রাজীব মজুমদার
আলোচনা
হারাধন বৈরাগী
এক মিতবাক কবির কবিতা
হারাধন বৈরাগী
হারাধন বৈরাগী
এক মিতবাক কবির কবিতা
"দৃশ্যে কেউ নেই" কিরাতভূমির তরুণতুর্কি কবি রাজীব মজুমদারের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ।বইমেলা ২০১৯এ প্রকাশিত।
কবিতা কি,কোন বাঁধনের কাছে না গিয়ে যদি বলি,তবে বলবো,কবির যাপন থেকে উঠে আসা বোধ কিংবা বুদবুদই যেন কবিতা।আগুন নেভার পর পরিত্যক্ত অঙ্গারগুলিই বুঝি কবিতা,কিংবা বলতে পারি পরিত্যক্ত গাইরিঙে ফেলে যাওয়া রিসাই বুঝি কবিতা।আসলে যাপনের কেরিকাঁটা থেকেই তো বোধের জন্ম।এই থেকেই তো ধাপ বা সিঁড়ির পর সিঁড়ি পেরিয়ে যাওয়া।এ তো যেন উর্দ্ধমুখি গমন।সহস্রার দেশে।আসলে সময় তো স্থির আর তাই গমন নিম্নমুখি হয় না,হতে পারে না।ধাপে দাঁড়িয়েই তো অমরা মন্থন করি অতীত, যেখান থেকে পেছনে ফেরা যায় না।ধাপেরও শেষ হয় না,বোধেরও। শেষ নেই। শেষ নেই।রাজীবের কবিতা পড়ে মনে হয়েছে,এ বুঝি কবির কোন একটি সিঁড়িতে থমকে দাঁড়িয়ে বোধের বুদ বুদ থেকে নিজের আত্মরতি কিংবা মিথস্ক্রিয়া।এ যেন কোন সাধকের চক্রভ্রমণের মতো।এক একটা চক্রে ক্ষণিক অধিষ্টান ।লব্ধ অনুভূতির পর অর্ধনারীশ্বর রূপে আত্মরতি।দেখি কবির একটি কবিতা -"এক একটা বোধ থেকে এক একটা কথার জন্ম,/ধাপের পর ধাপ বেয়ে উর্দ্ধগমনে মাথা তোলা/আসলে সীমারেখা নির্বাসিত মুক্ত গগনে-/সরল আলিঙ্গন যদি চক্রান্তের শিকার ভাবো/তবে ভালোবাসার স্পর্ধা দেখিও না;/মূল থেকে উপড়ে ফেলে দিলে বৃক্ষ বাঁচে না-/সহজ কথাটি অরণ্য বোঝে,তুমি বোঝ না।"(বোধ)।
অরণ্য যদি হয় কবির রূপক,কবি সেই অর্থে সরল নন,যেই অর্থে অরণ্যও নয়।তবে অরণ্যের মাঝে সরলতার রিদম জেগে থাকে,ভেতরে অরণ্য ভয়াল।তাই অরণ্যের কথা সকলে বোঝে না।বোঝেন কবি।কবি চান তাঁর 'তুমি'অরণ্যের কথা বুঝোক। কিন্তু শেকড় সচেতন কবির অসম্ভব অভিমান 'তুমি' তা বুঝে না। এখানে 'তুমি' মনে হয় তাঁর হৃদয় খানখান করা প্রিয়া।এখানেই বুঝি কবির বোধ কিংবা আক্ষেপ খান খান করে গুঁড়িয়ে দেয় পাঠকের হৃদয়।
কবিতা গুলো পড়তে পড়তে মনে হল,কবি কোনো মত ও পথের বিশ্বাসে মুখোমুখি ভীষ্ম যেন।'আধ্যাত্মিক' কবিতা পড়ে মনে হল,মূলাধার বিচরণ শেষে কবি অনাহুতে এসে দণ্ডায়মান। রাজীব অভিমান ও ক্ষোভ প্রকাশে নিদারুণ স্লীম! একটি স্থির সময়ের উপর দিয়ে ধাপের পর ধাপ পেরোতে গিয়ে কবি যেন একটি অসম্ভব লাল কাপালিকের ঘর অতিক্রম করেছেন।আর উৎসুক্য বশত পর্দা ভেদ করতে গিয়ে এমন এক সাধুকে পেয়েছেন যার ভেতর যেন ধুলামন্দির। যেন কোন এক বেদব্যাস,যিনি দ্বীপে বসে লিখে চলেছেন মহাভারত। হতাস হয়েছেন কবি। মনে হয়েছে ,কবিতাটি বুঝি কবি উৎস্বর্গ করেছেন গণতন্ত্রকে।এখন দেখি কবিতাটি।
"একটি আলো এগিয়ে আসছে/দু'চাকায় ভর করে মধ্যবিত্ত/কোলাহল প্রায় রিজার্ভ লাল দাগে।/
কিছু বুঝে ওঠার আগে চোখ পড়ে/সাময়িক ক্ষতিগ্রস্ত যুবতীর /আলুতালু বুকের উপরে।/
এরপর আলো-মধ্যবিত্ত-রিজার্ভ-যুবতী/সব খুচরো সংকেত মিলাতে গিয়ে/চোখে ভাসে এক জটিল ধর্মগ্রন্থ।/যেখানে ঈশ্বর মানুষকে আলো দেয়,/
মানুষ নিজেকে মধ্যবিত্ত করে রাখে,/রিজার্ভ দাগগুলো যুবতীকে/ঈশ্বরের জন্য প্ররোচিত করে।(আধ্যাত্মিক)।এই আলোটি কিসের আলো?একি তবে কবির গণবিশ্বাসের দিকে এগিয়ে আসা কোন আলো? মধ্যবিত্ত কোলাহল রিজার্ভ লালদাগে।-----তারপর এক জটিল ধর্মগ্রন্থ।তবে কি চকিতে বিশ্বাস সমর্পণ করে তিনি হতাস কোন বিষমদর্শণে।একি তবে মধ্যবিত্ত কবির চেতনার দোলাচল? কিংবা কবি যখন বলেন,-"পথে নেমে পেয়ে গেছি রথ,/চাকার গতি/এক এক করে মাইলস্টোন-/---নির্জনের সমুদ্র পেরিয়ে চেরাপুঞ্জি হয়ে/একটা গহব্বর পেলাম,কৃষ্ণ নয়-/--যত গুলিয়ে যাচ্ছি/স্বয়ংসম্পূর্ণ করে ফিরিয়ে দিচ্ছে রথ,/(অস্বীকার)।ভুলের ফাঁদ থেকে উত্তরণের আলোর আশ্বাসে যেন বিশ্বাসী কবি!এখানেও যেন কবির বোধের জন্ম ,আর সেই বোধের থেকে পরবর্তী বোধের দিকেই বুঝি এগিয়ে চলা।এ যেন গুহাজীবন থেকে শুরু করে বোধে বোধে স্থির সময়ে দাঁড় বেয়ে মানুষ কিংবা অমানুষ হওয়ার যে চরৈবেতি, তারই বুঝি নিশানা এঁকেছেন কবি। আবার যখন বলেন,-"প্রতিটি মোড়ের অন্ধকারে আলো জরুরী,/জেনেও পথের আলো সেখানে মজে যায়-/নিশ্চুপ দীঘিকে প্রণয়ে বাধ্য করে,/আমাদের সংসার সেখানে আত্মঘাতী,---।/("ঝাপ-দুই)
কবি এখানেও মানুষের সংগ্রামশীল জীবনের খর ও বাস্তবতার চিত্রটিই তুলে ধরেছেন বলে মনে হল। মানুষ মানুষের কাছে মানুষের মতো হোক।কিন্তু তা নয়,আমরা তো সেখানে আত্মঘাতীপ্রবণ হয়ে পড়ি।
জীবনের প্রতি পলে,ভালোবাসার রেড়ির তেলে জ্বলেপুড়ে মিতবাক কবির অভিমান আমাদের নিদারুণ ভাবে স্পর্শ করে ।যখন কবি বলেন-"ক্ষত পুঁজ রক্ত নামক কিছু সম্পর্ক অযাচিতভাবে এসে যায় গুলিবিদ্ধ হতে।যে একা সে একটি মৃতদেহ হাতে নিয়ে সংসার চালায়। আবার ঐ মৃতদেহ একটি সংসার হাতে নিয়ে সঞ্চয় বাড়ায়।---প্রয়োজনে শূন্যতাকে শূন্য দিয়ে আঘাত করা।এই করে করে একদিন ছায়ালিপি দীর্ঘ হয়,--প্রশস্ত ।অবিনশ্বর।"(ছায়ালিপি)
সমাজ নামক ইস্পাতের জাঁতাকল কিংবা বিধিবিধানের পিঞ্জিরায় যখন ভালবাসা খাবি খায়,জীবনে নেমে আসে দূর্বিপাক,জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে,প্রেমের বকুল শুকিয়ে যায়,কবির ঋজুপ্রতিবাদ কিংবা ধিক্কার সমাজ নামক অন্ধের বিরুদ্ধে,আমাদের অসম্ভব ভাবায়।যখন তিনি বলেন,-"নিয়মের বাধ্য জেনেও সহজভাবে/ভেঙে যায় সমান্তরাল ধাতব লাইন/কেউ কোন আভাস পায়নি আগে।/একজন আস্তিক বসেছিল প্রথম সারিতে/তার পেছনে বাস্তুকার/---অনেকটা পেছনে/ একদল অন্ধ,/সবশেষে সংরক্ষিত আবর্জনার কামরা।/"(সিস্টেম)
উল্লেখিত কবিতার অনুষঙ্গ ফুটে ওঠে অসম্ভব আক্ষেপ,বেদনা,শ্লেষ ও দ্রোহের চৌ-মিশালিতে।যখন কবি বলেন-,"পায়ের ছাপ রেখে গেছো/কদমতলায়--/পরজনমের রাধা তুমি/গতজন্মের সঙ্গম শর্তে/প্রতিজন্মে জাতিস্মর বানাও।"(রাধা)কবিতা পাঠককে ভালোবাসার কুহকে নিয়ে যায়।
সমকালীন 'র'নীতির পাশাখেলায় মর্মবিদ্ধ কবি বলেন,- "অরণ্যে পরিচয় লেখে বৃক্ষ/গা ঘেষা হাওয়ায় মন্ত্রপাঠ,/যজ্ঞ, মনোবাঞ্ছা পূরণ করে/ঋষি চলে যান বিভূতি নিরঞ্জনে/বুক জলে দাঁড়িয়ে শিখে নেন/ঢেউয়ের রীতিনীতি-/কিভাবে সমকালীন হয় প্রতিটি স্রোত/অথবা,তার প্রসঙ্গ।"
নিজের বিশ্বাস ও বোধের কাছে রাজীব অসম্ভব নতজানু।নিজের অন্তররাগ ও নিজস্বতায় অসম্ভব প্রত্যয়ী তিনি। নিজের ভেতরে ঘটে চলা দমবন্ধ রজক্ষরণ নিজের ভেতরেই বয়ে চলা নদীর মতো।কখনো পাড় ভাঙতে দিতে নারাজ।কেননা তিনি জানেন-"আত্মগ্লানি অন্যছাদে শুকোতে দেওয়া যায় না।তাতে কাকের ঝগড়া নিজের উঠোন-বারান্দাতে সম্পূর্ণ হওয়ার --সম্ভাবনা থাকে"।কেননা তিনি জানেন-"---এই ভেজা ন্যাকড়া নিজের ছাদে শুকোতে গিয়ে বৃষ্টি নামলে,সেই বৃষ্টিতে আপাদমস্তক ভিজে গেলে নিজেরই লাভ,আত্মগ্লানি আত্ম-শোধনের এক ঘরোয়া প্রতিষেধক।"
বিজ্ঞাপনের নগ্নতায়, বাড়াবাড়িতে কবি অসম্ভব ব্যাথিত হন।এই নগ্নতা বুঝি এখন আর কারোর অগোচর নয়।কেননা বিজ্ঞাপন যেন এখন স্পোরাডিক রূপ নিয়েছে,যা থেকে ব্যাষ্টির দমবন্ধ অবস্থা।তাই কবির খেদ ও দ্রোহ ফুটে উঠে বিজ্ঞাপনের যৌনগন্ধের বিরুদ্ধে ।আর তিনি বলেন,-মন নিয়ে পালাবদল সর্বস্তরে-/বর্ণান্দ পাগলও বুঝে যায়/বিজ্ঞাপন যৌনতায় নগর অন্তঃসত্ত্বা।/সংবিধান ছুঁয়ে বলছি-/ভালো না লাগারও একটা বিজ্ঞাপন থাকে;/একদিন ক্ষত বাড়তে বাড়তে/নিসর্গে আজন্ম দাগ না লেগে যায়।(বিজ্ঞাপন)
সময় ও 'র'য়ের সওদাগর কিংবা বেনিয়াদের জনগনের কাছে ভুয়ো প্রতিস্রুতি ও সওদা দেখে অসম্ভব ব্যাথিত হন কবি,তিনি দেখেন আসলে যারা প্রকৃতই মানুষের কাছে যেতে চায়,তাদের ল্যাংমেরে কিভাবে শঠতার জয় হয়-তিনি বলেন ,-"এসময় মোটেও সহিষ্ণু মাঝিদের অনুকূলে নয়।/নৌকোয় বসে হুজুক(হুজুগ?) তুলেছে যারা-/তারাও মাঝি।/কেউ সৈকতে বালি কাটছে,কেউ/সাগর দখল নিয়েছে।/জোরপূর্বক,গল্প শেষ হবে তো তাদের মতো করে।/আমরা যারা বন্দরে আদান-প্রদান দেখি-/---হৃদয় আছে,যেখানে প্রতিদিন/হাজার সেতু রচনা হয়, লক্ষ লোক আসে,/চরিত্র বাঁচে,নিজে থেকে গল্প রচিত হয়।/আমরা ধর্ণায় বসি না,বরং/বাণিজ্য করতে পাঠাই ওদের,/ পাঁচবছর।দশবছর।চোখের আড়ালে--"(সওদাগর)
রাজীবের মানস কিংবা ভালোবাসার গাইরিং কিংবা আলোগঘর যেন ফুটে ওঠে এই কবিতাটিতে, যখন কবি বলেন -"পৃথিবীকে যদি গৃহস্থের ঘর ভাবি/নিকানো ছাদখানি হবে উদার আকাশ,/---নদীকে চাইলেও ভেসে যেতে দেবো না-/বলবো এ আসলে নদী নয়,/হতে পারে মায়া,হতে পারে অন্তমিল।/এ যেমন-কবিতায় তুমি আসলে/নাম দেই হলুদ পাখি।(প্রতিচ্ছবি)। কিংবা দৃষ্টি থেকে বহুদূরে যেখানে মৃত্যুর কোন পরিচয় নেই,/সে বনে আমি পরিত্রাণ চাই।/(ক্ষয়-এক)
এ নদী এতটা বিচলিত নয়,যতটা পাড় ভাঙার দৃশ্য।/দু'পাড়ে বিশাল অববাহিকা,জেগে হাসছে সুপ্ত জীবাশ্ম।/(ক্ষয়-দুই)
জীবনকে জীবনের চোখে দেখে রাজীব।তাই সে বলতে পারে -"সমস্ত ঋতুজুড়ে উচ্চতার হয়রানি,/লালহলুদ সব পাতা ঝরে গেলে/হতাশা এসে ঘুমিয়ে পড়ে গাছতলায়।/কোথায় মায়াবন, কে বা কারা হরিণী?"(মায়াবন)
মিতবাক রাজীব পরাগের ঘায়ে ধর্মের গালে লাথি মারতেও জানে।কবি ধর্মান্ধ নন।তিনি অসম্ভব মানবতাবাদী,এই অর্থে বাস্তববাদী!।তাই তিনি অবলীলায় বলতে পারেন-"পাখি/ফুল/গতজন্ম/এরা প্রত্যেকেই এক একটি বিশেষ ধর্ম।/আমার নিজস্ব কোন ধর্ম নেই।/
শিস/মূর্ছা/কুয়াশা/এদের ঘরে আমি রোজ নামতা শিখি,/---"(আধার)
বাইর আর ভেতর।আলো আর অন্ধকারের অন্তরালের যন্ত্রণার ছবি তুলির মতো ফুটে ওঠে রাজীবের কলমে,শীতের কিংবা দুঃসময়ের বন্ধুও কিভাবে লাথি খায়, তাও যেন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে তাঁর কলমে ধানশিষের মতো ।তাই তাঁর মৃদু অথচ আলোড়িত উচ্চার।"এই পথে কুয়াশার বদনাম রটেছে।/গত শীতেদের আগুন খাইয়েছিল যারা/সকলে এবার ঋতুর আগে /হিসাব চেয়েছে।রোদের সাথে সঙ্গম আর কতকাল"(অন্তরাল)
ধোঁকা দেওয়া ও ধোঁকা খাওয়া ।এমন একটা দৃশ্যপটই বুঝি কবি তুলে এনেছেন এখানে অসম্ভব মুন্সিয়ানায়।যখন দেখি তিনি বলেন,- "এখানে কিছু ছায়া জমা আছে,/পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সুগন্ধি হাওয়া।/কেউ একজন দৌড়ে এসে বলল,/হাওয়ায় যে ফিতে গুলি উড়ছে/তাতে অনেক গুজব লুকিয়ে আছে।/পথে বসে খামোখা বিজ্ঞাপন বিকোচ্ছি।/পেশাদার এখানে কেউ নেই,/যা কিছু ভেজা-বৈশাখে অনাবৃষ্টি।/ঐ ছায়াদের তো শরীর আছে-চাঁদ নেই,/
চলো বরং হাতে গায়ে ব্যাপারীর জোৎস্না আঁকি।"(ছায়াছবি)
অসহায় মানবতার সপক্ষেই বুঝি কবির কলম ফুটে ওঠে ।তাই কবি শিরদাঁড়া খাড়া করে বলতে পারেন-"ভিতরে যা বাড়ছে,তা প্রাসঙ্গিক,/
যা নেভাতে বলছো- তা ধোঁয়া।/আসলে সে নেভানো যায় না।/ধোঁয়ার কথা আসলে প্রসঙ্গ চিরকাল/আগুন খেয়ে সংক্রামিত হয়।"(বহমান)
ভালোবাসা ,ভ্যালেন্টাইন শব্দ পুড়ে বুঝি কবির উপলদ্ধি,এসব নিয়ে ডামাডোলের দরকার নেই। পাঠককে এক চিরকালিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান ,যখন কবি বলেন,-"বরং একটা বুক দেখে বিঁধে যাওয়া শ্রেয়।/নাড়ির গহীন মূলে/নেশাতুর সাপ লুকিয়ে থাকে।/কয়েকফোঁটা বিষ শুধু হজম ঠেকাবে,/পুরো শরীর গিলে খাবে আদিম ছোবলে।/এরপর তো শুকনো শরীর,হাড় সর্বস্ব।/তার চেয়ে বরং/একটা হৃদয় দেখে হেরে যাওয়া শ্রেয়।"(বিদ্ধ)
একই অনুষঙ্গ ফিরে আসে কবির উপলদ্ধিতে, প্রেমিকার ছোবলে বিষখাওয়া কবি গাত্রদাহে পুড়ে বলেন,-প্রতিবার গল্প বানাও ভেবে/সহজ করে ফেলেছো/কারণের জটিলতা।/আনকোরা এ হৃদয় বরাবর ঝড়/অথবা দেওয়াল ভাঙে ছদ্মবেশী প্রশ্রয়।/অস্তিত্বের বিভাজন গ্রন্থিতে পুষে/ঝুঁকে পড়ো তার দিকে,মনগড়া/দুটি সংসার চলে/একান্ত আবদার বশে।"(পরকীয়া)
অন্ধ ঈশ্বর ভাবনার প্রতি কবির অসম্ভব দ্রোহ দেখে পাঠককে চমকে উঠতে হয়।আসলে কবির চৈতন্যে বিজ্ঞান মনস্কতা কিংবা বস্তুবাদ কতটা প্রবল হলে কবি বলতে পারেন-"জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি, একটি /বিশ্বস্ত ঘুমের নাম ঈশ্বর।/সত্যের ভিতর যে অনাহুত নিদ্রা চলে/আসে,তার জন্য জগতের স্থির বিশ্বাস,ঈশ্বর কোনদিন ঘুমান না।/এ এক আজব চক্কর।/ভ্রম।/সত্যের মতোই সচ্ছ এ ভ্রম/অথচ সত্য জানে না,ঘুম ব্যতিত/সে কতটা সত্য।/বস্তত,/মানুষের ঘুম না ভাঙলে ঈশ্বর জাগে না"(ঘুম ও ঈশ্বর)
কবির প্রেম পয়ার ও প্রণিপাত যখন ভালবাসার কেরিকাঁটা পথে হারিয়ে যায় ,তখন দমবন্ধ প্রশ্বাস এসে পাড় ভাঙে নদী।আঘ্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকেন কবি।হারানোর মাঝে মুখ তুলে ভালবাসা।কবির বুকে মেঘ হয়ে ভাসে স্মৃতির পরাগ। তিনি রুধিরাক্ত হন।পাঠক গভীর ভাবান্তরে চলে যায়।একাকার হয়ে যায় কবির সাথে পাঠকও।কবি বলেন"পাশফিরে শুলে/অন্ধকার।/কিছু মাঝবয়েসী/উন্মাদনা/অপলক শুয়ে পড়ে,/স্থবির নিশ্চুপ।("দৃশ্য -এক)
"কি করবো সুপর্ণা,/হয়ে যায়-/বাড়তি জলে /ধুয়ে দেয়া যায় না/বানিয়ে নেয়া পরাগগুলো/লেগে থাকে অদৃশ্য মায়া হয়ে/প্রতিরাতে প্রতি শীতে।"(দৃশ্য-তিন)
কিংবা -"ঘাস খেতে খেতে শেকড়ের গল্প ভাঙে/যে হরিণী,/তাকে কি উপহার দিতে পারি-/পুরোনো হয়ে যাওয়া একটি নুতন ডায়েরি!/তারিখ জুড়ে বহুপ্রাণের আগুন বিন্যাস/পাতায় পাতায় বোকা আঙুলের ছাপ/অক্ষরের প্রলাপে একটা হৃতপিণ্ডের ক্ষয়।/সবশেষে/আমার কাছে গচ্ছিত যে নাভি/তার সূত্রে বাঁধা আত্মজের দীর্ঘশ্বাস"(ডায়েরি)
"জন্মবিন্দু নিত্যান্তই ঢেউ নির্ভর/পক্ষকাল মেনে সমুদ্রস্নান সারি।/মাস্তুলে লেগে থাকা পরিযায়ী বোধ/অস্পষ্ট হতে হতে সংসার বিভাগী।"(পথ)
আবার রাজীব যখন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলেন,তখন তাঁর নিমগ্ন চৈতন্য পাঠককে অসম্ভব ভাবায়।রাজীব কোন ইজম যা তাঁর অসম্ভব প্রত্যয়, মুখোমুখি দাঁড়াতে বিশ্বাসী।কবি যখন বলেন-"সামান্য বয়ে যাওয়া ধারাকে নদীর নাম দিয়ে/কি যাদু দেখালে!তুমি চলে যাও ডিঙ্গা বেয়ে-/অনাহারে আমাদের মায়া মুক্তি ঘটুক,/তারপর না হয়,/খনন করতে করতে ফিরে যাবো/ঠিক উৎসের কাছে।"(উৎস)কিংবা -"পাতায় প্রকট জলীয় সংকেত-/অভুক্ত মাঠ,ছড়ানো প্রয়োজন/যে যার মতো শুদ্ধ এখন।/সমগোত্রীয় নাভিতে বায়ুশূন্যতা,/সস্তায় কেনা ঝিনুকের শ্বাস/বোতলবন্ধী।/অস্থির ফোন-আয়নার মুখোমুখি,/বাকিটা ব্যক্তিগত---অন্ধের গোধূলি।"(ব্যাক্তিগত)
"----/আমাকে পথ দেখিয়ে দাও গোধূলি/------------------/গ্রীবায় আটকে আছে ভিটের দলিল/দুপাশে শাল সারি/বাৎসরিক দেনাপাওনা/পায়ের ছাপ নিয়ে একা আছি।/আগুন কোথায়?/নিয়মের কাছে নিমিত্ত বাঁধা/নিদ্রার কাছে হাওয়ার আমি।"(একা)। দুঃসময়ের পরাগরেণুতে বিদ্ধ কবি রাজীব তাই বলতে পারেন "মেঘের ভিতর ডুবে যায় তারা,যারা বসে আছি -/মায়ার শিকার।"(বাজার)
আবার কবি রুখে দাঁড়াতেও পারেন,ভরসা হয়ে উঠতে পারেন নিজস্বীর মতো,নোঙর ফেলতে পারেন অতল দরিয়ায়।তাই তিনি বলতে পারেন স্বমহিমায়-"ডুবে যাওয়ার আগে হাত ধরো-/ভরসা রাখো,বুক সমান পতনের/ পরেও ফিরে আসা যায়।"(নোঙর)
কবির চারপাশের দৃশ্যপট,সব কিছু অভিনয় কিংবা মেকি মনে হয়।তাঁর উপলদ্ধি ধরা পড়ে সময়ের বেনোজল ,তাই কবি বলেন-"বৃক্ষ /প্রণয়রহিত বেঞ্চ/শেষ ট্রেন/লোকাল হয়রানি/দম দেওয়া ঘড়ি/--/পথ আছে পাশে/দৃশ্যে কেউ নেই"(শূন্য)
কবির অধিকার ও অবস্থান বোধ অসম্ভব প্রবহমান কিংবা টনটনে।মূলজ চেতনাও।তাই কবি বলতে পারেন-"আমি কোনোকালেই অন্ধকারে ছিলাম না,/কিংবা অন্ধকার দেখে ভাবতাম না/আমার বৃত্তের কেন্দ্র এক সুপ্রাচীন/অন্ধকার থেকে ছিটকে এসেছে। সিলেবাসে কত কী লেখা থাকে-/এ যাবৎ প্রস্তরযুগ লৌহযুগ থেকে /যে আলো বেরিয়ে এসেছে/--তার নাম দিয়েছি সুবর্ণলতা।"(আলো)
কবি তাঁর মেহনতি মানুষের বাঁচাবাড়ার দর্শনে বিশ্বাসী। তিনি নিজস্ব পতাকা সম্পর্কে অসম্ভব সচেতন।তাই ভুল পথ ও সময়কে আঙ্গুল উচিয়ে চিহ্নিত করেন।আর তিনি ধিক্কারে ফেঁটে পড়েন-"হাওয়া তাকে ভুল বোঝেনি দখিন দুয়ার ভেবে,/নিভিয়ে দিয়েছে যাবতীয় আলো।/লজ্জা কি তবে নাম পাবে না কোনো!/বেনামী নামতা পড়ে পড়ে শিস্ দিয়ে গেছে পাখি,/এই যে ফড়িং ধরা,ছেলেখেলা-/রোদ হাসে, পাশাপাশি।"(শিস্)।
পরিশেষে বলব, শব্দ ব্যবহারেও রাজীব নিজের মতোই সচেতন-মিতাচারী।বিন্দুতে ষড়দর্শণে বিশ্বাসী। কাব্যগ্রন্থ পাঠ শেষে নিজেই অদৃশ্য হয়ে গেছি।প্রচ্ছদ অন্যরকম হলেও হতে পারতো। মনে হল।কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের দিকে তাকিয়ে আছি।আশা করি পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে কবিকে নুতন কোন নকসিবাঁকে দেখতে পাবো।
কাব্যগ্রন্থ:দৃশ্যে কেউ নেই
রাজীব মজুমদার
প্রকাশক:টার্মিনাস,৪৫/১যশোররোড(পূর্ব)কাজিপাড়া,বারাসত, কলকাতা-১২৫
প্রচ্ছদ:পুষ্পল দেব
বিনিময় ১৭৫টাকা
0 মন্তব্যসমূহ