্রকাশিত প্রথম গল্পের নাম ‘মেঘের খেলা’। প্রকাশিত হয়েছে বাগেরহাট পিসি কলেজের স্মরণিকা ‘প্রজ্ঞা’-য় ১৯৭৭ সালে। আমার প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ “কবিগান: অতীত ও বর্তমান”। প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ‘সাহিত্য পত্রিকা’-য়। আমার প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম ‘মুকুন্দদাস’। ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি থেকে এটি প্রকাশ পায়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাহিত্যসাধক চরিতমালার আদলে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল তখন জীবনী গ্রন্থমালা নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে আমি লেখক হিসেবে আমন্ত্রণ পাই। বলা যায়, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ঐ আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে প্রাবন্ধিক হিসেবে লেখালেখির জগতে আমার প্রবেশাধিকার সৃষ্টি হয়।

আমার লেখক হয়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক ঐতিহ্য কিছুটা কাজ করেছে বলেও আমি মনে করি। আমার পিতা স্বরূপেন্দু সরকার কবিগান করতেন। ১৯৬০-এর দশকে তাঁর গানের বই ‘ভাটির নাইয়া’ প্রকাশিত হয়, সেই বইয়ের সূচনায় তাঁকে লেখা জসীমউদ্‌দীনের একটি পত্রও মুদ্রিত হয়। ছাত্রজীবনে লেখাপড়ার চেয়ে কবিতা-গল্প লেখার দিকে আমার মনোযোগ কিছুটা বেশি থাকতো। তাই পরীক্ষার ফল তেমন ভালো হতো না। কিন্তু কবিতা লিখে, গল্প লিখে পুরস্কার পেতাম, পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশিত হতো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক হিসেবে পাই বিখ্যাত প্রাবন্ধিক ডক্টর গোলাম মুরশিদকে। তাঁর কাছে আমার প্রবন্ধ লেখার হাতেখড়ি।

গত ত্রিশ বছরের লেখালেখির বিচারে আমাকে একজন প্রবন্ধকার বলাই যেতে পারে। তবে অভিধান সংকলন- সম্পাদনার কাজ, ব্যাকরণ রচনার কাজ, অনুবাদের কাজ, ও নানা ধরনের বই-জার্নাল সম্পাদনার কাজও আমাকে করতে হয়েছে। প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হয়েছে কখনো সাহিত্য সমালোচনা, কখনো সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব, কখনো ইতিহাস, কখনো ফোকলোর, আবার কখনো ভাষাবিদ্যা।

যিনি গবেষণা-প্রবন্ধ লিখবেন, তাঁকে পক্ষে কোনো ধরনের আদর্শবাদ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া চলে না। এ কথা মনে রেখে সবসময়ে চেষ্টা করি যথাসম্ভব নির্লিপ্ত থেকে আমার গবেষণালব্ধ ধারণা প্রবন্ধের আকারে উপস্থাপন করতে। এ কাজে ভিতরের চাপ যতোটা না কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে কোনো না কোনো উপলক্ষ। সেসব উপলক্ষ আবার প্রায় ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো বিদ্যায়তন, সংগঠন বা পত্রিকার আগ্রহের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

প্রায় ত্রিশ বছর ধরে আমি কম্পিউটারে লিখি। প্রথম জীবনে কালির কলম দিয়ে কাগজের উপরে লিখতাম। কিন্তু এগুলো হলো লেখার বাইরের উপকরণ। প্রবন্ধ লেখার সময়ে আমাকে দুই ধরনের তথ্যের উপরে নির্ভর করে লিখতে হয়: প্রাথমিক উপকরণ আর সহায়ক উপকরণ। ধরা যাক বরীন্দ্রনাথের উপরে একটি প্রবন্ধ লিখছি। তখন আমার প্রাথমিক উপকরণ হলো রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় রচনা। আর সহায়ক উপকরণ হলো এই বিষয়ে অন্যেরা যা কিছু লিখেছেন, সেসব।  লেখার লক্ষ্য ঠিক করার পর আমি প্রাথমিক ও সহায়ক উপকরণ পাঠ করি, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করি, তারপর নির্ধারিত লক্ষ্যের মধ্যে যে মোক্ষম প্রশ্নগুলো থাকে, সেই প্রশ্নের জবাব মেলাতে শুরু করি। তাতেই একটা প্রবন্ধ দাঁড়িয়ে যায়।

সাধারণত গবেষণাপত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হয়। বাংলা একাডেমি পত্রিকা, এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা, সাহিত্য পত্রিকা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, আইবিএস জার্নাল প্রভৃতি পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় আমার বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বড়ো ধরনের একাধিক গবেষণা-প্রবন্ধ একাধিক বই আকারে বাংলা একাডেমিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশক প্রকাশ করেছে।

যাঁরা প্রাবন্ধিক এবং বিশেষভাবে যাঁরা গবেষণা-প্রবন্ধ লেখেন, তাঁরা অনেকটা মজুরের মতো। প্রবন্ধ রচনার অনুরোধ বা আহ্বান থেকেই তাঁরা অনুপ্রেরণা পান। আমার লেখার পেছনেও তাই বহুজনের অনুপ্রেরণা সক্রিয়। আমি আমার বইগুলো যাঁদের উৎসর্গ করেছি, আমার প্রেরণার উৎস হিসেবে তাই তাঁরা বিবেচিত হতে পারেন। এই তালিকায়  আনিসুজ্জামান, গোলাম মুরশিদ, হাসান আজিজুল হক, শামসুজ্জামান খান, আবুল হাসনাতের মতো বহু বিখ্যাত ব্যক্তি যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন আমার পিতা-মাতা-স্ত্রী-বন্ধুবান্ধব আর ছাত্রছাত্রী। তবে আমার লেখার সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা হলো পাঠকের প্রতিক্রিয়া।

আমার প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। তার মধ্যে অনেকগুলো একক বইয়ের আকারে এবং অনেকগুলো সংকলিত বইয়ের মধ্যে মুদ্রিত হয়েছে। এ পর্যন্ত আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আটত্রিশ। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণা-গ্রন্থ, প্রবন্ধ-সংকলন, সম্পাদিত বই ও জার্নাল, অভিধান, অনূদিত বই, ও পাঠ্যপুস্তক। অনলাইনে আমার নাম লিখে (https://bn.wikipedia.org/wiki/স্বরোচিষ_সরকার ) অনুসন্ধান করলে এসব বইয়ের নাম পাওয়া যায়।

আমার প্রথম প্রকাশিত বই ‘মুকুন্দদাস’ (১৯৮৭) সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। সে বছর বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ৩০টি বই সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি মাত্র তিনটি বইয়ের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন, যার মধ্যে আমারটি ছিলো। আমার ‘একাত্তরে বাগেরহাট’ (২০০৬) বই সম্পর্কে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর পরিমার্জিত সংস্করণে আমার ভূমিকা ও কৃতিত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আবদুল কাইউম তাঁর ‘অভিধান’ (২০০২) গ্রন্থে।

প্রবন্ধ ও গবেষণা শাখায় ২০১৯ সালের জন্য আমাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়। একই বছর আমি আরো একটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার পেয়েছি, তার নাম ‘জোহরা শামসুন্নাহার সাহিত্য-গবেষণা পুরস্কার’ (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)। ২০১৩ সালের মধুসূদন পদক বা ২০০৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এওয়ার্ডও প্রবন্ধকার হিসেবে আমার স্বীকৃতির স্মারক।
==== 
ড. স্বরোচিষ সরকার: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ