কী লিখি কেন লিখি রণজিৎকুমার মণ্ডল

কী লিখি কেন লিখি
রণজিৎকুমার মণ্ডল


কী লিখি কেন লিখি
রণজিৎকুমার মণ্ডল
কবি- গবেষক 

এ জীবন বহমান নদীর মতোই- কখনো কাঁদায়, কখনো হাসায়, আবার কখনো ভয়ঙ্কর রাতের অবসান ঘটিয়ে সোনালী সূর্যের স্বপ্ন দেখায়া। এমনি এক কষ্টকর জীবননদীর তলদেশ থেকে তুলে আনা একমুঠ বেদনার্তি প্রকাশ করছি এজন্য - হয়তো তা হতে পারে, নিরাশার সাগরে ডুবে থাকা কোন অভাগার বুকে- বেঁচে থাকার আশ্বাস। তাইতো বলি সংক্ষেপে----
                আমার জীবন যেনবেদনার নির্যাস
                বিষাদ সিন্ধুর বুকে উন্মাতাল ঢেউ;
                ঝর্নার কলরোলে কান্নার স্রোত---
                 হতাশার বুকে আশার পূর্বাভাস।
প্রকৃত জন্মতারিখ,বার ও সনের কোন ঠিকুজি নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়া সনদ অনুসারে জন্ম তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সাল। জন্ম : কাদাকাটি,আশাশুনি, আশাশুনি, সাতক্ষীরা, বাংলাদেশ। পিতা স্বর্গীয় ভক্তরাম মণ্ডল, মাতা স্বর্গীয়া দুলী রানী মণ্ডল। পিতার দ্বিতীয় পক্ষের পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ও জ্যেষ্ঠপুত্র। শৈশবে চতুর্থ শ্রেণি পাস করার পূর্বেই মায়ের অকাল মৃত্যু। রোগগ্রস্ত বাবার চোখে জল। যমের সাথে আড়ি, বড়ো বাড়াবাড়ি, বড়ো টানাটানি। ক্রমে দুটি বোনের বিয়ে। হতাশার বেলাভূমে ছোট বোন, ছোট ভাই ও আমাকে নিয়ে বাবার কষ্টের সংসার। অজ পাড়াগাঁয়ের মধ্যবিত্ত কৃষিজীবী পরিবার। তাই হাইস্কুলে ওঠার সাথে সাথে বাবার কাজে সহায়তা করার জন্য সেই শৈশব থেকেই ধরতে হলো লাঙলের মুঠি। সংসারে অন্নের অভাব না থাকলেও রান্নার অভাবে কখনো অনাহারে, কখনো অর্ধাহারে স্কুলে যেতে হতো। কখনো রাতের আঁধার মুছাতো চোখের জল---মা'র মতো বাবাও যদি আমাদের ছেড়ে চলে যান! বাবাও আমাদের নিয়ে বড় চিন্তিত। তাইতো শঙ্কিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাকে বিয়ে দিয়ে নববধূর হাতে সংসারের চাবি তুলে দেবেন। সে সময় আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তাই বিয়ের কথা শুনে আসতো কান্না। এমন ক্ষুদে বরের হাতে কে দেবে তাঁর শিশু কন্যাকে তুলে? তবুও পাত্রীর সন্ধান চলতে থাকলো, শেষ পর্যন্ত ছোট মামার (সুপদ সরকার এম.কম.) ধমক খেয়ে বাবা তাঁর পুত্রবধূর মধুর রান্নাখাওয়ার আশায় ইস্তফা দিলেন। এমনিভাবে নানা সমস্যার দোলায় দুলতে দুলতে এক সময় ১৯৮৫ সালে মাধ্যমিক পাস করার সৌভাগ্য হলো। কিন্তু ১৯৮৬ সালে যখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র তখন প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বসতে হলো বিয়ের পিড়িতে- স্বয়ং ছোট মামার নির্দেশে। বাবার আশা পূরণ হলো কিন্তু আমি ভাসতে থাকলাম সীমাহীন সাগরে। পল্লিসমাজের সুরসিক বন্ধুরা তামাশার হুল ফুটায়ে রক্ত ঝরাতে ভালোবাসে--- তাইতো কেউ বললো লেখাপড়া এবার শিকেয় উঠবে---কেউ বললো 'বিয়ে' পাস হয়ে গেছে, এবার চাকরিটা ----- ইত্যাদি ---- ইত্যাদি ----। বিয়ের পর লেখাপড়া করা যায় না এ বদ্ধমূল ধারণার মুখে মুখাগ্নি করার জন্য আমিও কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। তাইতো নববধূর বাহুর বাঁধনে একই সাথে বাঁধা পড়লো আমার গার্হস্থ্য আর ছাত্র জীবন। সে সময় সংসার সাগরে হাবুডুবু খেলেও তার উপর চাপলো   দুরারোগ্য ব্যাধি যক্ষা আর চিরসখা কানের সমস্যা। স্বপ্নীল পর্দার পরতে পরতে পড়লো বেদনার ধূলিকণা! কোমল কুঁড়ির পাপড়িগুলি প্রস্ফুটিত হবার আগেই বেদনায় হলো মলিন। তবুও মৃত্যুর আলিঙ্গন উপেক্ষা করে ঝঞ্ঝা-ক্ষুব্ধ উত্তাল সাগরের বুকচিরে চললো ছুটে আশার তরীখানি। সে তরী যেন সওদাগরী ময়ূরপঙ্খি নাও। বন্দরে বন্দরে মণি-মাণিক্য কিনে ছুটতে থাকলো মরীচীকার দিকে। তাইতো ১৯৮৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৮৯ সালে বি.এ. (পাস) ও ১৯৯১ সালে এম.এ. পাস করার সৌভাগ্য হয়।
এমনিভাবে বৈবাহিক জীবনে দশটি বছর নিয়মিত ছাত্র হিসেবে লেখাপড়া করে সার্টিফিকেট লাভের আশায় ইস্তফা দেয়ার সাথে সাথে ১৯৯৫ সালে সুযোগ এলো সদ্য প্রতিষ্ঠিত ননএমপিও ভূক্ত শালিখা কলেজে শিক্ষকতা করার। যখন বেগারখাটা জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৯ সালে বেতন এলো তখন ২০০১ সালের ৩ মে থেকে কলেজের অদূরে মহাকবি মধুসূদন জননী জাহ্নবী দেবীর জন্মস্থান কাটিপাড়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ হলো। জীবনপালে যখন স্বাচ্ছন্দ্যের হাওয়া লাগলো, যখন সংসাররূপ সোনার তরীতে ---- পত্নী রেনুকা রানী, কন্যা রিংকু ও পুত্র রিপন কুমার এই তিন যাত্রীকে নিয়ে চলেছি সাফল্যের স্বর্ণদ্বীপে তখনই মনের কোণে উঁকি মারলো এক অভূতপূর্ব অনুভূতি-----'সৃষ্টি সুখের উল্লাস'---
             দুঃসময়ের গোধূলি লগ্ন পেরিয়ে-----
              সুদীর্ঘ পথ হেটে হেটে, হলো রাতের অবসান
               তখনই উষর জমিনে উঠলো জেগে
                সুপ্ত চেতনার দল----ছড়াতে ফুলের সৌরভ।
সাহিত্য জগতে বিচরণ করার সময় ও সুযোগ আমার কখনো ঘটেনি। কিন্তু যখন ক্লান্তিকর জীবনের অবসান ঘটলো, জগৎকে মনে হলো--- 'সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্' তখনই দেহের তিনতলা ঘরে লাগলো ছন্দের দোলা। একটুকরো অনুভূতি আমাকে নিয়ে গেলো সাহিত্যের সুদীপ্ত গলিতে - যেখানে নেই কোন হিংসা, বিদ্বেষ, দুর্নীতি, রক্তপাত। আছে শুধু অনাবিল শান্তি। সৎ-সত্য-সুন্দরের উপাসনা। তাইতো আনুমানিক চল্লিশ বছর বয়সে ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হলো "ধূমায়িত এককাপ চা" কবিতা লিখেই সাহিত্যের হাটে বেসাতি। তারপর সহকর্মী প্রভাষক পলাশ দাশের উৎসাহ অনুপ্রাণিত করে। আর একজন শিক্ষক সেই সূচনালগ্ন থেকে আজ অব্দি সুপরামর্শ দিয়ে চলেছেন, তিনি আমার অন্তরঙ্গ সহকর্মী ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক এস এম নূরুল্লাহ। অভিভাবকের মতোই পরামর্শ দিয়েছেন রাজশাহী থেকে অধ্যাপক সরদার সাইফুল ইসলাম। এ পর্যন্ত এ অভাগার ঝুলিতে সংরক্ষিত হয়েছে---১। সুনীল আকাশে শকুনের বিচরণ (কাব্য)- সিঁড়ি প্রকাশন, ঢাকা-২০১৩, ২। নিসর্গের বেদনা (কাব্য)- সাম্প্রতিক প্রকাশনী, ঢাকা-২০১৩, ৩। ফেরিওয়ালা (৪ টি নাটক)- সাম্প্রতিক প্রকাশনী, ঢাকা- ২০১৪, ৪। নামামৃত, শতাধিক মনীষীর নামের আদ্যাক্ষরে রচিত কবিতাবলি (কাব্য)- সাম্প্রতিক প্রকাশনী, ঢাকা- ২০১৫, মম প্রকাশ, ঢাকা- ২০১৭, পুথিনিলয়, ঢাকা- ২০২০, এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন, জনাব, শাহিদা খাতুন, পরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ৫। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবন-কর্মের উপর রচিত গবেষণা গ্রন্থ 'আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়'- পুথিনিলয়, ঢাকা- ২০১৬। এ গ্রন্থটি বাংলা একাডেমির বিচারে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় ২০১৭ সালে (প্রথম অংশ)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ