কী লিখি কেন লিখি কামাল চৌধুরী

কী লিখি কেন লিখি 
কামাল চৌধুরী 

কামাল চৌধুরী
জন্ম : ২৮শে জানুয়ারি ১৯৫৭

কবিতা নিয়ে যা কিছু ভাবি তা কবিতাতেই প্রকাশ করার চেষ্টা করি। এ নিয়ে আমার আলাদা কোন ব্যাখ্যা নেই। আমার আগে পৃথিবীতে যত কবির আবির্ভাব ঘটেছে, তারা প্রায় সবাই কমবেশি কবিতা-প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন। জীবনস্মৃতি বাদ দিলে তাদের সবার কথা আমার নিজেরই কথা।
নতুন করে কী বলবো?
শুধু বুঝি, একটা জীবন সাতপাঁচ না ভেবেই কাটিয়ে দিচ্ছি কবিতার জন্য। মাটি খুঁড়ছি। অন্ধকারে খুঁজে ফিরছি আলো। রেসের ঘোড়ার মতো ছুটছি অনেক কিছু পিছে ফেলে; অনেক কাজ, বৈষয়িক জীবনের অনেক দাবি অবহেলাও অগ্রাহ্য করে। আমার দিন রাত্রি সৃষ্টি ও অপচয়ের বহতাসময়। কোন দিকে পাল্লাভারী? এ প্রশ্ন কখনো করিনি। কেবল ছুটেচলা..। এই ছুটে যাওয়াই কবির কাজ। যদিও জানি, একজীবন কবিতার জন্য যথেষ্ট নয়। একজীবনে কবিতাকে ধরা কঠিন।

২.
কবিতা ভেতরের ব্যাপার বাইরের জগতের কোলাহল, আলো অন্ধকার ও স্তব্ধতাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙেচুরে বাস্তব ও স্বপ্নের পরে জন্ম হয় কবিতার। কবিতার প্রকাশটা বাইরের ব্যাপার। ব্যক্তি তখন সমর্পিত ও বিস্তারিত সমষ্টির কাছে। ব্যাখ্যা ও যুক্তির প্রসঙ্গ তখনই আসে। প্রকাশিত হতে হতে কবিকে দাঁড়াতে হয় পাঠকের মুখোমুখি জবাবদিহিতার এক জগতে। কবিকে ব্যাখ্যা করতে হয় নিজেকে। সন্দেহ নেই, কবি নিজের শ্রেষ্ঠ পাঠক, শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা। কবির জবানিতে এই ব্যাখা আমরা হতে দেখি বহু বিচিত্রভাবে। কবিতা কারো কাছে সমাজ বদলের হাতিয়ার; কেউ কেউ লেখেন সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য, আনন্দের জন্য, কেউ বেঁচে থাকার জন্য। কেউ স্রেফ নিজেকে প্রকাশের জন্য। কারো কাছে কবিতা সত্যানুসন্ধানের বাহন, কারো কাছে কবিতা লেখাই একমাত্র কাজ। এভাবে নানা জনের নানা মতে কবিতা আজ বিশ্বকর্মার রূপ নিয়েছে। কবিতা সর্বব্যাপী ; যা কিছু বোধের, যা কিছু বোধের অতীত সবই কবিতার বিষয়। দেশকাল, সমাজ, ইন্দ্রিয় ও অতীন্দ্রিয় জগত কিছুই দূরে নয় কবিতা থেকে। কবিতা বহুমাত্রিক, তাই বিচিত্ররূপে উদ্ভাসিত। কাব্যচিন্তনের ক্ষেত্রে এসব নানামুখী ব্যাখ্যার গুরুত্ব আছে কবির নিজস্ব চিন্তা ভাবনা অনুধাবনের জন্য। তবে এসব ব্যাখ্যা কিছুটা উপলব্ধিজাত, কিছুটা বানানো এতে অন্যের কথার প্রতিধ্বনি যেমন থাকে তেমনি সমকালের নিরিখে কাঠামোগত সমন্বয়ের প্রবণতাও থাকে।
এ জগতে বহু জিজ্ঞাসার মতো কবিতা জিজ্ঞাসারও কোনো শেষ নেই। কবিতা কোথা থেকে আসে? কোথা থেকে কবিতার শুরু? কবিতা কি কোনো দৈববাণী? অতীন্দ্রিয় অলৌকিক কোনো সত্তার জাগতিক বহিঃপ্রকাশ নাকি স্বাভাবিক মনন-চর্চার ফসল? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট-নির্দিষ্ট কোন উত্তর জানা নেই। এখন চারণের, স্বভাবকবিতার যুগ শেষ ; আধুনিক কালের কবিমাত্রই স্বাভাবিক কবি। প্রযুক্তি ও প্রকাশনা শিল্পের চরম উৎকর্ষের এই যুগে পূর্বসাধকের প্রায় সকল কবিতাই উত্তরসাধকের করায়ত্ত। পুনর্গঠনের আওতায়। মানবজীবন কিছু মৌলিক বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত; প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, দেশকাল, ক্ষুধা, যৌনতা, যুদ্ধ, জন্ম-মৃত্যু এসবের বাইরে মৌলিক বিষয় খুব বেশি নেই। কবিতাও আবর্তিত এসব অনুষঙ্গের বিচিত্র ব্যবহারে। কবিকে তাই দাঁড়াতে হয় বহুব্যবহৃত, বহুচর্চিত অথচ বিস্তৃত অসীম বলয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির উন্মাদনায়। শুধু আবেগ ও স্বতঃস্ফূর্ততায় কবিতা হয় না। কবিতার স্বাভাবিক ব্যাকরণ, কাব্যবিবর্তনের ইতিহাস, প্রকরণ, ছন্দ ও অলংকার সম্পর্কেও সম্যক অবহিত থাকতে হয়। এসবই স্বাভাবিক কবি হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত।
প্রশ্ন থেকে যায়- অনুশীলনই কি সব? শুধু নিরন্তর কাব্যচর্চাই কি জন্ম দিতে পারে উৎকৃষ্ট ও সমুন্নত কবিতা? তবে, পরিশ্রমী ও বহুপ্রজগণই হতেন সবচেয়ে সফলকবি। সন্দেহ নেই অনুশীলন সুনির্মাণের অবলম্বন ও অত্যাবশ্যক শর্ত কিন্তু কবিতা নির্মাণের বিষয় নয়, বিজ্ঞানের কোনো মৌলিক সূত্র আবিষ্কারের বিষয়ও নয়। কবিতা কোনো নিয়ন্ত্রণ মানে না, কবিতা খেয়ালি, কবিতা লেখা কোনো নিয়মমাফিক কাজও নয়। কবিতা লেখা শিখিয়ে দেয়া যায় না। শেখানো যায় পদ্য নির্মাণের প্রকৌশল। ছন্দমাত্রার হিসেব যদিও গাণিতিক তবু কবিতা মুক্তবিহঙ্গ। এখানেই কবিতা তত্ত্বদর্শনবিজ্ঞান ও ইতিহাসের বাইরে ব্যক্তিঅস্তিত্বের ভিন্ন রূপপ্রকাশ।
কবিতা হয়ে ওঠার বিষয়, আলো আলো-আঁধারির মাঝখানে যে অজানা দূরত্ব তাকে স্পর্শ করার বিষয়। কবি কীভাবে স্পর্শ করবেন এই অজানাকে? এর উত্তর কেবল কবিতাতেই। কবিতা রহস্যময়ী, সহজে ধরা দেয় না, বছরে তিনশ পয়ষট্টি দিনে তিনশ পয়ষট্টিটি কবিতা লেখা যায় না। এক লাইন দুইলাইন এভাবে অনেক অসমাপ্ত চরণ লিখে কবি জীবনের বহু বসন্ত হারিয়ে যায় শীতের ঝরাপাতার দৃশ্যে। বুদ্ধদেব বসু তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝেছেন অনেক সময় কবির কিছুই করার থাকে না, অপেক্ষাই কবির কাজ হয়ে ওঠে। আমরাও অভিজ্ঞতা থেকে জানি, মগ্নতা ও অপেক্ষার শেষে কখনো কখনো প্রবল হাওয়া লাগে কবিতার আকস্মিক জোয়ারে ভেসে যায় কবি। কেউ যেন তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় আরাধ্য কবিতা। কোথা থেকে আসে এই জোয়ার, অপেক্ষার বহুদিন বহুরাত্রিপর? 
তবে কবিতা কি দৈববাণী। কবির কাজ কি শুধু অনুলিখন? 

৩.
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, কবিতা কী করে লিখতে হয় এখনো জানি না। হয়তো জানা হবে মৃত্যুর আগে; ইয়েটস যেমন জেনেছিলেন। মৃত্যুর আগে তাঁর এই উপলব্ধি হয়েছিল কবিতা কী করে লিখতে হয় তিনি জেনে গেছেন। আমার হবে কিনা জানি না। তবু কবিতাকে খুঁজি জীবনের ভেতর, অসীম প্রকৃতি, পথঘাট, ধুলোর ভেতর। কবে কীভাবে শুরু হলো এই অন্বেষণ। সবই অস্পষ্ট। কবি হওয়ার জন্য আমি জন্মাইনি। আমার জন্মও কোন কবিবংশে নয়। মায়ের মুখে শুনেছি নানা নানীকে চিঠি লিখতেন পদ্যে, বাবা আমাকে ছোট বেলায় মুহম্মদ বরকতুল্লাহ’র ‘পারস্যপ্রতিভা’ থেকে ফেরদৌসি, খৈয়াম, রুমীর কবিতা শুনিয়েছেন, মনে পড়ে। এই সামান্য সূত্র কি কবি হওয়ার জন্য যথেষ্ট? আমার বাবা জেঠা ছিলেন ইতিহাসের প্রবল অনুরাগী। বাবার মুখে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আনুপূর্বিক বর্ণনা শুনে ইতিহাসের প্রতি আমারও প্রবল আগ্রহ জন্মে। যার রেশ আজো আছে। কিন্তু আমি কখনো ইতিহাসবিদ হতে চাইনি। মধ্যবিত্ত এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মলাভের সুবাদে পাঠাভ্যাস গড়ে উঠেছে ছোটবেলা থেকে। তবে তাতে কবিতার স্থান ছিল সামান্যই। ঘরে যদিও তাঁদের কবিতার বই ছিল, তবু গড়পড়তা বাঙালি পাঠকের ক্ষেত্রে যেমন ঘটে তেমনি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সঙ্গে আমার পরিচয় পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে। এছাড়া স্কুলে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছি জসীমউদ্দীন, সুকান্তের দু’একটি বই। জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় এঁদের নাম তখনো শুনিনি। ছোটবেলায় ঠাকুরমার ঝুলি, দস্যুদস্যু বই আর রহস্য কাহিনি আমাকে টানতো বেশি। নীহাররঞ্জন গুপ্ত ছিলেন আমার খুবই প্রিয়। ট্রেজার আইল্যান্ড, ওজের জাদুকর এসবই আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে পড়েছি। আমাদের গ্রামে ‘বিজয় করা সবুজসংঘ’ নামে একটা ক্লাব ছিল। ক্লাবের লাইব্রেরি থেকে এবং বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধার করে ফাঁকে ফাঁকে পড়ে ফেললাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, বিমল মিত্র, বনফুলসহ আরো অনেকের গল্প, উপন্যাস। যতদূর মনে পড়ে সেসময় আমি জনস্ট্যাইনবেক-এর ‘মুনইজডাউন' গ্রন্থের বঙ্গানুবাদও পড়ে ফেলি। এসব গদ্যপাঠের প্রভাবে ভেতরে ভেতরে লেখক হওয়ার বাসনা জন্মনেয়া অসম্ভব নয়। আমার হাতেখড়ি গদ্যলেখায়। মনে পড়ে কয়েকপৃষ্ঠার একটি দস্যুকাহিনী রচনা করেছিলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে।
তারপরও কবিতা আমাকে টেনে এনেছে এতদূর। আজ যখন ভাবি কোনো কূলকিনারা পাই না। কোথায় কুড়িয়ে পেলাম আমি প্রথম কবিতাকে? আর কী ছিল শুভলগ্নের প্রথমচরণ। একসময় ছিল যখন আমার মুখস্থ ছিল গ্রামের পথঘাট, বনবাদাড়, পানাপকুর। অন্ধকারে ঝিঁঝিঁর ডাক, জোনাকির ওড়াউড়ি ছিল অতিচেনা। শীতের রাতে দলবেঁধে খেজুরের রস নামিয়ে পায়েস রেধেছি। শীতের সকালে, চুলোর চারপাশে আমরা সব ভাই গোল হয়ে বসেছি মায়ের হাতের পিঠা খাওয়ার জন্য। পূর্ণিমারাতে কবিগান শুনতে, যাত্রা দেখতে ছুটে গেছি মঠতলার মেলায়। কত আলোভরা রাত কেটে গেছে হা-ডু-ডু হা-ডু-ডু শব্দে।
 গ্রামজীবনের এইসব অসাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্যে সঙ্গোপনে কবিতার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল কিনা জানা নেই। বাবার চাকরি সূত্রে আদমজী পাটকলে বাস করেছি প্রায় চোদ্দবছর। জ্ঞাতসারে কবিতালেখার শুরু তখন থেকেই। প্রথম কবিতা লিখি ইস্কুল ম্যাগাজিনে, তারপর চড়ে বসলাম কবিতার সাম্পানে। মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, শ্রমজীবীমানুষ এসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হয়ে উঠলাম কবিতা-পথিক। ইস্কুলের গ-ি পার হলাম- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জুটে গেল অনেক কবি লেখকবন্ধু। কবিতার প্রবল জোয়ারে, আড্ডায় ভেসে গেল পাঠ্যপুস্তক পরীক্ষাচিন্তা, বাবার উদ্বেগ। সে কাহিনী দীর্ঘ, অন্যদিন বলা যাবে।

৪. 
আগেই বলেছি কবিতাকে খুঁজি জীবনের ভেতর। এই উপলব্ধি নতুন কিছু নয়- এ কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বহুজনে বলেছেন। কবিতা ও জীবন একই জিনিসেরই দুইরকম উৎসারণÑ জীবনানন্দের এই অবিস্মরণীয় উক্তির কথা আমরা জানি। কাব্যধারাই কবির শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনীÑ বুদ্ধদেব বসুর এ উপলব্ধিও আমাদের অজানা নয়। অনেকে বলেন কবিতায় কোনো ম্যাসেজ থাকবে না, অভিপ্রায় থাকবে না। মালার্মে যেমন বলেছেন কবিতা রচিত হয় শব্দে আইডিয়ায় নয়। সন্দেহ নেই, শব্দ নিয়েই কবির কারবার, শব্দের সঙ্গেই কবির বসবাস। কবি শব্দের পর শব্দ সাজান, কখনো সরল কখনোবা দুর্বোধ্য। রহস্যময়তা থাকবে, আড়াল আবডাল থাকবে কিন্তু অর্থহীন নয় তার শব্দযাত্রা। যা অবোধ্যতা কখনোই কবিতা নয়।
কবি হিংটিংছট রচনা করেন না। তবে কবি কথা বলেন আলাদা ভাষায়। সে ভাষা যাদের আয়ত্ত তারাই রস আস্বাদন করতে পারেন- অন্য কেউ নয়। জগতে সকলে কবিতার পাঠক নয়। আজকের দিনে পাঠককেও হতে হয় মননশীল ও অগ্রসর। প্রকৃত পাঠক যারা তারাও ভেতরে ভেতরে কবি, শুধু প্রকাশের যন্ত্রণা, আর্তি ও ব্যর্থতা বহনে তারা পরান্মুখ।
কবি শব্দচয়ন করেন জীবনের মূর্ত ও বিমূর্ত অভিজ্ঞতা থেকে। শব্দ নিজে কখনো স্বয়ম্ভু নয়, তাকে আলোকিত করে না না অনুষঙ্গ, দৃশ্যমান ও দৃশ্যাতীত বাস্তবতাও স্বপ্ন। কবি ভিনগ্রহের আগন্তুক নন। ভেতরে ভেতরে হয়তো একা, চন্দ্রাহত ও স্বপ্নচারী। কিন্তু বিবিক্ত, বিচ্ছিন্ন নন সমাজ থেকে, বহির্জগত থেকে। অন্যদের মতো তাকেও বহু কাজ করতে হয়। সংসার, অফিস, বাজার-হাট সবকিছু।
শব্দ দিয়ে যে কাঠামো তৈরি হয় তাতে শুধু স্কেলিটনটা দাঁড়ায়। রক্তমাংস মজ্জা ও স্পন্দন দিয়ে কবিতাকে জীবনদান করেন কবি। কবিতার রক্তপ্রবাহ, আনন্দ, উল্লাস, অশ্রু ও বিষাদ সবই নিতে হয় জীবন থেকে, অতীত ও বর্তমানের অভিজ্ঞতা থেকে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন থেকে। কবিতা এসবেরই সমাহার, মিলিত বৈভব। আমরা চারপাশে যা দেখি তাই আমাদের অভিজ্ঞতা, আমরা যে পথে হাঁটি তা-ই আমাদের জীবনের পথ। আমরা যা স্পর্শ করতে চাই, পারি না। সে-ই আমাদের স্বপ্ন।
কবিতা তা-ই সর্বজনীন সময়হীন এক ধারণা।
একবার এক পঙ্গু আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসে বলে ছিল সে একজন মুক্তিযোদ্ধা। একবার প্রবল বন্যায় এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে গলা পানিতে হেঁটে আসতে দেখেছিলাম সামান্য সম্বল মাথায় তুলে। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত টাঙ্গাইলের এক গ্রামে একদিন চুয়ান্নটি লাশ আমাকে দাফন করতে হয়েছিল। বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে এক শীতের রাতে, পূর্ণিমায় হেঁটে পার হয়েছি বিশুষ্ক ধলেশ্বরী। ডাব কাটতে গিয়ে কামলার দা ভেঙে যেতে দেখে একদিন দুঃখ পেয়েছিলাম। নীল নদের সেতুর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একদিন পৃথিবীকে আমার মনে হয়েছিল খুব সুন্দর। বাবাকে নিজহাতে দাফন করে এসেছি স্বগ্রামে; বাঁশঝাড় ও ভাটপুকুরের পাশে বাবা এখন অনন্ত ঘুমে। সামান্য দূরেই আমার যমজ ভাইয়ের কবর। আজ ঠিক শনাক্তও করা যায় না। আমার জন্মদিন তার মৃত্যুদিন! বেঁচে থাকলে সে- হয়তো কবিতা লিখতো। এখন তার হয়ে আমি লিখছি। মায়ের পাশে দাঁড়ালে আমি এখনও চিরকালের শিশু। স্ত্রী পুত্র কন্যা স্বজনের হাসি আমার কাছে স্বর্গ সুখের সমান। এক জীবনে কত ঘটনা, কত অনুভব কত আনন্দ, অস্থিরতা, শোক অশ্রু ও বিষাদ। জীবনের তুচ্ছ, ক্ষুদ্র, বৃহৎ ও মহৎ। শব্দ কী করে একা ধরে রাখবে সব কিছু যদি না কবির হৃদয় এসে যুক্ত হয় তাতে?
প্রেরণাকে আমি মূল্য দিই। প্রেরণা তখনি উৎকৃষ্ট কবিতার বাহন যখন সে উদ্দীপকের কাজ করে। লঙিনুসের মতে রচনার জন্য প্রয়োজন ভাব সমুন্নতি। কল্পনার অপ্রতিম ঐশ্বর্য না থাকলে সাহিত্যের উৎকর্ষ ঘটে না। কবিকে তাই কল্পনার ঐশ্বর্যেও সৃজন শক্তিতে বলীয়ান হওয়া চাই। সমকালে কবিতা বিচার দুরূহ, সমকাল ব্যক্তি-সম্পর্ক দেখে। কবিতার প্রকৃত মূল্যায়ন তাতে হয় সামান্যই। অন্যদিকে উত্তর প্রজন্মের কাছে কবিতাকে বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ভাবসম্পদ ও সৃজন-মহিমার দীপ্তি না থাকলে কবিতা কালের বিচারে টেকে না। তৎক্ষণিকতার মূল্য আছে তবে তা সাময়িক-মহৎ ও চিরায়ত রচনার জন্য প্রয়োজন অগ্নিশিখার প্রাচুর্য যা দূর বিস্তারি, উৎস থেকে উৎসান্তরগামী। পাতা ঝরে যাওয়ার দৃশ্য প্রাকৃতিক নিয়মেই সুন্দর। এই দৃশ্য তখনই প্রেরণা, তখনই উদ্দীপক যখন কবির কল্পনাশক্তি এতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। দৃশ্য রচনা কবির কাজ নয় সেজন্য তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখতে হবে অন্তর্গত অনুভবে। একদিন অস্পষ্ট কুয়াশায় তারা নড়ে উঠবে, উদাসীন দুপুর কিংবা চন্দ্রালোকিত বাতায়নে কবির খাতায় এসে বসবে অন্য রূপে, পরিশ্রুত অবয়বে।
চারপাশে ঘটে যাওয়া সবকিছুই আমার কবিতাকে স্পর্শ করে। সব অভিজ্ঞতাকে ভেঙেচুরে শব্দকে নিয়ে আমি পায়ে হাঁটি, রিকশায় চাপি। বাসে, গাড়িতে চড়ি। ভেতরে ভেতরে ছুটতে থাকি কবিতার ধুলোহাওয়া মাটির ভেতর। তবু আমি যা লিখতে চাই তার সবটুকু লেখা হয়ে ওঠে না। কত অতৃপ্ত চরণ হারিয়ে গেছে ছেঁড়া ও টুকরো কাগজে। কত অসমাপ্ত লাইন লেখা আছে কবিতার খাতায়। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো এসব লাইন। হয়তো বহু দিন, বহু বছর পর বিস্ফোরণ ঘটবে, কবিতাগুলো সম্পূর্ণ হবে।

৫.
এতক্ষণ যা বললাম তা আমার কবিতাকালের ভগ্নাংশ মাত্র। জীবনের সামান্য অংশই এতে প্রতিফলিত। সব অনুভব কবিতায় ধরা যায় না, গদ্যেও নয়। কিছু কথা অনুল্লেখ্য থেকে যায়। এক জীবনে কত দেখা হলো, জানা হলো- কত আনন্দ বিষাদ, সুন্দর ও অসুন্দরের কত দ্বৈরথ। কত পথ হেঁটে গেছি ধূলি ধূসরিত, কত চেনা মিশে গেছে অচেনায়। চলার পথে কতজনের আশীর্বাদ ও ভালোবাসা- সতীর্থ ও বন্ধুর সহমর্মিতা এবং উৎসাহ আমার অন্ধকার ও স্তব্ধতায় জ্বালিয়ে দিয়েছে দূর নক্ষত্রের আগুন। সবকিছুই কবিতার অবিনশ্বর পাথেয়।
শুধু কবিতার সঙ্গে কথা বলি একা একা, চুপি চুপি। কবিতা কি আমার কথা শোনে?

=====

মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ২৪তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৯) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ