কী লিখি কেন লিখি আমিনুল ইসলাম

কী লিখি কেন লিখি 
আমিনুল ইসলাম
কী লিখি কেন লিখি 
আমিনুল ইসলাম

কবি। অতিরিক্ত সচিব ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ সমবায় অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার



কেন কবিতা লিখি? কবে থেকে লিখি? কি নিয়ে লিখি? কে আমাকে কবিতা লেখা? এসব প্রশ্নের এককথায় সোজাসাপ্টা উত্তর নেই আমার কাছে। সেজন্য কবিতা লেখার পেছনে যে অনুষঙ্গ আলোছায়ার মতো উঁকিঝুকি মারে, সেসব কথাই আজ বলতে চাই। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লেখা এবং  প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া একটি বিখ্যাত গানের প্রথম দুলাইন এমন, “আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান / সেদিন থেকে গানই জীবন, গানই আমার প্রাণ।’’ আমার কবিতাপ্রেমের সূত্রপাত শিশুকালে-বাল্যকালে আব্বার মুখে রুমী, শেখ সাদী, হাফিজ, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের কবিতা এবং আরব্য উপন্যাস , পুঁথি এসবের পাঠ শুনে। আব্বা নিজেও যে কোনো বিষয় নিয়ে মুখে মুখে ছড়াপ্রকৃতির কবিতা রচনা করতে পারতেন এবং করতেন। তিনি ছিলেন খুবই রসিক প্রকৃতির মানুষ। আমাদের এলাকায় আলকাপ, কবিগান, যাত্রা এসব লেগেই থাকতো। আব্বা ছিলেন কবিগানের ভক্ত। কবিয়াল গুমানীর কবিগান তিনি বহুবার শুনেছেন এবং তার গভীর ভক্ত ছিলেন। একইভাবে তিনি ছিলেন খনার বচনের গভীর অনুরাগী। আব্বার মুখস্থ করার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণভাবে প্রবল। তিনি শত শত কবিতা অথবা কবিতাংশ, খনার বচন, রূপকথা, কাহিনি মুখস্থ রেখেছিলেন এবং কাজের অবসরে সেসব শোনাতেন গ্রামের মানুষজনকে। আব্বা সাধারণত ভরদুপরে শুয়ে শুয়ে পুঁথি পাঠ করতেন। আমি তার পাশে বসে কিংবা শুয়ে সেসব শুনতাম মুগ্ধ হয়ে। একসময় আমি নিজেও চুরি করে পুঁথিপাঠ শুরু করি। কিন্তু আব্বার নিষেধ ছিল। পুঁথির নেশা হলে স্কুলের পড়ায় মন বসবে না, এই ছিল তাঁর যুক্তি। বন্যা, খরা, বর্ষা, বোম্বে প্রিন্টের শাড়ি, টেডি জামা, বেলবোটম প্যান্ট, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির অনিয়ম, স্মাগলিং করে ধনী হওয়া প্রভৃতি নিয়ে আব্বা অজস্র ছড়া/পদ্য বাঁধতেন। গ্রামের সেসব শুনে খুবই উপভোগ করতেন। তখন থেকেই আমার কবিতাপ্রেম দানা বাঁধতে থাকে। যত দিন গেছে, আমি কবিতার ভক্ত হয়ে উঠেছি। নবম শ্রণিতে পড়ার সময় আমি প্রথম কবিতা লিখি। সেগুলো বহুদিন আমার খাতায় ছিল। প্রেমের কবিতা এবং প্রকৃতির কবিতা বিশেষত বর্ষার। ভার্সিটি জীবনে অনেক গান এবং প্রেমের কবিতা লিখেছিলাম। সেসব এখনও ডায়েরিতে আছে। কিন্তু কোনোদিনও সেসব সংবাদপত্রে পাঠাইনি। লিটল ম্যাগাজিনের কথা জানতাম না। আব্বার কাছে কবিতা শোনাই শুধু নয়, আমার মনে হয়েছে, আমার রক্তে আব্বার কাব্যপ্রতিভার এসে গেছে জন্মসূত্রে। তো আমর কবিতাপ্রীতি ও কবিতাচর্চ্চার জন্য সবকিছুর আগে আব্বার অবদানই স্বীকার করতে হয়। আমি আব্বাকে নিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছি এবং সেসব কবিতায় তাঁর কবিমনের প্রসঙ্গ এসে গেছে। 
‘আমার মার্বেলশৈশবকে তুমি দিনেদিনে ভরে তুলেছিলে 
কবিতার অলৌকিক সৌরভে, 
রূপকথার লাল-নীল রোমাঞ্চে।
মসনবীর স্বর্গীয় সুবাস, দেওয়ানের রহস্যমাতাল ঘ্রাণ
মহারাজপুরের তিলখাজার মতো গুলিস্তা-বোস্তার মচমচে মজা
হাতেম তাঈ ও আরব্য উপন্যাসের লোমহর্ষক সাসপেন্স
তোমার খাটটাকে করে তুলেছিল
এক মুগ্ধবালকের স্বপ্নের আকাশে ঝুলন্ত আনন্দের বাগান।
---- ----------------  ----------------
আচ্ছা বাবা, তুমি কি কখনো মাকে শোনাতে এসব-
কাহিনী-কবিতা-রূপকথা?
অন্ততঃ যখন সে সরল বালিকা বধু হয়ে এসেছিল
বোবা শ্রোতার দুটিকান আর ভয়ে ভরা একটি কচিমন নিয়ে
তোমাদের ইয়া বড় একটি যৌথ সংসারে!
কিংবা চেরাগ নিভে গেলে যখন সে তার ছোট দেহখানি নিয়ে
গুটিসুটি বেঁধে শুয়ে পড়তো
কবিতায় গুঞ্জরিত তোমার প্রাপ্তবয়স্ক বুকের পাশ ঘেঁষে!’
(বাবার খাটে শুয়ে/আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট)

বাংলাদেশ হচ্ছে নদীমাতৃক দেশ; আর নদী ছিল আমার শিশুকালে-বাল্যকালে মাতৃসমা এবং যৌবনে প্রিয়তমার প্রতিদ্বন্দ্বী। নদীর জন্য আমার আবেগ ও ভালোবাসা গভীর, নিবিড় ও বিস্তারিত। নদী এবং বৃক্ষ এদুটোর কোনটিকে আমি বেশি ভালোবাসি, সেটা নিয়ে আমি সিদ্ধান্তহীন। যতদুর মনে পড়ে শিশুকাল হতেই আমি বৃষ্টি ও নদীর অক্লান্ত ভক্ত। বৃষ্টি হলে আমাকে ঘরে বেঁধে রাখবে এমন সাধ্য কারুরই ছিল না। আমি তখন রবীন্দ্রনাথের বর্ষার কবিতা বা গান কিছুই শুনিনি বা বুঝিনি- কিন্তু বাস্তবিকই বৃষ্টির নূপুর বেজে ওঠার সাথে সাথে আমার হৃদয়মন ময়ূরের মতো নেচে উঠতো। আর বৃষ্টিমুখর নদীতে দলবলে সাঁতার কাটায় যে আনন্দলাভ ঘটতো, পরবতীতে মহার্ঘ্য আর কোনো কিছুতেই তা জোটেনি। যে কোনো অর্থেই আমি জলের সন্তান-  কোনো জনমে জলদাস ছিলাম  কি না জানি না। নদী আমার জন্মদাত্রী থেকে খেলার সাথি হয়ে প্রথম যৌবনে প্রেমিকার স্থান দখল করে। ভরাবর্ষায় আমি তরঙ্গায়িত পাঙ্গাশমারীর বুকে গাঙচিলের মতো ঝাঁপ দিতাম আর স্রোত ও ঢেউয়ের দোলায় ভেসে  যেতাম দায়হীন আনন্দে, অবারিত অগন্তব্যে। বহুবার নাকানিচুবানি খেয়েছি, তবে কখনো সে আমাকে মাঝগাঙে ডুবিয়ে মারেনি। পরবর্তীতে ইটসিমেন্টের পাষাণ উঠোনে বসে পাঙ্গাশমারীকে নিয়ে স্মৃতিকাতর কবিতা লিখেছি। নদী আমার ব্যক্তিগত জীবনে, আমার স্বপ্নের উঠোনে এবং আমার কাব্যভাবনায় প্রায় স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে আছে।  নদী নিয়ে আমি প্রায় স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন দেখি। নদী নিয়ে আমার ১৫/১৬টি কবিতা আছে। আমার নদী বিষয়ক অধিকাংশ কবিতাতে নদী প্রতীক কিংবা রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আমার নদী বিষয়ক কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরাবাস্তব ভাবনা, পরকিয়া প্রেম প্রভৃতি নানা বিষয় স্র্র্রোতের ঢেউ আর গাঙেয় বাতাসের রূপকে প্রতীকে প্রতিতুলনায় কথা বলতে চেয়েছে। বলা যায় , আমাকে কবিতা লেখায় নদীর উপমা, উপমেয়, উৎপ্রেক্ষা, তুলনা, প্রতিতুলনা হওয়ার অনিঃশেষ ঐশ্বর্যের অভিজ্ঞান। 

‘আমার একটি নদী ছিল; হাওয়া আর স্রোতের খেলা তুঙ্গে উঠলে, 
কোনো এক শ্রাবণে সবকিছু সিকস্তি হয়ে যায়। অবশ্য হেমন্তে 
কাশবনে স্রোত ও হাওয়ার সমঝোতা হলেও আমার আর জলবর্তী 
উঠোনে ফিরে যাওয়া হয়নি। তবে দূষিত কোলাহল ভেদ করে 
আল মাহমুদের তিতাসের মতো নদীটি আমাকে কলের গান 
শুনিয়ে দিয়ে যায়; তাই ঘুমের অগভীরতা নিয়ে আমার কোনো 
মাথাব্যথা ছিল না। অথচ ইদানীং দক্ষিণের একটি নদী গোপন 
ঢেউয়ের আঁচল বাড়িয়ে আমার স্বপ্নের উঠোন ভিজিয়ে দিতে চায়। 
আমি ছাদে উঠে বসলেও বাতাসে ভেসে আসা নোনা ঘ্রাণের জোয়ার 
দু’হাত দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারি না। সত্য এই যে ঢেউহীন 
সুখে অভ্যস্ত হয়ে আছি বলে গাঙচিলের আনন্দে আর সাহসী হয়ে 
উঠি না। এ নিয়ে পদ্মাপাড়ে ফেলে আসা দিন গোঁয়ারের মতো তর্ক 
জুড়ে দিতে আসে। অথচ নদীটিকে আমার কিছুই বলা হয়ে ওঠে না।’
(নদী-- এক / শেষ হেমন্তের জোছনা)

পিতার সহজাত কাব্যপ্রেম আমার রক্তে সঞ্চারিত- এটা স্পষ্ট হয়ে যায় আমার ছাত্রজীবনে এবং আমি ছন্দবদ্ধ কবিতা (আসলে পদ্য) লিখতে শুরু করি এবং লেখায় হাত দিলেই- কিছু একটা হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গানের প্রতি আমার নেশা আজন্ম এবং যতই বয়স বেড়েছে, সে নেশা ততই গভীর ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। সবধরনের গানই আমি শুনি।  আমার জীবনে গানের মতো এত সুনিবিড় ও স্থায়ী প্রভাব রাখেনি অন্য কিছুই; এমনকি আমার অচ্ছেদ্য পাঠ্যবিষয় কবিতাও নয়। আমি পাঠক হিসেবে সর্বভুক। অনুরাগী পাঠক হিসেবে আমার কবিতাপাঠের সিলেবাস অনেক বড় এবং বিস্তৃত। আমি সেই প্রাচীনকালের আরবি কবি ইমরুল কায়েস থেকে শুরু করে ক’বছর আগে আবির্ভূত হওয়া বঙ্গীয় তরুণ আনিফ রুবেদ এর কবিতা সমান আগ্রহ নিয়ে পড়ি। কোনো কবির  কোনো একটি কবিতার কোনো চরণ বা  অংশবিশেষ, কিংবা  চিত্রকল্প বা উপমা ভালো লেগে গেলে আমার মনজুড়ে সে মুগ্ধতার রেশ থাকে সুদীর্ঘকাল। যখন একটি উৎকৃষ্ট কবিতা পড়ি, তখন আনন্দরসে উপচিয়ে ওঠে মন। যতবার পড়ি, ততবারই বাড়তি আনন্দ পাই।  রবীন্দ্রনাথ ঠকুরের ‘শেষের কবিতা’, ‘বিদায় অভিশাপ’, নজরুলের ‘সিন্ধু’ ‘দারিদ্র’, জীবনানন্দের ‘অবসরের গান’ , ‘বনলতা সেন’, আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’, ‘তুমি, আমার প্রথম উচ্চারণ’, ‘অন্যায় বৃষ্টি’ আবুজাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আামি কিংবদন্তীর কথা বলছি’, আবুল হাসানের ‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ’, ‘উদিত দুঃখের দেশ’  -প্রভৃতি কবিতার মধ্যে মুগ্ধ করার যাদু অনিঃশেষ। উভয় বাংলার আরও আরও অনেক কবির অনেক কবিতা  আমার ভালো লাগে। শামসুর রাহমানের কবিতায় বিশেষণের স্বতন্ত্র ব্যবহার দেখে আমি খুবই মুগ্ধ হতাম। কাজী নজরুল ইসলাম অনুদিত ওমর খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ এবং শঙ্খ ঘোষ প্রমুখ সম্পাদিত-অনুদিত কাব্যসংকলন ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত’ এর অনেক কবিতাই আমার দারুণ ভাল লাগে। টি এস এলিয়ট এবং বোদলেয়ার এর কবিতা পড়ে ভিন্ন স্বাদ পাই। গালিবের গজল পড়ে এখনও অভিভূত হই। আর নেটে অজস্র বিদেশী কবিতা পড়ে নেয়া তো খুবই সহজ ব্যাপার এখন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আবৃত্তি এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এখনও যতবার শুনি, শোনার আগ্রহ থেকে যায়। আসলে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণটাও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ এর মতো একটি মহাকবিতা। এ দুটোর কোথাও কোনো তুলনা নেই। এসব একারণেই উল্লেখ করলাম যে আমার কাব্যরুচি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বলা যায়, এসব কবিতা এবং এধরনের আরও অসংখ্য দেশি-বিদেশি কবিতা আমাকে কবিতা পাগল করে রেখেছে। অন্যদের কবিতা ভালোবাসতে বাসতে নিজেও কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা ও উস্কানি পেয়েছি এবং পেয়ে চলেছি আপনার মাঝে কখনো চেতনে, কখনো অবচেতনে। 

প্রসঙ্গত আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য,  সরকারি চাকরিসূত্রে বাংলাদেশের বিচিত্র জনপদ দর্শন ও বিচিত্র শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেশার ফলও আমাকে ইতিহাসমনস্ক, সমাজমনস্ক, রাজনীতিসচেতন করে তুলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে একধরনের মোহমুক্তি এনে দিয়েছে। আমার কবিতায় তার প্রতিফলনও ঘটেছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ, দেশবিদেশের ইতিহাস-ভূগোল-নৃতত্ত্ব পাঠ  আমার ভাবনায় ও কবিতায় পড়েছে সেসবের ছাপ। আমি প্রায় সমগ্র বাংলাদেশ দেখেছি। আমি সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, বেহুলার ভিটা, রামসাগর, নীলসাগর, মহীপালের দিঘি, দিবর দিঘি, কুসুম্বা মসজিদ, ভিমের পান্টি, কান্তজীর মন্দির, উয়ারী-বটেশ্বর, ময়নামতি-শালবনবিহার, শাহজালালের মাজার, জীবনানন্দ দাশের জন্মভিটা, পতিসর-শাহজাদপুর-শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিস্থান, সোনারগাঁও, বিভিন্ন জমিদারবাড়ি, রাজবাড়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং খালবিলনদীসমুদ্র দেখেছি। এবং জানার চেষ্টা করেছি এসব স্থানের মানুষের অতীত-বর্তমান। আমার কাব্যভাবনার ওপর এসব দর্শন ও পঠনের প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে এবং তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচকতায়। আমি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত নিয়ে দীর্ঘকবিতা লিখেছি: আমি সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, বেহুলার ভিটা, মহিপালের দিঘি, দিবর দিঘি, কুসুম্বা মসজিদ, উয়ারীবটেশ্বর, ময়নামতি-শালবনবিহার প্রভৃতিকে প্রচ্ছদ করে লিখেছি দীর্ঘতর কবিতা। আমার ‘পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি’ শিরোনামের দীর্ঘতর কবিতাটি তার বুকে ধারণ করে আছে সেই ভূগোল-ইতিহাস-ঐতিহ্যের সোনালি যোগসূত্র। মহানন্দার পাড়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন জনপদ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে অতুলনীয় ঐশ্বর্যের অধিকারী, অথচ আমাদের সাহিত্যে তার ছবি প্রায় অনুপস্থিত। এই বেদনার উপলব্ধি আমাকে ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ কবিতাটি লিখতে বাধ্য করে যার সমাপনী ঘটেছে খেদোক্তির মতো চরণ দিয়ে- “আমাদের একজন অদ্বৈতমল্ল নেই, থাকলে আমরাও পেতাম/ কালের স্রোতে মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম”। অনুরূপভাবে দেশের ভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন চাকরিকালে সেই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতির নিকট অতীত, তার বর্তমান দৈন্য ও দারিদ্র আমাকে ব্যথিত করে তোলে। আমার কলমের ডগায় এক ধরনের অনিবার্য স্বতঃস্ফূর্ততায় উঠে আসে ‘গাইবান্ধায় শীত’, ‘তিস্তার কোল ঘেঁষে মাঘ’, ‘হিজলের সার্কিট হাউসে বসে শোনা’, ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’, ‘ ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘নাফ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে’, ‘একদিন সারাদিন ব্রহ্মপুত্র’, ‘বেহুলার দেশে’, ‘করিম মাতবরের কাহিনি’, ‘বঙ্গোপসাগরের দুইপাড়ে’, ‘হিরোসিমা’, ‘সুন্দরবনের সুরসভায়’, ‘ বেহুলার ভিটা’, ‘সুন্দরবনের গল্প’, ‘জগতশেঠ দিন’  প্রভৃতি প্রতীকধর্মী সমাজমনস্ক কবিতা। আবার নওগাঁ থাকাকালীন তার শস্যের অবারিত মাঠ, ঐতিহ্যবাহী প্রত্ননিদর্শনাদির ঘ্রাণ এবং আত্রাই-নাগর নদীর আদর আমার চোখে মুগ্ধ গভীর দৃষ্টির প্রলেপ এঁকে দিলে আমি মুগ্ধ বর্ণমালায় লিখেছি ‘ ভোরের হাওয়ায় ভাসে বাংলাদেশ’ নামের কবিতা।  অনুরূপভাবে বাংলার আদি সভ্যতা কেন্দ্রভূমি বগুড়া বা পুন্ড্রবর্ধনকে বিষয় করে কিংবা চিত্রকল্প হিসাবে ব্যবহার করে আমার অনেক কবিতা আছে। আজো বগুড়ায় বেহুলার ভিটা বা চাঁদ সওদাগরের ভিটার ধ্বংসাবশেষ বা ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে, বেহুলা-লক্ষীন্দরের কিংবদন্তী নিয়ে বাংলা ভায়ায় বহু কবিতা আছে। বহু কবিতায় এই প্রসঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে। শামসুর রাহমানের একটি বিখ্যাত কবিতা ‘চাঁদ সওদাগর’। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বেহুলা-লক্ষীন্দরের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। এসেছে আল মাহমুদের কবিতাতেও। আমি নিজেও একাধিক কবিতা লিখেছি; আমার একাধিক কবিতায় চিত্রকল্প বা উৎপ্রেক্ষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে এই কিংবদন্তী। আমি লিখেছি ‘বেহুলার ভিটা’ নামক কবিতা। ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রীতি আমার মধ্যে গভীর নিবিড় ও প্রবল। আমি অতীতমুখী নই , অতীতচারীও নই কিন্তু অতীতের মহাকালিক সাম্রাজ্যে ইবনে বতুতার মন নিয়ে একজন পরিব্রাজক। অদেখা  অতীত আমাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রেরণা জোগায়, ঐতিহ্য আমাকে প্ররোচিত করে। আমি ইতিহাস ও কিংবদন্তীর জ্ঞান এবং নিজস্ব কল্পনা সহযোগে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে কবিতার সেতু রচনায় প্রলুব্ধ বোধ করি। অতীতকে পুনর্গঠিত বর্তমানে রূপান্তর করতে হাতে নিই বহুমাত্রিক চিত্রকল্প, নতুন উপমা, বহুভাষিক শব্দ এবং বহুশাস্ত্রীয় প্রপঞ্চ।   
‘কী লাভ বলো বৃত্তের ভূগোল পুষে রেখে উটপাখিপ্রাণ?
তার চেয়ে সেই ভালো-নিয়ে আসো ফ্লাশব্যাক যাযাবর দিন।
পুঁজির বেদীতে হাসে স্ফুয়ার্ট মিল; আর অভুক্ত শিশুর
মতো একপাশে পড়ে আছে প্রাচ্য হৃদয়। প্রতিদিন দেখা,
অথচ হইনি আমরা দিগন্তের ছবি। ফিতাবাঁধা সিদ্ধান্তের
মতো আর কতো ঝুলে রবে আমাদের একদফা দাবি?
আমার বক্ষভরা জবাফুল জেনেও সন্ধ্যাবতীর শরীর
নিয়ে তুমিই বা আর কতোদিন থাকবে বসে আঘাটায়?

দ্যাখো আজ সোমপুর বিহারে সবুজসঙ্কেত হয়ে জমে ওঠে
বনভোজনের দিন! এসো আমরা দু’জনে রচি এশতকের
গন্ধেশ্বরীর ঘাট। সবুজ আঁচলের সুতোয় এ হাতে বেঁধে
দিলে বনভোজনের রাখি, লজ্জাভাঙা গৌরবের ছাপ
এঁকে দেবো আমিও। ক্ষতি কি বিজয় হলে কৈবর্তশাসন
যদি দিব্বক স্তম্ভ দেখে ভাবী মগজ মানে এদিনের প্রেম!’
(বনভোজন/ শেষ হেমন্তের জোছনা)

আরেকটি বিষয় আমাকে কবিতা লেখায় বাধ্য করে এসেছে, তা হচ্ছে আমার জীবেন বিচিত্র অভিজ্ঞতার চাপ। চাকরিসূত্রে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল (শহর থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত) দেখার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে আমার। অনুরূপভাবে বেশ কয়েকটি দেশ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেসব দেশের ভূগোল, ইতিহাস এবং মানুষ দেখে সমৃদ্ধ হয়েছে আমার জীবনাভিজ্ঞতা। নারীরা যেমন আমার প্রেমের কবিতাকে নানা ভাবে নানা মাত্রায় প্রভাবিত করেছেন, বিচিত্র জনপদ দর্শন ও বিচিত্র শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেশার ফলও আমাকে ইতিহাসমনস্ক, সমাজমনস্ক, রাজনীতিসচেতন এবং মনেপ্রাণে আন্তর্জাতিক ভূগোলের  অধিবাসী করে তুলেছে । আমার অভিজ্ঞতার কথা অন্যদের সাথে শেয়ার করার প্রণোদনা এবং আবেগের চাপ থেকে আমি সেসব নিয়ে কবিতা লিখেছি, ভ্রমণকাহিনী লিখেছি। ‘তুর্কী মেয়ের প্রতি’, ‘ব্লু মাউন্টেনে দাঁড়িয়ে’, ‘পিছিয়ে যাওয়া মানুষ’, ‘ভালোবাসার আকাশে নাই কাঁটাতারের বেড়া’, ‘প্রবাসের পাঠশালা’, ‘ইস্তাম্বুলের ই-মেইল’, ‘সাবিহা তোমার কাছে’, ‘ নেফারতিতির সঙ্গে’, ‘অভিবাসী চিরদিন’, ‘বিশ্বায়ন’, ‘ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’, ‘আরব বসন্ত’,  প্রভৃতি ভূগোল-প্রেম-নৃতত্ত্ব-ইতিহাস-সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ও প্রাতিস্বিক উপলব্ধি এর নির্যাস উৎসারিত কবিতা। আমার কবিতা আমার দেখা পৃথিবীর নবসৃষ্প রূপ। আমার কবিতা আমার যাপিত জীবনের--আমার উপলব্ধ জীবনের জলরঙছবি। 
‘------------------------------------আজ সেই তুমি কি
আমাকে নতুন ভাবনার কবিতা লেখাও যে একদিন আখেনাতেনের
শাসনকালকে ভরে দিয়েছিলে শিল্প-ভাস্কর্য-বিশ্বাসের নবজাগরণে?
লুডবিগ বোর্কাতের মনে বিস্ময়-জাগানো তোমার মোহনীয় চোখ 
আমার চোখের সাথে চেয়ে আছে বিকেলের রোদে সোনা হয়ে ওঠা 
পিরামিডের চূড়ায়। আচ্ছা, তোমাকে কি দেখেছিলেন আমাদের 
সঙ্গে  থাকা দুই নারী শোভা আর জোহরা? তাহলে কি জোহরার 
রহস্যময়ী চাহনি সহজাত অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি ছিল না মোটেও?

নেফারতিতি, হে মিসট্রেস অব হ্যাপিনেস, তুমি কি তবে বহু
জনমের অধিকার লাভ করেছো, ঘুমুতে যাওয়ার আগে যার স্বপ্ন 
নিয়ে পাথরের বুকে প্রাসাদ রচতেন দি ভ্যালি অব কিং এ ঘুমুতে 
যাওয়া তুথমোসিস-রামেসেসের দল? অবয়বহীন চারহাজার বছর
নীলনদে ভেসে ভেসে তুমি কি পুনর্জন্মের মাটি খুঁজে পেয়েছো
রূপবান-মধুবালার গাঙ্গেয় অববাহিকায়?’
(নেফারতিতির সঙ্গে/ অভিবাসী ভালোবাসা)

আামকে কবিতা লিখতে বাধ্য কের, কবিতা লেখায় নিত্যনতুন রসদ জোগায় আমার পেশাগত জীবন যাপনের অভিজ্ঞান। আমার পেশাগত জীবনে গত ৩৩/৩৪ বছরে কত মধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে; কত তিক্ত স্বাদ নিতে হয়েছে; কত মিশ্র অনুভূতি হৃদয়ে দোলাচল সৃষ্টি করেছে। কত সরলতা! কত ডাবল স্টান্ডার্ড! কত আন্তরকিতা! কত অভিনয়! কত প্রশংসা! কত নিন্দা! কত সহযোগিতা! কত অন্যায় বাধা! কত ন্যায্য স্বীকৃতি! কত অন্যায্য বঞ্চনা! কত সুনাম! কত অপবাদ! কত কী যে দেখেছি! কত কী যে দেখছি! পৃথিবীতে কোনো বিশুদ্ধ চাকরি নেই,  জীবনানন্দ দাশের মতো আমারও মনে হয়েছে এটা। 
‘কুইসলিং বানালো কি নিজ নাম- হিটলার সাত কানাকড়ি
দিয়ে তাহা কিনে নিয়ে হ’য়ে গেল লাল:
মানুষেরই হাতে তবু মানুষ হতেছে নাজেহাল;
পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।‘
(সৃষ্টির তীরে/ জীবনানন্দ দাশ )  

জীবনানন্দের চাকরির অভিজ্ঞতা ছিল এক রকম; বাস্তব কারণেই  আমার অন্যরকম। এসব কথা কোথাও বক্তৃতায় বলা যায় না। সাংবাদিকের মতো প্রতিবেদনও প্রকাশ করা যায় না কোনো মিডিয়ায়। কারণ চাকরি সংক্রান্ত আইন, বিধিবিধান এবং বাস্তবতা তা অনুমোদন করে না। একজন নিবিড়ভাবে ও গভীরভাবে সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সেসবের সবটুকু হজম করাও আমার পক্ষে অসম্ভব ওঠে। হয়তোবা এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি আরও অনেকেরই। কিন্তু তারা লেখালেখির সঙ্গে জড়িত থাকেননি বলে নিরুপায় মনে চেপে রাখেন এসব। একজন কবি তো কেবল নিজের ভাবনা, অভিজ্ঞতা আর কল্পনার কথাই লিখেন না, অন্যেও হয়েও তিনি কথা বলেন। তো নিজের কথা এবং অন্যদের কথা শৈল্পিক নিরাপত্তায় প্রকাশের সুযোগ দেয় কবিতা। তখন আশ্রয় হয়ে ওঠে কবিতা। কারণ কবিতা লেখায় আইনগত অথবা বিধিবিধানগত কোনো বাধা নেই। তাই তখন সেই বেদনামাখা ভাবনা অনেকটা নির্ভাবনায় কবিতা হয়ে উঠতে চায়। অপ্রিয় সত্যকে উপস্থাপন করতে আমি  প্রতীকের আশ্রয় নিই; রূপকের আশ্রয় নিই।  হয়তোবা আমার কবিতার এদিকটা লক্ষ করেই কবি অসীম সাহা আমার কবিতা নিয়ে লেখা তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘ অভিভূত রূপকের কবি আমিনুল ইসলাম’ এবং কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন তাঁর প্রবন্ধের নাম দিয়েছেন, ‘ প্রতীকী প্রতিবাদের কবি আমিনুল ইসলাম।’ 

‘বিজ্ঞাপনে দিন হাসে, নামঞ্জুর স্বপ্নে খেলে রাত;
এভাবেই ক’বছর। মামা নেই-
বৈবাহিক সূত্রটুকু ভবনে পৌঁছেনি।
তাই নিয়ম আমাকে জানে সৎপুত্র।

ও নিয়ম! ও আমার বিমাতার বর!
তুমি মোর হও তবে কে?’
(নিয়মের সৎপুত্র/ শেষ হেমন্তের জোছনা)

আমি একদিকে একটা  সরকারি চাকরি করে এসেছি, সরকারের আর্থসামাজিক পলিসি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি, অন্যদিকে অচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় ব্যাপক পঠনপাঠনের জ্ঞান আমাকে  সমৃদ্ধ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে আমার নিজস্ব ভাবনা, নিজস্ব অভিমত গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেসব বলবো কোথায়? কাকে? বিশ¡ায়নের পক্ষের তথাকথিত অনেক দাতা সংস্থা ও দেশ, এনজিও, বিশ্বব্যাংক, আইএফএফ এবং বিভিন্ন বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থার কার্যক্রম আমি আমার গভীর পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি নিয়ে দেখেছি। অনেক তুখোড় পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল পত্রিকা সম্পাদক- এইসব সংস্থা/দেশের হয়ে কাজ করে চলেছেন। আমলাতন্ত্র ও রাজনীতির ভেতর-বাহির গভীরভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি অপরিহার্য বাধ্যবাধকতায়। আর আমার নিত্যদিনের অভ্যাস ব্যাপক পঠনপাঠন। আক্ষরিক অর্থেও ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’। আমার ভাবনা ও একইসাথে সৃষ্টির ওপর পড়েছে এসব প্রত্যক্ষ পরোক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়াজনিত ছাপ। আমি একদিকে প্রেমভাবনা দ্বারা তাড়িত মানুষ, অন্যদিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নানাবিধ কারসাজি আমার চিন্তার রাডারে বেজে ওঠে। আমার ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামের কবিতাটিতে এই উভয় অবস্থার ছবি আছে; প্রেম ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক রাজনীতি অনেকটা উৎপ্রেক্ষা হয়ে আছে এ কবিতায়। কবিতাটির শেষাংশ:
‘ফলে তো আমার গোপন সর্বনাশের ক্ষান্তি নেই; 
ও আমার ভালোবাসার বিশ্বব্যাংক, 
উষ্ণখনির লোভে আর কত লোন চাপাবে ভাই! 
দ্যাখো, তুবও ফলিয়েছি রাতজাগা শ্রমের ফসল। 
কিন্তু ফাস্টফুডের বাজারে কি হবে এসব দিয়ে? 
ফলে তো আমি এভাবে ফতুর হয়ে গেলে,
তুমিই বলো, সেদিন কে নেবে আমার চক্রবৃদ্ধি বেদনার দায়?’

যারা আমার কবিতা পড়েন, তারা জানেন,  আমি প্রচুর প্রেমের কবিতা লিখি। কবিদের মন প্রেমময় । প্রকৃতপক্ষে কবিমাত্রই মূলত প্রেমের কবিতার কবি। ক্রিকেটারদের প্রধান পরীক্ষা যেমন টেস্ট খেলায়, কবিদেরও মূল পরীক্ষা প্রেমের কবিতা রচনায়। আমার নিজের ক্ষুদ্র কাব্যসাধনার পেছনেও প্রেমানুভূতি সবচেয়ে প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল বলে মাঝে মাঝে আমার মনে হয়। সে অনুভূতির প্রকাশ প্রায়শ নদীর প্রতীকে দানা বেঁধে উঠতে চায়। এখানে একটা কথা বলে রাখা যায়: আমার প্রেমের কবিতাগুলো প্রচলিত প্রেমের কবিতার চেয়ে কিছুটা আলাদা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক গানে বলেছেন যে তিনি যখন গানের ভিতর দিয়ে জগতকে দেখেন তখনই সে জগতকে সঠিকভাবে জানতে এবং চিনতে পারেন। আমি প্রেমের ভিতর দিয়ে জীবন ও জগতকে দেখার করে আসছি; তবে রোমান্টিকতার চোখ ও মন নিয়ে নয়। একবিংশ শতাব্দির উঠোনে দাঁড়িয়ে অতোটা রোমান্টিক হওয়ার সুযোগ নেই, যুক্তি তো নেই-ই। সেজন্য আমার প্রেমের কবিতা নিছক প্রেমের কবিতা হয়ে থাকেনি। গতানুগতিক একমুখী প্রেমের কবিতা আমার নয়। আমরা জানি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এমনতর আরো অনেক সংস্থা গরীব দেশগুলোকে নানা কৌশলে শোষণ করে এসেছে। এটা জানার পরও গরীব দেশগুলো তাদের কাছ থেকে চড়াসুদে এবং নানাবিধ প্রতিকূল শর্তে ঋণ গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। একসময় সুদাসলে সে ঋণ শোধ করতে গিয়ে ফতুর হওয়ার অবস্থা হয়। মাঝে মাঝে অসম প্রেমও এমন অবস্থার সৃষ্টি করে। অসহায় প্রেমিক বা প্রেমিকার অবস্থা হয়ে ওঠে ঋণভারে জর্জরিত তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের মতো। আমি প্রেমের কবিতার কাঠামোর মাঝে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ এসব বিষয়কে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এসমস্ত বিষয় আমাকে ভাবায়, উৎকণ্ঠিত করে, উত্তেজিত করে কিন্তু  আমি এসব বিষয় নিয়ে ড. আকবর আলি খান,  অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অথবা অধ্যাপক এম এম আকাশের মতো গবেষণাধর্মী নিবন্ধ লিখতে পারি না বলেই হয়তোবা বহুব্যঞ্জনাময় প্রেমের কবিতা লেখার চেষ্টা করি। দুধে যার অধিকার নেই, সে যদি ঘোলে স্বাদ মেটাতে চায়, তাতে কার কী ক্ষতি! 
‘অথচ তুমি সবুজঘাসে পা নামিয়েই ভুলে যাও ঝঞ্ঝাতাড়িত ঢেউবেলা! 
আমার লবণে দোল খায় বঙ্গোপসাগরের ঘ্রাণ; আর তুমি চান্স পেলেই 
বিশ্বব্যাংকের মালিশ নাও; আমার তন্দ্রা এলেই সুদখোরের আখড়ায় 
মৌ জমে ওঠে কেন, সেকথাও তো আমাকে ভাঙে! আমি আড়াল হলেই 
বেড়াগুলো কদমগাছ হয়ে ওঠে; অথচ আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না-
এমন অভিব্যক্তি ছড়িয়ে রাখো অনুগত বাতাসে। হে আমার স্বপ্নের সাথি,
তুমি কি জানো না- নষ্টজোটের লোভের সাফল্যে ভালোবাসা কোনো 
সুবিধাবাদী রাজনীতি নয়?’
(ভালোবাসা কোনো সুবিধাবাদী রাজনীতি নয়/জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)

আমি কবি, কারণ আমি প্রেমিক। আর সেকারণেই বর্তমান সময়ে প্রেমের কবিতা কম লেখা হলেও আমি প্রেমের কবিতাই বেশি লিখে থাকি। হাইস্কুল জীবনে নবম-দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে এক সহপাঠিনীকে গভীরভাবে ভালো লাগতো আমার, যদিও তাকে কোনো কিছুই বলা হয়ে উঠেনি- তবে একথা সেও বুঝতে পেরেছিল বলে তার চোখ-মুখের ভাষা আমাকে জানিয়ে দিতো। এসএসসি পাশের পর আমি রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়। অগণিত ঝলমলে শহুরে যুবতী সহপাঠিনীর ভিড়েও আমার মনজুড়ে থাকতো স্কুলের সেই সহপাঠিনীর প্রতি অন্তঃসলিলা অন্তরঙ্গ অনুরাগ। সেই প্রথম আমি আমার হৃদয়ে প্রবলভাবে জেগে উঠি এবং  তাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখি। আর ৪ বছরের স্থলে আমি ৭ বছর কাটাই ভার্সিটিতে। সেশনজটকে ধন্যবাদ। ভার্সিটি জীবনের আনন্দ-বেদনার বহু স্মৃতি অম্লান আজো স্মৃতির পাতায়। দু’একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত কয়লাচাপা হীরক খন্ডের মতো রয়ে গেছে হৃদয়ের আঁধারে যা কখনো কখনো দুর্বল মুহূর্তের অন্তরঙ্গ আলোয় সাতরঙের বর্ণছটা ছড়াতে জেদী হয়ে উঠেছে। ভার্সিটিজীবনে প্রেম এসেছে, প্রেম গেছে। চাকরিজীবনের শুরুতেই প্রেম এসেছে, প্রেম গেছে । সেই প্রেম আমাকে দিয়ে অনেক কবিতা লিখিয়ে নিয়েছে। প্রেমকে স্মরণ করে লিখেছি, ‘এ মহাফাঁপর পপি! নোম্যান্সল্যান্ডেও থাকা দায়/ তুমি যদি ভিসা দাও সীমান্ত ভাঙিবো দুই পায়’। কারণ যাই হোক, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিদুষী নারীর সাথে অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছে আমার। তারাই আমার কবিতার গাছের গোড়ায় জল-মধু-সার সরবরাহ করে এসেছেন, কখনো সচেতনভাবে, কখনোবা মধুর অসচেতনতায়। একের পর এক আমি লিখে এসেছি প্রেমের কবিতা। এই ধারা এখনও অব্যাহত । তাই তো আমার ২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় প্রকাশিতব্য কাব্যগন্থের নাম দিয়েছিলাম, ‘আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট’। ২০১৯ সালে প্রকাশিত কবিতার বইয়ের নাম ‘জলের অক্ষরে লেখা প্রেমপত্র’, ‘ ২০২০ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ প্রেমিকার জন্য সার-সংক্ষেপ’।   প্রেম আজও আমাকে বেহিসেবী করে তোলে, পরিণামের ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে আমার মন প্রণয়-উচ্চারণে মাতাল হয়ে উঠতে চায় যার অনিবার্য ফল প্রেমের কবিতা। 
‘সাঁঝের আকাশে এখনো কি ফোটে তারা?
রাতের নদীতে এখনো কি জাগে ঢেউ?
খোলা বাতায়ন এখনো কি চায় সাড়া?
আমাকে পোড়াতে এখনো কি পোড়ে কেউ?’
(একাকী, অবরণ্যে/ জলের অক্ষরে লেখা প্রেমপত্র)

আমি গ্রামের ছেলে। পদ্মাবিধৌত একটি চর এলাকায় আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমার গ্রামের নামটিও অমন: টিকলীচর। ছোটকাল থেকেই আপকাশ-নদী-মাঠ-বৃক্ষ-পাখপাখালি-গবাদি পশুর সঙ্গে কেটেছে আমার শৈশব-বাল্যকাল-শৈশোর-যৌবন। রাজধানীতে এসেছি বয়স চল্লিশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর। ততোদিনে কবিতার সঙ্গে আমার ঘরগেরস্তালি পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতি আমাকে কবিতা লেখায়। আমি নদী সিরিজের, বৃক্ষ সিরিজের , সুন্দরবন সিরিজের বহু কবিতা লিখেছি। আর আমার নাগরিক জীবনের , অর্থনৈতিক ভাবনার, প্রেমভাবনা, আন্তর্জাতিক বিষয়াদি সংশ্লিষ্ট কবিতার পরতে পরতে ঢুকে পড়েছে প্রকৃতির নানা উপকরণ অলংকার। আরবি ভাষায় একটি প্রবাদ বাক্য আছে, প্রতিটি বস্তু তার মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। আমার মূল প্রকৃতি। আমি রবীন্দ্রনাথের মতো প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকি মুগ্ধচোখে কিন্তু তাঁর মতো করে প্রকৃতিকে উপস্থাপন করতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ তো একবারই জন্মায় এই পৃথিবীতে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি ও তার প্রাণের দিকে চেয়ে বলেছেন,
‘শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে 
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়ানে,
সমস্ত প্রাণে  কেন যে কে জানে
ভরে আসে আঁখিজল-
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা,
বহু দিবসের সুখে দুখে আঁকা,
লক্ষ যুগের সংগীতে মাখা
সুন্দর ধরাতল!’
(পুরস্কার/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

আমি সেভাবে বলতে পারি না। সে শক্তি নেই আমার । তবু প্রকৃতি আমাকে কবিতা লিখতে বারবার প্ররোচিত করে। আমি সে প্ররোচনাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারি না। আমি আমার মতো করে কিছু লিখার চেষ্টা করি। কখনো তা মানসম্মত কবিতা হয়, কখনোবা হয় না। চূড়ান্ত সত্য এই যে   আর দশটি অনুষঙ্গের মাঝে প্রকৃতি আমার কবিতার একটি প্রধান অনুষঙ্গ।   
‘দ্যাখো, নীলশাদা প্রচ্ছদে ভাঁজ হয়ে শুয়ে আছে সুন্দর 
লাল আলো চুমে যায় শাদাকালো চোখ
ভোরের হাওয়া এসে খেলা করে মেঘভাঙা চুলে
দেরি নেই আর,
শিহরিত আবেশে খুলে যাবে দুইরঙা নন্দনের ভাঁজ
খুলে যাবে বাসি পরিধান!
যদ্যপি পাহারা শাসিত উঠোন 
তথাপি সুরভিত মুগ্ধতায় মাতোয়ারা জগতের সকল পাহারা!

আ রে ও বঙ্গোপসাগর, তুমিও তো চেটে খাচ্ছো
উজ্জ্বল এক্সপোজার! খাও, তবে প্রভাতসূর্যের 
দোহাই, তোমার জিহ্বা নিও না হাঁটুর ওপরে!
ওই সংরক্ষিত সৌন্দর্য শুধু কবির জন্য প্রকল্পিত।

সুদখোর রোদের উঠোনে-
দন্ডপ্রাপ্ত কবিকে প্রেমিক হয়ে বোধিপ্রাপ্ত হতে হয়।’
(শুয়ে আছে সুন্দর/ আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট)

আবার কখনো কখনো এমনও হয়, কোনো নির্ধারিত বিষয় নেই, কোনো কারণ জানা নেই, কী এক অনির্বচনীয় অনুভূতি মনের মাঝে দোলাচলের ঢেউ রচনা করে। মনটা অকারণে উদাস হয়ে যায়, ব্যাকুল হয়ে ওঠে।  কিন্তু কাউতে তা বলা যায় না। কারণ অস্থিরতার কারণটি নিজের কাছেই স্পষ্ট হয় না, ফলে কারণ জানার কোনো সূত্র মাথায় আসে না। এধরনের অনির্বচনীয় অনুভূতি, অসংজ্ঞায়িত আবেগ, কার্যকারণসূত্রের বাইরের আকুলতা কবিতায় প্রকাশিত হতে চায়। হয়তোবা রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ ভাষা ও ছন্দ’ কবিতাতে একেই ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমিও মাঝে মাঝে এমন অবস্থাকে কবিতার অবয়বে বাঁধতে চেষ্টা করি। এসব কবিতার আক্ষরিক অর্থ খুঁজতে গেলে মেলে না উত্তর। কেবল একটা ঘোরের আনন্দ রচনা করে পাঠককে হাতছানি দিয়ে ডাকে। 
‘একমুঠো জল ঘুরপাক খাচ্ছে একনদী জলে
না উজান না ভাটি
না এপার না ওপার
শুধু ঘুরপাক-
শুধু বিবাগী হাওয়ার খেলনাগিরি
দগ্ধ তো বটেই তথাপি কীভাবে ডুব দেবে সে গভীরে!
নদী অনেক ঘোলা যে!
তো না সে ঘাটের---না সে স্রোতের
তারচেয়ে স্বাধীন বটে কচুরিপানা
নাই বা হলো তার উজান যাওয়া
ভেসে তো যেতে পারে-
কান দিয়ে স্রোতের সেতারে!’
(আচ্ছন্নতা/ প্রণয়ী নদীর কাছে)

পরিশেষে একটা কথা খোলসা করা দরকার। কবিতা লেখার কোনো সাংসারিক প্রয়োজন আমি অনুভব করিনি। কবিতাকে পেশা হিসেবে নেয়ার কোনো সুযোগও তৃতীয় বিশে^র কোনো দেশে নেই।  কোনো গোষ্ঠীকে খুশি করে স্বার্থ হাসিলের জন্যও কবিতা লিখি না এবং ‘আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনো কালে সঞ্চয় করিনি’। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আমার কবিতাপ্রেম আমাকে এ পথে নেমে আসতে বারবার প্ররোচিত করেছে। কবিতার জগত আমার মনের জগত, আমার ভালোবাসার জগতও। এক কথায় বলতে গেলে কবিতা লিখে আমি অনাবিল আনন্দ পাই। যখন একটি কবিতা প্রকাশের মুখ দেখে আমার মন খুশিতে ভরে ওঠে। আমার মানসিক অস্থিরতা ও গভীর অনুভব-অভিজ্ঞতা প্রকাশেরও এটি সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ মাধ্যম। যে কথা  আমি কোথাও বলতে পারি না,  যে অনুভুতি ব্যক্ত করতে পারি না কোনো গদ্যে তা-ই সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়ে ওঠে কবিতায়। কবিতা  সুন্দর করে কথা বলতে শেখায়। যে কোনো বিষয়কে গভীরভাবে এবং বহুকৌণিক দৃষ্টিকোণ হতে দেখার প্রণোদনা ও সুযোগ দান করে কবিতা। আর এখন তো কবিতা এক ধরনের নেশাতে পরিণত হয়েছে;  একটি কবিতার সাফল্য বয়ে আনে আরেকটি কবিতা লেখার তাগিদ ও সাহস। মনে হচ্ছে লিখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আরেকটা কারণও হয়তো ক্রিয়াশীল। আমি কোনোভাবে একটা চাকরি করি। সেখানেও বসদের খুশি করার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীয় তরিকা মেনে চলতে পারি না। আমি ব্যবসায়ের জন্য অনুপযুক্ত; রাজনীতির মাঠ আমার জন্য নয় এবং সংসারধর্মেও পটু নই। সংবেদনশীল একজন মানুষ হয়ে এতসব ব্যর্থতা নিয়ে বাঁচি কেমনে? হয়তো-বা কবিতা আমাকে এক ধরনের নির্ভরতা দেয়; আমাকে এক ধরনের সাফল্যের সহায়তা দিয়ে সংসারে জীবনে খাড়া করে রাখে। সেটাই-বা লেখালেখির কারণ হিসেবে কম কী! তাই আমি কবি পরিচয়েই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কবিতাই আমার ভাব ও ভাবনার, কথা ও কল্পনার, ভিড় ও একাকীত্বের, ব্যর্থতা ও সাফল্যের, স্বপ্ন ও বাস্তবতার শৈল্পিক অভিজ্ঞান।                                                               ----০০০----




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ