কী লিখি কেন লিখি আসিফ রহিম

কী লিখি কেন লিখি 
আসিফ রহিম
কবি-হৃদরোগবিশেষজ্ঞ
কী লিখি কেন লিখি 
আসিফ রহিম


শৈশব কৈশোর যৌবন পেরিয়ে মধ্যবয়সে এসে নতুন বোধোদয় হল। হৃদপিন্ড ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে জীবন-মরণের দোলাচলে অনুভব করলাম ক্ষনস্থায়ী জীবন পদ্মপাতার মত টলটলে যেকোন মুহুর্তে ভবলীলা সাঙ্গ হতেই পারে৷ অথচ চিন্তাভাবনার নিরন্তর ব্যাপ্তিতে মনের আকাশে আকুল আবেগীয় বিহবলতা। সময়ের কাছে সে তার আসল কথা বলতে চায় অকপটে। 
ফেসবুকে হুলুস্থুল স্ট্যাটাস আর কমেন্টের ছড়াছড়ি। হঠাৎ দেখি আমার সিনিয়র আপা ডা ফারহানা নীলা আর প্রিয় বন্ধু ডা ফারজানা হায়দার চৌধুরির কবিতা। দুষ্টুমির ছলে উত্তর দেয়া শুরু করলাম ছন্দে ছন্দে একদিন আপা বলল "তোমার হবে, তুমি লিখ "। সহস্র ভোল্টেজের শক খেলাম মনে বাজতে থাকে তোমার হবে কথাটা বারবার। এইসময় পাশে দাঁড়ালো ঢাকা মেডিকেল সহপাঠী অপর কবি ডা,ফারজানা তানিয়া। সে একের পর এক আমার লেখা অখাদ্য কবিতার সমালোচনা ও গাইডলাইন দিল৷ প্রথমে ভাবলাম এ বোধ হয় অসাধ্য। তানিয়ার কথা কানে বাজলো লিখে যাও ডোন্ট গিভ আপ৷ 
কাকতালীয়ভাবে একই সময় আবির্ভাব হল ভাইবার গ্রুপে নটরডেম ব্যাচ ৮৫ এর তুমুল আড্ডা। সেখানে ৩৩ বছর পর পুরানো বন্ধুদের খুঁজে পেয়ে আবেগে ভেসে গেলাম শুরু হল বিপুল উদ্দীপনায় কবিতা লেখা বন্ধুরাও খুব দ্রুত উৎসাহ দিতে লাগল। এত আনন্দ পেলাম যে গেট টু গেদারের সুভ্যেনির ভেসে গেল আমার কবিতায় এরপর নটরডেম অ্যালামনাই ও ৭০ বছর পুর্তিতে ছাপা হল কবিতা আর স্মৃতিচারণ লেখা৷ 
একসময় গল্প উপন্যাস লেখায় মন দিলাম এভাবেই শুরু পাশে ছায়া হয়ে রইল বন্ধু তানিয়া আর নীলা আপা। তাই নীলা আপা আমার অনুপ্রেরনা আর তানিয়া আমার গুরু৷ কখনো বই লিখব ভাবিনি হঠাৎ দেখি তানিয়ার প্রথম কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নেরা বাতিলের দেশে প্রকাশিত হল দ্বিগুণ অনুপ্রেরণা পেলাম৷ 
এরই মধ্যে বন্ধুরা ও ফেসবুকে প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা বাদল ভাই, কবি নাহার আলম, অপার বাংলার রীতা চক্রবর্তী দিদি দেবাশীষ দা দেবলীনা দি, সবার অনুরোধে ধর্না দিলাম প্রকাশকদের কাছে।
অবশেষে চর্চা গ্রন্থ প্রকাশের কবি অর্মত্য আতিকের সহযোগিতায় কবিতাগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থের সুচনা। বইমেলায় বন্ধুদের অংশগ্রহণ অপার বাংলার পুজা সংখ্যায় আমার কবিতার প্রকাশ সহকর্মী ডাক্তারদের উৎসাহ সব দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল কবিতা লেখার স্পিড। অকৃতদার বন্ধু মাহমুদ মনোয়ার উপন্যাস ছাপিয়ে দিল ওর ফুফা জহিরুদ্দিনের সুলেখা লাইব্রেরির কল্যাণে।
 এরপর কয়েকটা কবিতগ্রন্থের পর বাংলা একাডেমির উপপরিচালক বন্ধু ড তপন বাগচীর অনুপ্রেরণায় পেশাগত বই ওপেন হার্ট সার্জারির টুকিটাকি ও জেনারেল ভাস্কুলার সার্জারি লিখি। এত বড় সাহিত্যিক ছড়াকার হয়েও নিরহংকারি বন্ধুটি একেবারে আপন হয়ে যেভাবে বিনামুল্যে পাললিক সৌরভের শোয়েব ও হযরত আলির মাধ্যমে বইটি ছাপিয়ে দিল তার জন্য শুধু কৃতজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়৷ 
আমার প্রথম বই কবিতাগ্রন্থ ছিল ‘স্বপ্নকানন’ আর দ্বিতীয় বইটি ছিল ‘কসমিক রাত’। মূলত বিরহনির্ভর হলেও তা ব্যক্তির অনুভুতি থেকে সমস্টির জীবন বোধকে তাড়িত করে৷ আমার প্রথম গল্পগ্রন্থের সংকলন ছিল ভালবাসার ক্যাক্টাস সেখানে জীবন থেকে নেয়া কিছু পাচ মিশালি ভালবাসা বিরহ যন্ত্রনা আর হাহাকারের গল্প আছে একটি গল্প আছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে৷ এই ৩ টি বই ই চর্চা গ্রন্থ প্রকাশ কবি অমর্ত্য আতিকের মাধ্যমে প্রকাশিত। উনার সাহায্য ভুলার মত না৷ এই ৩ টি বই প্রকাশিত হয় ২০১৮ ও ২০১৯ এর বইমেলায়৷ এর পর ২০২০ এ একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় ফেরারি প্রেম নামের প্রথম উপন্যাস যা মুলত প্রেমের মিস্টি মধুর ও বিরহ বিচ্ছেদী কস্টে ভরা ৩ টা বড় গল্পের আকারে লেখা সুলেখা লাইব্রেরির সত্বাধিকারি জহুরুল ইসলাম এর কাছে কৃতজ্ঞ। বন্ধুর ফুপা হয়েও আপনপজনের মত যত্ন করেই প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন৷ একই সাল২০২০ ও ২০২১ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলায় বের হয় আরো ২,টি কবিতার বই। ১ম টি কবি ওমর ফারুকির হরিতপত্র প্রকাশনের পক্ষ থেকে বুনো হরিনের স্বপ্ন আর ২য় টি রোদ নেই দৃশ্য ও নেই বেহুলা বাংলার চন্দন চৌধুরির সাহায্যে প্রকাশিত৷ মুলত প্রেম, ধর্ম, বঙ্গবন্ধু ও করোনাকালের মহামারী মৃত্যু ও যন্ত্রনা এর উপজীব্য বিষয়৷ তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে প্রফেশনাল রিসার্চ বুক বাংলা ভাষায় প্রথম " ওপেন হার্ট সার্জারির টুকিটাকি ও জেনারেল ভাস্কুলার সার্জারি বইটি " এই বইটি বিনামুল্যে ছাপানোর পিছনে বন্ধু ড তপন বাগচীর আন্তরিক প্রচেস্টা ও পাললিক সৌরভের শোয়েব হযরত আলি এর সহযোগিতা অনস্বীকার্য। আমার প্রায় ১০ টি যৌথ কাব্য তার মধ্যে রক্তে ভেজা হৃদয় সোনালি সকাল, একটাই আকাশ, নবস্বপ্ন, কবিতায় ভালবাসা, নীলাক্ত নীলপদ্ম ও কবির চোখে স্বপ্নতরী উল্লেখযোগ্য৷ আমার একটা কবিতা হিন্দী ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ২০১৯ সালে এপার ওপার বাংলার কবিদের সাথে অনুকবিতার বই স্বাদের খাতা দুই বাংলার বইমেলার ব্যপক আলোড়ন তৈরি করে। আমি ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গ একাডেমি সম্মাননা ২০১৯ সালে বঙ্গরত্ন সম্মাননা পেয়েছি। সম্প্রতি ২০২১ এর আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে অপার বাংলার মহাবঙ্গ সাহিত্য পরিষদ আমাকে শব্দ সৈনিক সম্মাননায় ভূষিত করে।
এই সব আনন্দ নিয়েই তো বেঁচে আছি।

লেখক: কবি-কথাসাহিত্যিক। সহকারী অধ্যাপক, কার্ডিয়াক সার্জারি, চট্টগ্রাম চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. লিখে যা দোস্ত। অনেক অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা।

    উত্তরমুছুন
  2. আপনার কাছ থেকে আরও অনেক লেখা আশা করি -- আরও অনেক সত্য কথন, আসিফ ভাই।
    -- শামীম রেজা।

    উত্তরমুছুন