কী লিখি কেন লিখি মাহবুবা হক কুমকুম

কী লিখি কেন লিখি 
মাহবুবা হক কুমকুম

কী লিখি কেন লিখি 
মাহবুবা হক কুমকুম
কবি-ছড়াকার। বাংলাদেশ

অ-আ-ক-খ শেখা আর রঙবেরঙের লেখা-কম-ছবি-বেশি বই পড়াছেঁড়া এক সঙ্গে শুরু হয়। ক্লাস টু/থ্রি থেকে বাংলাভাষার ছড়া কবিতা গল্পের পাশাপাশি পড়তে শুরু করি ননী ভৌমিক অনূদিত সোভিয়েত ইউনিয়নের বাচ্চাদের বই। পড়া চলতে চলতে লেখা শুরু হয়। ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি যখন, তখন প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয় কালি কলম মন নামে একটি সংকলনে। 

শিশুকিশোরদের মন মাতানো চারটি  মাসিক পত্রিকাও তখন বাড়িতে আসছিলো। শিশু, ধান শালিকের দেশ, নবারুণ ও কিশোরবাংলা (সাপ্তাহিক)। এ সময় শিশুকিশোরদের ছবি আঁকা শেখার ক্লাস 'শিল্প বিতান'এ ভর্তি হই। শিশু পত্রিকায় আমার লেখার সংগে আমার আঁকা ছবি ইলাস্ট্রেশন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এরপর এই চারটি পত্রিকাসহ দৈনিকের শিশুকিশোর পাতায় লিখতে থাকি।  

পড়া এবং লেখার প্রেরণা মা, বাবা, দুই মামা কবি হুমায়ুন কবির এবং কবি নাসির আহমেদ। ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি নাসির মামা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ছন্দের বারান্দা বইটি হাতে তুলে দেন। এ বইটি ছিলো ছন্দ শেখার প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপে ছিলো বিভিন্ন ছড়া পড়ে তার ছন্দ বোঝার চেষ্টা করা এবং তৃতীয় ধাপ ছিলো শব্দ ভাঙচুর করেও মাত্রানুবর্তী থাকা। ক্লাস সেভেন/এইটে পড়াকালীন যুক্ত হই অনুশীলন সংঘে। শিশুকিশোর এই সংগঠনটি প্রতি রোববার সাহিত্যসভার আয়োজন করতো। সিনিয়র লেখকেরা কিশোর-লেখকদের লেখার চুলচেলা বিশ্লেষণ করতেন। এ সভা থেকে প্রচুর শিখেছি। শিখেছি কিশোরবাংলা ও দৈনিক বাংলার কচিকাঁচার আসরের সাহিত্যসভা থেকেও। অন্ত্যমিলের অভিনবত্ব প্রথম শিখেছি এ সকল সাহিত্যসভায়। কিন্তু আমি নিজে অন্ত্যমিল নিয়ে খেলেছি খুব কম। কারণ আমার ক্ষেত্রে যেটি ঘটে, তা হলো অভিনব অন্ত্যমিলের সন্ধানে মনকে নিয়োজিত করলে আমার ছড়ার বিষয়টি হুমকির মুখে পড়ে যায়।    

এ সময় থেকে গল্প লিখতে শুরু করি। ইত্তেফাকের দাদাভাই, দৈনিক বাংলার আফলাতুন ভাই ও কিশোরবাংলার দাদুভাইয়ের কাছেও শিখেছি অনেক। নির্মেদ গল্পভাষা তৈরির পাঠটি প্রথম পেয়েছিলাম আফলাতুন ভাইয়ের কাছে। 

আমার সকল গুরুর কাছ থেকে কিশোরবেলায় যে শিক্ষাটি পেয়েছি, তা ছিলো- লিখতে হলে পড়তে হবে এবং সেই পড়ায় সীমারেখা টানা চলবে না। সাহিত্যের বাইরেও পড়তে হবে। পড়তে হবে সাহিত্যের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন, মনস্তত্ত্ব। জানতে হবে মানুষ ও তার জীবন। রাজনৈতিকবোধ তৈরি হতে হবে। ক্ষমতা ও তার কাঠামো, সমতা-সাম্য-বৈষম্য বুঝতে হবে ও সমকাল সম্পর্কে হালনাগাদ থাকতে হবে। শিখেছি যে পড়তে পড়তে সূক্ষ্মবোধ তৈরি হবে, উপলব্ধিতে গভীরতা সৃষ্টি হবে আর পড়ার মাধ্যমে বোধ ও উপলব্ধি প্রকাশের নান্দনিক ভাষাই কেবল তৈরি হবে না; সৃষ্টিশীলতার নবায়নও হতে থাকবে ক্রমাগত। শিখেছি যে লেখায় বিষয়বৈচিত্র‍্য আনতে, বিষয়ভাবনার সুস্থিত প্রকাশের জন্য এবং ব্যাকরণ ভাঙার সাহস ও দক্ষতা তৈরিতেও পড়ার বিকল্প নেই।

স্কুলে থাকতেই আবৃত্তি ও অভিনয়ে যুক্ত ছিলাম। সেটি কলেজে পড়াকালীন আরও বাড়লো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে আমার শিক্ষক নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সান্নিধ্যে দৃশ্যকাব্য তৈরির পাঠে নিমগ্ন হয়ে লেখালিখির সংগে দূরত্ব তৈরি হয়। যুক্ত হই অভিনয়, নাটক লেখা ও নির্দেশনায়। পড়াশুনার জায়গাটি এককভাবে দখল করে দেশ বিদেশের নাটক পড়া, ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের বিষয় ও আঙ্গিক বোঝা এবং সেলিম আল দীন প্রবর্তিত 'দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব' এর সংগে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করা। 

পুনরায় লেখায় ফিরি ২০১২/১৩ এর দিকে। ছড়াকার সৈয়দ সায়েমের সংগে ফেসবুকে ওপেন করি 'গোলপাতার ছাউনি' নামে একটি ছড়ার গ্রুপ। নতুন সংঘবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আবার লেখালিখি শুরু হয়। দৈনিক আমাদের সময় এর সম্পাদক কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের তাগিদে তার পত্রিকায় কিশোর সাহিত্যের পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক কলামও লিখতে শুরু করি। পুনরায় লিখতে শুরু করি ঠিকই; কিন্তু কম-লিখিয়ের তকমা এঁটে নিয়ে। 

২০১৯ এ দেশ পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত হয় কিশোর ছড়া-কবিতার বই 'বাড়িরা বাড়ি যায়'। আমার অনুজ বন্ধু শিশুসাহিত্যিক অদ্বৈত মারুত তাড়া দিয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করিয়েছে এবং প্রকাশ সংক্রান্ত দেখভালের দায়িত্ব সে না নিলে এ বই বেরুতো কিনা সন্দেহ আছে। বন্ধু ছড়াকার সৈয়দ সায়েম, অগ্রজ ছড়াকার আমজাদ হোসেন, বন্ধু কবি খালেদ হোসাইনসহ আমার লেখক বন্ধুদের তাড়নাও ক্রিয়াশীল ছিলো এই বইটি প্রকাশের নেপথ্যে। ২০২০ থেকে বড়োদের গল্পলেখায় মনোযোগী হই। সেটিও ইত্তেফাকের বিভাগীয় সম্পাদক ছড়াকার ওয়াসিফ-এ-খুদার ক্রমাগত উৎসাহ দেয়ার মাধ্যমে ঘটেছে। 

মাঝখানের বিরতিতে লিখিই নি, ব্যাপারটা তা নয়। লিখেছি কিন্তু ছাপাই নি। অভিনয়, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, লেখা সবই তো নিজের ভিন্নতর সত্তা অথবা অন্তর্গত সত্তা প্রকাশমান রাখার তৃষ্ণা থেকেই উৎসারিত। সুতরাং লেখা প্রকাশ না করলেও বা নিয়মিত না লিখলেও লেখা চলেছে নিভৃতে। 

যা কিছু শিখেছি, শিখছি; যে বোধ ভাঙছে, গড়ছে, ধারণ করছি, তার মিশেলে ক্রমাগত তৈরি হয়ে চলেছি। আর তার প্রতিরূপ ছায়ার মতো মিশে থাকছে লেখায়।   

'বাড়িরা বাড়ি যায়' নিয়ে শিশু সাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের প্রকাশিতব্য 'শিশুসাহিত্যের আলোছায়া' ২য় খণ্ডে
পর্যালোচনার অংশবিশেষ উল্লেখ করি: শিল্পবোধে ও কাব্যগুণে অপূর্ব সব লেখা। বিষয় বৈচিত্র্যে মাহবুবা হক কুমকুম খুব সচেতন। প্রতিটা পংক্তিকেই তিনি কাব্যময়তায় আচ্ছন্ন করেছেন। তার ভাবনার জগতও ভিন্নতর। চেনা পথের পথিক তিনি নন। তার কাছে শিল্পের ব্যাখ্যা ভিন্নতর। চিন্তার জগতেও তিনি হালকা চালে চটুলভাবে চলাচল করেন না। সামান্য ঘটনাকে তিনি চিন্তা ও মননের মাধ্যমে দার্শনিকতায় নিয়ে যান। কিশোর কবিতার একই রকম চর্চিত জগত থেকে তিনি আমাদের মুক্তি দিয়েছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ