কথাসাহিত্যিক নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর
মুখোমুখি
কথাশ্রমিক ও কবি গোবিন্দ ধর
কথাসাহিত্যিক নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর
মুখোমুখি
কথাশ্রমিক ও কবি গোবিন্দ ধর
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর।কথাসাহিত্যিক।
জন্ম ১৯৬৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া,বাংলাদেশ। বসবাস ঢাকা।
গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ৬। (ভোরের জন্য প্রতীক্ষা, উত্তরসূরিগণ, রবীন্দ্রনাথ উপমা এবং আমি, মরণ চাঁদের রবীন্দ্রনাথ, মাননীয় মন্ত্রীর জন্য মানপত্র, পুষ্পিত ফাগুন সায়াহ্নের আগুন। উপন্যাস ৮। উদ্বাস্তু, কেকো, কেঁচো, জাল থেকে জালে, মাটির প্রদীপ ছিল সে কহিল, বিল ডাকিনি , A Tale of Rohingya, অচেনা নগরে অর্বাচীন কিশোর, দায়ভাগ, থাকে শুধু অন্ধকার। প্রবন্ধ বই ১। ছিন্নপত্রে রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ। গবেষণা গ্রন্থ Traditional Medicine in Bangladesh.
গোবিন্দ ধর :
(১)আবহমান বাংলাসাহিত্যে আপনার পরিচিতি ইতিমধ্যেই বই পাঠকদের নিকট শ্লাঘনীয়।
আমরা তাও আবার পরিচিতিটা তুলে ধরতে আহ্বান করি?
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর:১.
আমার জন্ম বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, ১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর। আমার লেখালেখির শুরু বলা যায় শৈশবে। ১৯৮১ সালে, এসএসসি পরীক্ষার পর হঠাৎ করেই। পরীক্ষার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গণপাঠাগারে যাতায়াত করছি, নানা রকম বই পড়ছি। আর পড়তে পড়তে হঠাৎ একদিন মনে হলো, আমিও গল্প লিখতে পারব। একটা ছিন্নমূল কিশোর আর ওর অসহায় পরিবারের কথা ভেবে সুখী নামে একটা গল্প লিখে ফেলি। সেটা স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ পায়। তার পর থেকে লিখতে থাকি।
গোবিন্দ ধর :
(২)আপনার জন্মস্থান বাংলাদেশের কোন জায়গায়?
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর:
(২)আমার জন্ম অজপাড়ায়। সবুজ গ্রাম। আমার শৈশব কেটেছে ওখানে। বর্ষায় বাড়িগুলোকে দ্বীপের মতো দেখাত। আমাদের ফসলের মাঠ তখন থৈথৈ। আমনের খেত জলে ভরভর। নানারকম জলদ লতাপাতার ভীড়ে ভেসে থাকত ধবল শাপলা আর শালুকের ফুল। এমন কি অতি ছোটো ছোটো পোকামাকড় ধরে খেতে দেখেছি চেলামাছ। ভাদরে ভেসে বেড়াত ডাহুকের ছা। আমি তো সাঁতার শিখি তিন বছর বয়সেই। বর্ষায় ঠেলা জাল, বাঁকজাল (ধর্মজালও বলে), কৈ মাছের জাল পেতেছি খেতের আলে, পানির তলে। পুটিমাছ ধরেছি জাল দিয়ে। শীতে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যেত। পানাফুল রঙিন করে রাখত ডোবার জল, ফাঁকে বরশিতে ধরেছি কালোপিঠ-হলুদ বুকের বড় বড় কৈ। আমনের নাড়ার তলের গর্তে জমে থাকত মাছ, আমরা ধরতাম। গ্রীষ্মে ধুসর মাঠ থেকে ওঠে আসত ঘূর্ণিবায়। রাতে চাঁদের তলে বসে দাদা দাদীর মুখে রাক্ষস হোক্কসের কিসসা শুনেছি। আরও কত কথা বলার আছে। এসব কিছু এবং যা বলা হয়নি সবই আমার লেখায় ওঠে আসে। আমি মূলত গ্রামসমাজ নিয়ে লিখেছি বেশি। সেটা কখনো নিজের গ্রাম, কখনো বাংলাদেশের দেখা অন্যান্য গ্রাম।
গোবিন্দ ধর :
(৩)গ্রামের ছবিটি বলুন।আপনার হয়ে ওঠা মানে কথাসাহিত্যিক হয়ে ওঠায় কতটুকু গ্রামের ভূমিকা বলুন?
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর:
(৩)উপরেই বলেছি।প্রশ্ন এক না হলেও বিষয়টি এক উত্তর এক।তাই আলাদ আবার বলছি না।
গোবিন্দ ধর :
(৪)আপনার জীবনের সাথে দেশভাগ কিরকম জড়িয়ে?
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর:
(৪) আমি দেশভাগ দেখিনি। বলা যায় পূর্বপাকিস্তান যা দেখেছি সেটা শিশুর চোখ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ দেখা। সে এক আতঙ্ক। দেশভাগের ক্ষতগুলো পরবর্তীকালে বেড়ে উঠতে উঠতে দেখেছি, উপলব্ধি করেছি পড়ে। আর নিকটজনদের দেশ ছেড়ে যাওয়া, তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে গিয়ে কিছুটা জেনেছি। দেশভাগ পরোক্ষভাবে আমার গল্পে এসেছে।
গোবিন্দ ধর :
(৫)আপনার সংকলনগ্রন্থগুলোর নাম বলুন ধারাবাহিকভাবে?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর:
(৫)গল্পসংকলন-- ভোরের জন্য প্রতীক্ষা, উত্তরসরণ, রবীন্দ্রনাথ উপমা এবং আমি, মরণচাঁদের রবীন্দ্রনাথ, মাননীয় মন্ত্রীর জন্য মানপত্র, পুষ্পিত ফাগুন সায়াহ্নের আগুন।
উপন্যাস -- উদ্বাস্তু, কেঁচো, জাল থেকে জালে, মাটির প্রদীপ ছিল সে কহিল, থাকে শুধু অন্ধকার। বিলডাকিনি, দায়ভাগ, আদম সুরত, সোলেমন।
কিশোর উপন্যাস -- অচেনা নগরে অর্বাচীন কিশোর, অর্কিড।
প্রবন্ধ - ছিন্নপত্রে রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ।
গোবিন্দ ধর :
(৬) আমি গল্প আর উপন্যাস দুটোই লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি।
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর:
(৬)আমি গল্প আর উপন্যাস দুটোই লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি।
গোবিন্দ ধর :
(৭)রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন নিয়ে আপনার উপন্যাসটির নাম?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর:
৭. রোহিঙ্গাদের নিয়ে উভয় বাংলার লেখকদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যে আমিই প্রথম উপন্যাস লিখি, উদ্বাস্তু ২০০২ সালে, প্রকাশিত হয় পত্রিকায় ২০০৫ এ, গ্রন্থাকারে ২০০৬। উদ্বাস্তু ইংরেজিতে A Tale of Rohingya নামে লিখি ২০১৩ সালে, যা ২০১৮ তে প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজিতেও আর আর কেউ রোহিঙ্গা নিয়ে উপন্যাস লিখেন নি।ভ রোহিঙ্গা জাতিসত্তার সংকট নিয়ে দ্বিতীয় উপন্যাস লিখি ২০২০ তে, সোলেমন শিরোনামে। এটি এবার প্রকাশিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমার পাঠ চলেছে ১৯৯৫ সাল থেকে। এবাত মোশে ইয়েগার এর দি মুসলিমস অব বার্মা অনুবাদ করেছি, যা প্রকাশের পথে।
গোবিন্দ ধর :
(৮)রোহিঙ্গা বিষয়ে আপনার কাজগুলো তাদের সমস্যা সমাধানের পথ কী বাৎলে দিয়েছে?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর:
৮. আমার লেখা রোহিঙ্গাদের সঙ্কট বুঝতে সহায়ক বলে পাঠকের অভিমত। তবে এদের সমস্যার সমাধান করতে হবে বিশ্বমোড়লদেরই।
গোবিন্দ ধর :
(৯)জল জীবন।জেলে জীবন নিয়ে আপনার উপন্যাস জাল থেকে জালে।সংক্ষিপ্তভাবে উপন্যাসটিতে জেলে জীবনের যে কষ্ট যন্ত্রণা জীবন জীবিকা তাতে কি কোন রকম আর্থসামাজিক উন্নয়নে সাহায্য করেছে?
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর:
(৯)জেলে জীবন নিয়ে রচিত উপন্যাস জাল থেকে জালে। এতে সমকালীন প্রান্তিক পেশাজীবী হিসেবে জেলেদের টিকে থাকার নাজুকতা তুলে ধরেছি। তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নির্ভর করে সরকারের পলিসির উপর, ক্ষমতাসীন্দের রাজনৈতিক চেতনার উপর।
গোবিন্দ ধর :
(১০)আদম সুরত নিয়ে বলুন?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর :
(১০)একটা উপন্যাস সে কলেবর আর আকারে যত ক্ষুদ্রই হোক এর সম্পর্কে খুব অল্প কথায় কিছু বলা যায় বলে আমি মনে করি না। তবে এর ভাষা নিয়ে, শৈলী নিয়ে তথাকথিত ব্যাকরণ নিয়েও অনেক কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু এর বিষয়, প্রেক্ষাপট, সমাজ, অর্থনীতি বা রাজনীতির কতটা ধারণ করল, এর উন্মোচন আর প্রক্ষেপণ কী এসব কিছু স্বল্প কথায় বলা যায় বলে অন্তত একজন লেখক হিসেবে আমি মনে করি না। আমি এমন কোনো উপন্যাস, গল্প বা একটি অনুচ্ছেদ বা বাক্যও লিখতে চাই না যা নিষ্প্রয়োজন। কারো লেখায় যে বিষয় একবারও এসে গেছে বা আমি মনে করতে পারি যে এ বিষয়ে কথাও পড়েছি সে রকম গল্প আমি সজ্ঞানে লিখতে চাই না। এবার আদম সুরত নিয়ে বলি।
আদম সুরত ছোট একটি উপন্যাস। তবে এর পশ্চাতে আরো দুটো উপন্যাস রয়েছে -- বি ল ডা কিনি এবং দা য় ভা গ। তিনটি মিলে ত্রয়ীত উপন্যাস।
সব কটি উপন্যাসের পটভূমি গ্রাম, গ্রামের রাজনীতি, শোষণ, দুর্বলের উপর সাবলেট অবিচার, নারী নির্যাতন আর এসবের বিপরীতে জেগে ওঠার সম্ভাবনার দিক। আদম সুরত উপন্যাসে নাম চরিত্রটা এমন এক যুবক যার জন্মপরিচয় সংকট আছে। সে বলাৎকারের শিকার এক নারীর সন্তান যে বেড়ে উঠে ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অকৃতদার মানুষের আশ্রয়ে এবং প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠে। অবৈধ সম্পর্কের সূত্রে জন্ম নেতা এক শিশুর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিকূলতায় ওর বেড়ে উঠা এবং যুবকের প্রতি উদারমনা আধুনিক তরুণীর ভালবাসা আর ওদের ঘিরে বর্তমান সময়টা আদম সুরত উপন্যাসে তুলে আনার প্রয়াস রয়েছে।
গোবিন্দ ধর :
(১১)আপনার প্রথম বই কোনটি?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর :
(১১) প্রথম গল্পের বই ভোরের জন্য প্রতীক্ষা ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়।
গোবিন্দ ধর :
(১২)কবিতা বিষয়ে আপনার ভাবনা বলুন?কবিতার বাঁক নিয়ে কিছু বলুন?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর :
(১২)কবিতায় আমার বিচরণ কম। রবীন্দ্রনাথের পর জীবনানন্দ এখনো আমাকে টেনে রাখে। এখনকার অনেক কবির কবিতা পড়ি, কিন্তু কবিতার বাঁক নিয়ে কথা বলার স্পর্ধা দেখাতে চাই না।
গোবিন্দ ধর :
(১৩)সাহিত্যে আন্তর্জালের ভূমিকা কিরকম বলে মনে করেন?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর :
(১৩)সাহিত্য বিকাশে অন্তর্জাল ভূমিকা রাখতে পারে অতি সামান্য মাত্রায়।
গোবিন্দ ধর :
(১৪)ই-বুক বিষয়ে কথা শুনবো?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর :
(১৪)ইবুক সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই।
গোবিন্দ ধর :
(১৫)সাহিত্যে রাজনীতিকরণ বিষয়ে কিছু বলুন?
নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর :
(১৫)সাহিত্যে রাজনীতি সরাসরি থাকবে না, কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্র সাহিত্যের অন্যতম প্রধান বিষয় হবে, যেহেতু মানুষ রাজনৈতিক প্রাণি।
গোবিন্দ ধর :
ধন্যবাদ আপনাকে।এই ক্রান্তিলগ্নে নানান মানসিক টানাপোড়েনের সময়েও সৃজনশীল উৎকর্ষতায় একটি সাক্ষাৎকার আপনি দিলেন।আপনার ব্যস্ত সময় থেকে এইটুকু আমাকে দেওয়ার জন্য দুদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির সৌহার্দ্যই সমৃদ্ধ হলো বলে মনে করি।
0 মন্তব্যসমূহ