কী লিখি কেন লিখি
জাফরুল আহসান
জাফরুল আহসান
জন্ম : ৩১শে মার্চ ১৯৫৩
কবিতা কী?
কবিতা কেন লিখি? কবিতা না লিখলে কী হয়?
এসব প্রশ্নের মাঝে কবিতা লেখার মর্মবাণী নিহিত বলে আমার বিশ্বাস। ভালোলাগা-ভালোবাসা, সময়ের উত্থান আর রাজনৈতিক পালাবদলের মাঝেই কবিকে এগুতে হয়। কবি সে তো সমাজেরই একজন। প্রাত্যহিক জীবনের টানাপোড়েন, নানাবিধ সঙ্গতি-অসঙ্গতি কবিকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িত করে, কবির মনোজগতে রক্তক্ষরণ হয়, ভেতরে ভেতরে ক্ষত-বিক্ষত হয়; রক্তাক্ত হয় কবিচিত্ত; তারই প্রতিবিম্ব প্রস্ফুটিত হয় কবিতায়।
কবির অন্তরে লালিত মর্মবাণী বিশাল শব্দভা-ার থেকে উৎকৃষ্ট শব্দচয়নের মাধ্যমে উপমা-উৎপ্রেক্ষা আর চিত্রকল্পের ছন্দবদ্ধ শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গিই হয়ে ওঠে কবিতা; যার সর্বত্রই জাদুকরি স্পর্শ। অর্থাৎ কবির জাদুকরী স্পর্শে নির্মিত কবিতা উৎকৃষ্ট শিল্পমাধ্যমের নাম।
অবশ্য শিল্প-সাহিত্যের যে কোন মাধ্যমের কথাই বলি না কেন শেষকথা বলে কিছু নেই। কবিতা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে নিরন্তর। আধুনিক পরাবাস্তবতার আড়ালে কবিতা কারো কাছে দুর্বোধ্য মনে হলেও আগামীই বলে দেবেÑ এগুলো কতটা কবিতা।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সঙ্গতকারণেই সমাজের প্রতি আমরা কেউ দায়বদ্ধতা এড়াতে পারি না। করিও না। স্বভাবতই কবির কলমে কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে হরতাল জায়গা করে নেয়, কবিতার শরীর জুড়ে প্রেম-বিরহ, প্রকৃতির বৈচিত্র, জীবনাচরণ লক্ষ্য করার মতো, পাশাপাশি রাজনৈতিক পালাবদলের বর্ণিল চিত্র, মিটিং, মিছিল, আর মুক্তিযুদ্ধ কবিতার ক্যানভাস জুড়ে থাকে। প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের চিত্র রং ছড়ায় কবিতায়।
সোনালি শৈশব, দুরন্ত দুপুর, শান্ত পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে বৃত্ত বানাবার চিত্রকল্পও কবিতায় হেঁটে বেড়ায়। সবকিছুর মাঝে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির চিত্রের হাত ধরে প্রেম-বিরহের আলোছায়া কবিতার শরীরে রেখাপাত করে। কবিতা যথার্থই শিল্প।
কবিতা কী? কেন কবিতা লিখি এ প্রসঙ্গে যা-কিছু উল্লেখ করা হয়েছে পুরোটাই কবিতা বিষয়ে আমার ভাবনা। আমার কবিতায় এসবকিছুরই সরব উপস্থিতি রয়েছে বলে মনে করি।
কবিতা লিখে বিশ্বযুদ্ধ জয় করা যাবে এমনটি কখনো ভাবি না আমি। তবে মনে হয়Ñ একটি কবিতার একটি চরণও যদি পাঠকচিত্তে দোলা দিয়ে যায় সেখানেই কবিতার সার্থকতা, কবির অমরতা। আমি কবিতা লিখি আমার ভালোলাগা মন্দলাগা বোধগুলোকে প্রকাশ করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি আমার চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ আমার কবিতায় সাবলীলভাবে উঠে আসে।
আমি আমার কবিতা প্রসঙ্গে বলতে চাইÑ ধরা যাক একখ- স্বর্ণপি-, যা কেবলি স্বর্ণ বৈ অন্য কিছু নয়। কিন্তু যখনই অলঙ্কারের প্রশ্ন উঠবে তখন স্বর্ণখ- পুড়িয়ে, এতে খাদ মিশিয়ে, স্বর্ণকারের মেধা ও পরিশ্রমে উদ্ভাবিত নকশা সন্নিবেশিত করে তৈরি করা অলঙ্কার, যা কেবলি শোভাবর্ধন করে রমণীয় করে তোলে। তেমনি বিশাল শব্দরাজি কেবলি অভিধান, অভিধান বৈ অন্য কিছু নয়। কিন্তু যখনই কবিতার প্রশ্ন উঠবেÑ তখন কবিতার বিষয়বস্তু, কবিতার পেছনে কবির শ্রম মেধা ও মননের চর্চা, চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা মিলেমিশে শব্দাবলির সুনিপুণ ব্যবহারে ছন্দ কাঠামোর মাঝেই নির্মিত হয় কবিতা। মনে করি আপন গরবে গরবিনী কবিতা আমার।
সুপ্রিয় পাঠক, আমি কেন লিখি? আমার দৃষ্টিতে কবিতা কী? সে প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেছি মাত্র। দ্বিমত থাকাটাই স্বাভাবিক।
============
অরণি’র ১৯তম সংখ্যায় (জানুয়ারি-জুন ২০১৪) প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ