গল্পকার সংযুক্তা দাস পুরকায়স্থ মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর

গল্পকার সংযুক্তা দাস পুরকায়স্থ 
মুখোমুখি 
কবি গোবিন্দ ধর 



গল্পকার সংযুক্তা দাস পুরকায়স্থ 
মুখোমুখি 
কবি গোবিন্দ ধর 

সংযুক্তা দাস পুরকায়স্থ মেঘালয়ের শিলং এ বসবাস করেন।শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। গল্পকার। শিলং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক। বর্তমান সক্রিয় সদস্য।এই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ দুই দুইবার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে দারুণ উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিলো।বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রথম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটন ম্যাগাজিন সম্মেলন-২০০৫ সালে আয়োজনের মূল কারিগর। ২০১৫ তিনি এই সম্মেলনের সময় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর সম্পাদকের দায়িত্বে।  আমরা আজ মুখোমুখি  গল্পকার সংযুক্তা দাস পুরকায়স্থের সাথে।

গোবিন্দ :
(১)আপনার পরিচয় হোক পাঠকের সাথে?
সংযুক্তা:
(১)আমি একজন শিক্ষয়িত্রী।, গল্পকার। শিলং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক। বর্তমান সক্রিয় সদস্য।
গোবিন্দ :
 (২)কবে থেকে লেখালেখিতে এসছেন?
সংযুক্তা:
২) কৈশোরে আমি যখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী তখন থেকেই লিখতাম। তবে, প্রথম ছোটগল্প অনামিকা লিখি যখন আমি স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। গল্পটি অবশ্য পরে সুবর্ণ জয়ন্তী পত্রিকার জন্য মনোনীত হয় নি।
(৩)শিলং যাপনের দিনগুলো কেমন কাটছে?

সংযুক্তা:
: ৩) আমি মেঘ পাহাড়ের কন্যা। তাই শৈল শহর শিল ্ আমার প্রিয় বাসভূমি। এখানকার রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ছাড়া আর কিছুই আমার অপছন্দের নয়। এখানকার নয়নাভিরাম পর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের  তো তুলনা নেই। এই পাহাড়ী রাজ্যের উপজাতিরা বিশেষত গ্রামাঞ্চলে সরল এবং সাধারণ জীবনযাপন করে। আজকাল হয়তো রাজনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র
গ্রামের অভ্যন্তরে ও প্রবেশ করেছে। তবে, এই শহরে পাকাপাকি থাকার বন্দোবস্ত করা চলে না তাই, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে ভাবলে বুকের মধ্যে এক অজানা মোচড় অনুভব করি।
গোবিন্দ :
(৪)শিলং এবং রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি কেমন?
সংযুক্তা:
(৪)শিলং এবং রবীন্দ্রনাথ এই ব্যাপারটাই এক অজানা অনুভূতি। তিনি তিন বার এখানে এসেছেন ভাবলেই শরীরে এক রোমাঞ্চকর শিহরণ লাগে। ১৯১৯,১৯২৩,১৯২৭ রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত এই তিন জায়গায় রবীন্দ্র সার্ধশতবর্ষে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের তরফ থেকে প্রভাত ফেরি  করে যাওয়ার আমার সৌভাগ্য ঘটে। দু:খের সঙ্গে জানাই বর্তমানে দুটি বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে আর বাড়ির মালিক ফলক পর্যন্ত রাখতে নারাজ। শুধু শেষের কবিতার পটভূমি শিলঙে আজ মেঘালয় সরকারের  তত্তাবধানে brookside বাড়িটি সযত্নে রক্ষিত।

গোবিন্দ :
(৫)বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ বিষয়ে বলুন।
সংযুক্তা:
৫) একটি বহু প্রাচীন সংস্থা। এর
।জন্ম ১৩৪৪ বাংলার ২৬ শে বৈশাখ, ইংরেজি ৯ই মে, ১৯৩৭খৃষ্টাব্দ। সৃষ্টি লগ্ন থেকেই পরিষদ সৃজনশীল কাজে ব্যাপৃত। তারপর শুরু হয় মাসিক সভা, সাহিত্য আলোচনা চক্র, তথ্য রচনা পাঠ।, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি। ২৯ শে জুলাই ১৯৯০ সাল থেকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর রবিবারের কর্মশালার শুভ উদ্বোধন হয়। সেই লগ্ন থেকেই শিলঙে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তার ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা কর্মশালা প্রকাশ করা আরম্ভ। করে। কর্মশালায় আগত লেখক/ লেখিকাদের  রচনা সম্ভারে এই পত্রিকা তার যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে ও পরিষদ  তাঁর সাহিত্য সংস্কৃতিকমূলক আবেদন নিয়ে আপন ঐতিহ্যে দাড়িয়ে আছে।
গোবিন্দ :
(৬)চেরাপুঞ্জিতে একদিন কেমন কাটলো?কোন বিশেষ মিথ?
সংযুক্তা:
৬) মেঘের কোলে চেরাপুঞ্জি সত্যিই এক মোহময় রোমান্টিক দিন যাপন। পাহাড়ের কোলে ঝরণা ছবির মত লাগে। আর গুহার কথা তো ভাষায় অব্যক্ত। যে ঐ গুহার ভেতরে প্রবেশ করেছে সেই একমাত্র এর মাহাত্ম্য। ওখানকার নংকালিকাই  জলপ্রপাত স্থানীয় প্রেমের মিথ কথার সাক্ষী। পাহাড়ের খাজে খাজে লুকানো ভালোবাসা যেন কবি মনকে নাড়া দেয়। আমি কবি নই তবুও। কবিতা লেখার গোপন বাসনা মনকে সেদিন মাতিয়ে তুলেছিল।মিথ নিয়ে কিছু কথা - স্থানীয় লোকের বিশ্বাস লিকাই নামে এক অল্প বয়সী বিধবা  গ্রামের রমণীদের প্রলোভনে দ্বিতীয় বার তাঁর শিশুর কথা ভেবে বিয়ে করে। কিন্তু নতুন স্বামী শিশুকে ভালোবাসা তো দূরের কথা  মায়ের শিশুর প্রতি এত অপত্য স্নেহ দেখে হিংসায় অন্ধ হয়ে একদিন মায়ের অবর্তমানে শিশু টিকে কেটে মাংস  রান্না করে । কাজ থেকে ফিরে আসার পর সে লিকাই কে তা খেতে দেয়। খাওয়ার পর বাইরে গিয়ে লিকাই কাচা সুপারি বা খোয়াই কাটছিল। হঠাৎ দেখতে পায় দূরে প্যাকেটে জড়ানো বাচ্চার আঙুল আর হাড় গোড় মাথা লিকাই সব ঘটনা বুঝতে পেরে জলপ্রপাতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। কথিত আছে লিকাই জলে  ঝাপ  দিয়ে প্রাণ দিয়েছে তাই এই জল প্রপাতটির নাম নংকালিকাই।
গোবিন্দ :
(৭)কোন বিশেষ স্মৃতি?
সংযুক্তা:
৭) সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর রবিবারের কর্মশালায় ২০০৩ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিন। অনেক বুদ্ধিজীবী আর জ্ঞানীগুণী জনের সমাবেশে আমি ভীরু ভীরু পায়ে প্রবেশ করি। সেখানে প্রথম পরিচয় কবি পীযূষ ধরের সঙ্গে। প্রাথমিক ভয় কেটে যাওয়ার পর আমি কেমন যেন অবলীলায় পীযূষ ধরের মতো প্রতিষ্ঠিত কবির কবিতার সমালোচনা করার দু:সাহস দেখিয়েছিলাম। অবশ্য সেদিন অনেকের বাহবা কুড়িয়ে ছিলাম।
গোবিন্দ :
(৮)আপনার গল্প সংকলন কয়টি? বলুন?
সংযুক্তা:
৮) গল্প সংকলন একটি নাম তরঙ্গিম।
গোবিন্দ :
(৯)এ যাবৎ রচিত গল্পগুলোর নাম বলুন।
সংযুক্তা:
৯) রচিত গল্পের সুখ্যাতি অনেক। তাই সংকলনের বাইরে আমার মনের পর্দায় যে ক'টি গল্প বিশেষ রেখাপাত করে। সে গুলির নাম  বলছি  স্বর- প্রকাশক ভাষা সাহিত্য, বর্ণমালার ৯ - প্রকাশক ত্রিপুরা, মিস কল, ভালোবাসার স্বপ্ন, মধু বসন্ত, অনামিকা,। প্রকাশিত গৌহাটি সময়প্রবাহ দৈনিক পত্রিকা। বাকি অপ্রকাশিত-উইক্যাণ্ড, কে বলে বিদায়, বড়মা,গফতার, ১৯শে ডিসেম্বর, কামাখ্যা স্পেশাল, পারিজাত, প্রগতিসদন, বেলাশেষে, ভালো থেকো, সাক্ষাৎকার, ডোর বেল, ঢুয়াত্তর নম্বর বাড়ি, অতনুর ঠাকমামণি, স্কাইলাক নাসিংহোম।
গোবিন্দ :
(১০)আপনার ছোটবেলা কোথায় কাটলো?জন্মই বা কোথায় হয়েছে?
সংযুক্তা:
১০) বল লাম  তো আমি মেঘ পাহাড়ের কন্যা। আমার জন্ম স্থান  শিলঙ। ছেলেবেলা ও কেটেছে এই শহরের বুকে।
গোবিন্দ :
(১১)পরিবার পরিজন সম্পর্কে জানবো?
সংযুক্তা:
(১১)পরিবার বলতে মা বাবা গত, আমরা পাচ ভাই বোন । তিন বোন  দু ভাই। দাদা ব্যাঙ্গালোর থাকে আর দিদি মুম্বাইতে। এখানে আমরা তিন ভাই বোন থাকি।
গোবিন্দ :
(১২)একলা আছেন?নাকি কোন বিশেষ পণ?কিংবা কোন স্মৃতিবহনের তাগাদা?
সংযুক্তা:
১২) না কোন পণ নয় শুধু সাহিত্যকে ভালোবেসে স ্ সার আশ্রমে ঢুকলাম না। বানপ্রস্থে থেকে গেলাম। তবে আনন্দে আছি।
গোবিন্দ :
(১৩)শিক্ষকতা থেকে অবসর যাপনের পর কোথায় কাটাবেন?কলকাতা নিশ্চয়ই?  কোন জায়গা?
সংযুক্তা:
১৩) দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়ায়।
গোবিন্দ :
(১৪)উপন্যাসে হাত দেননি?
সংযুক্তা:
১৪) না এখনো ভাবিনি।
গোবিন্দ :
(১৫)মেঘালয়ের কথাসাহিত্য বিষয়ে আলোকপাত করেন?
সংযুক্তা:
১৫) সম্প্রতি কিছু কাজ করছি।
গোবিন্দ :
(১৬)মেঘালয়ের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে অনুভব?
সংযুক্তা:
১৬) মেঘালয় রাজ্যে নানা রাজনৈতিক চাপান উত্তরের মধ্যে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে কাজ করা মানেই বিশাল প্রতিবাদ। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ। তবুও গারো পাহাড়ের মিলন আর খাসিয়া পাহাড়ের কর্মশালা নিয়ে আমরা মাভৈ মন্ত্রে, এগিয়ে ঢলেছি।
গোবিন্দ :
(১৭)মেঘালয়ের শিলং থেকে পীযূষ ধর সম্পাদিত পাহাড়িয়া এখনো বের হয়?পীযুষদা কেমন আছেন?
সংযুক্তা:
১৭) না পাহাড়িয়া এখন বের হয় না। পীযূষদার ও বয়স হয়েছে তিনি দিল্লিতে ছোট মেয়ের কাছে আছেন।
গোবিন্দ :
(১৮)ইতিহাসবিদ মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য মহোদয়ের বিষয়ে একটু বলুন?
সংযুক্তা:
(১৮)মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য  কর্মশালার প্রাণপুরুষ  প্রধানত তিনি এবং আরো দুজন সদস্যের উদ্যোগে কর্মশালার সাহিত্য আসরের শুরু। তাছাড়া তিনি নবাগত লেখক লেখিকাদের খুব উৎসাহ দিতেন। তিনি আজ নেই মেঘালয়ের বাংলা সাহিত্যের এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ও বিশাল শূন্যতা।
গোবিন্দ :
(১৯)শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য একজন লিটল ম্যাগাজিন যুদ্ধ। প্রথমবার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন করে পূর্বাঞ্চলে হইচই ফেলেদিলেন।মানুষটি কেমন আছেন?
সংযুক্তা:
১৯) শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য ভালো আছেন। অতীতের অন্বেষাই তার নিরন্তর প্রচেষ্টা । তা নিয়েই ব্যস্ত আছেন।
গোবিন্দ :
(২০)মেঘালয়ের সাহিত্যের সম্ভাবনা কিংবা বাংলা সাহিত্যের বর্তমান হালহকিকত?
সংযুক্তা:
২০) প্রতিকূল পরিবেশে আজও আমরা বলতে পারেন আশাবাদী। বাংলা সাহিত্যের কথা কী বলব বলুন অভিভাবকরাও শুধু মাত্র জীবিকার জন্য যা প্রয়োজন তার তাগিদ অনুভব করেন।
গোবিন্দ :
(২১)আগামীদিন বাংলাভাষায় রবীন্দ্রনাথের শৈলশহরে চর্চা থাকবে?
সংযুক্তা:
২১) সত্যি কথা বলতে কি সম্ভাবনা খুবই কম। আজ যারা সাহিত্য চর্চা করছেন সবাই চল্লিশোর্ধ। তালে বুঝতেই পারছেন আগামীর অবস্থা কি।
গোবিন্দ :
(২২)কোন পথে আমাদের মাতৃভাষা বিপন্নতা?
সংযুক্তা:
২২) অতি মাত্রায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিজের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে মাতৃভাষার অবহেলা করছি। সেখানেই হয়তো আমাদের বিপন্নতার ইতিহাসের শেকড় লুকিয়ে আছে।
গোবিন্দ :
(২৩)পরিশেষে জানতে চাই এমন কোন স্মৃতি যা আজীবন রেখাপাত করছে মনের গভীরে?
সংযুক্তা:
২৩) আমি একজন অতীতপ্রেমী বা নস্টালজিক। তাই সব পুরনো স্মৃতিই আমার মনে সবসময়ই জীবন্ত। তার মধ্যে কোন একটি বিশেষ ঘটনার কথা আমার আজ মনে পড়ছে না।

আপনাকে ধন্যবাদ। 

২৩:০৫:২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ