উজান মাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট :হারাধন বৈরাগী

হারাধন বৈরাগী
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট-১২

মাঝেমধ্যে কবিতার জন্য কবিতাঘাট যাই
মাঝেমধ্যে কবিতায় কবিতায় দেওলা হয়ে ওঠে দেওসঙ্গম।ঝড় ওঠে কবিতার।

কবিতার কৈলাস থেকে আসে অমলকান্তি
কবিতার কৈলাস থেকে আসে পরিযায়ী গল্পকার দেবব্রত।
আমি হারাধন যাই কাঞ্চনপুর থেকে
উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে।

দেবব্রতের টান আমি ভুলতে পারি না
সেলিমের টান ভুলতে পারি না
ভুলতে পারি না জয়বাংলা ডাক্তার সত্যেন্দ্রের টান‌ও।

ভোলা যায়?যাদের হাতে একদিন খোদিত দেওভ্যালির কবিতার মুখ, আমারই মুখ যেন
যাদের হাতে একদিন দেওভ্যালির চক্ষুদান।
আমার‌ই চক্ষুদান যেন

তাদের কথা মনে হলেই 
কাঞ্চনপুর যেন আমার আসমানের চেয়েও উচুঁ।

অমলটাকে ধরে রাখা গেল না
হঠাৎ কি যে হল তার 
উড়ে গেল মনুঘাট
উড়ে গেল ছাওমনু
মাঝখানে করমছড়ার কমল মাড়িয়ে অবশেষে কৈলাসে থিতু।
কৈলাসে কি ভালো আছে অমলকান্তি?
ভালো থাকলে কি আর আমার সাথে ,গোবিন্দের সাথে ,পদ্মশ্রীর সাথে ,গোপালের সাথে দেখা করতে ঝুলা নিয়ে আসে কুমারঘাট? মাঝেমধ্যে আমাদের নিয়ে রাতাছড়ায় আলাল‌উদ্দিনের বাড়ি গিয়ে গিলে আসে কবিতা?

অবশ্য কৈলাস থেকে খালি হাতে আসে না অমলকান্তি
ঝুলাভর্তি নিয়ে আসে ছড়া ও কবিতা। 

শুধু আমি‌ই থাকি শুন্যতায় মোড়া 
মনিকাঞ্চনের দেশে থেকেও আমার শূন্য ঝুলি।
কাঞ্চনপুর মনিকাঞ্চনের দেশ
পারি মাধুরীর দেশ।

কেবল স্থানীয় কেউ মনিকাঞ্চন মেলাতে পারে না।
মাঝেমধ্যে পরিযায়ী জুহুরীরা আসে,জড়ো করে ঠোঁটে ঠোঁটে কবিতার দেওলাদানা।
তারপর ঠোঁটে করে উড়ে উড়ে চলে যায়
সাজায় নিজের গেরস্থালি,ঘর করে কবিতার সাথে।

শুখা মরশুমে জলের অভাব হলে
ধুকতে থাকে গোটা দেওভ্যালি 
ঝুলা নিয়ে উড়ে আসে চরকবাই'র অভীক
বিশালগড়ের অপাংশু ,সঙ্গমের গোবিন্দ-পদ্মশ্রী
আর গৈরীকারা,আরো আসে জানা অজানা কবি লেখক ভ্রমণবিলাসী।

সকলের সাথে দেখা হয় না
স্মরণাগত হতে কেউ কেউ চায় না
স্মরণাগত না হলে কি দেখা হ‌ওয়া যায়?
তুমিই বলো অমলকান্তি?
ছুঁড়ে দিলাম তোমার কাছে সেলিমের‌ সংপ্রশ্ন‌ও
"কবিতা কি প্রকৃতই জাগিয়ে তোলে? যদি না তোলে, তবে সেটা কী?"
আমি বলি কবিতা আদৌ জাগিয়ে তোলে না
কবিতা কবির বুদ্ধি বাড়ায় জাগিয়ে তুলে ছলচাতুরি!

কাঞ্চনমার্গে থেকেও শুধু‌ই বুক চাপড়ে মরি
ধূলোঝড় উড়ছে গোটা বনস্থলী
ধূলো উড়ছে পাহাড় থেকে
ধূলো‌ উড়ছে সমতল থেকে
ধূলো উড়ছে আমার‌‌ই চোখে।

শূন্যঝুলা নিয়ে মাঝেমধ্যে ছুটে যাই 
যদি কিছু নিয়ে আসতে পারি
কবিতার জারিজুরি -ছলচাতুরী।

বেশ ছিলাম তো আমি
ইদানিং এক বেমোতে ভুগছি
পেঁচারথল পেরোতে গেলেই বুকটা ধুকপুক করে
আস্ত শাখানপাহাড়টাই বিশাল বিশাল মেশিনে
গিলে চলেছে।আর কটাদিন বাকী একে একে গিলে খাবে লংতড়াই, আঠারোমুড়া বড়মুড়া বেলকম জম্পুই কালাঝারি -নদীর যতো জারিজুরি।
ধূলিধূসর সকল পাহাড়তলি।রেণু রেণু ধূলিঝড় উড়ছে বাতাসে।

যেতে যেতে কেঁপে উঠি,শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
মারিজুয়ানা খেয়ে চিৎপটাং হয়ে যেন গোটা শাখানপাহাড়
অরণ্যনারীদের দেখা নেই কোথাও
সবুজের শ্বাস নেই,সর্বত্র‌ই অম্লজানের হাহাকার।
হন্যে হয়ে তাকিয়েও দেখতে পাইনি আমার রাঙাচুলিকে,মলিরুং কিংবা মেডোনা ডারলংকে।

ব‌ইবাড়ি গিয়ে দেখি এক‌ই রোগে আক্রান্ত কবি সমর‌ও।নদীহীন শহর কবেই বুঝি ধর্মনগর। অম্লজান নাকি নেই কোথাও।দলাদলি খেয়ে কবেই খেয়ে ফেলেছে কবিতার ঘরবাড়ি।রজ-বীর্য-ঘাম-লালা-থুথু সর্বত্র ছড়ানো-ছিটানো।কানাঘুষো,আক্রান্ত গোটা ধর্মতলি।

চারদিকে রটনা চলেছে
শহর থেকে দূরে বাউণ্ডুলে কবি সমর
অম্লজানের খোঁজে ঘুরপাক খায়
এক বাগান থেকে আরেক বাগানে 
বাগান নাকি তার শৈশব,বাগান নাকি তার আঁতুরঘর
চায়ের শাখা এখনও নাকি ভরপুর অম্লজানে।

চোখেমুখে চকমকি,তার শ্মশান আলো করে একদিন সবুজ চোখে তাকাবে চায়ের পৃথিবী।পায়ে পায়ে বেড়ে উঠবে চা-গাছগুলি।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোটা কিরাতের বনস্থলী,
আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে গোবিন্দের ব‌ইবাড়ি শ্বাস তুলে আমার প্রিয় বাঁশপাতা ছড়ার মতো
আর কতদিন হবে,শাখানের রাই আমার গেরস্থালি।

ইদানিং শুনতে পাই আমাকে মঙ্গলে যেতে হতে পারে।
তার আগে একজন নারীকে মঙ্গলে পাঠানো হবে
নারী নাকি পৃথিবীর প্রথম শষ্যের জননী।

তুমিই বলো অমলকান্তি শষ্যশ্যামলা সয়ম্ভু চিৎভূমি ছেড়ে
রুক্ষ উষর উপলখণ্ডাবৃত প্রাণহীন মঙ্গলে 
নারী কি হতে পারবে একাকি গর্ভধারিণী?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ