কী লিখি,কেন লিখি
জাহিদ মুস্তাফা
কী লিখি কেন লিখি
জাহিদ মুস্তাফা
কবি ও চিত্রকর
সুপ্রিয় অনুজ বন্ধু সুসাহিত্যিক ড. তপন বাগচীর অনুরোধ ছিল কেন লিখি, কি লিখি বিষয়ে কিছু লেখার। লিখতে ভালো লাগে বলেই নানা কিছু লেখার সংগে আমার থাকা। কথাকে সহজ করে যেমন বলি আমার লেখার ধরণও তেমনই।
আমার লেখালেখির শুরু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে স্কুলের খাতার পাতায়। পাঠ্যবইয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী পড়ে প্রথম অনুপ্রাণিত হই এই ভেবে- চরম দারিদ্র্যের সংগে যুদ্ধ করেও তিনি যদি এতো বড়োমাপের কবি হতে পারেন, তবে আমি কেন পারবো না!
কণ্ঠস্বর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ আমাদের জন্মস্থান টাংগাইলকে বলেছিলেন- কবিধাম! কাব্যিক মনোরম এক পরিবেশ ছিল মফস্বঃল টাংগাইলের। কবিতার সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখন টাংগাইলে আয়োজন হয় দুই বাংলার কবিদের নিয়ে কবিতা উৎসব।
১৯৭৩ সালে আমি বিন্দুবাসিনী বালক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ওই বছর একুশে ফেব্রুয়ারি টাংগাইল বৈশাখী কচি-কাঁচার মেলা থেকে প্রভাতী নামে সাইক্লোস্টাইলে ছাপা পত্রিকায় আমার লেখা চার লাইনের একটি ছড়া ছাপা হয়। মেলার সংগঠক ছড়াকার খান মোহাম্মদ খালেদ ও ফাতেমা সাইফুল বীনুর উৎসাহে আমার এই লেখা। একই সংগে সহপাঠী শফিক ইমতিয়াজ ও অসীম রায়ের লেখাও ছাপা হয়। প্রথম ছড়া প্রকাশে আমরা তো দারুণ খুশি! শফিক আর আমি নিয়মিত লিখতে শুরু করি আর ডাকযোগে ঢাকার পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠাতে শুরু করি। পত্রিকার দোকানে যেয়ে ছোটদের পাতা খুলে আতিপাতি করে আমাদের লেখা খুঁজতাম। ১৯৭৩ সালে কবি শামসেত তাবরেজী টাংগাইলে এসে বিন্দুবাসিনী স্কুলে আমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়। ও তখন থেকেই কবিতা লেখে। ও আসায় আমাদের কবিতা লিখিয়েদের শক্তি বাড়ে!
১৯৭৪ এর বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ মাস যায়, আমরা বিরামহীনভাবে লিখি, লেখা পাঠাই, কিন্তু ছাপা হয় না! ভাদ্রমাসে বন্ধু শফিক ইমতিয়াজের একটি ছড়া দৈনিক বাংলার বাণীর শাপলা কুঁড়ির আসরে ছাপা হয়। এতে আমার প্রত্যয় হয়- এবার আমার লেখাও আসবে। পরের সপ্তাহে হলোনা। তার পরের সপ্তাহে আমার চক্ষু ছানাবড়া! বিরাট এক ছবিসহ আমার লেখা একটি গল্প ছাপা হয়েছে শাপলা কুঁড়ির আসরের পাতায়! ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষপীড়িত একশিশুর অনুভূতি নিয়ে লেখা আমার গল্পের শিরনাম ছিল- 'সূর্য না ওঠুক'। এর কিছুদিন পর দৈনিক বাংলার 'সাত ভাই চম্পা'য় বৃষ্টি নিয়ে আমার একটা ছড়া ছাপা হয়।
১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে টাংগাইলে কচি-কাঁচার মেলার জেলা সম্মেলনে আসেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি সুফিয়া কামাল, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, বিজ্ঞানলেখক আবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিন, শিল্পী হাশেম খান, আইনুল হক মুন্না, শাহেদ কামাল ও কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার কিশোর সদস্য লুৎফর রহমান রিটন। রিটনের ছড়া তখন কচি-কাঁচার আসরসহ নানা কাগজে ছাপা হয়। আমাদের সংগে ওর বন্ধুত্বের শুরু সেইদিন থেকে।
১৯৭৫ সালের ৯ জানুয়ারি টাংগাইলে কবি শামসুর রাহমান আসেন আমাদের অগ্রজ কবি মাহমুদ কামালের উদ্যোগে অরণি সাহিত্য গোষ্ঠীর এক সাহিত্য আসরের প্রধান অতিথি হয়ে। কবি বুলবুল খান মাহবুব, সাযযাদ কাদির ও মাহবুব সাদিকসহ অন্যান্যের সংগে তাবরেজী, শফিক, অসীম ও আমি স্বরচিত কবিতা পাঠ করি। শামসুর রাহমান উৎসাহ যোগাতে আমাদের কবিতার প্রশংসা করেন!
এরপর স্থানীয় পত্র-পত্রিকায়, ছোট কাগজে আমার কবিতা বের হতে থাকে। ওই বছরেই আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু শামসুদ্দিন আহমেদের সম্পাদনায় বিন্দুবাসিনী স্কুলবার্ষিকীতে 'দীপুর দুপুর বেলা' নামে আমার লেখা গল্প ছাপা হয়।
১৯৭৭ সালে কবি আলমগীর রেজা চৌধুরীর উদ্যোগে ময়মনসিংহে যাই কবিতা পাঠের এক আসরে। ওখানে কবি শামসুল ফয়েজ ও আনজীর লিটনের সংগে আমার পরিচয় হয়। ফয়েজ ভাই আমাদের অগ্রজ আর আনজীর তখন স্কুলছাত্র! আমরা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের হলে তাবরেজীর ফুপাতো ভাই ডা. মুকুল, ডা. কামরুল হাসান খান ভাইয়ের রুমে রাত কাটাই।
১৯৭৭ সালের শেষদিকে টাংগাইলে জন্মগ্রহণকারী কলকাতার বিখ্যাত কবি তারাপদ রায় টাংগাইলে আসেন। আমরা তাঁর সংগে পরিচিত হয়ে যেন হাতে চাঁদ পাই! আগেই রায়হানের রাজহাঁসখ্যাত কবি আবু কায়সারের কাছ থেকে তারাপদ রায় সম্পর্কে জানতে পারি। তাঁর কবিতা পড়েও বেশ মজা পাই। সেবার শিল্পীবন্ধু শিশির ভট্টাচার্যও প্রথম টাংগাইলে আসেন।
টাংগাইলে আনন্দময়ী কেবিনের আড্ডায় মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে এসে যোগ দেন কবি রফিক আজাদ, অরুণাভ সরকার। তারাপদ রায়ের কল্যাণে এখানে সুনীল গংগোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও এসেছেন! মুক্তিযোদ্ধা আবিদুর রহিম টাংগাইলে চাকরিসূত্রে এসে কবিদের আড্ডার গড্ডালিকায় পড়ে কবি আবিদ আনোয়ার হয়ে ওঠেন।
১৯৭৮ সালে আমি উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হই। পরের বার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ঢাকায় এসে নিয়মিত নানা সাহিত্য আসরে অংশ নিতে থাকি। কবি হারুন রশীদের সূত্রে পরিচয় ঘটে গল্পকার সম্পাদক আনওয়ার আহমদ, কবি নাসির আহমেদ, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, সৈয়দ আল ফারুক, আসলাম সানী, ইউসুফ হাসান, আহমদ মাজহারদের সংগে।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ্কে প্রথম দেখি স্টেডিয়ামে বইবিপণী ম্যারিয়েটায়। প্রথম দেখায় তাঁকে আমার কাছে মনে হয়েছিল- যীশুর মতো! ১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহে কবিতা পাঠের আসরে ঢাকা থেকে রুদ্রদা যোগ দেন, আমরাও যাই। তসলিমা নাসরিন তখন ময়মনসিংহ মেডিকেলের ছাত্রী। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়ে তসলিমা বেশ পরিচিতি পান। সেবার ময়মনসিংহে কবি আলমগীর রেজা চৌধুরী রুদ্রদা'র সংগে তসলিমার পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর তাঁদের প্রেম ও বিয়ে।
আমার ঢাকায় পড়তে আসার পর ক্যাম্পাসে হাকিম চত্ত্বরের নিয়মিত আড্ডায় আমার যোগদান। ওখানে একে একে পরিচয় হয়- চলচ্চিত্র সংসদ নেতা মুহম্মদ খসরু, কবি গোলাম সাবদার সিদ্দিকী, ইসহাক খান, আলী রীয়াজ, জাফর ওয়াজেদ, কামাল চৌধুরী, মঈনুল আহসান সাবের, মাঈনুস সুলতান, রেজা সেলিম, আহমদ আজিজ, মুজাহিদ শরীফ, তুষার দাস, সুব্রত ধর, মাসুদ বিবাগী, সৈয়দ আজিজুল হক, সোহরাব হাসান, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, নকীব ফিরোজ, মঈনুদ্দীন খালেদ প্রমুখ লেখক কবিদের সংগে।
কবি আহসান হাবীবের সম্পাদনায় দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় আমার লেখা গল্প ও কবিতা ছাপা হয়। কবি শামসুর রাহমানের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রায়ই আমার কবিতা ছাপা হতে থাকে।
বাংলা একাডেমির সাহিত্য পত্রিকা 'উত্তরাধিকার', 'ধান শালিকের দেশ', বাংলা একাডেমি পত্রিকা, শিশু একাডেমির মাসিক পত্রিকা শিশু, শিল্পকলা একাডেমির 'শিল্পকলা', তথ্য অধিদপ্তরের সচিত্র বাংলাদেশ ও নবারুণে আমার অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতা লেখার পাশাপাশি কবি আল মুজাহিদীর সম্পাদনায় দৈনিক ইত্তেফাক সাময়িকী, আবুল হাসনাতের সম্পাদনায় দৈনিক সংবাদ সাময়িকী, কবি সিকদার আমিনুল হক সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিপ্লব, কবি বেলাল চৌধুরী সম্পাদিত সচিত্র সন্ধানীতে শিল্পকলা বিষয়ক লেখা লিখতে থাকি।
পরবর্তীকালে কলকাতার দেশ, দৈনিক প্রথম আলো সাময়িকী, ভোরের কাগজ সাময়িকী, আজকের কাগজ সাময়িকী, সমকালের কালের খেয়া, যুগান্তর দৈনিক দেশ, কালের কণ্ঠ পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে আবার শিল্প নিয়ে এন্তার লিখেছি। মাসিক কালি ও কলম, ত্রৈমাসিক শিল্প ও শিল্পী, ষান্মাসিক যামিনী, শিল্পরূপ, ত্রৈমাসিক শিল্পপ্রভা, দেশপ্রসংগ প্রভৃতি পত্রিকায় সমকালীন শিল্পপ্রদর্শনী নিয়ে অসংখ্য লেখা লিখেছি। বিশেষ বিশেষ সংখ্যা কালি ও কলমে কবিতা লিখেছি।
শিল্প নিয়ে আমার লেখার কারণ হলো- আমি নিজে শিল্পী বলে- শিল্পকে পাঠকের কাছে পৌঁছানো আমার পক্ষে সহজ হবে। আরেকটা কারণ- শিল্প ও শিল্পীদেরকে সহজ করে পাঠকদের কাছে তুলে ধরা।
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'তুমি রাত্রি আমি কাপালিক' বের হয় ১৯৯০ সালের বইমেলায়। আবৃত্তিকার শিমুল মুস্তাফা আমার কাব্য ও বন্ধু সঞ্জীব চৌধুরীর গল্পগ্রন্থের প্রকাশক। প্রচ্ছদ করেন শিল্পীবন্ধু অশোক কর্মকার ও অংগসজ্জা করে অনুজপ্রতীম শিল্পী ধ্রুব এষ। এরপর ১৯৯৭ সালে তপু প্রকাশনী বের করে আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ- 'কষ্টপাথর কন্যা'। এটির প্রচ্ছদ করে ধ্রুব এষ। ২০০৭ ও ২০০৯ সালের বইমেলায় ছোটদের মেলা আমার দু'টি ছড়ার বই বের করে- নাম যথাক্রমে 'ছড়াছড়ি গড়াগড়ি' ও 'ছবির হাটে ছড়ার মাঠে'। ২০১৩ সালে বের হয় আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ- 'করতলে মেঘ'। এর প্রচ্ছদ করে সঞ্জীব সাহা। ২০১৮ সালে আমার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ 'পদ্যবাড়ি' বের হয়। ছেলেবেলার পাঁচ সহপাঠী বন্ধুর একডজন করে কবিতা নিয়ে 'পাঁচের পাঁচালি' নামে যৌথ দু'টি কবিতার বই বের হয় ২০১৮ ও ২০২০ সালে। আমার সংগে অন্য কবিবন্ধুরা হলেন- শামসেত তাবরেজী, শফিক ইমতিয়াজ, হোসেন মোফাজ্জল (সিডনি প্রবাসী) ও শহিদ আজাদ।
লেখক জীবনে আমি দু'বার সম্মানিত হয়েছি। একবার ১৯৮৩ সালে কবিতার জন্য টাংগাইল জেলায় প্রথম হই। আর ২০১৯ সালে শিল্পলেখক হিসেবে ত্রৈমাসিক শিল্পপ্রভার সম্মাননা পাই। লেখালেখিতে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি- আমার প্রয়াত শিক্ষক বরেণ্যশিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, কাজী আবদুল বাসেত এবং সমরজিৎ রায়, হাশেম খান, বুলবন ওসমান ও রফিকুন নবীসহ অগ্রজ-অনুজ শিল্পীদের সপ্রশংস নানা মন্তব্য। এর মধ্যে প্রথম দুই শিক্ষকের মন্তব্য ছিল প্রায় একরকম- লেখা তোমার শক্তি- এটিকে কখনও ছাড়বে না।
আপনাদের আকাঙ্ক্ষাকে আমি মাথায় তুলে রেখে আজ অকপটে বলি- লেখালেখিকে সানন্দে আমার সংগেই রেখেছি।
===
পরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা
0 মন্তব্যসমূহ