কী লিখি কেন লিখি ব্রজকুমার সরকার


কী লিখি কেন লিখি
ব্রজকুমার সরকার


কী লিখি কেন লিখি
ব্রজকুমার সরকার

প্রশ্নটা যদি এমন হয়- ‘কেন লিখি, কি লিখি’, তাহলে মনে হয় প্রশ্নটা অধিক অর্থবহ হয়। কেন আমি লিখি বা লিখতে চাই, না লিখলে কি ক্ষতি হবে, সেটাই তো প্রথম মনে আসার কথা। কারণ মূখ্যত ,কেন আমি লিখি, সেটা পরিস্কার না হলে, পরের প্রশ্নটা আসতে পারছে না।এরপর আসছে ,আমি কি লিখি বা লিখতে চাই। প্রসিদ্ধ লেখক আনিসুর রহমান এক জায়গায় লিখেছেন-

“লেখালেখির জীবন গোবেচারার জীবন। তারপরও কিছু বোকাপ্রজ মানুষ কেন লেখে? কথাটার মধ্যে খটকাও অনেক। যখন আমরা দেখি জাঁদরেল আমলা, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ঠিকাদার, অধ্যাপক, উজির, নাজির, উকিল, ব্যারিস্টার, বিচারপতি মুকতার এরকম অনেকেই তো লেখালেখি করে খাচ্ছে। পদ পদবী পুরস্কার খ্যাতি লাভ করছে। তাহলে লেখালেখির জীবন গোবেচারার হবে কেন? মোক্ষম প্রশ্ন।
এবারে আরো কয়েকটা প্রশ্ন জুড়ে দিই। সক্রেতিস হুদাহুদি কেন তার কথা প্রচার ও প্রকাশের জন্যে হেমলক খেয়ে মরতে গেল আর কেন বলে গেল- I to die, You to live? খামোখা গো না ধরে বিচারের রায়ের শর্তে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নিলেই তো পারতো। তাহলে প্রাণটাও রক্ষা পেত, আরো অনেক কিছু প্রচার ও প্রকাশের সুযোগ থাকত। কিন্তু তাতে সক্রেতিস আর সক্রেতিস থাকতেন না। সত্য পরাজিত হত, মিথ্যার জয় হত।
লেখালেখির উদ্দেশ্য হচ্ছে- I to die; তার মানে লেখকের জীবন ফালাফালা, জীবনের নিঃশ্বাস বাজি রেখে এ পথ। একই সঙ্গে You to live অর্থাৎ জীবনের জয় দেখানো। সক্রেতিস কথাটা বলে চলে গেলেন, কিন্তু আলোর মশাল জ্বেলে গেলেন সত্য ও জ্ঞানের নিরন্তর অভিষেকে। 
আমাদের লেখালেখির দর্শনটা কী? আমার কেন যেন মনে হয় সক্রেতিসের শেষ কথাটা উল্টে আমরা করে নিয়েছি- I to live, You to die; এটাই দুর্ভাগ্যক্রমে আজকের দর্শন। “

কেন লিখি-এই প্রশ্নের উত্তরে আনিসুর রহমান আরও লিখেছেন সত্য প্রকাশ। এই সত্য প্রকাশে ভীত ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ, নজরুল , কাঙাল হরিনাথ , হুমায়ুন আজাদ এবং আরও অনেক লেখক। চর্যাপদের কবিরাও দেশান্তরিত হয়েছেন সত্যপ্রকাশের দ্বায়ে। বর্তমান ভারতেও দেখছি অনেক লেখক,সাংবাদিক সত্যপ্রকাশের দ্বায়ে প্রতিষ্টানের কূনজরে পড়েছেন, জেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু ‘সত্য’ কী, এটা একটি মহার্ঘ প্রশ্ন। সত্য কথাটির ধারনাও পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে। ‘মৃত্যু’ ছাড়া অন্য সত্য কিছু নেই, এটা আমার ধারনা।  
অন্যদিকে, এই প্রশ্নটার উত্তর ব্যক্তি নির্ভর। সবাই সত্য প্রকাশের জন্য লিখেন না। কেউ টাকার জন্য লিখেন,কেউ খ্যাতির জন্য,কেউ  নিজের তৃপ্তির জন্য , অনেকে পাঠকের জন্য লিখেন বা কেউ কেউ অমরত্ব লাভের জন্যও লিখতে চান। হয়তো আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। একজন লেখক , তিনি কবিতাই লিখুন বা গল্প-উপ্ন্যাস বা প্রবন্ধ যাই লিখুন , যে কারণেই লিখুন, তার তো একজন পাঠক চাই। কে সেই পাঠক?  এই পর্যায়ে এসেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি সামনে এসে যায়- কি লিখি? কেন লিখি প্রশ্নের জবার দেওয়া হয়ে গেলেই প্রশ্ন আসে কি লিখি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ কাহিনী, দিনলিপি, কেচ্ছা-কাহিনী নাকি কবিতা,পদ্য, কাব্য? আমার লেখার পাঠক কে, কজন আমি জানিনা। কে পড়ছে তা জানাই  যথেষ্ট নয়। কবি হয়তো ভাবেন তারা কিভাবে পড়ছে, কতটুকু বুঝছে। গুণগত ধারণা মাথায় রেখে বলা যায় যে পাঠক সম্পর্কে একটা মিথ্যা ধারনা পোষন করেন লেখক। বেশির ভাগই দেখা যায় যে যাকে কবিতার বই উতসর্গ করা হয়েছে তিনি কবিতা বুঝেন না, বা পড়েন  না। কবিরাও বা অন্য কবির কবিতা কতটা মনযোগ দিয়ে পড়েন, তাতে সন্দেহ জাগে। একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সময়টা পেরিয়ে যাবার পড় সাধারণত কেউ আর ফিরে পড়েন না। অন্যভাবে বলা যায় কবি নিজেই তা বারবার পড়েন, নিজেই নিজেকে আচ্ছন্ন, প্রভাবিত করে রাখেন। তিনিই তার শ্রেষ্ট পাঠক। অবশ্যই এই ধারনার ব্যতিক্রম আছে, সবাই এক রকম চিন্তা করবেন,এটা বলা মুর্খতা। 
নিজেই জন্য কবিতা লিখি, এ প্রত্যয়ের পর একজন অনুসন্ধিতসু পাঠক পেলেই ও বিস্মিত হই, অনুরক্ত হই । এই প্রসুংগে এটাও বলতে চাই ,সবাই পাঠক নন, কিছু একটা পড়লেই পাঠক হয় না। লেখকের মত পাঠককেও মননশীল ও সচেতন ,দীক্ষিত হতে হয়। নিজেকে দীক্ষিত পাঠক হিসাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকি সর্বদা।
আমার মনেও প্রশ্ন জাগে, আমি কেন লিখি? এর উত্তরে বলব- আমি নিজেকে প্রকাশ করার জন্যই লিখি। নিজেকে খনন করে আবিস্কার কবি নিজেকেই। জীবনের বিচিত্র পথে নানা অভিজ্ঞতা, নানা ভাবনা, প্রতিনিয়ত আমাকে সেই অন্বেষনে চালিত করে, জীবনের গূঢ় রহস্য উন্মোচত হয় , নানা ঘাত-প্রতিঘাতে যে অনুভব, অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়, যা আমাকে , আমার ভেতরের আমিকে প্ররোচিত করে লিখতে। আর তার জন্য কবিতা মাথায় জারিত হয়, প্রসুত হয় এবং এর মধ্যেকার সমস্ত লালন পালন বৃদ্ধি মস্তিস্কে চলতে থাকে। এই মধ্যে চলতে থাকে পড়াশোনা। নিজেকে উন্নীত করার প্রচেষ্ঠা। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে আমার জীবনবোধ, যা আমি কবিতা নির্মানে প্রকাশ করতে সচেষ্ঠ থাকি। আমার মনে হয়, নিজেকে প্রকাশ করার শ্রেষ্ট মাধ্যম কবিতা। জীবনের গভীরতম অনুভুতিগুলি গদ্যের চেয়ে কবিতায় প্রকাশ করা অধিকতর সুবিধাজনক। এটাও মনে হয়, কবিতা সাধারন মানুষের কাছে কখনই গ্রহনীয় নয়, প্রয়োজনীয় হিসাবে গন্য নয়। কবিতার উপযোগিতা নিয়েও হাজার তর্ক হতে পারে। সেটা শুধু কবিতা কেন, চিত্রকলার ক্ষেত্রেও তাই। সব শিল্প সবার কাছে উপযোগী নাও হতে পারে। কবিরা এসব ভেবে কবিতা রচনা করেন না। সবচেয়ে কঠিনতম, জটিলতম ও মহার্ঘ শিল্প মনে হয় কবিতা। সেই শিল্প গুণের মাধ্যমেই সত্যের অন্বেষণ এবং নিজেকে আবিস্কার করার জন্যই কবিতা লিখি, নির্মান করি আমারই স্থপতি।
কবি শুধু কবিতা লেখেন যা তার নিজের কাছে সার্থক। তাই বলে কবি শুধু কবিতা লিখবেন, তাও স্বীকার্য নয়। একজন কবি , কবিতা ছাড়াও প্রবন্ধ লিখতে পারেন, গল্প -উপন্যাস , অনেক কিছুই লিখতে পারেন, যদি তার সামর্থ থাকে। এভাবেই তো আমরা অনেক মহৎ কবিকে পেয়েছি যাঁরা উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ লিখেছেন, কেউ কেউ গল্প-উপন্যাস ও অন্যান্য গদ্য লিখেছেন। নিজের কথা বলতে হয় যদি, তবে বলি, আমি তো জনপ্রিয়, বিখ্যাত লেখক নই। সাহিত্য-শিল্পকলা নিয়ে যেটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি বা অর্জন করার চেষ্ঠা করছি, তা যৎসামান্য। তবু চেষ্টা করি প্রবন্ধ লেখার, আমি মনে করি , কবিতায় যা প্রকাশ করতে পারছিনা,বা সম্ভব হচ্ছে না,  তা প্রবন্ধের ভিতর প্রকাশ করা  সম্ভব। তাই প্রবন্ধের মাধ্যমে নিজের চিন্তা-ভাবনাকে প্রকাশ করি। 
পরিশেষে একটি কথা বলে রচনাটির ইতি টানছি। বিস্ময়, আনন্দ এবং বেদনার  জন্য লিখি। কবিতা লিখে যাওয়া আমার পরম দায়!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ