কী লিখি কেন লিখি স.ম. শামসুল আলম

কী লিখি কেন লিখি 
স.ম. শামসুল আলম


কী লিখি কেন লিখি 
স.ম. শামসুল আলম

কবি-শিশুসাহিত্যিক-গীতিকার

নিস্তব্ধতা ভাঙার মতো কোনো শক্তিশালী শব্দ আমার কণ্ঠে নেই। অথবা নৈমিক্তিক কোলাহল থামিয়ে দেবার মতো কোনো যাদু-মন্ত্রও আমার জানা নেই। তবে আমার স্পন্দিত অন্তরে একধরনের হাহাকার তৈরি হয়। এটা ঠিক পণ্য উৎপাদনের মতো, কিন্তু কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। বলা যায় আনন্দ-পণ্য। ব্যক্তিগত আনন্দ, যেটা দিয়ে অন্য কাউকেও আনন্দদানের চেষ্টা করি। আমি কীভাবে আনন্দ করব অথবা আনন্দ দেব, সেটা অবশ্যই নির্ভর করে আমার অন্তর থেকে নির্গত শব্দ সাজানোর ওপর। কখনো এই হাহাকার মিশ্রিত শব্দগুলোকে আমি রূপদান করি কবিতার পঙ্ক্তিতে, কখনো সমকালীন ভাবনাসমৃদ্ধ ছাড়ায়, কখনো গল্পের অবয়বে, কখনো পরিশীলিত কলামে, কখনো সুরঝংকৃত সংগীতে, কখনো সামাজিক প্রেক্ষাপটবিধৃত নাটকে, কখনো পরিসর বৃদ্ধি করে উপন্যাসে, কখনো শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক দিক বিশ্লেষণে শিশুসাহিত্যের সকল শাখায়। এই আকৃতি রূপায়ন আপনাআপনি হয়ে যায়। কেননা আনন্দটা আমি যে-কোনোভাবেই করতে পারি। স্বাধীনতা আছে। যে-কোনো মানুষের যে-কোনোভাবে আনন্দ করার স্বাধীনতা থাকে। 
কেন এতসব বিষয়াদি নিয়ে লিখি তার সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। আমি লিখলে বা না লিখলে কারো কিছু এসে যায় না। তবুও ভেতর থেকে লেখার একটা তাগিদ অনুভব করি। যদি আমার এই লেখাটি পড়ে কোনো একজন অসৎ ব্যক্তি সৎ হয়ে যান, দুর্নীতিপরায়ণ কোনো ব্যক্তি যদি সুনীতির পথে পা বাড়িয়ে দেন, কারো ভেতরে যদি দেশপ্রেম জাগ্রত হয়--এসব ভাবনা একেবারে অমূলক মনে করি না। হতেও তো পারে, আমার একটি লেখা কারো মনে তদ্রুপ রেখাপাত করেই ফেলল! লেখালেখির ব্যাপারে আমার একটি কমিটমেন্ট আছে--দেশ ও মানুষ। আমি কারো প্রতি কখনো আনুগত্য প্রকাশ করে লিখি না। যেটা সঠিক মনে করি, সেটাই লিখি। কখনো আমি আমার কমিটমেন্টের বাইরে যাই না। অতি বাস্তবের ভেতরে প্রয়োজনে পরাবাস্তব মিশেল দিতে হলে, পরাবাস্তবকেও জীবন্ত করে তুলতে নিরতিশয় প্রয়াস চালাতে সচেষ্ট হই। জীবনধারা বদলে দেবার পক্ষে আমি নই, তবে প্রতিক্রিয়াশীল ও পরাক্রমশীল গোষ্ঠীর চিন্তাধারাকে বদলে দেবার পক্ষে। এরকম প্রগতিশীল মনোভাব আমার নির্ধারিত ব্যথনবিন্দুতে দাপাদাপিপূর্বক চাপ প্রয়োগ করে বলেই আমি লিখি। আবার অন্যভাবে বলা যায়, গায়ে জোর নেই বলে মনের জোর কাজে লাগাই। 
কীভাবে লিখি তা বলে বুঝাতে পারব না। যখন অন্তরের টান আমাকে একেবারে হেলিয়ে দেয়, তখন না লিখে থাকতে পারি না। নিজে একবার হেলে পড়লে আর উপায় থাকে না। এটা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো কাজ করে। পড়ন্ত বস্তুকে পড়তে দিতে হয়। আটকে রাখাই বরং দুঃসাধ্য কাজ। ফলে স্বতঃস্ফূর্ততা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লিখতে গিয়ে অনেক সময় আমি কাঁদি, অনেক সময় আমি হাসি। এটাই স্বতঃস্ফূর্ততা। আমার কান্নাকেও অবহেলা করি না, হাসিকেও অবহেলা করি না। গুরুত্ব দেবার ক্ষেত্রে আমি সচেতন। ফলে আমার লেখায় একধরনের আত্ম-অহংকার থাকে। সেই ধরন অবশ্য নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ--কেউ অনুধাবণ করতে পারে না, এমনকি ধারণ করতেও পারে না। ফলশ্রুতিতে, আমি নির্বিঘেœ ও নিশ্চিন্তে লিখতে পারি। 
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতা, উপসম্পাদকীয় পাতা, শিশুদের পাতা বা অন্যান্য সাহিত্য পত্রিকা ও শিশু-কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত আমার লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমার অতৃপ্তির জায়গা থেকে যায়। আমি যদি আরো ভালো লিখতে পারতাম, আরো মানসম্মত লেখা লিখতে পারতাম। এসব অনুশোচনা আমাকে অবশ্যই পরিণত লেখা লিখতে সাহায্য করে। কিন্তু ইচ্ছের মতো সব সম্ভব নয়। সাধনা এবং সৃষ্টিকর্তার যোগসাজস প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। তবে উৎসাহ দেবার মতো নির্ধারিত কারো নাম বলছি না। অনেকেই প্রেরণা দিচ্ছেন। বন্ধুবান্ধবেরা প্রশংসা করেন, সম্পাদকেরা লেখা ছেপে উৎসাহ দেন--এগুলো আমার বড় প্রাপ্তি বলে মনে করি। লেখালেখির শুরুতে আমার কোনো গুরু ছিল না। কারো দ্বারা কখনো প্রভাবিত হইনি। তবে, অনেক পরে শিশুসাহিত্য নিয়ে আমাকে কিছুটা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। তিনি আমার লেখা প্রথম যখন ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে ছাপেন, তখন থেকে ৬ বছর পর তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়। ঘনিষ্ঠ হতে আরো দু বছর সময় লাগে। তিনি তখন চাইতেন আমি যেন শিশুসাহিত্য চর্চাটা বেশি করি। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করতাম ও গুরু মানতাম। তাঁর ইচ্ছে থাকাতেই আমার ব্যাক ডেটেড নামটা পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়নি।

এ পর্যন্ত আমার ৭৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে শিশুকিশোরদের জন্য লেখা গ্রন্থের সংখ্যা বেশি। ১৯৮৭ সালে কবিতার বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। এখনো মনে হয় সেই আনন্দটা ভুলতে পারিনি। অর্জন বলতে আমার প্রকাশিত গ্রন্থগুলি। তবে কয়েকটি বই কয়েকবার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে এবং ‘আমার বঙ্গবন্ধু’ বইটির ৭টি মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে--এটা বড় অর্জন বলেই মনে করি। আমার লেখা গানে সুবীর নন্দী, কুমার বিশ্বজিৎ ও রূপঙ্কর চক্রবর্তীর মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা কণ্ঠ দিয়েছেন--এটাও বড় অর্জন। বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা পেয়েছি, সেটাও কম কি? অর্জন আর প্রাপ্তি নিয়ে কখনো ভাবিনি, এখনো ভাবি না। আমি আমার ইচ্ছের মতো, চাওয়ার মতো লেখা লিখে যেতে পারলেই স্বস্তি পাব। লেখা হোক আমার ধ্যান-জ্ঞান, সুখ-শান্তি, ধর্ম-কর্ম--সকল কিছুর ঊর্ধ্বে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ