বাবার দেশবাড়ি গোবিন্দ ধর

বাবার দেশবাড়ি 

গোবিন্দ ধর 




বাবার দেশবাড়ি 

গোবিন্দ ধর 

শ্রীহট্টীয়পুরাণ

শেকড় উপড়ানো গাছ আমি।
নাগরীলিপি ভুলে গেছি কবেই
শব্দকোষ যৎসামন্য মনে থাকলেও
পুরায় বুঝি না হেরে বুঝি।

শ্রীমঙ্গল আগুন লাগলে এখনো দেখি।
বাবার পদধূলিমাখা চালতাপুর বর্ডার হয়ে
যেদিন আমিও ভারতে এলাম
শরীরের লোমকূপ কাঁটা দিয়ে উঠলো।

আমিও শ্রীহট্টীয় আমার রক্তেও আছে
সিলেটের লবণ ও মাটি
জেতাগাছ হয়তো মনের গভীরে
বাকীটা শেকড় উপড়ানো মৃতকাঠ।

০৮:০৬:২০১৮
রাত:১১টা ৪০মি
কুমারঘাট।
[
আত্মজীবনী:৪

তাহলে কি আর কিছু করার নেই 
সময়ের নিকট মাথা নত করে 
চলে যেতে হবে দিকশূন্য পুর?

ছেলেটি মেয়েটি আবাল্য থেকে কিছু পেয়েছে? 
যদিও পেয়ে থাকে তাদের আর কিছু পাওয়ার নেই?
যদি না পেয়ে থাকে তাও পাবে না আর?

তাহলে কি গোপনে বেঁধেছে কর্কটজাল
শেকড় বিছিয়েছে শরীর জমিনে 
তারই কী পূর্বাভাস জানাতে চায় শ্রীচরণ। 

ক্রমশ চিতার আগুনসম জ্বলে কর্কটশরীর
পিতার কর্তব্যের কাছে হেরে যায় পিতা
সন্তানের মুখে দেখি অজানা সংক্রমণ। 

বন্ধন  অটুট থাকুক কিছুটা সময় 
এই প্রত্যাশার নিকট মাথা এসে ভূমিষ্ট 
আত্মজন আত্মার নিকট চায় মুক্তিপণ।

নিজেকে নিজেই বলি চলো হাঁটি
কর্কটক্রান্তি রেখার বিপ্রতীপে 
তাও মাথা এসে খুলে মায়াবী শিরস্ত্রান। 

১৬:১০:২০১৯
রাত:০২:৪৫মি
কুমারঘাট।

আত্মজীবনী :১


সেলাই রিপু আর জুড়াতালির সংসারে আমি তৃতীয় পাণ্ডব। 
সারাক্ষণ পার্থের ভূমিকায় থেকেও একটি পরিবারের স্লোগান শিখি।পাঠ নিতে নিতে জরুরী পতাকা আকড়ে বেঁচে আছি।
হাভাতে সংসারে কাঁঠাল বিচির উপদ্রব সহ্য করে করে 
ভাত নামতো গলদেশ।
নুন নেই তো পান্তা নেই দিন আনি দিন খাই ছিলো বাজেট।
ভাতের নেশায় পাগলের মতো দৌড়তাম 
এই রকম কেটে গেলো জীবনের সতেরো বসন্ত।
তারপর নেমে আসে ঘুর অন্ধকার। চারদিকে শুধু ক্লোরোফিল বাবার মতো অক্সিজেন নেই। 

১২:০৬:২০১৯
সকাল:১০:৩৫মি
রাজেন্দ্রনগর।

 ঠাকুমা

বাবার মাকে ঠাকুমা ডাকতাম
তিনি বয়স হওয়ার পর আরো তেজস্বী।
মা ঘর লেপলে তিনি খুশি হননি
বলতেন :"পা দিয়ে লেপলেও আরো ঝকঝকে
মাটির ঘর লক্ষ্মী লক্ষ্মী লাগবে"।
মা তেমন গায়ে মাখতেন না।

আমরা ঠাকুমার সাথে খুনসুটি করলে
তিনি এক দুজনকে ধরে
এক পা নিজে এক পা উপরে তুলে
বলতে:"এখন ছিঁড়ে ফেলি"? 

অনেক কাকুতি করে রক্ষা পেতাম।
আবার খুনসুটি:"বুড়ি ওই বুড়ি"?
তিনি আবার কোন রকমে  ধরলে
আমরা মিঁউ মিঁউ করতাম।

আমরা জানতাম তিনি সরোজিনী মুক্তিকামী নারী।
তাঁর গলায় বাঘিনীর শব্দ গমগম করতো
আর শরীরে ছিলো অসম্ভব বল।
আমরা দুতিনজন এক সাথে কাহিল হয়ে পড়তাম
যখন মাটির উঠোনে টেনে হিঁছড়ে নিতেন।

অসুখে বিছানায় পড়ার আগে অব্দি তিনি
বীরঙ্গনা, আমাদের সকল আবদারের আশ্রয়।

১৩:১১:২০১৮
রাত:০৮:০৫মি
কুমারঘাট।


বাবা বিষয়ক

আমার পাপা নেই
ফাদার নেই
ডেড নেই।

আমরা সকল ভাই বোনের
একজনই বাবা ছিলেন।
তিনিও নেই অনেকদিন।

বাবার শূন্য সময়  ধরে
দাদারা শিব্রাই ফাদার।

১৬/১০/২০১৬
সময়:সকাল:৭:৪৫
 দেওপার

আত্মজীবনী :৩

তিরিশ বছর বাবা নেই 
মা নেই ২৪ বছর।
এখনো বাবার শেষ কথা প্রতি নিয়ত
আমার কানে এসে লাগে:"সুভাষ দেখে রাখিস 
আমার সন্তানদের"।
সুভাষ আমার কাকা আমরা বাবু ডাকতাম।
তিনি বাবার মৃত্যুর পর কোনদিন দেখে রাখেননি।

মাকে বলেছিলাম:"বিদায়"
সাথে সাথে মা কথা রেখেছেন।
এসব জীবনের গল্প ভুলে বাঁচা যায়?

১৪:১০:২০১৯
রাত:০৮ঃ৪৮মি
কুমারঘাট।


রাতাছড়া সমগ্র :এক


মাটিতেই আঁকতাম ঘাতক,বন্ধুক
বৈরী বাতাস এলে 
মাকে জড়িয়ে বলতাম আমি একাত্তরের যুদ্ধশিশু।
কখনই প্রকৃত বন্ধুক না ছুঁয়েই আমিও স্বাধীন। 

এ দেশ আমি ও আমার বন্ধু আব্দুল আলিম মতিন
আর মসজিদের যুবক বদরুল হোসেন, তারও।

যদিও বাহান্নের ভাষা আন্দোলনে ঠাকুরদা
রাতাছড়ায় প্রান্তিককৃষক,বাবা সবে নবমশ্রেণি।

২৪:০১:২০২০
সময়:৫:৫০মি
কুমারঘাট।


রাতাছড়া সমগ্র :দুই 

কৃষিবিদ ঠাকুরদা শিক্ষক ছিলেন 
ঠাকুমা সরোজিনী সামান্য সামাজিক 
বাবা লেব্রেটরী এসিটেন্ড আর
মা যৌথ পরিবারে জোড়াতালি দিতে দিতে
নিজেই নিজেকে রক্তাক্ত করে 
১০০% সফল গৃহিণী চিরকাল। 

২৬:০১:২০২০
সকাল:০৭:০০টা
কুমারঘাট।



মৌলভীবাজার জেলা

বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের একটি জেলা মৌলভীবাজার জেলা (সিলেটী: ꠝꠃꠟꠜꠤꠛꠣꠎꠣꠞ) বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। মৌলভীবাজার পৌরসভাকে বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর পৌরসভা হিসাবে বিবেচনা করা হয় | প্রশাসনের উদ্যোগে এই পৌরসভার ব্যাপক কর্মকাণ্ড চলছে | বর্তমান পৌরসভাকে আরো আধুনিক ও মানসম্পন্ন নাগরিক সুবিধা দিতে মৌলভীবাজার জেলা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন |

বাংলাদেশে মৌলভীবাজার জেলার অবস্থান

বাংলাদেশে মৌলভীবাজার জেলার অবস্থানস্থানাঙ্ক: ২৪°৩০′ উত্তর ৯১°৫০′ পূর্ব। দেশ বাংলাদেশ বিভাগ সিলেট বিভাগআয়তন • মোট২,৭৯৯ বর্গকিমি (১,০৮১ বর্গমাইল)জনসংখ্যা (২০১১[১]) • মোট১৯,৯৪,২৫২ • জনঘনত্ব৭১০/বর্গকিমি (১,৮০০/বর্গমাইল)সাক্ষরতার হার • মোট৫১.১%সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)প্রশাসনিক
বিভাগের কোড৬০ ৫৮।

ভৌগোলিক সীমানা

উত্তরে সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা, গোলাপগঞ্জ উপজেলা ও বিয়ানীবাজার উপজেলা; দক্ষিণে ত্রিপুরা রাজ্য (ভারত); পূর্বে কাছাড় (ভারত)এবং পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলা ও বাহুবল উপজেলা। জেলার প্রধান নদ-নদী ৬ (ছয়)টি- মনু, বরাক, ধলাই, সোনাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ


ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী মৌলভীবাজার জেলার স্বাগত মিনার।

এই জেলা সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত; এগুলো হলোঃ

কমলগঞ্জ,কুলাউড়া,জুড়ী,বড়লেখা,মৌলভীবাজার সদর,
রাজনগর এবং শ্রীমঙ্গল।

ইতিহাস

শাহ মোস্তফা-এর বংশধর মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মনু নদীর উত্তর তীরে কয়েকটি দোকানঘর স্থাপন করে ভোজ্যসামগ্রী ক্রয় বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেন। মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ প্রতিষ্ঠিত এ বাজারে নৌ ও স্থলপথে প্রতিদিন লোকসমাগম বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমের মাধ্যমে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে মৌলভীবাজারের খ্যাতি।
কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব : হয়রত শাহ মোস্তফা (র:), মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী হামিদুর রহমান,কবি মুজাফফর খান, সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রাক্তন প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্য, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও দানশীল ব্যক্তিত্ব মো. কেরামত আলী, প্রাক্তন জাতীয় পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ মুহিবুর রহমান [[১]], জাতীয় পরিষদ সিলেটের প্রথম মহিলা সদস্য বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী, সাবেক স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, গবেষক ড. রঙ্গলাল সেন প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধ : মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজার ছিল ৪ নং সেক্টরের অধীন। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সি.আর.দত্ত। রাজনগর পাঁচগাঁও এর গণহত্যা, বড়লেখা ও কুলাউড়ার বধ্যভূমিতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষকে কাঁদায়। ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার শত্রুমুক্ত হয়।

কৃতি ব্যক্তিত্ব

মো. কেরামত আলী- ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও দানশীল ব্যক্তিত্ব

শায়খ লুৎফুর রহমান বর্ণভী- ধর্মীয় নেতা

এম সাইফুর রহমান -অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ

মোহাম্মদ মুহিবুর রহমান [[২]], রাজনীতিবিদ ও দানশীল ব্যক্তিত্ব

সৈয়দ মহসিন আলী রাজনীতিবিদ ও দানশীল ব্যক্তিত্ব

শায়খ আব্দুল বারী- আলেম

শায়খ আব্দুল মালিক- সভাপতি জমিয়ত মৌলভীবাজার জেলা

লীলা নাগ -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী

সৈয়দ মুজতবা আলী -ঔপন্যাসিক

চৌধুরী গোলাম আকবর -বাংলাদেশী লেখক

মেজর জেনারেল(অবঃ)সৈয়দ ইফতেখারউদ্দিন-কারা মহাপরিদর্শক

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ -ভিপি-ডাকসু,সভাপতি-বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, এমপি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক

অর্থনীতি

মৌলভীবাজার এর অর্থনীতির প্রধান ভীত হলো চা শিল্প ও রাবার শিল্প । এ জেলায় প্রচুর পরিমানে চা ও রাবার উৎপাদিত হয় । এ ছাড়াও এ জেলার অর্থনীতিতে এই জেলার পর্যটন শিল্পও বিশেষ ভাবে উল্ল্যেখযোগ্য, তা ছাড়াও এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় শিল্প যা মৌলভীবাজার জেলার অর্থনীতিকে করছে সমৃদ্ধশালী ।

চিত্তাকর্ষক স্থান

মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত চা-কন্যা স্থাপত্য।

শাহ মোস্তফা -এর মাজার - মৌলভীবাজার শহরের কেন্দ্রস্থলের বেড়ীরপাড়ের দক্ষিণ তীর;

রাজা সুবিদ নারায়ণ - রাজনগরের শেষ রাজা।

ঐতিহাসিক কমলারানীর দিঘি, রাজনগর।

খাজা ওসমান - সপ্তদশ শতকের বাংলার শেষ পাঠান সেনাপতি;

চা বাগানসমূহ

চা কন্যা ভাষ্কর্য। সাতগাও, মৌলভীবাজার।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান।

মাধবকুন্ড জলপ্রপাত - বড়লেখা

মাটির পুল, বড়লেখা।

হাম হাম জলপ্রপাত- কমলগঞ্জ

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান- স্মৃতিস্তম্ভ - কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম আমবাসা;

মাধবপুর লেক - মাধবপুর, কমলগঞ্জ

কেরামত হাউস- কমলগঞ্জ

মো. কেরামত আলী মসজিদ, কমলগঞ্জ

গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গলফ ক্লাব, শ্রীমঙ্গল।

শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত শতাধিক রিসোর্ট।

নবাব আলী আমজদের বাড়ি, কুলাউড়া

হাকালুকি হাওর,

খোজার মসজিদ;

গাছপীর আব্রু মিয়ার মাজার - সিরাজনগর;

ইউনুছ পাগলার মাজার - সাতগাঁও বাজার, শ্রীমঙ্গল।

খাজার টিলা - হযরত শাহ মনজুর আলী রহঃ মাজার সিন্দুরখান, শ্রীমঙ্গল।

হযরত খরমশাহ মাজার পাচাউন, মির্জাপুর।

৩০০ বছরের পুরোনো মাজার।

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী

পিতা: খাঁন বাহাদুর সৈয়দ সিকন্দর আলী৷
জন্ম: ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর৷
কর্ম: বাংলা কথা সাহিত্যের প্রাণ পুরুষ৷ সিলেট বিভাগের প্রথম মুসলমান হিসাবে ১৯৪৯ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নরসিংহ দাস পুরষ্কার ও ১৯৬১ সালে সুরেশ চন্দ্র স্মৃতি পুরষ্কার লাভ করেন৷ ২৯টি গ্রন্থের প্রণেতা৷ উল্লখযোগ্য হল দেশে বিদেশে (১৩৫৪), পঞ্চতন্ত্র (১৩৫৯), চাচা কোহিনী (১৩৫৯), ময়ুরকন্ঠী(১৩৫৯) ইত্যাদি৷ তিনি বহুভাষাবিদপন্ডিত ছিলেন৷
মৃত্যু: ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রয়ারী ঢাকায় ইন্তেকাল করেন৷ আজিমপুর গোরস্থানে ভাষা শহীদ বরকত ও শফিকের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়৷
 
সৈয়দ শাহনূর

পিতা: সৈয়দ নূর
জন্ম: ১৭৩০ সালে রাজনগর উপজেলার ঘড়গাঁও গ্রামে৷
কর্ম: মধ্যযুগের শ্রেষ্ট কবি। ১৮১৯ সালে “নূর নছিহত” নামক সুবৃহৎ পুথি রচনা করেন। পুথির পৃষ্টা সংখ্যা ৩০২, গানের সংখ্যা ১০৮, ধাঁধাঁর সংখ্যা ৪১।
অন্যান্য গ্রন্থ : রাগনূর, সাত কন্যার খান৷
মৃত্যু: ১৮৫৫৷ তাঁর মাজার নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাপ গ্রামে অবস্থিত৷
 
কাজী মুহম্মদ আহমদ

জন্মঃ ১৮৩০ সালে মৌলভীবাজার জেলার ­ধউপাশা গ্রামে৷
কর্মঃ সিলেট বিভাগের প্রথম ইতিহাস লেখক৷ ১৮৮১ সালে জেলার কাজী নিযুক্ত হন৷ আঞ্জুমানে ইসলামিয়া স্থাপন করে এর সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন৷ ১৮৮৫ সালে বাংলা ভাষায় সিলেটের গ্রন্থ শ্রীহট্ট দর্পন রচনা করেন৷
 
আশরাফ হোসেন-সাহিত্য রত্ন

পিতা: মুন্সী জওয়াদ উল্লাহ৷
জন্ম: ১৮৯৯ সালে কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর গ্রাম৷
কর্ম: সিলেট বিভাগের লোক সাহিত্যের পথিকৃত৷ তাঁর রচিত গ্রন্থ সিলহটের ইতিহাস, মনিপুরের লড়াই, শাহজালালের কিচ্ছা ইত্যাদি৷ তাঁর সংগৃহীত মরমী গানের মধ্যে রয়েছে শাহ হাজির আলির হাজিরতরান এবং সাধক কবি রাধারমনের রাধারমন সংগীত৷
মৃত্যুঃ১৯৬৫সালের২৪জানুয়ারী৷
 
দ্বিজেন্দ্র শর্মা

জন্ম: ১৯২৯ সালের ৩০ মে বড়লেখা উপজেলার শিমলিয়া গ্রামে৷
কর্ম: ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমী পুরষ্কার পান৷ আধুনিক গদ্যে দক্ষ ছিলেন৷ ব্রজমোহন ও নরটডেম কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন৷ বহুগ্রন্থপ্রণেতা৷
 
মাওলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী

জন্ম:  ১৮৭৮ সালে মৌলভীবাজার সিংকাপন গ্রামে৷
কর্ম:  ১৯২০ সালে নাগপুর নিখিল ভারত কংগ্রেস খেলাফত সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেন ১৯২১ সালে যোগী ডহর সম্মেলনে বিশেষ ভূমিকা ছিল সুলেখক ও বক্তা ছিলেন এবং বিভিন্ন ভাষার উপর দখল ছিল।
মৃত্যু:  ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে৷
 
বিচারপতি

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্‌হা  
বাংলাদেশের সাবেক মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্‌হা ১৯৫১ সালের ১ ফেব্রুয়ারী মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলাধীন তীলকপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি স্বর্গীয় ললিত মোহন সিন্‌হা এবং ধনবতী সিন্‌হা এর জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করে ১৯৭৪ সালে একজন আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বিচারপতি সিন্‌হা ২৪ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে এবং ১৬ জুলাই ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ১২ জুন ২০১১ সালে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং ১৭ জানুয়ারী ২০১৫ সালে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১১ নভেম্বর ২০১৭ পদত্যাগ করেন।
 
বিচারপতি গীতেশ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য

জন্ম:  ১৯৩৮ সালে রাজনগর উপজেলার হাঁসখলা গ্রামে৷
কর্ম: কোলকাতা থেকে বিএল উপাধি পান৷ কোলকাতা হাইকোর্টে বিচার পতির দায়িত্ব পালন করেন৷
 
বিচারপতি সিকন্দর আলী

জন্ম: বড়লেখা উপজেলার ইনাইনগর গ্রামে ১৯০৬ সালে৷
কর্ম:  সিলেট জজ কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন৷ ১৯৩৪ সালে মুন্সেফ পদে ময়মনসিংহে যোগদেন৷ পরবর্তীতে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন৷
মৃত্যুঃ ১৯৬৬ সালে৷
 
সাংবাদিক

গৌরী শংকর ভট্টাচার্য্য তর্কবাগীশ
পিতা: জগন্নাথ ভট্টাচার্য্য৷
জন্ম: ১৭৯৯ সালে রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে৷
কর্ম: সিলেট বিভাগের প্রথম সাংবাদিক৷ গুড়গুড়ে হুক্কায় আসক্তির জন্য তাঁকে গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্য বলে ডাকাহত৷ ১৫ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন বদ্বীপেযান এবং ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তর্কবাগীশ উপাধি লাভ করেন৷ জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকার মাধ্যমে ১৮৩১ সালে সাংবাদিকতা পেশায় আসেন৷ তিনি অল বেষ্ট নিউজ পেপার ইন কোলকাতা এর সম্পাদক ছিলেন৷ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ হল শিশুপাঠ নীতিকথা (১৮৩০), গীতার অনুবাদ প্রথম খন্ড (১৮৩৫), জ্ঞান প্রদীপ প্রথম খন্ড (১৮৪০) ইত্যাদি৷
মৃত্যু: ১৮৫৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী৷
 
মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক

আব্দুল মুন্তাকীম চৌধুরী
পিতা: তজম্মল আলী চৌধুরী
জন্ম: অজ্ঞাত৷ কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুরের অধিবাসী৷
কর্ম: ১৯৭০ সালে এম.এল.এ নির্বাচিত হন৷ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এই ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতার পর জাপান ও জার্মানীতে রাষ্ট্রদুতের দায়িত্ব পালন করেন।
মৃত্যু: অজ্ঞাত৷
 
সমাজ সেবক ও শিক্ষাবিদ

দেওয়ান আব্দুল হামিদ চৌধুরী
জন্ম: ১৮৫০ সালে রাজনগর উপজেলার মনসুরনগর গ্রামে৷
কর্ম: সমাজ সেবার জন্য খান বাহাদুর খেতাব পান৷ রাজনগর পোর্টিয়াম স্কুলের জন্য জমিদান করেন৷ আসামের এমএলএ ছিলেন৷
আলহাজ্জ কেরামত আলী
পিতা: শফাত আলী
জন্ম: ১৯০১ সালে ভানুগাছে৷
কর্ম: ১৯৪৬ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে এম.এল.এ পদে জয়লাভ করেন৷ ১৯৬৫ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন৷ মৌলভীবাজার কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নে ৭৫,০০০ টাকা এবং শ্রীমঙ্গল কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নে ২৫,০০০ টাকা দান করেন।
মৃত্যু: ১৯৬৯সালের৩জুন৷
 
আব্দুল খালিক চৌধুরী
জন্ম: ১৮৮৬ সালে কুলাউড়া উপজেলার বিজলী গ্রামে৷
কর্ম: সিলেট এমসি কলেজের প্রথম মুসলিম ছাত্র৷ ১৯২১-৩৬ পর্যন্ত আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন৷ মৌলভীবাজার লোকাল বোর্ড এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন৷
মৃত্যু: ১৯৪৮৷
 

কাশীনাথ ঘোষ
জন্ম:রাজনগরউপজেলারথলাগ্রামে৷
কর্ম: তিনিকোর্টেরমোক্তারছিলেন৷মৌলভীবাজারকাশীনাথস্কুলতাঁরনামেপ্রতিষ্ঠিত৷

গগন চন্দ্র সেনগুপ্ত
পিতা: অজ্ঞাত৷
জন্ম: মৌলভীবাজারজেলারবারহালগ্রামে৷
কর্ম: বৃটিশআমলেআসামবেঙ্গলেরডিএসপিছিলেন৷মৌলভীবাজারহাসপাতালসহবহুসামাজিককাজেবিশেষঅবদানরাখেন৷
মৃত্যু: অজ্ঞাত

 
সৈয়দ কুদরত উল্লাহ
পিতা- সৈয়দ হূরমত উল্লাহ
জন্ম: মৌলভীবাজার জেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামে ১৭৫০ সালে৷
কর্ম: মৌলভীবাজার জেলার প্রতিষ্ঠাতা৷ ১৭৯৩ সালে মুন্সেফ নিয়োজিত হন৷ মৌলভীবাজারের পশ্চিম বাজার তাঁর প্রতিষ্ঠিত৷
মৃত্যু: সাল নিয়ে দ্বিমত রয়েছে৷
 

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
জন্ম: মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মমরোজপুরের অধিবাসী৷
কর্ম: জেলার স্কাউট আন্দোলনের বলিষ্ঠ সংগঠক৷ ১৯৬৩ সালে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত রেফারী হিসাবে ক্রীড়া পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন৷ মৌলভীবাজার বিএমএ–র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন৷ বাংলাশেবয় স্কাউটের লীডার ট্রেনার এর দায়িত্ব পালন করেন৷

ড. সুরেন্দ্র নাথ ধর
জন্ম: ১৮৯০ সালে মৌলভীবাজার জেলার বাউরভাগ গ্রামে৷
কর্ম: তিনি সিলেট বিভাগের প্রথম ডিএসপি ও প্রথম বৈজ্ঞানিক৷ ১৯১৫ সালে আসাম সরকারের গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন৷ ১৯২০ সালে মাদ্রাজ কলেজে অধ্যাপনা নিয়ে গবেষণার কাজে নিয়োজিত হন৷
মৃত্যু: ১৯২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর৷

বিপ্লবী

শ্রী শশাংক শেখর ঘোষ"
জন্ম: বাংলা ১৩২১ সালের ২২ আশ্বিন রাজনগর উপজেলার খলাগাঁও গ্রামে৷
কর্ম: চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন৷ দেশ বিভাগের পূর্বে রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন এবং সেক্রেটারী ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু৷ ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের মাধ্যমে কংগ্রেসে যোগদেন ৷ কমিউনিষ্ট আন্দোলন ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা৷ সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী৷ তাঁর স্মরণে 'শশাংক শেখর ঘোষ স্মৃতি সংসদ, মৌলভীবাজার' নামীয় সমাজসেবামূলক একটি সংগঠন ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মৃত্যু: ১৯৮৯ সালের ৯ অক্টোবর৷
কমরেড তারা মিয়া
জন্ম: ১৯৩২ সালে রাজনগর উপজেলার নয়াগাঁও গ্রামে৷

কর্ম: সিলেট জেলার অন্যত মকমিউনিষ্ট নেতা৷ ১৯৬৬ থেকে আমৃত্যু কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন৷ ১৩৫৯-৬৩ পর্যন্ত কারাবরণ করেন৷ বৃটিশ আন্দোলন ও কাওয়াদিঘির হাওর আন্দোলন, গণভোট, ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৬সালে পৃথিমপাশায় কৃষক বিদ্রোহে সিলেট অঞ্চলের নেতৃত্ব দেন মুক্তিযুদ্ধে দেশের ভিতর থেকে অংশগ্রহন করেন।

লীলা দত্ত
জন্মঃ শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর গ্রামে ১৯২৮ সালে৷
কর্মঃ ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন৷ ১৯৪৩ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন৷ ভারতীয় সি.পি. এম দলের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন৷ কোলকাতা বেহালা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন৷
মৃত্যুঃ ১৯৮৫ সালের ৬ আগষ্ট৷
 
কারুশিল্পী

শ্রী জনার্দন
জন্ম: ১৫৭৫ সালে রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে৷
কর্ম: উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ কর্মকার৷ ১৬৩৭ সালে মুর্শিদাবাদের নবাবের জন্য জাহান কোষ নামে একটি তোপ তৈরি করেন৷ সপ্তদশ শতকে বিবি মরিয়ম ও কালে জমজম নামে দুটি কামান ঢাকা গিয়ে তৈরি করেন৷ বর্তমানে ওসমানী উদ্যানের সামনে ঐতিহাসিক কামান কালেজমজম শোভা পাচ্ছে৷
মৃত্যু: ১৬৪৫ সালে৷
 
উদ্যোক্তা

শ্রী সারদাচরন শ্যাম
পিতা- গৌরীকৃষ্ণ শ্যাম চৌধুরী।
জন্ম: রাজনগর উপজেলার উত্তর ভাগ গ্রামে ১৮৬২ সালের ২৫ মার্চ৷
কর্ম: সিলেট বিভাগের চা-শিল্পের কর্ণধার৷ চাকর ও প্রথিতযশা আইনজীবি হিসাবে পরিচিত ছিলেন৷ পর্বতপুর ও উত্তরভাগ চা-বাগানের প্রতিষ্ঠাতা৷
মৃত্যু: ১৯১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর৷
 
ধর্মপ্রচারক

হজরত শাহ মোস্তফা(রঃ)
জম্মঃঅজ্ঞাত৷
কর্মঃহজরত শাহ জালাল(রঃ) এর অন্যতম সহযোগী৷ ৭০০ জন সহযোগী নিয়ে ধর্ম প্রচারের জন্য এদেশে আসেন৷ এখানেই বিয়ে করেন এবং বংশ বিস্তার করেন৷ ঘোড় সওয়ার চাবুক মার নামে পরিচিত৷ তাঁর নামে রাস্তার নাম করন করা হয়েছে৷
মৃত্যু: অজ্ঞাত৷ মৌলভীবাজার শহরে তাঁর মাজার রয়েছে৷

পাকিস্তান দাঙ্গা 

১৯৫০-এর পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গা বলতে ১৯৫০ সালের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের চালিত হত্যাকাণ্ডকে বোঝায়। এসময় পাকিস্তানি পুলিশ,প্যারা মিলিটারি বাহিনী বাঙালি হিন্দুদের ওপর হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন,অপহরণ, ধর্ষণ চালায়।[১] ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস জুড়ে এই দাঙ্গা অব্যাহত থাকে।
১৯৫০-এর পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গাস্থানপূর্ব পাকিস্তানতারিখফেব্রুয়ারি-মার্চ, ১৯৫০লক্ষ্যবাঙালি হিন্দুহামলার ধরনগণহত্যা, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, লুটপাট, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণহামলাকারী দলপূর্ব পাকিস্তান পুলিশ, আনসার, পাকিস্তান সেনাবাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীকারণধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, মুসলিম জনগোষ্ঠী দ্বারা হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ

পটভূমি

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি দেশে পরিনত হয়। ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। অবিভক্ত বাংলা প্রদেশে জনসংখ্যার দিক দিয়ে মুসলিমরা হিন্দুদের চেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। কিন্তু অবিভক্ত বাংলারও বিভাজন হয়; মুসলিমগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) যুক্ত হয় পাকিস্তানের সাথে এবং হিন্দু গরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত হয় ভারতের সাথে। আসাম প্রদেশের অন্তর্গত বৃহত্তর সিলেট গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুসারে পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যার ২৪.৫% অমুসলিম, যাদের অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু। আবার পশ্চিমবঙ্গের ৩০.২%ছিল মুসলিম এবং বাকিরা সবাই ছিল হিন্দু।
দেশ বিভাগের পুরো দশক জুড়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ জাতিগত ভাবে হিন্দুদের নির্মূলীকরণের সাক্ষী হয়ে ওঠে। দেশবিভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অনিবার্য করে তোলার জন্য ১৯৪০ এর দশকে এই হিন্দু নির্মূলীকরণের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। ১৯৪৬ এর শেষ ভাগে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালী এবং ত্রিপুরা জেলার বাঙালী হিন্দুরা ধারাবাহিক ভাবে নির্মম গনহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণের শিকার হয় মুসলিমদের দ্বারা, যা নোয়াখালী দাঙ্গা নামে পরিচিত। দেশবিভাগের একমাসের মধ্যেই ঢাকাতে জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রায় মুসলিমরা আক্রমণ করে।১৯৪৮ সালে বিখ্যাত ধামরাই রথযাত্রা এবং জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়।[৩] ১৯৪৯ সালে সমগ্র ঢাকা অঞ্চলে বাঙ্গালী হিন্দুদের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার বিরুদ্ধে পোস্টার লাগানো হয়। এজন্য দুর্গাপূজার আয়তন এবং সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পায়। বিজয়া দশমীর দিনে শত শত হিন্দু বাড়ি ঘরে অগ্নি সংযোগ করে মুসলিমরা। ফলে কমপক্ষে ৭৫০ টি হিন্দু পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে নেমে আসতে হয়। প্রেস ট্রাস্ট অব ইণ্ডিয়া বা পিটিআই (PTI) এর প্রতিনিধি সন্তোষ চট্টোপাধ্যায়কে কোন রকম অভিযোগপত্র ছাড়াই ১৯৪৯ সালের ২৫ নভেম্বরে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং একমাস জেলে বন্দী করে রাখে।

আগস্ট ১৯৪৯ - জানুয়ারি ১৯৫০ এর নৃশংসতাসম্পাদনা
১৯৪৯ সালের আগস্ট মাস থেকে সমগ্র পূর্ব বাংলা জুড়ে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর নৃশংস বর্বরতা শুরু করে দেয় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়; যা প্রায় তিন মাস জুড়ে চলতে থাকে।[৫] আগস্ট মাসে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার এবং বড়লেখা পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন এলাকার নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর স্থানীয় মুসলিম অধিবাসীরা পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর সহযোগিতায় আক্রমণ শুরু করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর লুটপাট করা হয়,গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। হিন্দু গ্রামবাসীদেরকে লাঞ্ছিত করা হয় এবং হত্যা করা হয়। অনেক হিন্দু মেয়েকে এসময় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ধর্ষণ করে। এর কিছুদিন পরেই বরিশাল জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামের হিন্দুরা আক্রান্ত হয়।রাজশাহী বিভাগের একজন পাদ্রী ফাদার থমাস ক্যাটানিও রিপোর্ট করেন যে, সেখানকার সাঁওতাল গ্রামের অধিবাসীরা আক্রান্ত হয়েছে ,তাদেরকে আটক করা হয়েছে এবং সাঁওতাল নারীদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ডিসেম্বরের ১০ তারিখে উন্মত্ত মুসলিম জনতা রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়িতে ও আশপাশের বাড়ি-ঘরে হামলা চালিয়ে সম্পদ লুটপাট করে এবং সে সব বাড়িঘর দখল করে নেয়।

কালশিরা হত্যাকাণ্ড

১৯৪৯ সালের ২০ ডিসেম্বরে তৎকালীন খুলনা জেলার বাগেরহাট উপজেলার মোল্লাহাট পুলিশ স্টেশনের আওতাধীন জয়দেব বর্মের বাড়ীতে কম্যুনিস্ট সদস্য লুকিয়ে আছে এই অভিযোগ করে শেষরাতে চারজন পুলিশ কনস্টেবল অভিযান চালায়।কিন্তু জয়দেবের বাড়ীতে কোন কম্যুনিস্ট সদস্যকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ সদস্যরা তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করতে চেষ্টা করে।তার স্ত্রী চিৎকার শুরু করলে জয়দেব বর্ম এবং তার আত্মীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে দু’জন পুলিশ কনস্টেবলের উপর চড়াও হয় এবং ঘটনাক্রমে একজন পুলিশ কনস্টেবল সেখানেই মারা যায়। বাকি দু’জন পুলিশ বিপদ ঘণ্টা বাজিয়ে দিলে পাশের প্রতিবেশীরা এসে তাদের উদ্ধার করে।পরের দিন জেলা পুলিশ সুপারিনটেনড সশস্ত্র পুলিশ কন্টিনজেন্ট এবং আনসার বাহিনী সহযোগে কালশিরা ও এর আশেপাশের হিন্দু গ্রামগুলোতে নির্দয় ভাবে আক্রমণ শুরু করে। তারা আশেপাশের গ্রামগুলোর মুসলিম অধিবাসীদেরকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর এবং সম্পত্তি লুটপাটে উৎসাহ দিতে থাকে। তারা হিন্দুদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করতে শুরু করে এবং হিন্দু পুরুষ-মহিলাদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র প্রতিমা, ছবি ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং হিন্দু মন্দিরগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়।ঐ গ্রামগুলোর ৩৫০টি বাড়ির সবগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। তিনটি মাত্র ঘর অবশিষ্ট ছিল। হিন্দুদের গবাদি পশু, নৌকা সব কিছু জোর করে ছিনিয়ে নেয়া হয়। মাত্র এক মাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে খুলনার ৩০,০০০ হিন্দু প্রাণের ভয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

নাচোলের হত্যাকাণ্ড

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন ইলা মিত্র(১৯৫৪ সাল)

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নওয়াবগঞ্জ সাবডিভিশনের একটি পুলিশ স্টেশন হল নাচোল পুলিশ স্টেশন। দেশভাগের পূর্বে নওয়াবগঞ্জ ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের(ভারতের) মালদা জেলার অন্তর্গত। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পরে নওয়াবগঞ্জ রাজশাহী জেলার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আর বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত হয়। নাচোল পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত এলাকা ছিল অমুসলিম প্রধান। এখানকার বেশিরভাগ অধিবাসী ছিল সাঁওতাল এবং বাঙ্গালী হিন্দু যাদের মধ্যে প্রধান ছিল ক্ষত্রিয়, ভুঁইদাস এবং কৈবর্ত সম্প্রদায়। দেশভাগের পরপরই সদ্য জন্ম নেয়া পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তেভাগা আন্দোলনকে দমন করতে পৈশাচিক বর্বরতা এবং বর্ণনাতীত নৃশংসতার ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়। কিন্তু নাচোলে তখনও এই আন্দোলন সক্রিয় ছিল আত্মগোপনে থাকা কিছু ব্যক্তির নেতৃত্বে। ১৯৪৯ সালের শরতকালে আন্দোলনের মাধ্যমে তেভাগা প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে নাচোল পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন চণ্ডীপুর গ্রামের সাঁওতাল অধিবাসীরা পুলিস স্টেশনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে কারণ পুলিশ বাহিনী বিনা কারণে একজন সাঁওতাল আদিবাসীকে আটক করে। কিন্তু পুলিশ ঐ জনসমাবেশের ওপর গুলি চালালে সাঁওতাল আদিবাসীরা সহিংস হয়ে ওঠে এবং পুলিশের সাথে তাদের হানাহানি শুরু হয়। এতে ঘটনা স্থলে পাঁচ জন পুলিশ বাহিনীর সদস্য মারা যায়। এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে ৭ জানুয়ারি তারিখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ২,০০০ সদস্যের একটি সেনাবাহিনীর কন্টিনজেন্ট প্রেরণ করে এবং এর সাথে সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার বাহিনী যুক্ত হয়। এই সশস্ত্র বাহিনী বারটি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়, চণ্ডীপুরগামী গ্রামবাসীদেরকে ধরে ধরে হত্যা করে।[১২] চণ্ডীপুরের পুরুষ সদস্যদেরকে তারা হত্যা করে আর মহিলাদেরকে ধর্ষণ করে। তাদের বসতভিটা পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। শতশত সাঁওতাল এবং হিন্দুদেরকে এভাবে হত্যা করা হয়। রোহানপুরের তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ইলা মিত্র সহ আরও শতাধিক দরিদ্র কৃষককে গ্রেফতার করা হয়। নাচোল পুলিশ স্টেশনে নিয়ে তাদের উপর নৃশংস অত্যাচার চালানো হয় বাকি নেতাদের নাম জানার জন্য। পুলিশের এই বর্বর অত্যাচারে সেখানেই প্রায় ৭০-১০০ জন কৃষক মারা যায়।ইলা মিত্রকে নওয়াবগঞ্জ পুলিশ স্টেশনে হস্তান্তরের আগে টানা চার দিন ধরে পাশবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।

ঘটনাক্রম

ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনী উপজেলাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ শুরু করে মুসলিমরা, যদিও এর আগেই ঢাকাতে নৃশংসতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

গল্প নয় সত্যি

নামকরণ

কথিত আছে যে, সৈয়দ শাহ্‌ মোস্তফা (র:) এর ভাতুষ্পুত্র হযরত ইয়াছিন (র:)এর উত্তর পুরুষ মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদীর তীরে ১৮১০খ্রিষ্টাব্দে যে বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই বাজারটি কালক্রমে প্রসিদ্ধিলাভ করে। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ১ এপ্রিল মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজারটিকে কেন্দ্র করে ২৬টি পরগনা নিয়ে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ শ্রীহট্ট বা সাউথ সিলেট নামের বদলে এ মহকুমার নাম মৌলভীবাজার রাখা হয়। ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার মহকুমাটি জেলায় উন্নীত হয়।


মৌলভীবাজার জেলার পটভূমি

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার মৌলভীবাজার জেলা। এ জেলার আয়তন ২৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তরে সিলেট জেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলা।

প্রাচীন ইতিহাস: বহুপূর্ব থেকেই মৌলভীবাজার তথা সিলেট অঞ্চল পবিত্র ভূমি হিসাবে পরিচিত। রামায়ন ও মহাভারত এর মত উল্লেখযোগ্য মহাকাব্যে এ অঞ্চলের উল্লেথ রয়েছে। মৌলভীবাজার অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বাশেংর কিছু অংশ ছাড়া বাকি সবটুকুই কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

মোগল আমল: মোগল আমলে বর্তমান মৌলভীবাজার অঞ্চল মোগল সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে এক যুদ্ধে ইটা রাজ্যের রাজা সুবিদ নারায়নের মৃত্যুর পর ইটারাজ্যের সমূহভুমি ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে পাঠান বীর খাজা ওসমানেরঅধিকারে আসে। ১৬১২ সালে সিলেটের অধিকর্তা মোঘল সেনাপতি ইসলামখানের আক্রমনের পূর্ব পর্যন্ত ইটা রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন খাজা ওসমান।

সুলতানি আমল: বর্তমান সিলেট অঞ্চল বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের (১৩০১-১৬২২) সময় মুসলমানদের অধিকারে আসে। আরবের ইয়েমেন থেকে আগত প্রখ্যাত দরবেশ হযরত শাহজালাল(রঃ)এর সিলেট আগমনের পর তাঁর সঙ্গীসাথীদের মধ্যে অন্যতম হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা(রঃ) ইসলাম প্রচারের জন্য মৌলভীবাজার অঞ্চলে আসেন। তিনি বাগদাদের অধিবাসী ছিলেন। মৌলভীবাজার শহরে তার মাজার রয়েছে।

বৃটিশ আমল: ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর পরই এদেশে ইংরেজ শাসন প্রবর্তিত হয়। বৃটিশ সরকার ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত প্রথা চালু করে এবং তালুকভিত্তিক জমিদার ও মিরাসদার শ্রেণী সৃষ্টি করে তাদের উপর এদেশের মানুষের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের ভার অর্পণ করে। জমিদার, মিরাসদাররা অবিবেচকের মতসাধারণ প্রজারকাছ থেকে খাজনা আদায় শুরু করে। এর ফলে ইংরেজ কর্তৃক এ দেশবাসীকে শোষনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইংরেজদের শোষন ও শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে স্বাধীনতার প্রথম চেতনা প্রকাশে ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লব সংঘটনে মৌলভীবাজার অঞ্চলের সিপাহীদের অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৮৫৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের ‘লাতু’নামক স্থানের নিকটে একদল বিদ্রোহী সেনা ইংরেজদের মুখোমুখি হয়।

নামকরণ: কথিত আছে যে, সৈয়দ শাহ্‌ মোস্তফা (র:) এর ভাতুষ্পুত্র হযরত ইয়াছিন (র:)এর উত্তর পুরুষ মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদীর তীরে ১৮১০খ্রিষ্টাব্দে যে বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই বাজারটি কালক্রমে প্রসিদ্ধিলাভ করে। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ১ এপ্রিল মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজারটিকে কেন্দ্র করে ২৬টি পরগনা নিয়ে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ শ্রীহট্ট বা সাউথ সিলেট নামের বদলে এ মহকুমার নাম মৌলভীবাজার রাখা হয়। ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার মহকুমাটি জেলায় উন্নীত হয়।





কমলগঞ্জ উপজেলা

মৌলভীবাজার জেলার একটি উপজেলা।
কমলগঞ্জ উপজেলা বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। রাজধানী ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০০ কি.মি। কমলগঞ্জ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি। এখানে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাম হাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক, সিপাহী বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের সমাধি, ও নয়নাভিরাম চা বাগান। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য কমলগঞ্জ একটি চমৎকার জায়গা।
কমলগঞ্জউপজেলা।

কমলগঞ্জ

বাংলাদেশে কমলগঞ্জ উপজেলার অবস্থানস্থানাঙ্ক: ২৪°২২′০″ উত্তর ৯১°৫২′০″ পূর্ব দেশ বাংলাদেশবিভাগসিলেট বিভাগজেলামৌলভীবাজার জেলাআয়তন • মোট৪২৬.৭২ বর্গকিমি (১৬৪.৭৬ বর্গমাইল)জনসংখ্যা (২০১১)[১] • মোট২,৫৯,১৩০ • জনঘনত্ব৬১০/বর্গকিমি (১,৬০০/বর্গমাইল)সাক্ষরতার হার • মোট৪৮.৬%সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)প্রশাসনিক
বিভাগের কোড৬০ ৫৮ ৫৬।


অবস্থান ও আয়তন

কমলগঞ্জ উপজেলার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ ২৪.৩৬৬৭° উত্তর ৯১.৮৬৬৭° পূর্ব। এই উপজেলার উত্তরে মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পশ্চিমে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা এবং পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত।

ইতিহাস

কমলগঞ্জ থানা ১৯২২ সালে গঠিত হয় এবং উপজেলার মর্যাদা পায় ১৯৮৩ সালে। কমলগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয় ২০০০ সালে।
ভানুবিল কৃষকপ্রজা আন্দোলন কমলগঞ্জের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক ঘটনা। বাংলা ১৩০৭ সনে সংঘটিত এই ঘটনায় মণিপুরী কৃষকরা ব্রিটিশ ও তাদের পোষ্য জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
১৯৪৭সালের পূর্ব অবধি ভানুগাছ সিলেট ও কমলপুরের মধ্যে সেতু বন্ধন হিসাবে কাজ করতো। আসাম থেকে ত্রিপুরা যাবার মূল রাস্তাটি ছিলো এই ভানুগাছ পরগনার বুক চিড়ে। যুগ যুগ ধরে এলাকা পূর্ব ভারতের খাদ্য ভান্ডার হিসাবে পরিচিতি ছিল,এলাকায় উৎপাদিত চায়ের কদর ছিলো মহারানী ভিক্টোরিয়ারও রন্ধন শালা পর্যন্ত।
৪৭ এ দেশ ভাগের সময় তৎকালীন দক্ষিণ সিলেট মহকুমা পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হলে স্বাভাবিক নিয়মেই সেই সময়ের ভানুগাছ পরগনা তথা কমলগঞ্জ থানা পূর্ববঙ্গের একটি সীমান্ত এলাকায় পরিণত হয়। আসাম থেকে ত্রিপুরা যাবার মূল রাস্তাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সময়ের শিল্প শহর ভানুগাছ অতি দ্রুত একটি অবহেলিত ও অনুন্নত এলাকা হয়ে উঠে। ৪৭ উত্তর সময়ে এই এলাকাটি নিষ্প্রভ হয়ে গেলে জন মানসে তীব্র একটা অসন্তোষ দানা বাধে আর এই সময়ে উক্ত এলাকার মানুষের অধিকার আদায় ও এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিতে এগিয়ে আসেন আলহাজ্জ্ব মো. কেরামত আলী।


কমলগঞ্জ উপজেলায় ৯টি ইউনিয়ন, ১১৮টি মৌজা, এবং ২৭৬টি গ্রাম আছে। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে -

রহিমপুর ইউনিয়ন

পতনঊষার ইউনিয়ন

মুন্সিবাজার ইউনিয়ন, কমলগঞ্জ

শমসেরনগর ইউনিয়ন

কমলগঞ্জ ইউনিয়ন

আলীনগর ইউনিয়ন, কমলগঞ্জ

আদমপুর ইউনিয়ন, কমলগঞ্জ

মাধবপুর ইউনিয়ন, কমলগঞ্জ

ইসলামপুর ইউনিয়ন, কমলগঞ্জ

জনসংখ্যার উপাত্ত

বাংলাদেশের ১৯৯১ সনের লোক আদমশুমারি অনুসারে কমলগঞ্জ থানার জনসংখ্যা হলো ১৯১,৬৭২ জন।[২] এর মধ্যে পুরুষ ৫১% এবং নারী ৪৯%। জনসংখ্যার ৬২.৯২% মুসলিম, ৩৬.০৯% হিন্দু, ০.০৪% বৌদ্ধ, ০.৮৮% খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য ০.০৭%।

জনজাতি

কমলগঞ্জ উপজেলায় বাঙালি ছাড়াও নানান জাতি ও আদিবাসী জনগোষ্টী বাস করেন। যেমন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মৈতৈ মণিপুরী, পাঙন, ত্রিপুরা, চা শ্রমিক, শব্দকর, খাসিয়াহালাম ইত্যাদি।

শিক্ষা

কমলগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষার হার ৪৮.৬%।

উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসম্পাদনা

কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়

সুজা মেমোরিয়াল কলেজ

আব্দুল গফুর চৌধুরী মহিলা কলেজ

বিএএফ শাহীন কলেজ,শমসেরনগর

পতনঊষার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

কমলগঞ্জ বহুমুখী সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

কমলগঞ্জ বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

আহমেদ ইকবাল মেমোরিয়াল হাইস্কুল, বনগাঁ

তেতইগাও রশিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়

দয়াময় সিংহ উচ্চ বিদ্যালয়,তিলকপুর

মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়

ভান্ডারীগাওঁ উচ্চ বিদ্যালয়

পদ্মা মেমোরিয়াল পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়

এ.এ.টি.এম বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় শমসেরনগর

আব্দুল মছব্বির একাডেমী শমসেরনগর

হাজী মুহাম্মদ ওস্তওয়ার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

কামদপুর উচ্চ বিদ্যালয়

ডালুয়াছড়া জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়

ইউনিয়ন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়

কালী প্রাসাদ উচ্চ বিদ্যালয় মুন্সীবাজার

সফাত আলী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা

ইসলামপুর ইসলামীয়া দাখিল মাদ্রাসা

উসমান আলী দাখিল মাদ্রাসা

আহমদ নগর দাখিল মাদ্রাসা

চিতলীয়া জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়

নাজির হাসান ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা,চিতলীয়া

অর্থনীতি

মূলত কৃৃৃৃষিনির্ভর। চা শিল্প এখানের অর্থনীতির এক বিশাল চালিকা শক্তি।

মৌলভীবাজারের নদ-নদী সমূহ

১। মনু নদী (মৌলভীবাজার সদর)
২। ধলাই নদী (কমলগঞ্জ)
৩। ফানাই নদী (কুলাউড়া)
৪। জুড়ী নদী (জুড়ী)
৫। কন্ঠিনালা নদী(জুড়ী)
অমিত সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। এদেশে বিরাজমান প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশের কাতারে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং কেন্দ্রমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে অঞ্চলভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলই ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে স্বকীয় বা অনন্য। অন্যান্য জেলার মত মৌলভীবাজার জেলাও রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য । মৌলভীবাজার জেলার অন্যান্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে জেলাটিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, সফল বিনিয়োগের মাধ্যমে জেলা ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলে তা জেলাটির পরিচিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করতে পারবে। এর ফলে রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনাময় উৎস সৃষ্টির পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন এক মাত্রা।


 
আমার বাবা

বাবার দেশবাড়ি ছিলো পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশের  মৌলভীবাজার। বাংলাদেশ শ্রীহট্টীয় অঞ্চলে। 
দাদু দেবেন্দ্রনাথ ধর ছিলেন মিঞারপাড়া প্রাইমারী স্কুলের প্রতিষ্টাতা প্রধান শিক্ষক।কাঁটা তার দেখতে দিলো না সেই স্কুল।এই আক্ষেপ রইলো।হয়তো একদিন যাবো।কিন্তু এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় না যে ভারত বাংলাদেশের কাঁটাতার উঠে যাবে।দাদুর ছেঁড়া মানচিত্র বগলে নিয়ে আমার বাবা দক্ষিণারঞ্জন ধর দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে মোটা ভাত মোটা কাপড় তুলে দিতে চাইছিলেন -সে লড়াই আজো আমার অব্যাহত।
আমার দাদুর দেশ পাকিস্তান।আমার বাবার দেশ ছিলো পাকিস্তান।না পাকিস্তানও নয় অভিবক্ত ভারত ছিলো দাদু আর বাবা কাকা আমার মায়ের দেশ।
তারপর পাকিস্তান ও ভারত।রায়ট।বড় রায়ট।দাদুর বুকের পাঁজর থেকে সাহসের হাঁড়গুলো নড়বড়ে হতে লাগলো।ছেঁড়া মানচিত্র নিয়ে দাদু,বাবা কাকা আর মাকে নিয়ে একরাতে ভারতে চলে আসেন ১৯৫০সালে।বগলে মানচিত্র।সমস্ত গতর দেওয়া শ্রম আর ঘাম ঝরিয়ে তিলতিল গড়া বাড়ি,জমি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে আসা।বাবার ১৬বছরের চোখ দিয়ে দেখা পাকিস্তানকে ফেলা আসায় জমি হারানোর ব্যথার চেয়ে স্বপ্ন হারানো,হয়তো কোন গাছতলায় হাতরাখা টগবগে দিন বাক্স তোরঙ্গ ফেলে রেখে আসার চেয়ে নিশ্চিত দামি ছিলো।
একজন যুবকের স্বপ্নগুলো মুছে যায় না।আটকে দেয় কাঁটাতার।বাবাও তাঁর বাবার হাত চেপে, দাঁতে দাঁত চেপে কত চেনা গাছ,প্রাণী রেখে চলে আসতে হলো সে এক ইতিহাস।
আমাদের বারো হাল চাষের বলদ ছিল।এক সাথে চাষ দিতে মাঠে নামতো বারো হাল।

রাতাছড়া

ভারত পাকিস্তান দুটো দেশের জন্ম হলো।তারপরই বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে চাতলাপুর বর্ডার ক্রস করে ত্রিপুরার রাতাছড়া আসেন ১৯৫০ সালে।মৌলভীবাজারের ধানী জমিন উর্বরতায় ভরপুর ছিলো।আর পুকুরভরা মাছ ছিলো আমাদের।
সে সব জমিন, গরু, গৃহ পালিত কুকুর,বেড়াল আর বাবার স্বপ্নগুলো পেছনে রইলো।বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে বর্ডার পেরিয়ে রাতাছড়ায় আসেন।রাজ আমলের বর্ধিষ্ণ প্রত্যন্তপ্রদেশ আজকের রাতাছড়া।একসময় এখানে প্রচুর বনমোরগ পাওয়া যেতো।ককবরক রাতা মানে মোরগ।আর ছড়া তো ছোট নদী।ছোট নদীর আশপাশে প্রচুর মোরগ দেখা যেত বলে ককবরক ভাষীরা গ্রামকে রাতাছড়া নাম দেন।আবার রাজধর  মাণিক্যের রাজ অভিষেক হয় রাতাছড়ায় তাই রাতাছড়া=রাঝ(ধর)->রাজ(ধর)->রাতাছড়া। কালক্রমে আজকের রাতাছড়া।
বর্তমান করইটিলা যা এমড়াপাশা,ডেমডুম,কাঞ্চনবাড়ি,মশাউলি,তরনীনগর,সায়দারপার, ফটিকরায় সব অঞ্চল থেকে আজকের রাতাছড়া ছিলো লোকবসতি সহ ও উন্নত গ্রাম। আমার দাদুও তাই বসবাসের জন্য রাতাছড়াকে কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার হিসেবেই দেখছিলেন।আজকে থেকে ৬৮বছর আগে বর্তমান কুমারঘাট যা পাবিয়াছড়া নামে পরিচিত ছিলো না।শুধু একটি ছড়ার চিহ্ন নিয়ে কলকল একটি জলধারা তখন দেওনদীর বুকে মিশতো।সুতরাং দাদুর চিন্তায় রাতাছড়া ছিলো আমেরিকা।আমাদের শেকড় বসলো।একটি জেতাগাছ শেকড় উপড়ে দীর্ঘ জার্নি তারপর আবার মাটিতে বসালে তার একটা ঝলসে যাওয়া থাকেই।দাদু,বাবা,কাকার জীবনে এটা এরকমই ছিলো।
বাবার মুখে শুনতাম তারপরও বারকয়েক বাবা চাতলাপুর চেকপোষ্ট ডিঙ্গিয়ে জন্মগ্রামে গেছেন।তখন গাড়ি ছিলো না।পায়ে হেঁটেই বাবা এ পথ পাড়ি দিতেন।আজকের সময় আমাদের কত মর্নিং ইভেনিং ওয়ার্ক।তবু রোগ অসুখের হাত থেকে আমাদের আর রক্ষা নেই।কিন্ত আমার বাবা কোন অসুখের কুকানি অর্থাৎ উঃ আঃ করতে দেখিনি।সন্যাস কেড়ে নিলো বাবাকে তৃতীয়বারের প্ররোচনায়।সেই রাত ১৯৯০ সাল।৩০ মে।রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে প্রতি রাতে গরমের সময় আমাদের বাড়ির রেয়াজ সবাই বাইরে বেঞ্চে বসে,কেউ কেউ চাটাই নিয়ে গল্প করতেন।সেই অভিশপ্ত রাতেও বাবা গল্পটল্প করে বিছানায় উঠেন রাত ১২টায়।রাত ১:৩০মিনিট।আমার চোখের সামনে কোন কথা বলতে না পেরেই স্ট্রোক করেন বাবা।বাইরে থেকে ঘরে এলেন।মাকে বললেন কি করছে শরীর।শুধু এই শুনলাম।তারপর বাবা নেই।আমরা হাসপাতাল নেওয়ার ব্যবস্থা করছি।রাতে পাড়ার ফার্মেসীর একজন কানে কানে বড়দাকে বললেন নেই।বাবা নেই।মা কিছুতেই রাজি নয়।বাবার নেই মানতে রাজি নয়।আঙ্গুলগুলো টানলে গিঁটগুলো শব্দ করছিলো।শরীর গরম তখনো।মা কিছুতেই মানতে রাজী নয়।বাবা নেই। আমরা ভাই বোনরা কেউ মানতে রাজি নয়।ধীরে ধীরে সকাল হলো।ছুটে এলেন চার গ্রামের মানুষজন।উঠোনে বাবা।সবার চোখে জল।সেদিন প্রথম বুঝলাম বাবা মানুষের মনে কি রকম ছিলেন।

শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ আসার বহু পর বাবার জন্ম

মমতাবিহীন কালস্রোতে
বাংলার রাষ্ট্রসীমা হোতে
নির্বাসিত তুমি
সুন্দরী শ্রীভূমি...
                 -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশ তখন।সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মিঞারপাড়ায় দেবেন্দ্রনাথ ধর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।বিদ্যালয়ের নাম মিঞারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়।দাদু দেবেন্দ্রনাথ ধর সেই বিদ্যালয়ে পঁয়ত্রিশ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।সেই সময় সিলেট মৌলভীবাজার ছিলো যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নত। ট্রেনে বাসে ভালো যোগাযোগ করা যেতো।

এরকমই এক সময় ২৯শে মে ১৯৩১ সাল বাংলা ১৫ই জৈষ্ঠ্য বাবা দক্ষিণারঞ্জন ধর জন্ম নিলেন।তখন ভারত পাকিস্তান নয় অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশ। সিলেট মৌলভীবাজার এক জেলা।মৌলভীবাজার মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত। এই সিলেটেই
বাবার জন্মের আগে বাংলা সাহিত্যের চিম্ময়পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমন ঘটে।৫-৭ নভেম্বর ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট আসেন।কলকাতা থেকে তিনি ট্রেনে রওনা হোন গৌহাটি হয়ে শিলং পৌঁছেন। সেখান থেকে কবি সিলেট ট্রেনে করে ৫ই নভেম্বর রওনা হোন।অনেকেই পথে থামান।এতে তিনি কুলাউড়া পৌঁছাতেই রাত হয়ে গেলো।সেখানে দর্শনার্থীরা থামিয়ে দেওয়ায় রাত হয়।তিনি সিলেটে তিনদিন থাকেন।
বাবার জন্মের ১২বছর আগে রবীন্দ্রনাথ সিলেটে আসেন।এরকম একটি সময় দেবেন্দ্রনাথ ধর ও সরোজিনী ধরের সংসারে বাবা দক্ষিণারঞ্জন ধরের জন্ম।১৯৩১ সালের ৩১শে মে।বাবার প্রয়াণ ১৯৯০ সালের ৩০শে মে বাংলা ১৬ই জৈষ্ঠ্য।

মৌলভীবাজার

বাবার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে শ্রীমঙ্গল রোড়ে  হাঁটতে হাঁটতে সারা শহর দেখতেন বৃটিশ পিরিউড।
তখনও নেতাজী রেঙ্গুন যাননি।
গান্ধীজীর টুপিও তখন জনপ্রিয় নয়।
বঙ্গবন্ধুর জয় বাংলা তেমন টেউ হয়ে আসেনি মনুর মুখ অব্দি।
তখনও শ্রীলেট সিলেট হয়নি কিংবা নাগরীলিপিও ধ্বংস হয়নি।
সুতরাং বাবাও জানতেন না ধীরেন দত্ত সংসদে দাঁড়িয়ে বাংলাভাষার জন্য আইন পাশ করাতে হবে।

চা গাছের দুপাতায় লেগে থাকা সোনার বাংলা
ধানের সবুজ পাতায় সোনার বাংলা
জলের স্রোতে মাছের সাঁতার সোনার বাংলা।

এমন কী ঘটলো
আমার বাবা তাঁর বাবার হাত ধরে সোনার বাংলা ফেলে
চাতলাপুর বর্ডার ক্রস করে হাঁটতে হাঁটতে
ছিঁড়া মানচিত্র বুকে জড়িয়ে চলে গেলেন রাতাছড়ায়?

পায়ের ছাপ আর ধুলো ঘাম বিন্দু বিন্দু গায়ে শুকালে
সারাদিন আনন্দাশ্রু টুপটাপ পড়বেই তো
প্রিয়ভূমি শ্রীভূমি সিলেটও দুজেলায় ভাগ হয়ে
মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল।পুরো শহর শ্রীমঙ্গল মনে হলেও
বাবার ঘাম
তাঁর বাবার ঘাম
তাঁর বাবার বাবার ঘাম
আমার ঘাম হয়ে ঝরলো এই একই পথের ধুলোয়।

ঘাম আর ধুলো মেখে শীতলপাটির মতো শুয়ে থাকবো
সদর হাসপাতালের পেছনের দুতলায় একরাত।

তিরিশ বছরেও ভুলা গেলো না বাবার মৃত্যুদিন।সে সময় কি বলেছিলেন। কি বলতে পারেননি।তখন কী অসহায় একজন সন্তানের অবস্থা হয়।বাবা মারা যাচ্ছেন সন্তান দেখছে এই কষ্টের চেয়ে পৃথিবীতে আর কোন কষ্ট বড় নয়।সুতরাং অন্যরা যখন কষ্ট দিয়ে সুখ পায় তখন আমি বাবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করি আর মনে মনে ভাবি কি আর দিচ্ছো তোমরা কষ্ট। আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যথা যা হয় তা আমি পেয়ে গেছি। বাবার মৃত্যুর সময় গ্রীষ্মের ছুটিতে বিলথৈ স্কুল থেকে রাতাছড়ায় ছুটি কাটাতে আসেন।কিন্তু ছুটির ২৪ দিনের দিন ৩০শে মে ১৯৯০ সালে রাত ১:৩০ মিনিট সন্যাসরোগ বাবাকে কেড়ে নিলো।রাতের খাবার খেয়ে বাড়ির যৌথ পরিবারের বড় উঠোনে ১১:৩০ মিনিট অব্দি সকলের সাথে নানা গল্প শেষে ঘুমাতে যান।রাত ১১:৩০মি নাগাদ টয়লেটে যান।তারপর ১ টা নাগাদ শ্বাসকষ্ট। শ্লেষা গলায় আটকে পড়ে।তারপর হার্ট অ্যাটাক। ১:৩০ মি সব শেষ। একটি কথা মনে পড়ে খুব।আমাদের কাকা সুভাষচন্দ্রকে বললেন :"সুভাষ তুই দেখে রাখিস "।তা কি আর হয়।কখনও কেউ দেখে টেকে রাখলেন কই।আমরা আমাদের নানা অভাব স্বভাবে তিরিশ বছর চলেছি।কেউ কথা রাখেনি।সব কষ্টকে মনে হয় এর চেয়ে কম।বাবার মৃত্যুর চেয়ে অনেক কম।সুতরাং আমার কোন আঘাতই আর আঘাত মনে হয় না।তেমনি মায়ের মৃত্যুও বাবার অভাবকে আরো শূন্যতায় নামিয়ে তিনিও গত হয়েছেন চব্বিশ বছর।মা মারা যান ১৯৯৬ সালের ৪ঠা মে। সুতরাং মাভৈ। এগিয়ে যেতে চাই। যত ব্যথাই হোক এটাই নিয়তি।আমিও তুমিও একদিন সবাই এরকমই কোন এক পরবে কোন এক উৎসবময় সকালে,রাতে কিংবা অন্য কোন সময় চলে যেতে হবেই।এটা নিয়তি।এটা প্রকৃতি। এটাই সৃষ্টিরহস্য।

বাজারে যেতে যেতে বাবা রাস্তায় একটি কাঁটা পেলে সরিয়ে দিতেন অন্যের অসুবিধা না হয় তা তার জীবনের ব্রত ছিলো।কারো অনিষ্ট কখনো চাননি।
সিলেটমৌলভীবাজারের আকাশের মতো বাবার মন।তাকে আমি জীবনে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বাবার সাথে নানা সময় হাঁটতে হাঁটতে মাইলের পর মাইল আমি গেছি।ছোট ছোট নানা প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে নানান জটিলতার সহজ সমাধান বেরিয়ে আসতো তখন।
অতি সামান্য সামান্য বিষয়কেও যে গুরুত্বপূর্ণ করে জীবনের সাথে মিশিয়ে ভাবতে হয় বাবা সে শিক্ষা দিয়ে গেছেন।



কাঁটাতার

কিছু স্বপ্ন আমার বাবা ওপারে রেখে গেছেন।
বাবার বাবাও কিছু স্বপ্ন ওপারে দেখতেন।
তাঁর বাবাও কিছু স্বপ্ন বুনতেন ওপারেই।
৫২র ভাষা আন্দোলনের আগে বাবার বাবা
আমাদের সকল স্বপ্নকে পাঁজাকোলা করে
এপারে নিয়ে আসেন।
তখনও কাঁটাতার দুই দেশের সীমানায় বসেনি।
বাবা চাতলা বর্ডার ক্রস করে
তাঁর প্রেমিকাকে ফুল দিতে পারতেন।

আমার কিছু মনের মানুষ ওপারে থাকেন
আমি ফুল নিয়ে কাঁটাতারে আসতেই
পাখির মতো সীমানা ভেদ করতে পারি না।
আমার ফুলগুলো সময় মতো প্রিয়জনের কাছে
দিতে পারি না।
আমার স্বপ্নের মতো ফুলও হেজেমজে যায়।

চাতলাপুর বর্ডার পেরিয়ে আসার সময় আমার যা মনে হলো:০২:০৩:২০১৮

চাতলাপুর

৬৮ বছর আগে এই পথেই বাবা দেশের বাড়ির মায়া বুকে কান্না চেপে পেরিয়ে গেছিলেন।
বাবার পায়ের ছাপ লেপ্টে আছে এই পথের ধুলোকণায়।
ধুলোগুলো উড়ে এসে আমার শ্বাসের ভেতর ঢুকে 
অবিকল বাবার শরীরের গন্ধ বহুদিন পর পেলাম।
বাবাই বললেন চল ইন্ডিয়ায় যাই।
ইন্ডিয়া মানে ভারত।ভারতদেশ।

আজ ৩০শে মে ২০২০।তিরিশ বছর বাবা নেই। এখনও কি নেই? আমার মনের সেতারে বাবার গান থেমে যায়নি কোনদিন।


জ্যোৎস্নারানী দাস আমাদের বড় বোন


১৯৭১ সাল আমার জন্মের পরপরই সারাক্ষণ যার স্নেহের পরশ পেয়ে আমার বেড়ে ওঠা তিনি জ্যোৎস্নারানি।আমাদের পাঁচবোন তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় বোন জ্যোৎস্নারানি।বাবার নিকট খুব আদরের মেয়ে জ্যোৎস্নারানি।
আমার ছোটবেলা তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলাম আমি।খাওয়া পরা ঘুমাতেও তাঁর সাথে আমার উঠবোস।তিনি খাবেন আমাকেও খাওয়াতে হবে।তিনি ঘুমাবেন তো আমার ঘুমাতে হবে।তিনি প্রাকৃতিক কর্মে তো আমারও যেতে হবে।এই দূরন্তপনা তিনি হজম করতেন আমারবেলা।
সেই তিনি বাবার আদর আর স্নেহের আশ্রয় পেয়ে লেখাপড়ায়ও ভালোই ছিলেন।
বাবা তখন ধর্মনগর পদ্মপুর দ্বাদশশ্রেণি বিদ্যালয়ে চাকুরী করতেন।বাবার চাকুরীসূত্রে জ্যোৎস্নারানি মানে আমার দিদিও ধর্মনগর থাকতেন।আমরা সবাই সে সময় ধর্মনগর থাকতাম।তখনও আমার ছোট ভাইবোন জন্ম নেননি।বড়দা,দিদি,ফুলতি আর আমি তখন বাবার কোলের পুত্রকন্যা।
দিদি পদ্মপুরেই পড়তো।সেই সময় ক্লাস অষ্টমশ্রেণি পাশ করার পূর্বেই বাবার অমতে তৎকালীন সময়ে একজনকে বিয়ে করে বসলো।বাবা তখন দিদির আচরণে ব্যথিত হয়ে কাঞ্চনবাড়ি স্কুলে বদলি হয়ে চলে আসেন।মেয়েকে মেয়েবরকে গ্রহণ করা তো দূর বাবা আর তার মুখ দেখতেও চাইতেন না।যদিও সেই বাবাও মেয়েকে আবার ঘরে তুলেন।বরকেও তুলেন।আমাদের প্রচণ্ড অভাবের সময় সেই জামাইবাবু আমাদেরকে আগলে রেখেও ছিলেন।
আজ অনেকদিন বাবা নেই। জামাইবাবু নেই। ভাগ্নে তিনজনের বড়জন রাজীবও নেই। আমরাও আর তেমন কেউ কারো খোঁজ নেবার সময় নেই। সকলেরই পরিবার পরিজনকে লালনপালন করতে করতে আমরা হিমশিম অবস্থায়। 
এই সময় দিদিও ফুসফুসের অসুখে, শ্বাসকষ্টের অসুখে দীর্ঘদিন  প্রায় সময় শয্যাশায়ী। বয়সও ষাটোর্ধ। পরিবারে পুত্র পরিজন আছে।পৌত্রও।কিন্তু দিদির শরীর ও মনে সুখ ছিলো না।সে রকম মানুষ হয়নি সন্তান।বড় ছেলে একটু মানুষের মতোই ছিলো।তাকেও ডায়াবেটিস আক্রান্ত করে কম বয়সে কেড়ে নিলো।পৌত্র ও ছেলে বউ আলাদা থাকেন।
দিদির বুকে যন্ত্রণা আমি টের পেতাম।আমারও সেরকম সময়-সুযোগ কমে যাওয়ায় সবসময় দেখতেও যাওয়া হয়ে ওঠে না।
এই সময়ে আসে পৃথিবীতে করোনার ক্রান্তিকাল। ভয়।ভয়ে আমরা পরিবারের সাথে পরিবারের দূরত্ব বাড়িয়েছি।
দিদির খবরও কদিন নিতে পারছি না।আমাদেরও পরিবারে চলছে অঘটন। 
গত দুবছর আগে বড়দার একমাত্র পুত্র দীনেনের মৃত্যু আমরা এখনও ভুলতে পারিনি।
গৌরবও প্রায় সময় অসুস্থ।
 দিদি কেমন ছিলো এই কদিন?
কেমন কাটতো তার সময়।
কে আর কার খবর রাখি আমরা।
বড়দাও বেশ কিছুদিন অসুস্থ। 
সময় আমাদের নাগালের বাইরে। 
আগরতলা বাড়ি আবার আগরতলা 
আবার ধর্মনগর।
আমিও বদলি হলাম বৃক্ষরাম।
পদ্মশ্রীও ধর্মনগর।
ছত্রছন্ন পরিবার আমাদের। 
কে আর কার খবর রাখি সময়ে পেরে উঠছি না।
এই সময়ে করোনা।পথে বের হতে ভয়।

১০:০৫:২০২১ খবর আসলো দিদি নেই। 

হতবাক। আমি হতবাক। আমি নির্বাক।এই দিদির সাথে ছোটবেলা না ঘুমালে না খেলে আমি আর আমি থাকতাম না।
তিনিও নেই। 
বড় অসহায় আমি।
পরিবার কেমন হয়ে যাচ্ছে। 
কেউ কারো খোঁজ নেবার সময় নেই। 
এই সময় দিদিও নেই। 
নেই মানে নেই। 
আর দেখা হবে না।
আর কথা বলবেন না।
আর কোন আব্দার করে বলবেন না
ভাই তুই একবার দেখে যাইচ...

আত্মক্ষর:দীনেনকান্তি ধর


দীনেনকান্তি ধর আমাদের পরিবারের সর্বশেষ পুরুষের মাঝে বড় সন্তান।গত দু'বছর আগে স্নাতক ডিগ্রি প্রাপ্ত হয় ফটিকরায় আম্বেদকর মহাবিদ্যালয় থেকে কলাবিভাগে।তার বাবা নিত্যানন্দ ধর।মা দীপালিরাণী মিত্র ধর।ছোটবেলা থেকে একটু অন্যরকম সে।সব কথায় রাজী থাকতো।আমার কথার অবাধ্য হয়নি একদিনও।
তার বাবা ও মা প্রায় সব বিষয়ে আমার পরামর্শ নিয়ে চলতেন।মেডিসিন থেকে সামাজিক সব রকম আনন্দ দুঃখ ভাগ করতেন।
আমি কর্ম ও অন্যান্য প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ১০কিমি দূর মহকুমা শহর কুমারঘাট থাকি।তাও প্রায় ১৪ বছর হলো।তবুও সব শলা পরামর্শ বাড়ির সকলেই করতেন।
দীপেন হরফে লিপ্টু। দুবছর আগে তার বোন দীপমালার বিয়েও হয়।
তারা এক ভাই এক বোন।
দ্বাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষাও আমাদের বাসায় থেকে  দিয়েছিলো।তার কাকুমণির একান্ত দেখভালে ও ভালোই ফল করছিলো।
গত কিছুদিন যাবৎ সে আসেনি আমাদের বাসায়ও।কিন্তু গত পরশুদিন হঠাৎ শুনলাম ও অসুস্থ। শুনেই বললাম হাসপাতাল যাও।তাড়াতাড়ি হাসপাতালও নেওয়া হলো।কৈলাসহর আর জী এম হাসপাতাল এখন জেলা হাসপাতাল।এর মূল পরিসেবা ভগবান নগর।ভর্তি করার পরই ডাক্তার বলছিলো রেফার লাগবে। আমি সাথে সাথে আগরতলা জি বি যাওয়ার পক্ষে ছিলাম।তার মা বাবা শিলচর।যথা যোগ্য প্রচেষ্টায় সে শিলচর মহেশপুর ভ্যালী হাসপাতাল (বেসরকারী) ০৬:০৭:২০১৯ সালের এক সকালে পাঁচটা নাগাদ ৫:৭:১৯ ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু হয়।

বাবার প্রবেশ ও প্রস্থান 

প্রবেশ:১৫ই জৈষ্ঠ (২৯শে মে)
প্রস্থান:১৬ই জৈষ্ঠ(৩০শে মে)

৩০ মে১৯৯০।আমার জীবনে একটি ঘূর্ণি ঝড়।কোন বিপদ সংকেত না জানিয়েই এসছিলো।আজ একটি ঝড় মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেলো।বুকের উপর দিয়ে শনশন বইছে।শীতল।হিম।হাত বাড়িয়ে খড়কুটোর নাগাল পাওয়া দুষ্কর।ঝড় বইছে সমান্তরাল। কখনো বাবার মৃত্যু। কখনো স্বপ্ন।মৃত্যু তো মৃত্যুই।আশা স্বপ্ন।কিংবা আপনজনের মৃত্যু সব কিছুতেই বিশেষ ক্ষতি।
আমার বাবার মৃত্যুও এরকম তুলপাড় তুলেছিলো হৃদয়ে।মন কিছুতেই মানতে পারছিলো না সে বিয়োগ।আজ থেকে সাতাশ বছর আগের একটি ভয়াবহ রাত ছিলে ৩০মে।কিছুতেই এ দিন আমার জীবন থেকে ভুলার নয়।আজ বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা আমাদের কোন সংকেত হয়ে আসেনি। তবুও এসছিলো।তা বাস্তব হয়ে এলো।আজকের ঝড়ও কি জীবনের পার্ট নয়?আমি তারে মেনে নিই বা না নেই জীবন এমনি।জীবন এক আনন্দ বিষাদের কারখানা।আজ আনন্দ তো কাল নিরানন্দ। কেউ সারা জীবন আনন্দে কাটায় এমন হয় না।আমরাও বাবার মৃত্যু মেনে না নিলেও মৃত্যু তো মৃত্যুই।
বাবার চলে যাওয়ার পর আমার ও আমাদের জীবন হয়ে ওঠে অন্ধকার।যেদিকে তাকাই শুধুই অন্ধকার।

বাবাকে নিয়ে প্রাসঙ্গিক একটি কবিতা

তিনি


তিনি হয়তো রাজধর মানিক্য ছিলেন না।
তিনি হয়তো আধিকারিক ছিলেন না।
তিনি হয়তো রাজনৈতিক ছিলেন না।
তিনি হয়তো বগল বাজাতেন না।
তিনি হয়তো সাতেপাঁচে থাকতেন না।
তিনি হয়তো প্রতিবেশির বেড়া টপকাতেন না।
তিনি হয়তো আলটপকা কিছু বলতেন না।
তিনি হয়তো কর্তাপুরুষ ছিলেন না।
তিনি হয়তো কেউ ছিলেন না।
কিন্তু তিনি মানুষ ছিলেন।

প্রবেশ:১৫জৈষ্ঠ(২৯ মে)। প্রস্থান:১৬জৈষ্ঠ(৩০মে)।


বাবাকে হারিয়ে এতিম আমরা।আজও উদ্বাস্তু জীবনের ঘ্রাণ কাটিয়ে আমরা মূল স্রোতে আসতে পারনি।

৩০:০৫:২০১৭
বিকেল:৪:৫০মি
তেলিয়ামুড়া।



তথ্য সুত্র :
১) মৌলভীবাজার জেলা ইতিহাস -মো: মুমিনুল হক
২) মৌলভীবাজার জেলা ইতিহাস ও ঐতিহ্য -রব্বানী চৌধুরী
৩) শিলহটের ইতিহাস -মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন
৪) শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ) -অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি
৫)পারিবারিক দলিলপত্র 
৬)গোবিন্দ ধর লিখিত কবিতা 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ