বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি||বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ গুণিজনদের মুখোমুখি গোবিন্দ ধর||এই পর্বে সুভাষ দাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
---------------------------------------
বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ 
গুণিজনদের মুখোমুখি
গোবিন্দ ধর
এই পর্বে সুভাষ দাস
------------------------------
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
---------------------------------------
বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ 
গুণিজনদের মুখোমুখি
গোবিন্দ ধর
এই পর্বে সুভাষ দাস


পরিচিতি
জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৮ নভেম্বর। অধুনা বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার আলিয়ারা গ্রামে। বাবা ও মা যথাক্রমে প্রয়াত হরেন্দ্র কুমার দাস ও চপলা রাণী দাস। 
প্রাথমিক পড়াশোনা বাংলাদেশে নিজ গ্রামের স্কুলে। সম্পত্তি বিনিময় করে এদেশে আগমন। মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা ত্রিপুরার অমরপুরে। এমবিবি কলেজ থেকে ষান্মানিক স্নাতক। বিএড এবং সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা লাভ। কর্মজীবনের শুরুতে সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা। ১৯৮২ সনে টিসিএসে যোগদান। অতিরিক্ত জেলা শাসকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ। পরবর্তীকালে তথ্য সংস্কৃতি পর্যটন দপ্তরের অধিকর্তা এবং ত্রিপুরা ক্ষুদ্র শিল্প নিগমের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন। 
লেখা ছাড়া প্রিয় বিষয় নাটক, ভ্রমণ, লোক গান, আড্ডা। এছাড়া 'আরশিনগর' লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা।


প্রশ্ন নং ১:
আপনার দেখা বা জানা ১৯৭১ সম্পর্কে একটু বিশদ জানতে চাই।
উত্তর : ১৯৭১সাল। বিংশ শতাব্দীর সাতের দশকের শুরু। আমি তখন আগরতলায় মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে পড়ি। ষান্মানিক স্নাতক স্তরের অন্তিম বর্ষের ছাত্র। কলেজ সংলগ্ন ২ নম্বর ছাত্রাবাসে থাকি। 
সত্তরের সেই দশকটা সারা বিশ্বজুড়েই ছিল এক আলোড়িত দশক। ভিয়েতনামে চলছে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের নেতৃত্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রাম। দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে কালো মানুষের লড়াই। ভারতবর্ষেও নানাবিধ আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দানা বাঁধছে। পশ্চিম বাংলায় বামপন্থীদের নেতৃত্বে একদিকে সংগঠিত গণবিক্ষোভ জোরদার হচ্ছে। অন্যদিকে নকশালবাড়িতে শুরু হয়েছে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ। 
আমাদের ছোট্ট ত্রিপুরা রাজ্যেও ছাত্র আন্দোলন, কর্মচারী আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষদের আন্দোলনের ব্যাপ্তি ঘটছে। শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সত্তরের দশকটি এরাজ্যে এক নবজাগরণের দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সাহিত্য, নাটক, সঙ্গীত সর্বক্ষেত্রেই এই সময়কাল নিঃসন্দেহে একটি সৃষ্টিমুখর উত্থানপর্ব । এককথায় ঐ সময়টাতে গণবিক্ষোভ তরঙ্গের ঢেউ নানা দেশে নানা ভাবে আঁছড়ে পড়ছিলো। 
আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের পূর্বখণ্ডে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে পাক জঙ্গি-শাহির অবিচার অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বিস্ফোরক হয়ে উঠেছিল। ১৯৭১ এর ঘটনাবহুল মার্চ মাসে তা চরম আকার ধারণ করে। ওপার থেকে প্রতিদিনই জনগণের ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ আর স্বৈরাচারী শাসকদের গণহত্যাসহ নানা  নৃশংসতার খবর নানা সূত্রে এপারে আসছিল। প্রায় ঘরে ঘরে বিবিসির খবরে কান পেতে থাকতো উদ্বিগ্ন মানুষ। 
 জঙ্গি শাহির বিরুদ্ধে ৭ই মার্চ বিকালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক মানুষের সামনে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করলেন -- সামরিক আইন তুলে নিতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, গণহত্যার উপযুক্ত তদন্ত করতে হবে। ঐতিহাসিক ভাষনে শেখ মুজিব বললেন -- 'ভায়েরা আমার! আমরা রক্ত দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। শহীদদের রক্তের উপর পা দিয়ে আমি এসেম্বলিতে যেতে চাই না। ভাইগণ, মনে রাখবেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' এই অগ্নিস্রাবী ভাষন ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের কোনে কোনে আর সীমান্তবর্তী ভারতীয় ভুখন্ডে। এই ভাষন আগরতলাবাসীদের মনেও ছড়িয়ে দিয়েছিল এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা। 
প্রতি দিন ঢাকার রাস্তায় বেরোত হাজার হাজার মানুষের মিছিল। 
স্বৈরাচারী শাসকেরা বসে থাকেনি। ২৫ মার্চ রাত বারোটা। সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজপথে। ছাত্রদের হোষ্টেলে, ইউনিভার্সিটিতে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, মসজিদে, মন্দিরে, সংবাদ পত্র অফিসে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যালীলা চালালো বর্বর সেনাবাহিনী। 
নাৎসি কায়দায় দেশের পূর্বখন্ডকে পশ্চিমী শাসকেরা কয়েকদিনের মধ্যেই বন্দিশিবিরে পরিনত করলো। এপারে টুকরো টুকরো খবর আসছিলো। আগরতলাবাসীরা উৎকন্ঠায় উত্তেজনায় দিনপাত করছিল। একসময় সেদেশের মুক্তিকামী জনতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সামিল হতে বাধ্য হল। 
সেই টালমাটাল সময়ে আন্দোলিত তরুণ প্রজন্মের সাধারণ একজন ছিলাম আমিও।
প্রশ্ন নং ২ : আপনার ছোটবেলায় যখন এক দেশ ভারত, যখন পাকিস্তান বাংলাদেশ ছিল না, তখনকার ভারতের একটি চিত্র লিখে আমাদের কৌতূহল দূর করুণ। 
উত্তর : আমার জন্মই হয়েছিল  এক বিভক্ত ভারতে। ভারত, পাকিস্তান দুটি দেশের জন্মলাভের অব্যবহিত পরেই। ফলে সে অর্থে অবিভক্ত ভারতের সামগ্রিক চিত্র চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয় নি। 
কিন্তু দেশ বিভাজিত হয়ে গেলেও, সীমান্ত বিভাজিত হলেও, রাতারাতি মানুষে মানুষে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে সামাজিক সম্পর্কগুলো তো উবে যায় নি। দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে তো দেয়াল উঠে যায়নি। সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়নি। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই পাশাপাশি বসবাস করেছে। পূর্ববঙ্গে নিজের গ্রামে যখন বসবাস করছি, সপ্তম অষ্টম শ্রেণিতে  পড়ছি -- তখন কিছুটা হলেও বুঝজ্ঞানতো হয়েছে। আমি দেখেছি আমাদের প্রতিবেশি মুসলমান পরিবারগুলোর সঙ্গে হিন্দু পরিবারগুলোর সুসম্পর্কের বাতাবরণ। উভয় সম্প্রদায়ের উৎসবে আনন্দে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ যোগ দিত। হাটে বাজারে মাঠে মেলায় একসঙ্গে কাজ করতো। হিন্দুদের বরঞ্চ দেখেছি মুসলমানদের সামাজিকভাবে খানিকটা হীন মনে করতে। মুসলমান প্রতিবেশি বাড়িতে এলে ঘরে নিতে দ্বিধা করতো, বারান্দায় বসতে দিত। এক হুক্কায় তামাক খেত না। সেই দিক থেকে আমি বলবো মুসলমানরা অনেক বেশি উদার ছিল। এটা যেমন একটা দিক, আরেকটা দিকও ছিল। সব মুসলমানই ভালো ছিল, সব হিন্দুরাই ভালো ছিল -- এমনটা নয়। সাধারণভাবে বেশিরভাগ মানুষই  মনের মধ্যে ধর্মীয় হিংসা বা জাতিগত হিংসা পোষণ করতো না। ব্যতিক্রম ছিল। তবে তাদের সংখ্যা ছিল কম। বিশেষ করে খেটে খাওয়া গরীব মানুষদের মধ্যে বিদ্বেষ ভাব প্রায়গ ছিলই না। ঘৃনা , বিদ্বেষ নিয়ে আসতো বাইরের মানুষ, অন্য এলাকার মানুষ। বিদ্বেষ পোষণ করা মানুষ সংখ্যায় কম থাকলেও তাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা ছিল বেশি। 
১৯০৫ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন উদ্দেশ্য প্রণোদিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করেছিলেন। এই 'বঙ্গভঙ্গে'র 
বিরুদ্ধে প্রবল স্বদেশী আন্দোলনও হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ 'রাখি বন্ধন' উৎসব  করেছিলেন। কিন্তু সেই বিভাজন জনিত ক্ষতনিঃসৃত বিষ দিনে দিনে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল আবহমানকাল সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করা নিম্নবর্গের মানুষগুলোর মধ্যেও। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী মানুষেরা এর সুযোগ নিতে এগিয়ে এল। সাম্প্রদায়িক আবেগকে সুকৌশলে কাজে লাগালো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ক্ষমতা লাভের স্বার্থে। ফলে বঙ্গভূমির নানা অংশে  একাংশের মানুষ জড়িয়ে পড়েছিল  ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। সে-সব আমরা ইতিহাসে পড়েছি।

প্রশ্ন নং ৩ : আপনার জন্মের সময় আপনি বাবা মা পরিবার  কোথায় বাস করতেন  ? 
উত্তর : আমি আমার মা বাবা ঠাকুরদা , ঠাকুরমা এবং অন্যান্য জ্ঞাতিবর্গ সহ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানাধীন আলিয়ারা গ্রামে বসবাস করতাম।
প্রশ্ন নং ৪ : ত্রিপুরার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় দু'দেশের সম্পর্ক কেমন ছিল  ? 
উত্তর : ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আত্মিক ও  সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। ত্রিপুরায় বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রায় সকলেই নানা ভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত। ফলে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিকতা, মনমানসিকতার উৎসটিও অভিন্ন। এরাজ্যের আদিবাসী মানুষেরাও ওপারের মানুষদের সঙ্গে ঐতিহাসিক সখ্যতার সম্পর্কে আবদ্ধ। অতীতে পূর্ব বাংলার চাকলা রোশনাবাদ পরগণা ত্রিপুরার রাজাদের জমিদারির অংশ ছিল। বাংলাদেশের বর্তমান কুমিল্লা জেলার একসময় নাম ছিল 'ডিস্ট্রিক্ট টিপারা'। রাজারা তাদের শাসিত অঞ্চলে বহু জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। এপারের দরিদ্র সরল আদিবাসীদের সঙ্গে ওপারের হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সুসম্পর্কের ধারা আদিকাল থেকেই বহমান ছিল। 
ফলে সীমান্ত বিভাজন সত্বেও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওপারের মানুষের আবেগ উচ্ছ্বাস আর এপারের মানুষের আবেগ উচ্ছ্বাস
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একই অভিন্ন ধারায় প্রবাহিত ছিল। এরাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত শচীন্দ্রলাল সিংহ। তাঁর নেতৃত্বে রাজ্য প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে  দিয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বেই ত্রিপুরা বিধানসভা সর্বপ্রথম বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে স্বিকৃতি প্রদানের জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করে ভারত সরকারের কাছে পাঠিয়েছিল। 
দু'দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ।


প্রশ্ন নং ৫ : ত্রিপুরার কোন কোন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল  ? সে-সব ক্যাম্পে স্হানীয়দের মধ্যে কারা সহযোগী ছিলেন  ? 
উত্তর : ধর্মনগর থেকে সাব্রুম দীর্ঘ সীমান্তে বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। যতটুকু জানা গেছে --- ধর্মনগর, কমলপুর, কৈলাসহর, খোয়াই, আগরতলা, সোনামুড়া, বিলোনিয়া, সাব্রুম সব মহকুমাতেই ক্যাম্প ছিল। মোটামুটি ৯ থেকে ১০ ক্যাম্প ছিল। প্রয়াত চিত্র সাংবাদিক রবীন সেনগুপ্তের কাছে শুনেছি, প্রথম ক্যাম্পটি গড়ে উঠেছিল চড়িলামে। এছাড়া মেলাঘর, সোনামুড়া, পালাটানা , চোত্তাখোলা ইত্যাদি স্থানে ক্যাম্প ছিল। পালাটানার ক্যাম্পটি সবচেয়ে বড় ছিল। আগরতলার বর্তমান নজরুল কলাক্ষেত্র, যেখানে আগে ক্র্যাপ্ট ট্রেনিং সেন্টার ছিল সেখানে একটি ট্র্যানজিট ক্যাম্প ছিল। 
রবীন বাবুর মুখেই শোনা -- ক্যাম্পগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল পদ্মা, মেঘনা, তিতাস, বুড়িগঙ্গা ইত্যাদি। 
স্হানীয়দের মধ্যে যারা সরাসরি প্রশিক্ষণ ইত্যাদিতে যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ক্যাপ্টেন বি আর চাটার্জি, অমল নাগ প্রমুখ।

প্রশ্ন নং ৬ : যতটুকু শুনেছি বিভিন্ন ক্যাম্পর আলাদা আলাদা রেজিমেন্ট যোদ্ধা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। 
উত্তর : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মোট এগারোটি সেক্টর ছিল । 
 এর মধ্যে ১,২,৩ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ত্রিপুরায় ছিল বলে জানা যায়। এছাড়া ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টর এবং বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও ছিল ত্রিপুরাতে। এসব সেক্টরের অধীনে বেশ কিছু ট্র্যানজিট ক্যাম্প ও ট্রেনিং সেন্টার ছিল ত্রিপুরায়। 
সব সেক্টর পরিচালিত হত কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে। অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন 
সামরিক ও আধাসামরিক আধিকারিকরা বিভিন্ন শিবিরে মূলত প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকতেন।

প্রশ্ন নং ৭ : সেক্টরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কোনটি বলে মনে হয়  ? 
উত্তর : সব সেক্টরই কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ত্রিপুরা সীমান্ত লাগোয়া কুমিল্লা এবং আখাউড়ার সঙ্গে যুক্ত সেক্টরগুলির ভূমিকা তুলনামূলক অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে আমার মনে হয়। কারণ কুমিল্লার কাছেই ছিল পাক সেনাবাহিনীর একটি শক্তিশালী হেডকোয়ার্টার এবং আখাউড়া রেল জংশন দিয়েই দেশের নানা প্রান্তে চলাচল করতো পাক সৈন্যরা, তাদের অস্ত্রশস্ত্র, রসদ ইত্যাদি।

প্রশ্ন নং ৮ : কথিত ইতিহাস হল ত্রিপুরার জনসংখ্যার চেয়ে বেশি শরনার্থীর ঢল আঁছড়ে পড়েছিল ত্রিপুরায়। এই ঢল কিভাবে সামলে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল ত্রিপুরাবাসী? 
উত্তর : এটা ঠিক যে ১৯৭১ সালে ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যা সাড়ে ১৫ লক্ষের মত ছিল। সেই সময় প্রায় সমসংখ্যক ছিন্নমূল উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ থেকে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। এদের একটা ক্ষুদ্র অংশ আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। বাকিদের জন্য শরনার্থী শিবিরের আয়োজন করছিল রাজ্য প্রশাসন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ত্রিপুরাবাসী এগিয়ে এসেছিল মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধের মহান তাগিদে। ত্রিপুরার আদিবাসীরা ঐতিহ্যগতভাবেই অতিথি পরায়ন জনগোষ্ঠী। তাদের কাছে প্রকৃত অর্থেই 'অতিথি দেব ভবন '। এ প্রসঙ্গে ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুরের একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, "এই প্রাচীনতম ত্রিপুরা রাজ্যের পবিত্র ইতিহাস চিরদিন অসাম্প্রদায়িকতার গৌরবে উজ্জ্বল ত্রিপুরেশ্বরগণের জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বিপন্নকে আশ্রয় দানের পুণ্য কাহিনীতে পরিপূর্ণ। এই বৃহৎ মানবসমাজের সকল আশ্রয়প্রার্থীই আমার দৃষ্টিতে সমান।" আদিবাসীরা, অন আদিবাসীরা সকলেই স্বজনহারা, সম্পদহারা, আশ্রয়হারা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিল সেই মনুষ্যত্ববোধের অন্তরতাগিদেই। এরাজ্যে শরনার্থীদের দীর্ঘ বহুমাসের অবস্হানকালে কোথাও একটিও অপ্রীতিকর ঘটনার কোন সংবাদ শোনা যায়নি। এটা সত্যিই এক বিস্ময়ের  ! 
কথায় আছে 'যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন'জন '।


প্রশ্ন নং ৯ : বাংলাদেশ  মুক্তিযুদ্ধে বা স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্রিপুরা কেন এত আন্তরিক ছিল? 
উত্তর : ৪ নং এবং ৮ নং প্রশ্নের উত্তরে এ প্রসঙ্গে অনেকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। উপজাতি জনগণের সহজাত অতিথি পরায়ণতা, জনশিক্ষা আন্দোলনের আদর্শে  উদ্বুদ্ধ উত্তর প্রজন্মের মানবতাবোধ এবং বাঙালি জনগণের আবেগসঞ্জাত আন্তরিকতা এর বড় কারণ বলে আমি মনে করি।  এপারের বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধ বলে মনে করতো। আমি সে-সময় আগরতলায় অনেক বাঙালি মানুষকে দেখেছি , পথে দেখা হলে 'গুড মর্নিং' , 'নমস্কার' বলার বদলে একে অপরকে 'জয় বাংলা' বলতো। 
এছাড়াও এ-রাজ্যের মানুষের সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক চেতনাজাত উদারতা এবং বিশ্ববোধ মানুষকে দায়িত্বশীল মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ করতে সহায়ক হয়েছিল নিঃসন্দেহে। 
তাই অর্থনৈতিক,সামাজিক ইত্যাদি নানা বাস্তব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এ-রাজ্যের মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে এপারে আসা লক্ষ লক্ষ বিপন্ন উদ্বাস্তু মানুষকে আত্মীয়ের মত আপন বক্ষে টেনে নিয়ে ছিল।

প্রশ্ন নং ১০ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ত্রিপুরার সংবাদপত্রের ভূমিকা কী রকম ছিল ? 
উত্তর : কোন বিষয়ে বা লক্ষ্যে  জনমত গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। তৎকালীন সময়ে ত্রিপুরায় প্রকাশিত সকল সংবাদপত্রই সাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। তারমধ্যে দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক দেশের কথা, ত্রিপুরা দর্পণ, জাগরণ, রুদ্রবীণা, বিতীর্ণ ইত্যাদি সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এক্ষেত্রে অবশ্যই দৈনিক সংবাদ অগ্রনী ছিল। তখন ঐ সংবাদপত্র অফিসে বাংলাদেশের খবর জানতে এবং মানুষকে তা জানাতে রাত জাগতেন যেসকল বিশিষ্টজন এবং সাংবাদিকেরা, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক ভূপেন দত্ত ভৌমিক, অধ্যাপক মিহির দেব, সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য, বিকচ চৌধুরী, বিপুল মজুমদার, লেখক ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য প্রমুখ। 
বিকচ দা'র মুখে শুনেছি -- ২৫ মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট' এর নামে পাক সেনাবাহিনী ঢাকা সহ বাংলাদেশে যে নৃশংস নরমেধ যজ্ঞ শুরু করেছিল, তার সম্ভবত এক দিন পরেই চট্টগ্রাম থেকে সীমিত ক্ষমতায় 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' নামে একটি রেডিও বার্তা প্রচারিত হতে শুরু করে। অধ্যাপক মিহির দেব এবং বিপুল মজুমদার একটি ছোট্ট ট্র্যানজিষ্টারের সাহায্যে বহু কষ্টে 'স্বাধীন বাংলা বেতার' কেন্দ্রের অতি ক্ষীণ শব্দ তরঙ্গ থেকে সংবাদ এবং তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরদিন তা পত্রিকায় প্রকাশিত হত। কিছুদিনের মধ্যে বিশ্বের তাবড় তাবড় সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরা আগরতলায় ভীড় করতে শুরু করেছিলেন। 
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখনতো আগরতলা বলা চলে  সারা দুনিয়ার নজরে। আগরতলা তখন মুক্তিযুদ্ধের অঘোষিত রাজধানী। 
মানুষ ওপারের খবরের জন্য উদ্বিগ্নতা নিয়ে অপেক্ষা করতো। সংবাদপত্র সমূহ রাত জেগে খবর সংগ্রহ করতো, ছাপতো। উৎকন্ঠিত মানুষ গোগ্রাসে সেইসব সংবাদে চোখ বোলাতো।

প্রশ্ন নং ১১ : রোওশন আরা ব্যাটারি বিষয়টি ঠিক কী ? 
উত্তর : বিকচ চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার থেকে এ বিষয়টি সম্পর্কে  জানতে পারি। বলা যায় এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। যুদ্ধরত সকল পক্ষই চেষ্টা করে শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে দিতে এবং স্বপক্ষের যোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা করতে। এর  জন্য কখনো কখনো কল্পিত কাহিনিরও আশ্রয় নিতে হয়। কারণ , বলা হয়, ' নাথিং ইজ আনফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার '। 
এই উদ্দেশ্যেই বিকচ চৌধুরী একটি ছোট্ট সংবাদে একজন কল্পিত বীরাঙ্গনা 'রোওশন আরা' র কাহিনি নির্মাণ করেছিলেন। তাতে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের  এক বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রোওশন আরা মৃত্যু ভয় তুচ্ছ করে বুকে মাইন বেঁধে
 আগুয়ান শত্রু সেনাদের ট্যাংকের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে
আত্মদান করেছেন এবং ট্যাংক ধংস করেছেন। 
এই ছোট্ট সংবাদটি অচিরেই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। এবং পরবর্তীকালে এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নানা স্হানে গড়ে উঠেছিল 'রোওশন আরা ' ব্রিগেডও।

প্রশ্ন নং ১২ : দৈনিক সংবাদ বা জাগরণ -- কারা বেশি আন্তরিক ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে? 
উত্তর : এ প্রসঙ্গে ১০ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে আমার যতটুকু জানা ছিল তা আলোচনা করেছি। সব ক'টি সংবাদপত্রই  যার যার নিজের অবস্থানে থেকে সম্ভাব্য  উদ্যোগ নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের খবর পরিবেশনে।
প্রশ্ন নং ১৩ : আপনার দেখা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের মানুষের উপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের বর্ণনা শুনবো  --
উত্তর : নির্যাতনের কোন ঘটনা চাক্ষুষ করার প্রত্যক্ষ কোন সুযোগ আমার ছিলনা, কারণ আমি এবং আমার পরিবার ১৯৬৩ সনেই পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে এসেছিলাম। এ বিষয়ে যতটুকু জানি তা সংবাদ মাধ্যম, আত্মীয় স্বজন এবং পরিচিতদের থেকে জানা। 
শুনেছি, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকার রাজপথে নেমেছিল সেনাবাহিনী। রাত দু'টোর সময় পুরো ঢাকা শহরের টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল বর্বর সেনা তান্ডব। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। ওদের প্রথম টার্গেট ছিল ছাত্ররা। কামান উঁচিয়ে ট্যাংক নিয়ে লরিভর্তি মারমুখী সেনারা ঢুকে পড়েছিল ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। শুধু ইকবাল হল আর জগন্নাথ হল লক্ষ্য করে গোলা ছুঁড়ে হত্যা করেছিলো তারা তিন শতাধিক ছাত্রকে। রক্তে ভেসে গিয়েছিল হলের ঘর,বারান্দা । বাদ যায়নি মেয়েদের রোকেয়া হলও। একে একে পুলিশ হেড কোয়ার্টার, সংবাদপত্র অফিস, হোটেল, বাড়ি ঘর কিছুই বাদ যায়নি। ঢাকা হয়ে উঠেছিল এক দুঃস্বপ্নের নগরী ! 
বুদ্ধিজীবীদের বীভৎস হত্যালীলার ঘটনা তো বর্বরতার নৃশংসতম  ঘটনা। সে-রাতের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। কারও কাছে শুনেছিলাম বা কোথাও পড়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের  একজন অধ্যাপক, অধ্যাপকের ভাই, দু' ভাইয়ের দু'ছেলে -- চারজনকে ঘর থেকে টেনে বের করে এনে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে খুনি সেনারা বেরিয়ে যেতেই অধ্যাপকের স্ত্রী বেরিয়ে এলেন। রক্তাক্ত স্বামী তখনো বেঁচেছিল। স্বামীকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেলেন এবং খাটের নীচে ঠেলে দিলেন। ঘন্টা তিনেক পরে ভোররাতে সেনারা আবার ফিরে এল। বাইরে মৃতদেহের হিসেব মেলেনা। ওরা আবার জোর করে ঘরে ঢুকলো। অর্ধমৃত অধ্যাপককে পায়ে ধরে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে করিডরে নিয়ে এল। সিঁড়িতে দেহ আটকে যাচ্ছিল, থেঁতলে যাচ্ছিল -- একজন ক্যাপ্টেন পিস্তল বের করে পাখি মারার মতো বুকে বুলেট ছুঁড়লো।
এ তো শুধুমাত্র ২৫ মার্চের একটু খন্ডচিত্র! 
তারপর ৯ মাস ধরে বাংলাদেশ জুড়ে সেনা বাহিনী, রাজাকার আর আলবদরদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষাধিক মানুষকে, লক্ষ লক্ষ নারী হয়েছেন পশুদের লালসার শিকার। 
মর্মন্তুদ কাহিনির শেষ নেই  !

প্রশ্ন নং ১৪ : আপনার পরিবার তখন কোথায় থাকতো? পরবর্তী সময়েই বা কোথায় এলেন  ? 
উত্তর : মুক্তিযুদ্ধ শুরুর বহু আগে থেকেই আমি এমবিবি কলেজের হোষ্টেলে থাকতাম। আমার পরিবারের সবাই অমরপুর শহরে আমাদের স্হায়ী ঠিকানায় থাকতো। যুদ্ধ চলাকালীন প্রথম কয়েক মাস আগরতলায় থাকলেও শেষ দিকে অমরপুরে পরিবারের কাছে চলে এসেছিলাম কলেজের কাজ শেষ করে।


প্রশ্ন নং ১৫ : শুনেছি আমার বাবা মা ঠাকুমা'র কাছে তখন নাকি মাইন পেতে রাখা হতো? এতে নানা ঘটনার সাক্ষী আমাদের আত্মীয় স্বজনদের করুণ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। আপনার এ-বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা  ? 
উত্তর : না, আমার সে-রকম কোন অভিজ্ঞতা হয়নি। হতে পারে -- সীমান্ত অঞ্চলে কোন কোন সামরিক কৌশলগত এলাকায় এরকম মাইন পাতা হতো। কিন্তু শহরে কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

প্রশ্ন নং ১৬ : বাঙ্কারও নাকি ত্রিপুরার বর্ডারবাসীর ঘরে ঘরেই ছিল  ! বিপদের আঁচ পেলেই সকলকেই লুকিয়ে থাকতে হতো! আমাদের রাতাছড়ার বাসায় বাঙ্কার করা হয়েছিল। আপনি বিষয়টি বিস্তারিত বলুন। 
উত্তর : হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সীমান্ত অঞ্চলে পাকিস্তানি গোলাবর্ষণ এবং গুলিগোলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রায় সকল বাড়িতেই মাটি খুঁড়ে গর্ত তৈরি করে বাঙ্কার বানানো হতো। বিপদ সংকেত পেলে বা  গোলাগুলি বর্ষণ শুরু হলে তা থেকে বাঁচতে মানুষ বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতো। আগরতলা শহরেও অনেক বাড়ি ঘরেই পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য বাঙ্কার করা হয়েছিল বলে জানি। সীমান্ত থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে --- যেমন আমাদের অমরপুরে বাঙ্কারের প্রয়োজন পড়েনি।

প্রশ্ন নং ১৭ : যদিও আগেই জানা দরকার ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার অবদানের কথা, তা যথাসময়ে না জানলেও এখন যদি বলেন  ? 
উত্তর : ১৯৭১ সালে  মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার চূড়ান্ত জাগরণ ঘটলেও, ইতিহাস বলে, এর অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল কয়েক দশক আগেই। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র কয়েক মাস পরেই ১৯৪৮ সালে জিন্না যখন ঘোষনা করেছিলেন ' উর্দু, শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের ভাষা' তখনই জিন্নার মুখের উপর বাঙালির ছাত্র তরুণেরা বলে দিয়েছিল 'আমরা উর্দু চাইনা, বাংলা চাই'। কিন্তু সেদিন পাকিস্তানের বাংলা-বিদ্বেষী শাসকেরা বুঝতে পারেনি বাঙালির সেই হুঁশিয়ারির গভীরতা।
 কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে তারা নানা ছলনার আশ্রয় নিয়ে, ষড়যন্ত্র করে, মুছে ফেলতে চেয়েছিল বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতির স্বতন্ত্র জাতি সত্তাকে। কিন্তু বাঙালি মনন, চেতনার গভীরে প্রোথিত সেই সত্তাকে মুছে ফেলা কি সহজ বা সম্ভব ? 
সারা পূর্ববঙ্গ জুড়ে শুরু হয়েছিল বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালে সেই ভাষা আন্দোলনে এল প্রবল জোয়ার। পূর্ববঙ্গ উত্তাল, টলমল। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে বেরোলো বিশাল ছাত্র মিছিল। আওয়াজ উঠলো সহস্র কন্ঠে - 'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই'। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল মিছিলের উপর। ঢাকার রাজপথ ভেসে গিয়েছিল রক্তে। ৯ টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো শাসকের বন্দুক। সেদিনের সেই শহীদদের আত্মবলিদানই নির্ধারিত করে দিয়েছিল পূর্ববঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিশা। তারই পথ বেয়ে নানা বাঁক মোড় পতন উত্থান পেরিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবিতে বাঙালি সামিল হল রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে । 'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই'  -- এ স্লোগানটা  গেল পাল্টে। লক্ষ কন্ঠে বাঙালির কন্ঠে তখন নতুন স্লোগান 
'বাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই '।

প্রশ্ন নং ১৮ : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আপনি কখনো শেখ মুজিবকে দেখেছেন? 
উত্তর : না। চাক্ষুষ দেখার সুযোগ হয়নি। তবে কেউ কেউ বলেন তিনি ত্রিপুরায় এসেছিলেন! এমন কোন প্রামাণ্য তথ্য আমার জানা নেই।

প্রশ্ন নং ১৯ : পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন  ? 
উত্তর : আমাদের বৃহত্তর পরিবারভুক্ত নিকটাত্মীয়দের মধ্যে, যারা বাংলাদেশের নাগরিক, অন্তত দুজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। একজন চৌমুহনীর কাঞ্চীলাল দাস, আর একজন লাকসামের নির্মল কুমার দাস। 
এ প্রসঙ্গে 'সেতুবন্ধনে কাঠবিড়ালি'র ভূমিকার মতো আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। বছর দশেক আগে ত্রিপুরার বিশিষ্ট সাংবাদিক সমীর ধরের উৎসাহে শেখ মুজিবের ৯০ তম জন্মদিবসে 'আজকাল ত্রিপুরা'র পাতায় এ নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করেছিলাম। তারই ফটোকপি এখানে সংযোজন করে দিলাম।

আগেই বলেছি, ১৯৭১ সালে এমবিবি কলেজের ২ নম্বর হোষ্টেলে থাকি। " সম্ভবত ২৭ অথবা ২৮ মার্চ হবে। বাংলাদেশের একদল তরুণ তরুনী আশ্রয়ের জন্য ছুটে এলেন আমাদের হষ্টেলে। আমরা তাদের সাদরে গ্রহণ করলাম। এই দলে ছিলেন তখনকার একজন বিখ্যাত ছাত্র নেতাও। সম্ভবত আসম আবদুর রব অথবা আবদুল কুদ্দুস মাখন। নামটা এখন মনে করতে পারছি না। ছিলেন কয়েকজন নাচ গানের শিল্পীও। একজন পুরুষ শিল্পী ছিলেন। যিনি নজরুলের 'কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট'-এর সঙ্গে দারুণ নাচতেন। আমরা সবাই মিলে একটা দল করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছি। বাংলাদেশের মানুষের জন্য চাঁদা তুলেছি। তখন আগরতলা বাংলাদেশ-জ্বরে থর থর কম্পমান। রাস্তায়, মাঠে, হোটেলে, রেস্তোরাঁয়, স্কুলে, কলেজে, অফিসে, আদালতে কেবল 'জয় বাংলা'। কলেজটিলা থেকে একদিন সন্ধেয় আমরা সবাই মিলে সংগঠিত করেছিলাম মশাল মিছিল। আখাউড়া চেকপোস্ট পর্যন্ত সেই মিছিল নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের বন্ধুদের সাহস আর শক্তি জোগানোই ছিল এই মিছিলের লক্ষ্য। তখনও সংগঠিত সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়নি। হাত-পা নিশপিশ করছিল হষ্টেলে আশ্রয় নেওয়া তরুণদের। পাকবাহিনী  বাংলাদেশের কোনায় কোনায় ঢুকে যাচ্ছে। নিরস্ত্র মানুষ পাশবিকতার শিকার হচ্ছে অসহায়ভাবে। এরকম খবর সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিনই আসছিল। সবাই অস্থির। একদিন রাতে তাঁদেরই একজন বললেন, আমাদের কিছু অস্ত্র জোগাড় করে দিন। এভাবে পড়ে পড়ে অসহায়ের মতো দেশের নিরীহ মানুষকে মার খেতে দেখতে পারছি না। কামান-বন্দুক না হোক, অন্তত  কিছু বিস্ফোরক। যাতে আমরা ব্রিজ, রেললাইন--- এসব উড়িয়ে দিয়ে পাক সেনাদের গতি অন্তত রুদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারি। তখন ডম্বুরে চলছিল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ। ওখানে পাহাড় উড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল ডিনামাইট। আমাদের মধ্যে একজন প্রস্তাব দিল ডম্বুর থেকে ডিনামাইট এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য। তৎক্ষণাৎ আমরা রাজি হলাম।। শ্যামলেন্দু মজুমদার ছিলেন আমার সিনিয়র রুমমেট। এখন আগরতলার চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। ওঁর এক সম্পর্কিত ভাই রতন মজুমদার কাজ করতেন ডম্বুর  প্রোজেক্টে। ওভারসিয়ার। আগরতলায় বিদ্যুৎ দপ্তরে এ সি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে খুব সম্ভবত রিটায়ার করেছেন। যেহেতু ডম্বুর অমরপুরে এবং আমার বাড়িও অমরপুরে, আমাকেই বাছাই করা হল ডম্বুর গিয়ে রতনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। আমার সঙ্গে গেল অশোক চৌধুরি। এখন ফরেষ্টে রেঞ্জ অফিসার। আমরা সেই রাতে যতনবাড়ি গেলাম। রতনবাবুর বাসায় উঠলাম। ডম্বুর-যতনবাড়ি তখন কর্মচারী আন্দোলনের এক অগ্রনী স্হান। কর্মচারী নেতা মধু সেনগুপ্ত সুধাংশু ভট্টাচার্য, তপন দাস, তপন চৌধুরি প্রমুখ তখন ওখানে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ঢেউ তখন সবার অন্তরে তোলপাড় করছে। রাতের অন্ধকারে গোডাউনের দরজা খুলে এক বাক্স ডিনামাইট বের করে আমাদের দু'জনের হাতে তুলে দিলেন সেদিনের যতনবাড়ির 
সংগ্রামী কর্মচারী নেতৃবৃন্দ। আমি আর অশোক জিপে করে সেই বাক্স পরদিন রাতে পৌঁছে দিয়েছিলাম সোনামুড়া সীমান্তের কোন এক জায়গায়। জানি না, সেই ডিনামাইট সেদিন কোথাও ব্যবহৃত হয়েছিল কি না। রামচন্দ্রের 'সেতুবন্ধনে কাঠবিড়ালির মতো আমাদের হষ্টেলের বন্ধুদেরও অতিক্ষীন ভূমিকার কথা মনে করে গর্ববোধ করি।"

প্রশ্ন নং ২০ : একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে এত কম সময়ে সাফল্যের স্বাদ পেতে পারে তা মুজিবই দেখিয়েছেন। আবার কম সময়ে এরকম অসম যুদ্ধে জনসম্পদের যে ক্ষতি এতে আত্মীয় হারানো মানুষ মনের ক্ষত কী এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন না  ? 
উত্তর : প্রশ্নের প্রথম অংশটির বিষয়ে আমি বলতে চাই যে, কোন দেশেরই স্বাধীনতার জন্য লড়াই হঠাৎ শুরু হয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে যায়না। এটা আমার বিশ্বাস। এত বড় একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি দরকার। দীপ জ্বালাতে হলে আগে থেকে সলতে পাকাতে হয়। বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সলতেও দীর্ঘদিন ধরে পাকাতে হয়েছে। এতে অনেক দেশপ্রেমিক মানুষ এবং নেতৃত্ব নানা সময়ে নানাভাবে হাত লাগিয়েছিলেন। শেখ মুজিব এই সলতে পাকানোয় নিজের মেধা, দেশপ্রেম, এবং রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ও কৌশলকে সুচিন্তিত ভাবে প্রয়োগ করেছেন, দেশবাসীর অন্তরে স্বাধীনতার স্পৃহাকে উজ্জীবিত করতে পেরেছেন এবং চূড়ান্ত ও সঠিক সময়ে সলতের মাথাটিতে আগুণ ধরিয়ে দিতেপেরেছেন। তাঁর পরিনত প্রজ্ঞা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের জয়লাভকে ত্বরান্বিত করেছে।
প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশটি সম্পর্কে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, যে শত সহস্র লাখো পরিবার  এই যুদ্ধে তাদের একান্ত স্বজনদের হারিয়েছেন,  তাদের এই স্বজন-হারানো অন্তরের গভীরে প্রোথিত ক্ষত কোন কালেই শুকোবে না। আজীবন এই ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ হবার নয়।


প্রশ্ন নং ২১ : ত্রিপুরার জনজাতিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কীরকম সহযোগিতা করেছিলেন? কোন ব্যক্তির নাম বলবেন?
উত্তর : এই বিষয়ে ৮ এবং ৯ নং প্রশ্নের উত্তরে আমি আমার সীমিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার নিরীখে আমার বক্তব্য যথাসাধ্য ব্যক্ত করেছি।  একজন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার শুনছিলাম বছর কয়েক আগে। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁদের ক্যাম্পটি ছিল একটি জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে। জনজাতি মানুষেরা তাঁদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। তাঁদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে হাঁড়ি পাতিল শাক সবজি ইত্যাদি দিয়ে আন্তরিকভাবে  সাহায্য করতে এগিয়ে আসতেন। 'জনশিক্ষা আন্দোলন'এ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী হিসেবে তাঁরা চরিত্রগতভাবেই বিশ্বের যে কোন প্রান্তের মুক্তিকামী মানুষের সহযাত্রী।
ব্যক্তিগত নাম উল্লেখ করার মত তথ্য আমার কাছে নেই। তবে গণমুক্তি পরিষদের নেতা হিসেবে প্রয়াত দশরথ দেব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন।

প্রশ্ন নং ২২ : অপূরণীয় ক্ষতি  এসব কী একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ভুলে যেতে পারে  ? 
উত্তর : এ প্রসঙ্গে আমি ২০ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে সম্যক আলোচনা করেছি।

প্রশ্ন নং ২৩ : সাব্রুম, গরিফা , হরিণা, সোনাই, কৈলাশহর থেকে প্রায় সব বর্ডারেই ক্যাম্প বসেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ ভাবে সামরিক বোঝাপড়া না হলে যুদ্ধ কী এত সহজ ছিল  ? 
উত্তর  : ত্রিপুরার জনগণের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক বোঝাপড়া বিষয়ক প্রশ্নটি নিয়ে আমি খানিকটা দ্বিধাগ্রস্থ। কেননা, বেসামরিক জনতার সঙ্গে সামরিক বোঝাপড়া হয়না। ত্রিপুরার জনগণ, জাতি-উপজাতি এককাট্টা হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপকভাবে পাকবাহিনীর উপর হামলা চালাচ্ছে। ত্রিপুরায় শরনার্থী আগমন অব্যাহত। রাজ্যের সবকটি সীমান্তে গ্রেনেড, রকেট আক্রমণ বাড়তে থাকে। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে পাকিস্তানি ফৌজ আগরতলা শহরের নাগরিক এলাকায় মর্টার শেল বর্ষণ করে। বনমালীপুর, শিবনগর এলাকায় ৩/৪  জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ত্রিপুরা সীমান্তে পাকবাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতির খবর আসতে থাকে। পাকবাহিনী হামলা অব্যাহত রাখে। মুক্তিবাহিনীও প্রবল প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। 
ওদিকে নানা প্রান্তে পাক ভারত সীমান্ত-উত্তেজনাও ক্রমশ চরম আকার নিচ্ছিল। 
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সারা বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিনিধি পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন আর যুৎসই সময়ের অপেক্ষা করছিলেন। ডিসেম্বরে পাকিস্তান কাশ্মীরের বিভিন্ন সেক্টরে ভারতের উপর আক্রমণ হানলো। সেনাপ্রধানরা আর অপেক্ষা না করে দেশের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন : 'ওয়ার ইজ অন। হিট ব্যাক। হিট ব্যাক উইথ অল ইওর মাইট '। 
মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডে তৈরি হল 'মিত্রবাহিনী'। তখনই তৈরি হয়েছিল দু'দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে প্রত্যক্ষ সামরিক বোঝাপড়া।

প্রশ্ন নং ২৪ : দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাবার ক্ষতে কী প্রলেপ দেওয়ার জন্য ভারত সহযোগিতা করেছিল ? না এতে কোন আত্মীক দায়বদ্ধতা ছিল? 
উত্তর : দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল একথা যেমন সত্যি তেমনি অল্প দিনের মধ্যেই পূর্ববঙ্গের মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন রুচি এবং ভিন্ন স্বার্থের মানুষের ধর্ম এক হলেই এক রাষ্ট্রের কাঠামোয় তাদের সংহত করা যায় না। এটা ঐতিহাসিকভাবেই একটি বাস্তব সত্য। তা যদি সম্ভব হতো তাহলে মুসলমান অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইওরোপে এতগুলি রাষ্ট্র  না থেকে একটাই রাষ্ট্র থাকতো। দ্বিজাতি তত্ত্বের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার প্রশ্ন আসেনা কারণ তত্ত্বটাই একটা অবাস্তব অচল ভাবধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। 
ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল আমার বিশ্বাস, নানা কারণে । এক : ভারত সরকার এটা বুঝেছিল যে, নবজাগ্রত বাঙালি জাতিসত্তা একদিন না একদিন নিজেদের মুক্তির পথ খুঁজে নেবেই। তাকে দাবিয়ে রাখা যাবেনা। দুই : মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল সমস্ত বাঙালি জনগোষ্ঠীর অসীমান্তিক আবেগ। এর পাশে না দাঁড়ালে এদেশের বাঙালিরাও বিষয়টাকে ভালভাবে নেবে না। তিন : বিশ্ব সমাজে ভারত স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের  পূজারী বলে পরিচিত। বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনের দাবির বিরোধিতা করলে বিশ্ব দরবারে ভারতের মুখ থাকবেনা। চার : নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটলে  এবং বাংলাদেশ বন্ধু রাষ্ট্র হলে এতদ্ অঞ্চলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে আসবে। পাঁচ :  ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দূয়ার খুলে যাবে। ছয় : সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা মানে পাকিস্তানের জঙ্গিশাহির  পক্ষে দাঁড়ানো। এই অবস্থান ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার পক্ষে ঝুঁকিবহুল হতো নিঃসন্দেহে। 
গণতন্ত্রের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর যে দায়বদ্ধতা  ভারতের ঘোষিত নীতি -- সেটাই এক আত্মিক দায়বদ্ধতা।

প্রশ্ন নং ২৫ : বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে আপনার জীবনের সাথে এমন কোন স্মৃতি জড়িত আছে? আজীবন সে স্মৃতি বহন করছেন  ? 
উত্তর : ১৯ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়টির উপর আমি আলোকপাত করেছি।
প্রশ নং ২৬ : ত্রিপুরার কোন সেক্টরে আপনি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন  ? 
উত্তর : সশস্ত্র যুদ্ধের কোন সেক্টরেই আমি যুক্ত ছিলাম না।


প্রশ্ন নং ২৭ : এখনও অনালোচিত, অনালোকিত কোন ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের  ? 
উত্তর : না, তেমন কিছু মনে পড়ছে না। তবে আমাদের রাজ্যের শিল্পী সাহিত্যক বুদ্ধিজীবীরা সেই টালমাটাল সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে যেভাবে ব্যাপক অংশ নিয়েছিলেন, সেই বিষয়টি কোথাও কোথাও সীমিত উল্লেখ হলেও , আমার মনে হয়েছে যেন , শিল্পী সাহিত্যকদের ভূমিকা আরও বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। 
আমরা ক'জন জানি, আমাদের রাজ্যের একসময়কার স্বনামধন্য নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা প্রয়াত অজিত মজুমদারের  পরিচালনায় এবং নেতৃত্বে  মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তারই রচিত 'জয় বাংলা' নাটকটি অভিনীত হয়েছিল আগরতলায়। 
ক'জন জানি, ১৯৭১ এর এপ্রিল মাসেই গঠিত হয়েছিল প্রখ্যাত গল্পকার প্রয়াত বিমল চৌধুরীর 
সভাপতিত্বে 'স্বাধীন বাংলা সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি'। ওই সমিতির ১৮ এপ্রিল ১৯৭১-এর অধিবেশনে গৃহীত ৭ দফা  প্রস্তাবসহ একটি ছাপানো বিবৃতি প্রকাশ করে যাতে প্রথম অনুছেদটি ছিল -- 'ত্রিপুরার শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত "স্বাধীন বাংলা সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি'র পক্ষ থেকে স্হানীয় নেতাজী পার্কে ও শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্হান সমূহে বিগত ১৮ই এপ্রিল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীদের সমর্থনে নিয়মিত ভাবে স্বদেশী সংগীত 
পরিবেশন, বাংলার পটভূমির উপর রচিত কবিতা ও প্রবন্ধ পাঠ ইত্যাদি গণজাগরণমূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়ে 
আসছে"। 
এছাড়াও আরও বহু অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি পালন করেছে এরাজ্যের শিল্পী সাহিত্যিকরা যার দলিল বা তথ্য আজ আমার সংগ্রহে নেই।

(২৮)এই বুদ্ধিজীবি সমিতির বিষয়ে কিছু বলুন।

উত্তর :প্রয়াত রমাপ্রসাদ দত্তের ( পল্টুদা ) মুখে শুনেছি --  এই সমিতির পতাকা তলে আগরতলার শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা দলমত নির্বিশেষে সমবেত হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে জনউজ্জ্বীবনে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন নানা স্থানে।

প্রশ্ন নং ২৯ : মুক্তিযুদ্ধের এমন কিছু বিষয়, স্মৃতি আপনার সংরক্ষণে আছে  ? 
উত্তর : মুক্তিযুদ্ধকালীন  নানা বিষয়ের কিছু ছবি আমার কাছে দীর্ঘদিন ছিল। কালস্পর্শে অনেকটাই বিনষ্ট হয়ে গেছে। এখনও এক দু'টো  খুঁজলে পাবো, কিন্তু অক্ষত নেই। অস্পষ্ট, ঝাপসা হয়ে গেছে। 
সেসময়ের কিছু পত্রিকার খবরের কাটিং এখনো কিছুটা বেঁচে আছে। শিল্পী সাহিত্যিক সমিতির বিবৃতির একটি কপি আছে।

প্রশ্ন নং ৩০ : আপনার দেখা ১৯৭১ একটু বিশদভাবে জানতে চাই। 
উত্তর :  শুরুতেই ১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এ-বিষয়ে আমার সীমিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুসারে বলার চেষ্টা করেছি। আরও দু'একটি বিষয়, যা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না, এখানে আমি সংযোজন করতে চাই। 
প্রথমটি হচ্ছে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'। এই মামলাই আগরতলাকে তথা ত্রিপুরাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় করে দিয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে আগরতলা সুপরিচিতি পেয়েছে। 
 পাকিস্তানি ফৌজি জমানার বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের মানুষের বিপুল ক্ষোভের আঁচ করতে পারছিল পশ্চিমি শাসকেরা। বুঝতে পারছিলেন, শেখ মুজিবকে জনবিচ্ছিন্ন করতে না পারলে, তাঁকে জব্দ করতে না পারলে ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতি সত্তার বর্শামুখটিকে ভোঁতা করা যাবে না। সেই লক্ষ্যে আয়ূবশাহি ১৯৬৮ সালে  তৈরি করেন 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'র ব্লুপ্রিন্ট। ১৯৬৮ সালে ৩রা জানুয়ারি ঐ সাজানো মামলায় মুজিব সহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা এবং নেতৃত্বেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার  অভিযোগ এনে অভিযোগ গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ ছিল -- সামরিক বাহিনীর এবং প্রশাসনের অফিসারদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ভারতের সহযোগিতায় শেখ মুজিব রাষ্ট্রদ্রোহের চক্রান্ত করেছেন।
কিন্তু 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ' সাজিয়ে বাঙালিদের ধোঁকা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল পাকিস্তান সরকার। মানুষ বহু আগেই বুঝে গিয়েছিলেন কে তাঁদের শত্রু আর কে তাঁদের মিত্র। মুজিবের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করে ফৌজি শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল পাকিস্তানে । এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের তীব্র লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলেন সেখানকার গণতান্ত্রিক মানুষ। আয়ূব খান ১৯৬৯ এর ১লা জানুয়ারি মুজিব সহ সকলকে জেল থেকে মুক্তি দিতে এবং মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেন ।
 আর একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। সেটি হচ্ছে   আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য আগরতলা জিবি হাসপাতালে যেমন ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা রাতদিন খেটেছেন , তেমনি মফস্বলেও গড়ে তোলা হয়েছিল অস্থায়ী হাসপাতাল। এমনই একটি হাসপাতাল ছিল বিশ্রামগঞ্জে হাবুল বানার্জির বাগানে। শুনেছি,  ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটির বিশেষত্ব ছিল -- সেটির ঘর, শয্যা এবং আসবাবপত্র সবই ছিল বাঁশের। 'বাঁশের কেল্লা'র কাহিনি শুনেছি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালে শুনলাম  পৃথিবীতে বেনজির এক বাঁশের  হাসপাতালের কথাও।

প্রশ্ন নং ৩১ : মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাস, ভূগোলে কোন পরিবর্তন এনেছিল ? 
উত্তর : ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের নিষ্পেষণ থেকে মুক্ত হয়ে শুধু একটি স্বাধীন বাংলাদেশেরই জন্ম হয়নি, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক দৃশ্যপটেও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সুচিত করেছিল। একটি নতুন দেশের অভ্যুদয়ে এ-অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে অঙ্কিত হয়েছে। 
প্রায় এক কোটি শরনার্থী আমাদের সীমান্ত রাজ্যগুলিতে -- বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের থাকা খাওয়া চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থাপনায় মানবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকার ও প্রশাসনের নানা স্তরে নানা প্রভাব পড়েছিল যার রেশ বহুদিন পর্যন্ত ছিল। 
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় প্রকাশ্য আলোচনায় খুব বেশি না এলেও, কিছু কিছু স্তরে আলোচিত হয়েছে। বিষয়টি হল -- আমরা জানি যে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল শেখ মুজিব এবং তাঁর দল আওয়ামী লিগ। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল বামপন্থী ভাসানী সমর্থক ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা এবং গেরিলা যুদ্ধকৌশলী নকশাল পন্হীরাও। ভারতীয় রাজনীতিকদের একটা অংশের মধ্যে ভয় ছিল -- মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ভারতপন্থী আওয়ামী লীগের হাত থেকে চীনপন্থী বামপন্থীদের হাতে না চলে যায়  ! কেউ কেউ বলে থাকেন, এ-জন্যই ভারত সরকার তড়িঘড়ি সর্বশক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। 
আর একটি বিষয়ও অভিজ্ঞ মহলের দৃষ্টি এড়ায় না। পাকিস্তান বিভাজিত হয়ে সৃষ্ট নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রত্যাশিতভাবেই এখন ভারতের  প্রতিবেশি বন্ধু রাষ্ট্র । ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত আপাতত দু'ফ্রন্টে যুদ্ধ করার ঝুঁকি থেকে মুক্ত। তাই অনেকেই বলার চেষ্টা করেন যে, পূর্ববঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের ভূমিকা  সম্ভবত ভারতের বিদেশনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

প্রশ্ন নং ৩২ : সে-সময় কোনভাবে জড়িয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কোন কাজে  ? 
উত্তর : এ-প্রসঙ্গে সম্যক আলোকপাত আগেই করেছি।

প্রশ্ন নং ৩৩: জনজীবনে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব আলোকপাত করবেন দয়া করে। 
উত্তর : মুক্তিযুদ্ধের জয়লাভ অর্জনের লক্ষ্য ত্বরান্বিত হোক এটাই আপামর জনজীবনে সবচেয়ে বড় উদ্বেলিত আকাঙ্ক্ষা ছিল। মানুষের জীবনে স্বাধীনতার গুরুত্ব, গণতান্ত্রিক অধিকারের গুরুত্ব যেন নতুন করে অনুভব করতে পারছিল মানুষ। জনমনে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিবাচক তাৎপর্য অনস্বীকার্য। 
এ-তো ছিল একটা দিক। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে যে খানিকটা সমস্যা তৈরি হয়নি তা নয়। যদিও  শরনার্থীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা পূরণে ভারত সরকার  ও আন্তর্জাতিক ত্রান সংস্থাগুলো যথাসম্ভব ত্রান সরবরাহ করে গেছে, তথাপি লক্ষ লক্ষ মানুষের সামগ্রিক চাহিদা পূরণের তাগিদে স্হানীয় অর্থনীতি ও বাজারে অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল, এটা অস্বীকার করা যাবে না। জিনিসপত্রের দাম, যোগান , মজুত ইত্যাদিতে কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া কোথাও সৃষ্টি হয়নি। মানুষের বোধ এবং চেতনা মানুষকে সেটুকু মেনে নিতে সাহায্য করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে দু'দেশের মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে ত্রিপুরার জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নানা ক্ষেত্রে আরো প্রসারিত হয়েছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়গুলি খানিকটা স্পষ্ট হবে। আগরতলার ছোট্ট বাংলাদেশ ভিসা অফিসটি ধাপে ধাপে সহকারী কমিশনের অফিসে উন্নীত হয়েছে। ভিসা ফরম্যালিটিজগুলো অনেক টাই সরলীকৃত হয়েছে। সীমান্ত চৌকিগুলোর পরিকাঠামো অনেক উন্নত হয়েছে। আগরতলায় আন্তর্জাতিক মানের চেকপোষ্ট নির্মিত হয়েছে। আমদানি রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সাব্রুমে মৈত্রী সেতুর কাজ সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আশা করি হচ্ছে ,  দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দূয়ার খুলে যাবে। ত্রিপুরা একদিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গেটওয়ে  হয়ে উঠবে। 
পালাটানা বিদ্যূৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় অতি ভারী যন্ত্রপাতিসমূহ স্থলপথে আনা সম্ভব হতো না, যদি বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিত। পাকিস্তান সরকার থাকলে এটা প্রায় অসম্ভব ছিল। 
এ-সবকিছু আমাদের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং দু'দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। 
অপরপক্ষে বাংলাদেশও স্বাধীনতার৫ সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ  পিছিয়ে পড়া  একটি অনুন্নত দেশ থেকে বর্তমানে উন্নতশীল দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি দেখা গেছে বাংলাদেশ গড় জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে।

প্রশ্ন নং ৩৪ : আপনার জীবনে ও রচনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব কতোখানি  ? 
উত্তর : বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি, আমার শেকড়। শেকড়ের গুরুত্ব, শেকড়ের টান যে কারও জীবনে অপরিসীম। ফলে বাংলাদেশের ভালোমন্দের সঙ্গে আমার আজীবনের নাড়ীর যোগ অবিচ্ছেদ্য। চেতনে , অবচেতনে আমার চিন্তা, ভাবনা  কোথাও না কোথাও শেকড়ের রসধারায় সিঞ্চিত। 
বছর কয়েক আগে একদিন তরুণ চিত্র সাংবাদিক রাজু ভৌমিক আমার বাড়িতে  এলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার ভূমিকা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করার ইচ্ছে প্রকাশ করলো এবং আমাকে অনুরোধ করলো একটি চিত্রনাট্য ( স্ক্রিপ্ট) তৈরি করে দেবার জন্য। আমি সানন্দে তা করতে রাজি হলাম। একটি চিত্রনাট্য তৈরি করে দিলাম। এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করলাম বিশিষ্ট সাংবাদিক মানস পালকেও। রাজু বহু পরিশ্রম করে, অক্লান্ত খেটে নির্মাণ করলো তথ্যচিত্র 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা'। আগরতলায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে রিলিজ হলো। প্রশংসিত হলো। 
তথ্যচিত্রটি বাংলাদেশের 'মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ'এ গুগলে আপলোড করা আছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা 
তথ্যচিত্র রচনা:সুভাষ দাস

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দাদা। 
১৫:০৬:২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ