কী লিখি কেন লিখি
এমরান হাসান
কী লিখি কেন লিখি
এমরান হাসান
কবি ও প্রাবন্ধিক
লেখাটা আসলে নিজেকে একরকম প্রকাশ করার জন্যই করা। নিজের চিন্তা,নিজের বিশ্বাস, সমস্ত দীর্ঘশ্বাস কে লুকোনোর একটা প্রক্রিয়াকেই মূলত আমি লেখা হিসাবে বলতে পারি।প্রথম লেখার শুরুর ঘটনাটি ঠিক গল্পের মত নয়। অনেকেরই তো অনেক রকম বিষয় থাকে, অনেক রকম গল্প থাকে অনেক রকম ভাবনা থাকে, যে ভাবনা; যে গল্পগুলোর ভেতর থেকেই মূলত তারা লিখতে শুরু করেন। আমার বিষয়টা একটু উল্টো ।একেবারেই খেলতে খেলতে লেখার শুরু। বলা যেতে পারে অনেকটা মাটির সাথে জল মিশিয়ে তাকে মণ্ড তৈরি করে বা কাদামাটির কিছু একটা তৈরি করে তার ভেতরে একটা মনের অবয়ব দেয়ার যে প্রক্রিয়াটি সেরকম থেকেই আসলে লেখার শুরু।
ছোটবেলায় ঘরে একা একাই সময়গুলো কাটাতাম। একেবারেই কোন খেলার সঙ্গী ছিল না। তখন কিন্টার গার্টেনে আমি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। মা-বাবা দুপুরে খাবার পর ঘুমাতেন আর আমি বাইরের ঘরে গিয়ে বাসায় রাখা প্রতিদিনের পত্রিকাটি নেড়েচেড়ে দেখতাম। পড়তে যদিও পারতাম আসলে তেমন বুঝতেও পারতামনা পত্রিকার কথাগুলো। আমি পত্রিকার ছবির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতাম আমাদের দেশের রূপের কথা। কী সুন্দর আমাদের দেশ! এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন নিজের ভেতর একটা জগৎ তৈরি হয়ে গিয়েছিল! এখন বুঝতে পারি, ওই জগৎকেই আমরা মনোজগৎ বলি। তো যাই হোক, ওরসেই মনোজগতের ভেতর ছবি আঁকা হতে থাকতে থাকতে বেশ কিছু দিন চলে যায়। কিছুদিন পর বর্ষার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে যাই সবার সাথে। পুকুরে সবাই সাঁতরে বেড়াত। আমি সাঁতার না জানার কারণে প্রায়শই পুকুরের পাশে বসে বসে অন্য সকলের সাঁতার দেখতাম। খুব শখ করে পুকুরে একদিন নেমেছি কলাগাছের ভেলা ধরে ধরে সাঁতার শিখবো বলে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন মায়েব বকুনি খেয়ে তিন ঘণ্টা পর পুকুর ছেড়ে উঠেছিলাম। আসলে কে যেন সাড়া দিয়েছিল ওই দিন। সব ভাই- বোনেরা যখন রাতের বেলা খাবারের এরপর হই-চই করায় ব্যস্ত আমি তখন একটা খাতার পাতায় কাঠ পেন্সিল দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে ছড়ার মতো কিছু একটা লিখে ছিলাম নিজের মনে । ছড়া বললেই বেশি ভালো হয়। ওই লেখাটির দুটো লাইন এখনো মনে আছে...
সাঁতার কাটিতে মাঝ পুকুরে
জমেছে মধুর খেলা
মা হাঁকিতেন উঠে আয় খোকা
কেটে যে গেল বেলা
এরপর থেকেই কেমন যেন আনন্দ পাওয়া শুরু করলাম। সময় পেলেই দু-এক লাইন করে লিখতাম। ছড়ার মত অন্তমিল দিয়ে এক-পা দু-পা করে করে প্রতিদিনই প্রায় লেখা হতো কিছু না কিছু। প্রথম লেখা প্রকাশের ঘটনাটি একটু আনন্দের এবং অন্যরকম। আমি তখন সরকারি বিন্দুবাসিনী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র। সময়টা ২০০২ এর মাঝামাঝি। আমাদের এই শহরে অর্ক পরিবার নামে একটি সংগঠন কাজ করতো। তাদের একটি দেয়াল পত্রিকার জন্য আমার একজন শিক্ষক আমার কাছে লেখা চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন আমার লেখার অভ্যাসের কথা। দুরুদুরু বুকে আমি তাকে একটি লেখা দিয়েছিলাম। এটি ছিল একটি কবিতা, আট লাইনের। ঠিক সাত দিন পর নিজের স্কুলে দেয়ালে নিজের লেখা টি লিখে থাকা দেখে আমি যারপরনাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। এরপর ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে আমার বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর টাঙ্গাইলের স্থানীয় একটি পত্রিকা পূর্বাকাশ দপ্তরে আমি দু'টি কবিতা দিয়ে আসি। নিতান্তই শখের বসে। এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক পত্রিকা গুলোর মধ্যে এই পত্রিকাটির বেশ সুনাম রয়েছে। মাসখানেক পর সেখানে আমার একটি কবিতা ছাপা হয়। এবারও আনন্দিত হই আমি। এরপরে লেখা'টা একপ্রকার নেশার মতই হয়ে যায় আমার কাছে। সময়ে-অসময়ে নিজের শূন্যতা, নিজের ক্ষোভ, দুঃখ-হাসি কিছুই আমি লিখে রাখতাম কবিতার মত করে। ডায়েরিতে পাতার পর পাতা শুধু এ কথাগুলো লেখা থাকতো। ২০০৬ সালে টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগার কর্তৃক আয়োজিত তিন দিনব্যাপী কবিতা উৎসব হয় স্থানীয় ভাসানী হলে। এখানে অনেকের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। আমার বেশ মনে আছে এই উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন কবি আল মাহমুদ। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সাথে বেশ অনেকক্ষণ কথা বলার। তখন কেন যেন মনে হচ্ছিল সবকিছুই কিন্তু একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে ঘটে যাচ্ছে। ঐ অনুষ্ঠানে পরিচিতি হয়েছিলাম বিশিষ্ট গবেষক ড. সফিউদ্দিন আহমদ,কবি আসাদ চৌধুরী, কবি তপন বাগচী, কবি শামীম রেজা, কবি অনিকেত শামীম সহ আরো অনেকের সাথেই। সেই সময় কবি শামীম রেজা অধুনালুপ্ত আজকের কাগজ পত্রিকার সাহিত্য পাতা সুবর্ণরেখা সম্পাদনা করতেন। তিনি আমাকে লেখা পাঠাতে উৎসাহিত করেন তার কাগজে। আমি তার উৎসাহেই সুবর্ণ রেখায় লেখা পাঠাই, ছাপাও হতে থাকে। ঐ পত্রিকায়ই আমার গদ্য রচনার হাতেখড়ি।সেটি ছিলো পশ্চিমবঙ্গের কবি অমৃত মাইতি'র একটি কবিতা গ্রন্থ।
পারিবারিকভাবেই একজন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন কবিতার রাজ্যে প্রবেশের। তিনি আমার মাতামহ। হাইস্কুল শিক্ষক ছিলেন তিনি। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতেন, কবিতা লিখতেন,গজল লিখতেন, আবার নিজেই তা আবৃত্তি করে বেড়াতেন চারণ কবির মতো। এই মানুষটির কোন প্রায় সব লেখাই অপ্রকাশিত। বর্তমান সময়ে তেমন একটা খুঁজেও পাওয়া যাবে না হয়তো। তার মৃত্যুর আগে তার একটি কবিতা আমি কম্পিউটার-কম্পোজ করে দিয়েছিলাম। সেই লেখাটিকে তিনি গলায় রক্ষা-কবজ এর মত ঝুলিয়ে আনন্দ নিয়ে বসে থাকতেন। এ বিষয়টি আমাদের শৈশবে খুব বেশি তাড়িত করেছিল। আমার তখন কেন যেন মনে হয়েছিল তার অসমাপ্ত বেশকিছু কাজ আমাকে সমাপ্ত করতে হবে আর সে জন্যই মূলত লেখার দিকে একটু জেদ করেই ঢুকে পড়েছিলাম। তার একটি কবিতা পরবর্তীতে আমি একটি গ্রন্থে প্রকাশ করতে সমর্থ হই। বলতে গেলে তিনি আমার লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আমি লিখি এই জিনিসটা তিনি কখনো চাইতেন না। আবার বাধা দিতেন না কখনো। তার এই ভালোবাসায় আমাকে পরবর্তীতে লিখতে বাধ্য করেছে, প্রকাশ করতে বাধ্য করেছে জীবনের সর্বৈব সত্য।
প্রেমের শুরুটা এভাবেই হয়েছিল লেখার সাথে। তারপর থেকেই নেশার মত লিখেছি এখনো লিখে যাচ্ছি। নিজের মনের ভেতর একলা একার ভাবনা এবং সেই ভাবনার পরিস্ফুটন ঠিক কিভাবে হয়েছিল নিজের ভেতরে সেটা বলা সত্যিকার অর্থে একটা কঠিন ব্যাপার। আসলে নিজের ভেতরে নিজের যে একটা গোলার্ধ তৈরি হওয়া যেটা সব লেখকের এর মধ্যেই হয়ে থাকে এরকম একটা বিষয় আমার মধ্যেও তৈরি হয়েছিল,সে অনেক আগে, হয়তো তখন ভাবিনি কখনো লিখবো।ভাবি নি কী পাব? কেনইবা এরকম ছুটে চলা? কেবল লিখে গেছি নিজের আনন্দের জন্য।
অনুপ্রেরণা আসলে অনেকের কাছ থেকেই পেয়েছি। এর মত নিজে লিখে যাওয়া, গোপনে গোপনে নিজেকে একটা বিশেষ জায়গায় দাঁড় করানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করার দিকেই মনোযোগ ছিল বেশি যে কারণেই হয়তো এখনো বই করা হয়নি । ছোটবেলা থেকেই আবৃত্তির সাথে জড়িত। যে কারণে কবিতা পড়ার প্রতি একটা দীর্ঘ নেশা ছিল। তখন কেনো যেনো মনে হতো একটু অন্যরকম কিছু তৈরি করা সম্ভব, সহজ সাবলীল ঘরানার আড়ালে কিছুটা ব্যতিক্রমী ভোট দিয়ে তৈরি করা যায় নতুন কোন একটা পরম বস্তু ভাবগত বিষয় যাকে কবিতা বললে বেশিই বলা হয়। ভাবনা থেকে আসলে লেখার শুরুটা হয়েছিল। আমি থাকি একটি মফস্বল শহরে। এই শহরে অনেককেই বিখ্যাত কবি রয়েছেন বর্তমানে এবং বাংলাদেশের সাহিত্য চর্চায় এই শহরের স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে।এসব বিষয়গুলো আসলে আমি কখনো ভাবায়নি। সব সময় মনে হয়েছে এমন একটা কিছু করা দরকার এমন একটা চিন্তাকে লেখার ফ্রেমে আনা দরকার যে চিন্তাটি সবাই করে কিন্তু কেউ সাবলীলভাবে তার নিজের ইচ্ছামত প্রকাশ করতে পারে না। আমি আসলে এই কাজটিই করতে চেষ্টা করছি গভীর মনোযোগের সাথে। কখনো কখনো নিজেই কবিতার সাথে হেঁটে হেঁটে চলে যাই অতলান্তিক ভাবনার স্রোতে। মাঝে মাঝে যারা লিখছেন তাদের সাথে আড্ডা কিংবা কথাবার্তা থেকেও অনুপ্রাণিত হই। বেশি অনুপ্রাণিত হই নীরবতা থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধই আমাকে লেখার জন্য গভীরভাবে তাগিদ দিতে থাকে। সেখান থেকে আসলে সিরিয়াসলি লেখার শুরুটা হয়েছিল।
প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেবটা সত্যিকার অর্থেই কখনো করিনি আজো। অর্জিত হয়েছে সাধারণ মানুষের সঙ্গ, অর্জিত হয়েছে গভীর কোনো কিছুকে খুব সহজেই উপলব্ধি করার ক্ষমতা।
লিখছি নিজের মতই। জীবনে টানাপোড়েনের পাশাপাশি দেখতে পাওয়া পরম গভীরের উত্থানপতন আমাকে কলম ধরতে বাধ্য করেছিল শৈশবে। সেই থেকেই শুরু।নিজের ভাবনা গুলো লিখতে পারি, নিজের কথাগুলো নিজের মত বলতে পারি। এসবের থেকে আর কিই-বা আছে এই দুনিয়া নামক বৈকুণ্ঠে?
0 মন্তব্যসমূহ