কী লিখি কেন লিখি কমলিকা মজুমদার

কী লিখি কেন লিখি
কমলিকা মজুমদার 



কমলিকা মজুমদার 
কী লিখি কেন লিখি

খুব ছোটবেলায় সুকুমার রায়ের ‘আহ্লাদী’ কবিতায় একটা লাইন পড়েছিলাম – ‘হাসছি কেন কেউ জানি না, পাচ্ছে হাসি হাসছি তাই’ । ওপরের প্রশ্নটি প্রথম পড়েও আমার মনে এই লাইনটাই ঘুরিয়ে এসেছিল ‘লিখছি কেন তা জানি না,পাচ্ছে লেখা লিখছি তাই’। একেবারেই সহজ সরল উত্তর, কিন্তু এই যে লেখা পাওয়া, এইটাই সবথেকে গন্ডগোল ব্যাপার। লেখক মূলত এই লেখার পেছনেই ছুটে ছুটে সারা জীবন পার করে হাসিমুখে।   

প্রথমেই বলে রাখি এই লেখা লেখির জগতে আমি এখনও টালমাটাল পায়ে একটু আধটু হেঁটে বেড়াচ্ছি। বেশিরভাগ মানুষ আমার লেখা পড়েন নি, পড়তে চান এমন সংখ্যাও নেহাত কম। তবু আজকাল অনেকসময় দু-একজন ভুল করে কবি ডেকে ফেলেন, আমি চমকে উঠি, ভাবি গিয়ে ভুল শুধরে দি। 

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একটি মজার উপমা দিয়েছেন কবিতা সম্পর্কে। উনি কবিতা রচনাকে সিংহ শিকারের সাথে তুলনা করেছেন। শিকারী খবর পেয়ে ছুটে যান সিংহ শিকারে।আদতে তিনি নিশ্চিত জানেন অব্দি না সেখানে সিংহ আছে কি নেই,থাকলে সঠিক স্থান কোথায়। অথচ শুধু শোনার উপর নির্ভর করে তিনি খুঁজে বেড়ান ও হয়তো পেয়েও যান কখনো। কবিরা তাঁদের জীবনযাপনে ঠিক এভাবেই ছুটে চলেন কবিতার খোঁজে।কেউ খুঁজে পায়,কেউ পায় না,সে অন্য গল্প;কিন্তু খোঁজটাই আসল।

কবিতার দুনিয়ায় যখন প্রথম পা রেখেছি তখন বুঝতে পারিনি এতে এত খানাখন্দ, গলিপথ। কবিতা কোন অংক না যে সুত্র ধরে সমাধান মিলবে। ছন্দ,শব্দ,উপমা, রূপক এরা কবিতার এক এক অলংকার কিন্তু কোনটা কোথায় কতটুক দিলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি হবে তার কারিগর কিন্তু কবি। কবিতাকে ভাল রাখতে হলে ভাল বসতে হয়,সময় দিতে হয়। কবিতাকে ভালবেসে তার কাছে গেলে কবিতা নিরাশ করে না।

কবিতা হলো কবি জীবনের এক টুকরো এডভেঞ্চার ।জীবনের নানা সাধারণ কাজের সমুদ্রের ফাঁকে এক ফালি সবুজ জমি ।সেখানে সে একা বাসিন্দা,সে নিজেই  প্রভু ও নিজেই ভৃত্য। তাঁর দায় নেই সামাজিক বেড়াজাল রক্ষার, হাসি দেখিয়ে কান্না লুকোবার। সেখানে সে ঈশ্বরের বরপুত্র- শুভ্র, পবিত্র, শান্ত। যে জীবনে একবার এই রহস্যস্থল উদঘাটন করতে পেরেছে, বারবার সে ফিরে আসতে বাধ্য। এবং এর জন্যই হয়তো আমার কবিতা লেখা, কবিতাকে ভালোবাসা।
 
হুমায়ুন আজাদ বলেছেন ‘মানুষ ও কবিতা অবিচ্ছেদ্য। মানুষ থাকলে বুঝতে হবে কবিতা আছে : কবিতা থাকলে বুঝতে হবে মানুষ আছে।’ সত্যি হয়তো এমন করেই মিশে রয়েছে কবিতা মানবজমিনে। কবি শুধু শব্দ চাষ করে তাকে খুঁজে এনে তুলে ধরে। কবিতার রহস্যময় জগতে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে পেয়ে যায় তার অকাঙ্খিত  কবিতাটি। এটাই হয়তো আসলে কবির কবিতা পাওয়ার গল্প, বা কবিতার তার কবিকে পাওয়া। একথা শুধু জানে কবি,আর জানে তার কবিতারা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ