কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি
কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু
ঝর্ণা মনি
বাংলার বাঁশিওয়ালা
প্রথম পর্ব
সাতশ বছর আগের জার্মানি শহর আজকের মতো আধুনিক ছিল না। যেমন এলোমেলো ছিল জার্মানির ছোট্ট শহর হ্যামিলন। জার্মানির হানোভারের ৩৩ মাইল দক্ষিণে ছোট্ট শহরের মানুষ ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছিল। মেয়রের নেতৃত্বে সবাই মিলে একজোট হয়ে ঠিক করলো, শহরকে ইঁদুরের হাত থেকে যে বাঁচাতে পারবে তাকে মোটা অঙ্কের পুরস্কার দেয়া হবে। সেই ঘোষণায় সাড়া দিয়ে শহরে এসে হাজির হলেন রহস্যময় এক বাঁশিওয়ালা। তিনি জানালেন, তার বাঁশির সুরে শহরকে ইঁদুরমুক্ত করা সম্ভব। বাঁশিওয়ালাকে মোটা অঙ্কের পুরস্কারের বিনিময়ে শহরকে ইঁদুরমুক্ত করার আদেশ দিলেন মেয়র। বাঁশি বাজাতে শুরু করলেন বাঁশিওয়ালা। বড় অদ্ভুত সেই সুর। তার বাঁশির শব্দ শুনে গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো সব ইঁদুর। যেখানে যেরকম ইঁদুর ছিল সবই বেরিয়ে এলো বাঁশিওয়ালার মায়াবী সুরের টানে। একসময় ইঁদুরগুলোকে নিয়ে গিয়ে ওয়েজার নদীতে ফেলে দিলেন বাঁশিওয়ালা। ইঁদুরমুক্ত হলো হ্যামিলন। বিশ্ববিখ্যাত এই জার্মান গল্পটি ১২৮৪ সালের ২২ জুলাইয়ের।
ছয়শ সাতাশি বছর পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবারের স্থান নাৎসীদের দেশ জার্মান নয়; পূর্ব বাংলা। জার্মানীর ইদুরের চেয়েও ভয়ংকর শত্রু পাকিস্তানের হাতে প্রতিমুহুর্তে শোষিত-নিষ্পেষিত হচ্ছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার জন্য ব্যাকূল সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলার বাঁশিওয়ালা শোনালেন তার অমর কবিতা। রেসকোর্স ময়দানের উত্তাল সমুদ্রে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মোহনীয় সুরের লহরীতে উত্তাল বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়লো শত্রু নিধনে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কুখ্যাত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে হটিয়ে মুক্ত করলো বাংলাদেশ। বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই পেলো স্বাধীন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের আগুনঝরা দিনগুলোতে বাংলার বাঁশিওয়ালা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, অসংখ্য গান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তর পর্বে ছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির নয়নের মণি। তাকে নিবেদিত সহস্র কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে রয়েছে পিতার প্রতি সন্তানের পরম শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। দেশ-বিদেশের প্রধান কবির কলমের আঁচড়ে ফুটে ওঠেছে অবিসংবাদিত নেতা মুজিবের অবয়ব। পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ কবি এমনকি নাম না জানা অনেক কবিও তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে উচ্চারণ করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু।’
শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ হওয়ার আগেই তাকে নিয়ে কবিতা লেখা শুরু হয়। ষাট ও সত্তর দশক ধরে বিশ্বব্যাপী মুক্তিপাগল মানুষের তেজোদীপ্ত প্রতীক বঙ্গবন্ধুর নাম কবিতার ক্যানভাসে নিয়ে আসেন বিখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ। মুজিবকে নিয়ে প্রথম কবিতা লেখেন ১৭৬৭ সালে। ওই বছরের ১২ নভেম্বরে, সংবাদে (পত্রিকায়) প্রকাশিত হয়েছিল ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ শিরোনামের কবিতাটি। কবির জবানবন্দিতে, ‘ওই কবিতাটি আমি লিখেছিলাম ১৯৬৭ সালের কোনো এক সময়ে। তারিখ মনে নেই। তবে মনে আছে, অনেক বিলম্বে, ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে কবিতাটি ছাপা হয়। শেখ মুজিব তখন স্বদেশের কথা বলতে গিয়ে আইয়ুবের জেলে বন্দি জীবনযাপন করছেন। তাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আমি ওই কবিতাটি তার নামে উৎসর্গ করি। কবিতাটি পড়ে তিনি খুব খুশি হন। কিন্তু তিনিও কবিতাটি ভালো বুঝতে পারেননি। তাই বোঝার জন্য কবিতাটি নিয়ে যান মার্কসবাদী সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্তের কাছে। রণেশদাও তখন জেলে ছিলেন। রণেশদার কাছেই আমি ঘটনাটির কথা শুনেছিলাম। ওই কবিতায় আমি শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য মানুষের বিদ্রোহের কথাই বলেছি। ‘স্বদেশের মুখ’ বলতে আমি জীবনানন্দ-বর্ণিত ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ কথাটিরই প্রতিধ্বনি করেছিলাম। সর্বোপরি, আমি যে মুক্ত ভূমণ্ডলের স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছিলাম, আমার বিশ্বাস হয়েছিল, শেখ মুজিবের মধ্য দিয়েই একদিন আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। তিনিই হবেন আমাদের জাতীয় মুক্তির স্থপতি।’
১৯৬৮ সালের মধ্যভাগে মুজিবকে নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের দীর্ঘ রাজনৈতিক কবিতা ‘হুলিয়া’ ছাপা হয় দৈনিক আজাদের সাহিত্য পাতায়। তখন আজাদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবী আ. ন. ম. গোলাম মোস্তফা। রাজপথ কাঁপানো ‘হুলিয়া’ কবিতাটির কয়েকটি বিখ্যাত পঙক্তি,
‘খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য৷
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস৷
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর,
আমাদের ভবিষ্যত কী?
আইয়ুব খান এখন কোথায়?
শেখ মুজিব কি ভুল করেছেন?
আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?
আমি কিছুই বলবো না।
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যতকে চেয়ে চেয়ে দেখবো৷’
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে বিক্ষোভে উত্তাল বাংলার জনগণের মুখে মুখে তখন শেখ মুজিবের নাম। রাজপথ, মিছিল, সেøাগান আর ফেনায়িত বঙ্গোপসাগরের সফেদ সলিলে একটাই নাম, শেখ মুজিব। বাংলার আকাশে একটাই আওয়াজ, ‘জেলের তালা ভাঙবো/ শেখ মুজিবকে আনবো।’ আর ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসির আদেশ খণ্ডন করে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনা মুজিবকে নিয়ে বাংলার নতুন সেøাগান, ‘জেলের তালা ভেঙেছি/ শেখ মুজিবকে এনেছি।’ জনরোষের মুখে ওই বছরের ২৪ মার্চ পদত্যাগ করেন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। সারা দেশে তখন স্বতস্ফূর্ত আনন্দের বন্যা। জনতার মুখে মুখে তখন একটি ছড়া, কোথাও কোথাও পোস্টার ও লিফলেটেও। কেউ জানে না কে তার রচয়িতা। সেই ছড়াতেও ছিল বঙ্গবন্ধুর নাম। ছড়াটি ছিল এরকমেরÑ
‘আইয়ুব ব্যাটা মুরগি চোর
ব্যাড়া ভাইঙ্গা দিলো দৌড়
ধরলো ক্যাডা, ধরলো ক্যাডা?
শেখ মজিবর, শেখ মজিবর।’
ঊনসত্তরের উত্তাল দিন পেরিয়ে আসে ১৯৭০। সারা দেশে নির্বাচনী ডামাঢোল। বাঙালি জাতির জীবনে এই নির্বাচন ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা স্বরূপ ঘটনা। ফলে বাঙালি জাতি প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই নির্বাচনী যুদ্ধে। এখানেও বাংলার মহানায়ক শেখ মুজিবুর, যিনি ইতোমধ্যেই মানুষের ভালোবাসার দানে ‘বঙ্গবন্ধু’। এই সময় গ্রামোফোন রেকর্ডে ধারণ করা হয় সেই ঐতিহাসিক গান, যার দৌলতে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে সুরে ও ছন্দে পৌঁছে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। ‘মুজিব বাইয়া যাওরে/ নির্যাতিত দেশের মাঝে/ জনগণের নাওরে মুজিব/ বাইয়া যাওরে/ ও মুজিব রে, ছলে বলে চব্বিশ বছর রক্ত খাইল চুষি/ জাতিরে বাঁচাইতে যাইয়া/ মুজিব হইল দোষী রে...’
স্বাধিকার আর মুক্তির আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র কবিতা। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক হয়ে মিশে গেছে কবিতার দৃপ্ত উচ্চারণে। সময়, সংগ্রাম আর ইতিহাসকে কাব্যময় করে তুলেছেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কবিরা। ঐতিহাসিক সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে কবিতায় গেঁথে রেখেছেন নির্মলেন্দু গুণ। বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম, মুক্তিপাগল বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্ভুদ্ধ করতে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অনলবর্ষী আহ্বান, জনতার বাঁধ ভাঙা জোয়ার, আকাশে বাতাসে সাড়ে সাত কোটি প্রাণের জয়বাংলা ধ্বনি, সেদিনের সেই রেসকোর্স ময়দান সব কিছু ইতিহাস হয়ে আছে গুণের কবিতায়। শোষিত-নিপীড়িত প্রাণের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার আকুতি। কবিতাটির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে মুক্তির বারতা। হাজার বছরের বন্দিত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাঙালির দাসত্ব মুক্তির ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মুর্ত প্রতীক এই কবিতাটি হাজার বছর পরে বীর বাঙালির বীরত্বের সাক্ষ্য দেবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়াবে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের আহ্বান।
‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে, ‘ কখন আসবে কবি ?’
... হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।
সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগান, এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখণ্ড অখণ্ড আকাশ যেরকম, সে রকম দিগন্ত প্লাবিত
ধু-ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু-ধু মাঠের সবুজে।
কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক।
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে।
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের : ‘কখন আসবে কবি?, ‘কখন আসবে কবি?’
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি,
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’/ নির্মলেন্দু গুণ।
কবি সিকান্দর আবু জাফরও ওই সাত মার্চে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ও কবির বন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি কবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের ত্যাগতিতিক্ষা আর বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আপোষহীনতার চেতনাদৃপ্ত রূপ স্বাধীনতার আগেই কবি তুলে ধরেছেন তার কবিতায়।
‘ভেঙ্গে যাবে শত্রুর যত ষড়যন্ত্র
জনগণের বাংলা পাবে গণতন্ত্র
দুর্বার মুজিবের দুর্জয়মন্ত্র
জয় জয় জননী বাংলা।
‘ইতিহাস চারিনী বাঙলা’/ সিকান্দার আবু জাফর।
অবশ্য ৭ মার্চের ভাষণের পর বিশ্ব মিডিয়া বঙ্গবন্ধুকে বিশেষায়িত করেছিল ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে। তিনি ছিলেন রাজনীতির মহান এক কবি। যার ভাষণের পঙতিতে পঙতিতে ছিল কাব্যিক ব্যঞ্জনা, অনুপ্রাস ও মাত্রাবোধের এক অপূর্ব সম্মিলন। ‘নিউজউইক’ সাময়িকীর বিখ্যাত রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুকে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ হিসেবে। ওইদিন (একাত্তরের ৭ মার্চ) এএফপি বলেছে,‘৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ঐ দিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।’ ১৯৭১ সালে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক ভাষ্যে বলা হয়, ‘শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ঐ ভাষণেরই আলোকে।’ ১৯৭২ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার এক নিবন্ধে বলা হয়, ‘উত্তাল জনস্রোতের মাঝে, এ রকম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দিকনির্দেশনামূলক ভাষণই শেখ মুজিবকে অনন্য এক ভাবমূর্তি দিয়েছে। দিয়েছে অনন্য মহান নেতার মর্যাদা।’
একাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক হয়ে গিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষের কাছে। একাত্তরে গণসংগীতের মূল স্তম্ভও ছিলেন তিনি। কবিরা ক্ষণজন্মা পুরুষ বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে এক করেছেন পিতার ভালোবাসার প্রতিদানে। ‘বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু’ কবিতায় সালাউদ্দিন আহমেদ সালমান বলেছেন, ‘বাংলা মায়ের কাঁচা রক্ত, চুষে খাচ্ছে পাকিস্তান/ তাই দেখিয়া শোকে পোড়া বাংলার বুকে জন্ম নিলো শেখ মুজিবুর রহমান/ মুক্তির সংগ্রাম অপশক্তিতে নয়, প্রমাণ করেছে বাঙ্গালী রক্তের বন্যায়/ পাকবাহিনীর নাপাকি হাত ভেঙ্গে, বঙ্গবন্ধু দেখিয়েছে স্বাধীনতার সূর্য বাংলায়/ অবাক বিস্ময়ে নির্বাক পৃথিবী অপলক তাকিয়ে রয়, যেদিন শেখ মুজিবুরের সংগ্রামী ডাকে বাংলাদেশ পেয়েছিল স্বাধীনতার বিজয়।’
বঙ্গবন্ধু তার বড় শক্তির কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন জনগণের তার প্রতি ভালোবাসার কথা। আবার দুর্বলতার কথা বলতে গিয়েও বলেছেন, জনগণের প্রতি ভালোবাসার কথা। আর জনগণের মতো বাংলার কবিরাও অকৃপণ লেখনীতে গেয়েছেন মুজিব বন্দনা। কবি হাবীবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু তুমি আছ বলে’ কবিতাটি লেখেন ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক আজাদের ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সংখ্যায়। কবির ভাষায়, ‘বঙ্গবন্ধু, তুমি আছ বলে, বিভীষিকাময় অন্ধকারের শব ঠেলে ঠেলে/ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তের মৃত্যুকে উপেক্ষা করে/ আমরা এগিয়ে যাই উদয়াচলের পথে...।’
একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চে (১৬ মার্চ) পল্লীকবি জসীম উদ্দীনও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এক দীর্ঘ কবিতা লেখেন। বৃটিশদের গোলামী থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ বঞ্চনা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রক্তস্নাত বাংলা, বীরের বেশে মুজিবের অভ্যুত্থান সব ইতিহাস ঠাঁই পেয়েছে কবির কবিতায়। পল্লী কবির ভাষায়,
‘মুজিবর রহমান
ওই নাম যেন ভিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে
জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞঝা-অশনি বেয়ে।
...রাজভয় আর কারাশৃঙ্কল হেলায় করেছ জয়
ফাঁসির মঞ্চে-মহত্ব তব কখনো হয়নি ক্ষয়।
বাঙলাদেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমুর্ত রাজ
প্রতি বাঙালীর হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত-তাজ।
তোমার একটি আঙ্গুল হেলনে অচল যে সরকার
অফিসে অফিসে তালা লেগে গেছে-স্তব্ধ হুকুমদার।
... ধন্য এ কবি ধন্য এ যুগে রয়েছে জীবন লয়ে
সম্মুখে তার মহাগৌরবে ইতিহাস চলে বয়ে।’
‘বঙ্গবন্ধু’/ জসীম উদ্দিন।
আমাদের স্বাধীনতা নিয়েও যেমন কয়েকটি অমর কবিতা রচিত হয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও রচিত হয়েছে অনেকগুলো অসাধারণ অমর কবিতা। বঙ্গবন্ধুকে উপজীব্য করে লেখা কবিতাগুলোর সাহিত্যমূল্যও অনেক। ‘মার্চের কবিতাগুলি’ শিরোনামের কবিতায় মহাদেব সাহা শেখ মুজিবকে তুলনা করেছেন আফ্রিকার বর্ণবাদী মানুষের মানব দেবতা নেলসন ম্যাণ্ডেলার সঙ্গে। তার ব্যাঞ্জময় উচ্চারণ, ‘কতোদূরে হেঁটে গেলে স্বাধীনতা আসে?/ সদুত্তর দিতে গিয়ে/ ম্যান্ডেলা, মুজিব আর/...শোনা গেলো বহুবিধ করাতের কাতর আজান।’
আবু জাফর তার ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি’ কবিতায় বলেছেন, ‘দেখেছি ৭১, সাড়ে সাতকোটি মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলন/ শুনেছি রেসকোর্সে জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর অগ্নিঝরা ভাষণ।’ আবার ‘বঙ্গবন্ধু মানে’ শিরোনামের কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধু, বাঙালির স্বাধীনতা আর স্বাধিকার আন্দোলনের একসূত্রে গাঁথা ইতিহাস। কবির কাব্যে, ‘বঙ্গবন্ধু মানেই বায়ান্ন, ছেষট্টি, ঊনসত্তর/ বঙ্গবন্ধু মানেই উত্তাল ঊনিশশো একাত্তর/ বঙ্গবন্ধু মানেই সাতই মার্চ, দশই জানুয়ারী/ বঙ্গবন্ধু মানেই ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর বাড়ী/ ...বঙ্গবন্ধু মানেই পদ্মা, মেঘনা, সুরমা, যমুনা/ বঙ্গবন্ধু মানেই মিছিলের উদ্দীপণা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা/...বঙ্গবন্ধু মানেই পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ/ বঙ্গবন্ধু মানেই লাল সবুজে পতাকার রেশ/ বঙ্গবন্ধু মানেই ভোরের ডগমগ সূর্য, সোনালী আকাশ/ বঙ্গবন্ধু মানেই মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত ইতিহাস।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি বঙ্গবন্ধুর নামেই পরিচালিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামেই উচ্চারিত হত প্রাণের সেøাগান ‘জয়বাংলা।’ অসংখ্য কালজয়ী গান প্রচারিত হত শেখ মুজিবের নামে। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মুক্তিকামী বাঙালির চেতনার বাতিঘর শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযোদ্ধা কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন,
‘একজন মুক্তিযোদ্ধার এই ডায়েরিতে আমি
বঙ্গোপসাগরের কলধ্বনি শুনি
শুনি অপূর্ব লালিত্যময় কণ্ঠে গাওয়া
আমার সোনার বাংলা
একজন মুক্তিযোদ্ধার সমগ্র ডায়েরি জুড়ে আমি
লেখা দেখি শেখ মুজিবের নাম।’
‘একজন মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরিতে’/ মহাদেব সাহা।
তিরিশ লাখ শহীদ আর চার লাখ মা বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। কিন্তু এ স্বাধীনতা যেন অর্থহীন মনে হয় বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগারে রেখে বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত হতে পারে না বাঙালি জাতি। দেশ তাকিয়ে ছিল তার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়। সমগ্র জাতির এ প্রত্যাশা ফুটে ওঠেছে সিকান্দার আবু জাফরের ‘ফিরে আসছেন শেখ মুজিব’ কবিতায়-
‘মুক্তিকামী মানুষের শুভেচ্ছার পথে
বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জনক
শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসছেন বাংলাদেশে
...নির্ভয় ভবিষ্যতের স্বপ্নদীপ্ত
নিরষ্কুশ প্রত্যাশার পথে।’
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন দিবসে কবি কামাল চৌধুরীর ‘১০ জানুয়ারি’ কবিতাটি বাংলার গণ মানুষের আবেগ উদ্বেলিত অনুভূতি, ‘তিনি ফিরে আসলেন, ধ্বংসস্তুপের ভিতর ফুটে উঠল কৃষ্ণচূড়া/ মুকুলিত হ‘ল অপেক্ষার শিমুল/ শোক থেকে জেগে উঠলো স্বপ্ন; রক্তে বাজল দামামা/ বেদনার অশ্রুরেখা মুছে ফেলে/ ‘জয়বাংলা জয়বাংলা’ বলে হেসে উঠল/ লতাগুল্ম,ধুলিকণা,পরিপূর্ণ দীপ্ত পতাকা।’
নয় মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয়ের পূর্ণতা লাভ করে। ১০ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন বাঙালির নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জীবন-মৃত্যুর কঠিন চ্যালেঞ্জের ভয়ঙ্কর অধ্যায় পার হয়ে সারাজীবনের স্বপ্ন, সাধনা ও নেতৃত্বের ফসল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মহান এ নেতার প্রত্যাবর্তন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পূর্ণ হয়। স্বয়ং জাতির পিতা তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা।’ সেদিন বাংলাদেশে ছিল এক মহা উৎসবের আমেজ। গোটা বাঙালি জাতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন তাদের প্রিয় নেতা, স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি সদ্য স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখবেন। পুরো দেশের মানুষই যেন জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়। অবশেষে বন্দীর নাগপাশ ছিন্ন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বিজয়ের বেশে নামলেন বিমান থেকে। পা রাখলেন লাখো শহীদের রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। গোটা জাতি হর্ষধ্বনি দিয়ে তেজোদীপ্ত ‘জয়বাংলা’ সেøøাগানে তাদের অবিসংবাদিত প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানায়। বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকে লোকারণ্য। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জয়ধ্বনি করেছিল বিজয়গর্বে। নেতা এসেছেন বিজয়ীর বেশে, সোনার বাংলার আকাশে-বাতাসে তার আগমনী বার্তা। দিকে দিকে প্রাণের উৎসব। বাংলার সবুজ প্রান্তরে ঘাসে ঘাসে ছিল তারই রোমাঞ্চ। অনেক রাত্রির তপস্যা শেষে ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতার রক্তসূর্য পূর্ণতার মহিমায় উদ্ভাসিত। বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতা গেয়ে ওঠে, ‘...জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্তভাবনাহীন/ তুমি ফিরে এলে অপূর্ণতা ঘুচে বাংলাদেশ হলো পূর্ণ স্বাধীন।’
সারা জীবন রাজনীতিচর্চা করলেও রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা এবং প্রভাব সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে। বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের নানারকম বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বাঙালিরা যখন প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠতে থাকে তখন তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংগঠিত করা, সর্বোপরি স্বাধীনতা সংগ্রামে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাই তাকে অবিসংবাদিত করে তোলে। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি এবং রক্তগঙ্গায় তিরিশ লাখ মানুষের আত্মাহুতি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমিক বিভিন্ন আন্দোলনের পথ পাড়ি দিয়ে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ, করাভোগ এবং নেতৃত্বদান তাকে তার দেশ ও জাতির কাছে মহীয়ান করে তোলে। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ পরিণত হয় সমার্থক শব্দে। কবি গেয়ে ওঠেন বাংলার চিয়ারত গান,
‘অতঃপর সদ্য ফোটা গোলাপের মতো বাংলাদেশ
হাতে করে তরতর বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন মুজিব।
কারাগারের পাশেই ওরা খুঁড়েছিলো নির্মম কবর;
তখন খবর পেয়ে
অভুক্ত ছিলেন আমার বাবাও,
গ্রামে গঞ্জে অনেক মানুষ।
অতঃপর প্রত্যাশার সম্ভাব্য সকাল ঝলমল করে উঠেছিলো;
তাঁর অশ্রু
আর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের মিছিলে।
প্রিয় বঙ্গবন্ধু, পুরো বাঙালী জাতিই
আপনার পরিবার।
‘বাংলাদেশ’/ মহাদেব সাহা।
ক্রমশঃ
1 মন্তব্যসমূহ
এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুন