কী লিখি কেন লিখি সন্তোষ ঢালী

কী লিখি কেন লিখি 
সন্তোষ ঢালী

কী লিখি কেন লিখি 
সন্তোষ ঢালী
কবি। অধ্যাপক, বাংলা। প্রধান সম্পাদক, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), ঢাকা।

কবে, কখন, কীভাবে শৈশব কৈশোর তারুণ্য পেরিয়ে সাবালক হয়েছি- টের পাই নি। কবে যে নদীতীরে হাঁটতে হাঁটতে জীবনের মোহনার কাছে পৌঁছে গেছি- টের পাই নি। তেমনি করেই কবে, কখন, কীভাবে লিখতে শুরু করেছি এবং কখন যে সাহিত্য অঙ্গনে প্রবেশ করেছি- টের পাই নি। ফুলবাগানে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে রাজবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছি- টের পাই নি। কবে থেকে কেন যে লিখতে শুরু করেছি- মনে নেই। কলেজ জীবনেই সম্ভবত লেখালেখির শুরু। দু’একটা কবিতা, দু’একটা গান। এর আগে কখনও কিছু লিখেছি বলে মনে পড়ে না। 

মা ভালো গল্প বলতে পারতেন এবং প্রচুর প্রবাদ জানতেন। মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে গল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। রামায়ণ, মহাভারত পড়ে পড়ে শুনাতেন মা। স্কুল-জীবনে হোস্টেলে থাকা অবস'ায় বাবার চিঠি পেতাম। সে চিঠির ভাষার মধ্যে সাহিত্যের গাঁথুনি ছিল। নানা উপমা দিয়ে, বিশেষণ দিয়ে বাবা তাঁর দুঃখ কষ্ট হতাশার কথাগুলো লিখতেন। তার মধ্যে সাহিত্যের উপাদান ছিল। এস.এস.সি. পরীক্ষার পর ছুটির তিন মাসে পড়ে ফেলেছিলাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগ্র রচনাবলি। বাড়ির পাশের স্কুলের লাইব্রেরিতে লাল মলাটের বারো খণ্ডের সুদৃশ্য বই দেখে আকৃষ্ট হলাম। ‘বিভূতি রচনাবলী’। প্রথম খণ্ড পড়ে এত ভালো লাগল যে পরপর বাকি খণ্ডগুলোও ছুটির তিন মাসে পড়ে ফেললাম। এরপর থেকে বই পড়ার নেশা আমাকে পেয়ে বসে। এবং বিভূতিভূষণ আমার প্রিয় লেখক হয়ে ওঠেন। বিভূতিভূষণের সেই জীবনদর্শন ও জীবনবোধ আমার আদর্শ ও পাথেয় হয়ে থাকল। খুব আকৃষ্ট হয়েছিলাম তাঁর প্রকৃতি, চরিত্র ও বর্ণনায়। তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েও লেখালেখি শুরু করি নি। তবে প্রভাবিত হয়েছি, নিঃসন্দেহে বলতে পারি।

এস.এস.সি. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করলেও আশানুরূপ ফল না হওয়ায় রাগ করে ভারতে চলে যাই। সেখানে নানা জায়গায় ভ্রমণ করি। পুরী, কোনারক, ভুবনেশ্বর, উদয়গিরি, ধবলগিরি, খণ্ডগিরি, তারাপীঠ, বক্রেশ্বর। কিন' সব মিলিয়ে ভালো না লাগায় সাতানব্বই দিন ভারতে অবস'ান করে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসি। ভারতে পড়ালেখা করার কথা থাকলেও কোনো স্কুলেই ভর্তি হই নি। মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের মতো এত ভালো দেশ আর নেই। তাই আবার ফিরে আসা। বাংলাদেশে ফিরে ভারতের সেই হাহাকারের দিনগুলোর কথা লিখতে শুরু করি ‘এ ট্যুর ফর নাইনটি সেভেন ডেজ’ (বাংলায়)। বেশ কয়েক পৃষ্ঠা লেখর পর আর লেখা হয় নি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই কী কারণে যেন শুরু করে দিলাম লেখালেখি। কবিতা, গল্প এবং দু’টো উপন্যাস। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে বি.এ (অনার্স) ভর্তি হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল লেখালেখি। কারণ, ততদিনে শিক্ষকদের কল্যাণে জেনে গেছি- ওসব কিছুই হচ্ছে না। কিছু না জেনেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলাম। পুরনো দলিল বাতিল করে দিয়ে আবার শুরু করলাম লেখালেখি গল্প, কবিতা। প্রকরণ সম্পর্কে ততদিনে কিছুটা ধারণা জন্মেছে। এসবে কারও অনুপ্রেরণা ছিল বলে মনে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গণ্ডী এবং বিদ্যা ও সংস্কৃতি-চর্চার উদার আহ্বান আমাকে আকৃষ্ট করে। সে সময়েই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ও অনুরাগ সৃষ্টি হয়। আমার সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি। একটু-আধটু লিখতে চেষ্টা করা। জগন্নাথ হলের দেয়াল পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশ। ভালো লাগা এবং উৎসাহ-উদ্দীপনায় সাহিত্য রচনার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া।

১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে (জানুয়ারির ৩ তারিখ) মা মারা যান। জীবনে প্রথম কোনো শোকের আঘাত। শোক কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লেগেছিল। সে বছরই আমার জীবনে নেমে আসে আরেকটি বিপর্যয়। রাজনৈতিক কারণে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। এক গভীর রাতে আমার বাড়িতে আক্রমণও করা হয়। প্রায় দু’আড়াই ঘণ্টা বন্দুকের নল লাগানো ছিল বুকে। ডাকাতদের কেউ বলে গুলি করে মেরে ফেল। কেউ বলে গুলি খরচ করা লাগবে না; ডান হাতটা কেটে নিয়ে আয়। কেউ বলে দড়ি দিয়ে পিঠমোড়া বাঁধ দিয়ে মাথায় করে নিয়ে চল। পাথারে নিয়ে কুচিকুচি করে কেটে মাটিতে পুঁতে রেখে যাব। কাকুতি-মিনতিতে প্রাণে রক্ষা পাই। কিন' সর্বস্ব লুট করে দুষ্কৃতকারীরা চলে যায়। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে আমার জীবনে নেমে আসে আর একটি মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ঘটনা। সারাদেশ ডুবে গেছে বন্যায়। ঘরের ভেতরও জল। চৌকির নিচে মেঝেতে জল। ব্যাগের মধ্যে ছিল গোখ্‌রো সাপ। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছোট ভাই সৌমেন্দ্রকিশোরকে (বয়স মাত্র সাড়ে ছয় বছর) এক সকালে সাপে কাটে এবং আমার হাতে শুয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সারাদিন সারারাত মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ভোরে মারা যায়। এ হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাকে এতটাই বিধ্বস্ত করেছিল যে মানসিকভাবে আমি কিছুটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। স্বাভাবিক হতে বছর খানেক সময় লেগেছিল। একের পর এক মর্মন'দ এবং দুঃসহ ঘটনাগুলো আমার সময়কে দুম্‌ড়ে মুচ্‌ড়ে দেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে শেখায়। জীবনের মানেই আমার কাছে বদলে যায়। এই সব শোক কাটিয়ে উঠে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করাটা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। জীবনের গঠনের সেই আদর্শ সময়ে এইসব শোক ও বিপর্যয় আমাকে একেবারে বিধ্বস্ত করে দেয়। আমার সেই কষ্টের বোধ এবং উপলব্ধিগুলো সাহিত্যের আধারে ধরা দেয়। এ সময়ে লিখতে শুরু করেছিলাম ‘দুঃস্বপ্নের কালো রাত’ উপন্যাস। তাও আলোর মুখ দেখে নি। 

১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে সাপ্তাহিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় প্রথম লেখা। একটা কবিতা। জগন্নাথ হল ‘সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহ’এ অংশগ্রহণ করে ছোটগল্প রচনায় দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করি। পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটগল্পটি ‘বাসন্তিকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে পড়ে সকলেই প্রশংসা করেন এবং উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। এতে নিজের লেখার প্রতি আমার আস'া জন্মে। তখন থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির শুরু। এম.এ. পাস করার পর ‘বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : বিষয় ও শিল্পরূপ’ শিরোনামে এম.ফিল. গবেষণা করি। পরবর্তী সময়ে ‘নজরুলের কবিতা ও গানে লোকজ উপাদান’ শিরোনামে পিএইচ.ডি. গবেষণা করি। গবেষণা করতে গিয়ে লেখালেখির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি। লিখতে আনন্দ পাই। তখন থেকেই নিয়মিতভাবে লিখছি গল্প, কবিতা, ছড়া, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক। আর লিখি প্রাণের টানে। বুঝতে পারি, কবিতায় জীবনানন্দ দাশ দ্বারা প্রভাবিত। গল্পে রমাপদ চৌধুরীর বর্ণনা দ্বারা অনুপ্রাণিত, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা আপ্লুত এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকৃতিচেতনা দ্বারা ঋদ্ধ। সেই অর্থে আমার কোনো গুরু নেই। পূর্ববর্তী সকল সাহিত্যিকই আমার গুরু। আমার শিক্ষকবৃন্দ আমার গুরু। সব সময় অন্তরে লালন করি- ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’।      

আমার লেখা প্রকাশিত গ্রন': ফসিল, প্রপার জন্য পঙ্‌ক্তিমালা, একলব্যের তীর, ভুবনডাঙা, আকাল; অন্তরঙ্গ দ্বৈরথে, নিলামবালা, ছাই, দর্পণ, একাত্তর; মন না মতি, অচেনা মানুষ; নজরুলের কবিতা ও গানে লোকজ উপাদান; ব্যাবহারিক বাংলা। আমার সম্পাদিত সাহিত্য-সংকলন: মলয়া, নৈবেদ্য, ফুলকি, কালরাত। অর্জন বলতে মানুষের ভালোবাসা। পেয়েছি মুক্তধারা একুশের সাহিত্য পুরস্কার (ঢাকা), সুনীল সাহিত্য পুরস্কার (মাদারীপুর), অনুভব সম্মাননা (ঢাকা), বিন্দু বিসর্গ সম্মাননা (গাইবান্ধা), বিন্দু বিসর্গ পদক (গাইবান্ধা)।

বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে নানা সময়ে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম এবং আছি। তার মধ্যে- ‘বাংলা একাডেমি’র জীবনসদস্য; ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য; ‘ব্রতচারী সমিতি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য; ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’ (নারায়ণগঞ্জ) এর সভাপতি; ‘লক্ষ্যাপার শাস্ত্রীয়সংগীত’ (নারায়ণগঞ্জ) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; ‘হাওয়াইয়ান গিটার পরিষদ’ (নারায়ণগঞ্জ) এর সদস্য; ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ (ঢাকা) এর সদস্য; ‘কথন’ আবৃত্তি সংগঠন (নারায়ণগঞ্জ) এর সদস্য; ‘জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ (ঢাকা) এর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক; ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ এর জীবনসদস্য; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বাংলা বিভাগ’ অ্যালামনাই এর জীবনসদস্য; ‘বাংলা ভাষা শিক্ষক পর্ষদ’ এর প্রকাশনা সচিব; ‘স্বরশ্রুতি’ আবৃত্তি সংগঠনের (ঢাকা) সদস্য; ‘কলকণ্ঠ’ সাংস্কৃতিক সংগঠন (ঢাকা) এর সদস্য; ‘নাট্যচক্র’ (ঢাকা) এর সদস্য; ‘জহির রায়হান ফিল্ম সোসাইটি’ (ঢাকা) এর সদস্য; ‘সংস্কৃতিসংসদ’ (ঢাকা) এর সদস্য; ‘উদীচী’ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য; ‘ডাকসু’র (ঢাকা) সদস্য; ‘সৈকত’ সংগীত একাডেমির (কদমবাড়ি, মাদারীপুর) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ; ‘চারুকণ্ঠ’ আবৃত্তি সংগঠনের (ঢাকা) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; দৈনিক ‘ভোরের ডাক’ (ঢাকা) এর সহকারী সম্পাদক; বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান ‘উদ্দীপন’ এর পরিচালক; উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার; বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন এর বিশেষজ্ঞ; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কমিটি অব কোর্সেস এন্ড স্টাডিজ’ (ডিপ্লোমা ইন মিউজিক) এর সদস্য; বাংলাদেশ বেতার (ঢাকা) এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন (ঢাকা) এর তালিকাভুক্ত কণ্ঠশিল্পী। বাংলাদেশ বেতার (ঢাকা) এর তালিকাভুক্ত গীতিকার। দেশে ও বিদেশে বহু সাহিত্যসভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় লিখছি নিয়মিতভাবে। দেশপ্রেম এবং মানবতাবোধ আমার সাহিত্যের মূল বিষয়। পৃথিবীর সকল মানুষ সুখী হোক, শান্তিতে থাক- এ আমার নিত্য প্রত্যাশা। জয় হোক মানবতার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ