কী লিখি কেন লিখি
রাশিদ আসকারী
প্রাবন্ধিক-অনুবাদক। প্রাক্তন উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
কী লিখি কেন লিখি
রাশিদ আসকারী
লেখালেখি একধরনের আসক্তি। অনেকটা চার্চিলের শ্যাম্পেন-আসক্তির মতো । চার্চিল বলেছেন, “In success you deserve it and in defeat you need it”। মানুষ প্রকাশবাকুল প্রাণী । সাফল্যে মানুষ প্রকাশ্ মুখর হয় আবার ব্যর্থতায় বাঙময় হয়। শুধু তাই নয়। লেখালেখি কেবল চার্চিলের শ্যাম্পেনের মতো সাফল্য আর ব্যর্থতার সঙ্গী নয় বরং জীবনের সকল দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা সুখ-দুঃখে লিখি; বিরহ-বেদনায় লিখি; প্রেমে-দ্রোহে লিখি; ধ্যানে-সাধনায় লিখি; কামে-হিংসায় লিখি। জীবনের একান্ত অনুভূতিগুলোকে যখনেই মানুষ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে তাতে স্থায়িত্ব আরোপ করতে চেয়েছে এবং তার মাধ্যমে এক প্রকার সৃষ্টির আনন্দ পেতে চেয়েছে তখনই তার মাধ্যম হিসেবে সামনে এসেছে লেখালেখি। এটি মনে হয় কমবেশি জগতের সকল লেখকের ক্ষেত্রে কমবেশি প্রযোজ্য। অবশ্য এর সাথে প্রাতিস্বিক কিছু বিষয় তো থাকেই। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। কেনো লিখি প্রশ্নের জবাবে চার্চিলের শ্যাম্পেন তত্ত্বে উত্তর খুঁজে নিতে বলবো। তবে আমার লেখালেখির পেছনে মনে হয় অন্যের লেখা ভালোলাগার একটি ব্যাপার প্রচ্ছন্ন রয়েছে। ছেলেবেলায় রঙিন প্রচ্ছদের ঠাকুরমার ঝুলি, ঠানদিদির থলে, রাক্ষস-খোক্কোস আর ভূত-পেত্নীর গল্প আমাকে দারুণভাবে টানতো। কৈশোরে পঞ্চতন্ত্রের কাহিনী, ইশপের গল্প, গ্রিন ব্রাদার্সের রূপকথা মুগ্ধ করেছে। কলেজ জীবনে আরব্য রজনী, রহস্যোপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী পড়ে শিহরিত হতাম। স্বপ্ন দেখতাম একদিন এরকম আমিও লিখবো।
আশির দশকের প্রথমার্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে এসে আমার লেখক সত্তা বেশ বড় রকমের পুষ্টি পায়। শেকসপীয়র, তলস্তয়, দান্তের লেখা আর খ্যাতনামা শিক্ষকদের পাঠদান লেখক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার সাহস জোগায়। সেই সাহস আরো মোমেন্টাম পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের লেকচারার হিসেবে যোগদান করায়। আমার লেখালেখির হাতেখড়ি বাংলায়। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে কলকাতার জিজ্ঞাসা পত্রিকায় ‘অমানুষ’ নামে একটা ছোটগল্প পাঠাই। সম্পাদক শিবনারায়ণ রায় একজন ডাকসাইটে লেখক। তাঁর পত্রিকায় লেখা ছাপাবে ভাবতেই পারিনি। এক সুন্দর সকালে শিবনারায়ণ বাবুর গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা একটি চিঠি আসলো ‘অমানুষ’ জিজ্ঞাসার পরবর্তী সংখ্যায় ছাপা হবে। নেই আনন্দ এবং সেই পরবর্তী সংখ্যার জন্যে প্রতীক্ষার উত্তেজনা অনির্বচনীয়। পত্রিকা হাতে এলে দেখলাম আমার গল্প শুধু প্রকাশই হয়নি, রায় বাবু সম্পাদকীয়তে আমার গল্প নিয়ে রীতিমতো একটি অনুচ্ছেদ লিখেছেন। বিষয়টি লেখালেখিতে আমার সাহিত্য-স্পর্ধা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শিবনারায়ণ রায়ের লেখা ও তাঁর স্নেহসান্নিধ্য আমার মধ্যে মুক্তচিন্তার চর্চাকে ভীষণভাবে উসকে দিয়েছে। আমি তাঁর কাছে অপরিশোধ্য ঋণে ঋণী।
লেখক হিসেবে আমার মধ্যে সবসময় এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করেছে। কিছুকাল বাংলা লিখে মনে হয়েছে সীমানা ডিঙ্গোতে হলে আমায় ইংরেজি লিখতে হবে। উপমাহদেশে ইংরেজি লেখালেখির সূচনাপর্বটা খুব আশাব্যঞ্জক না হলেও দেশভাগের পর ইংরেজিতে অনেক ভালো কাজ হয়েছে এবং অধুনা হচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। সৃষ্টিশীল ইংরেজি লেখার একটা ধারা বাংলাদেশেও বিকশিত হচ্ছে। এই ধারাকে আমিই প্রথম ২০১০ সালে দি ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় ‘Bangladeshi Writing in English’ (BWE) অভিধা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও এই ধারার সাথে সম্পৃক্ত হই। বারোটি ইংরেজি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত আমার প্রথম শর্ট ফিকশন সংকলন Nineteen Seventy One and Other Stories ২০১১ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। আমার ইংরেজি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর বাংলাদেশের একান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো রাণীর ইংরেজিতে (Queen’s English) লিখে বিশ্বব্যাপী এক বৃহত্তর পাঠক বৃত্তে তুলে ধরা। আমাদের ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী ঐতিহ্য কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরগাথা, বাঙ্গালির নজীরবিহীন আত্মত্যাগ, পৈশাচিক গণহত্যা, গ্রামবাংলার আস্তিত্বিক সংকট প্রভৃতি ইংরেজি ভাষায় বর্ণিত হলে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্যে বিশ্বায়নের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। মজার ব্যাপার হলো, গল্প গ্রন্থটি পরবর্তীতে দিল্লী থেকে হিন্দি ও ফরাসি ভাষায় অনুদিত হয়েছে । ইংরেজি ভাষায় রচিত না হলে হয়তোবা আমার কোনো গ্রন্থ এতো সহজেই অনুবাদের বাহনে চেপে বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারতো না।
একুশ শতকের একজন লেখক হিসেবে আমি দুটো ভাষা আয়ত্বে এনেছি। একটি আমার মাতৃভাষা বাংলা। অন্যটি আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আমার ভিত্তিভূমি। আমার পায়ের নিচের অবারিত মাঠ। আমার শেকড়। আর ইংরেজি আমার ডানা মেলার উন্মুক্ত আকাশ। আমি আকাশ ছুঁতে চাই, তবে মাতৃভূমির ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে। বাংলার জল-মাটি-কাদা, মানুষের হাসি-কান্নার কাহিনী আমি তুলে ধরতে চাই বিশ্ব অঙ্গনে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে।
আমার লেখালেখির প্রেরণা আমি নিজেই। শিল্পকলার প্রেরণাদাত্রী জিউসকন্যাদের (The Nine Muses) কেউই বস্তুত আমার উপর ভর করতে পারেনি। এক্ষেত্রে আমি স্বয়ম্ভূ। এটাও একধরনের নার্সিসিজম। বস্তুত, সব লেখকই নার্সিসিস্ট। নিজের লেখার প্রেমে আত্মহারা। এতে দোষের কিছু নেই। আমিও তাই। আমার লেখার আমি মুগ্ধ পাঠক। এটা অন্যের চাইতে ভালো কি মন্দ তা আমার বিবেচ্য নয়। আমার স্বস্তি এই যে, আমার লেখা অন্যের চাইতে আলাদা। আমার অসংখ্য প্রিয় লেখক রয়েছেন পৃথিবী জুড়ে। বিশ্বসাহিত্যে শেকসপীয়রের নাটক, টেনিসনের কবিতা, তলস্তয়ের উপন্যাস, মোঁপাসার ছোটগল্প, পেত্রার্কের সনেট, বেকনের প্রবন্ধ, কাফকার নভেলা আমাকে প্রবলভাবে টানে। বাংলা সাহিত্যে মধূসূদন-বঙ্কিম- রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছাড়াও পঞ্চপাণ্ডব (বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দে), তিন বন্দ্যোপাধ্যায় (বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর ও মানিক), দুই শওকত (শওকত ওসমান এবং শ্ওকত আলী) সহ এপার-ওপার বাংলার অনেক লেখক-কবি-সাহিত্যিক আমার পছন্দের তালিকা আলোকিত করে রয়েছেন। কিন্তু আমি কাউকেই অনুসরণ করিনি। আমার লেখালেখির রাস্তা আমি বেছে নিয়েছি। অনেক সময় পথ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। কোন পথে যাবো ভেবে পাইনি। তখন স্মরণ করেছি প্রিয় কবি রর্বাট ফ্রস্টের কথা: “Two roads diverged in a wood and I/ I took the one less traveled by./” লেখক হিশেবে আমি সবসময় আলাদা পথেই চলতে চেয়েছি । এটাই আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন ।
3 মন্তব্যসমূহ
স্যারকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই এই কথাগুলো সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষার মধ্যেকার দূরত্ব কীভাবে অতিক্রম করা যায় তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় এই প্রবন্ধে। আমি বিশ্বাস করি প্রবন্ধটি অনতিদূর ভবিষ্যতে অবশ্যপাঠ্য হিসেবে গৃহীত হবে। দুই ভাষার মধ্যেকার সম্পর্ক অনুভব করা এসময়ের খুব বড় দাবি। অধ্যাপক লেখক রাশিদ আসকারী স্যার সহজভাবে নিপুণ বর্ণনায় দুই ভাষার ভেতরকার অদৃষ্ট সংযোগকে দৃশ্যমান করে মূর্তমান করলেন নিজের জীবন থেকে। স্যারের অর্জন আরও মহিমান্বিত হোক।
উত্তরমুছুনএকুশ শতকের একজন লেখক হিসেবে আমি দুটো ভাষা আয়ত্বে এনেছি। একটি আমার মাতৃভাষা বাংলা। অন্যটি আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আমার ভিত্তিভূমি। আমার পায়ের নিচের অবারিত মাঠ। আমার শেকড়। আর ইংরেজি আমার ডানা মেলার উন্মুক্ত আকাশ। আমি আকাশ ছুঁতে চাই, তবে মাতৃভূমির ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে। বাংলার জল-মাটি-কাদা, মানুষের হাসি-কান্নার কাহিনী আমি তুলে ধরতে চাই বিশ্ব অঙ্গনে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ স্যারের কথাগুলো। অনেক ধন্যবাদ স্যারকে।
উত্তরমুছুন