♠#বিষাদবিন্দু_আনন্দসিন্ধু♥ (০৩) ♦সাত♦মানবর্দ্ধন পাল

♠#বিষাদবিন্দু_আনন্দসিন্ধু♥
                      (০৩)
                  ♦সাত♦মানবর্দ্ধন পাল

সাত একটি সংখ্যা-- সংখ্যাবাচক শব্দ। সংস্কৃত 'সপ্ত' থেকে তদ্ভব শব্দ সাত। এই সাত সংখ্যাটি অন্য অনেক সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়। গাণিতিক বিবেচনায় যা-ই হোক, সাত সংখ্যাটি বাঙালির ধর্ম, ইতিহাস,  দর্শন ও সমাজ-মনস্তত্ত্বের অনেকাংশ জুড়ে আছে। পৃথিবীর ইতিহাসেও সাত সংখ্যাটির জয়জয়কার। 

সবারই জানা, পৃথিবীতে মহাদেশের সংখ্যা সাতটি-- এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এন্টার্টিকা। সাতসমুদ্র-তেরো নদীর ওপারে কত রাক্ষস-খোক্কসের গল্পই-না ছোটবেলায় শুনেছি দাদুদিদার কাছ থেকে! তাছাড়া পৃথিবীতে আছে প্রাচীনকালের সাতটি  আশ্চর্য বস্তু। ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান, চীনের প্রাচীর এবং ভারতের তাজমহল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঢাকার মোহাম্মদপুরে ঐতিহাসিক সাত গম্বুজ মসজিদের কথা এদেশেকে না-জানেন? আর কবি ফররুখ আহমদের 'সাত সাগরের মাঝি' নামে একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থও আছে। বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতিমান কয়েকজন লেখককে নিয়ে লেখা আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি  বিখ্যাত বইয়ের নাম 'সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত'।

হাসি-কান্নার অনুভূতি প্রকাশের প্রক্রিয়া যেমন মানবজাতির মধ্যে একরকম তেমনই সুরের ভাষাও এক। সংগীতের ভাষায় আছে সাতটি মৌলিক সুরের প্রকাশ-- সা (সরভ), রে (ঋষভ), গা (গান্ধার), মা (মধ্যমা), পা (পঞ্চম), ধা (ধৈবত), নি (নিষাদ)। এই সাতটি সুরের সাতটি পাখি নিয়তই ডাকাডাকি করে আমাদের মনের দুয়ারে! সুরের সাম্রাজ্যে এই সপ্তসুর সংগীত-সংস্কৃতির ভিত্তি।  সপ্তসুর ও সংগীতের কথা উঠলেই মনে পড়ে ভাইবোনের সম্প্রীতিময় পুরনো দিনের সেই গানটির কথা-- "সাত ভাই চম্পা জাগোরে/কেন বোন পারুল ডাকো রে।

'কাণ্ড' শব্দটির অন্যতম অর্থ-- অংশ, ভাগ, পরিচ্ছেদ, পর্ব। ভারতবর্ষের প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণের আছে সাতটি অংশ। তাই বলা হয় সপ্তকাণ্ড রামায়ণ। প্রাচীনকালেও সম্ভবত জাতীয়ভাবে শোকপ্রকাশের জন্য সাতদিন নির্ধারণ করা হতো। তা-ই লক্ষ করা যায়, মধুসূদনের 'মেঘনাদবধ' মহাকাব্যে। রাম-রাবণের যুদ্ধে রাবণের বীরপুত্র মেঘনাদের মৃত্যু  হলে লঙ্কাপুরীতে সপ্তাহব্যাপী শোক ঘোষণা করা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন লিখেছেন, "সপ্তদিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।" ইসলাম ধর্মেও  সাত আসমান এবং সাত সালামের কথা আছে।

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার রক্তাক্ত বর্ণমালা কথা বললেও সাত সংখ্যাটির উঁকি দেয়। আমাদের স্বরধ্বনি এগারোটি হলেও মৌলিক স্বরধ্বনি সাতটি-- অ আ ই উ এ ও এবং অ্যা। এই মৌলিক স্বরগুলোই  স্বরধ্বনির প্রাণ। বাংলা ব্যাকরণে সমাসের নিয়মে 'সেতার' মানে তিন তারের সমাহার বা তিন তার আছে যার। তবে ব্যাকরণ যা-ই বলুক, সেতারে কিন্তু সাতটি তার-- তিনটি নয়!

 মহাকাশে সপ্তর্ষি মণ্ডলের কথা তো আমরা সবাই জানি! মেঘমুক্ত সন্ধ্যার শুক্লপক্ষের আকাশে শৈশবকালে কী  অবাক-বিস্ময়ে চেয়ে থাকা প্রশ্নবোধক চিহ্নটির মত সাতটি উজ্জ্বল তারার দিকে! দ্বিতীয় শতকে জ্যোতির্বিদ টলেমি আবিষ্কার করেছিলেন এই সপ্তর্ষিমণ্ডল-- যা আটচল্লিশটি তারকামণ্ডলের অন্যতম। ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা উজ্জ্বল এই সাতটি নক্ষত্রের নাম রেখেছেন প্রাচীনকালের সাতজন ঋষির নামে। এঁরা হলেন-- ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, অঙ্গিরা, অত্রি, বশিষ্ঠ, মরীচ।

বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে মৌলিক রঙের সংখ্যাও সাতটি-- বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। যাদের সংক্ষেপে বলা হয় "বনীাসহকলা"। এখানেও সাত সংখ্যাটির প্রাধান্য! এগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির পরিমিত মিশ্রণের ফলেই সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর অযুত রঙের মেলা। মনে হয় পুরনো দিনের সেই গানটির কথা-- "সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না-পাই/জানি না তো কেমন করে কী দিয়ে সাজাই।"

বাঙালির ভোজন-বিলাসিতা সর্বজনবিদিত। পঞ্চব্যঞ্জনের পরে আসে সপ্তব্যঞ্জনের কথা। বাঙালি খেতে যেমন ভালোবাসে তেমনই খাওয়াতেও। ভুঁড়িভোজন, আকণ্ঠভোজন, নাক ডুবিয়ে খাওয়া, কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া-- এসব তো সপ্তব্যঞ্জন দিয়েই সম্ভব। আর এই ভুঁড়িভোজন অধিকাংশই হয় সাত পাকে বাঁধার সময়। বাঙালি হিন্দুদের বিয়ের অন্যতম আনুষ্ঠানিকতা হলো--  বরকে ঘিরে বধুর সাত পাকের বন্ধন। তাই বাঙালির রসনাবিলাসেও সাত সংখ্যাটির গুরুত্ব কম নয়! সাত পাকের বন্ধন ও সপ্তব্যঞ্জনের সমাহার একসূত্রে গাঁথা। 

 একটু ঘুরে আসি বাংলা বাকধারার রাজ্যে। আমাদের মাতৃভাষার প্রবাদ-প্রবচন এবং বাকধারায়ও সাত সংখ্যাটির সমুজ্জ্বল উপস্থিতি। সাতকথা শুনানো (কটুকথা বলা)। সপ্তকাণ্ড রামায়ণ (মস্তবড়ো ব্যাপার)। সাতকাহন (প্রচুর পরিমাণ)। সাতখানা করে লাগানো (অতিরঞ্জন করা)। সাতখুন মাফ (বড়ো অন্যায় করে অব্যাহতি)। সাত ঘাটের জল খাওয়া (নানা স্থানে ঘুরে বেড়ানো বা নানাভাবে অপদস্ত হওয়া)। সাত চড়ে রা নেই (সমস্ত পীড়ন-অত্যাচার নীরবে সহ্য করা)। সাত তাড়াতাড়ি (খুব দ্রুত)। সাত-পাঁচ  (নানা ঝামেলার বিষয়)। সাত পুরুষের ভিটা (পূর্বপুরুষের আবাসস্থল)। সাত রাজার ধন (অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস)। সাত-সকাল (ভোরবেলা)। সাত-সতেরো (নানারকম জিনিসপত্র)। সাতেপাঁচে না-থাকা (কোনো ঝামেলায় না-জড়ানো)।

তাই লক্ষ করা, নানাবিধ ভাবপ্রকাশে এবং বাকচাতুর্যে সাত সংখ্যাটি কতোভাবেই-না জড়িয়ে আছে আমাদের মাতৃভাষায় এবং জীবনযাপনে। ইংরেজি ভাষায় সেভেন-- যাকে বলা হয় 'লাকি সেভেন'-- তার কথা না হয় বারান্তরে লিখব। তবে বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট বা ঐতিহাসিক মাইলফলক সাত মার্চের কথা যদি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ না-করি তবে তো সবই ব্যর্থ এবং এলেখাও ছাইভস্ম। বায়ান্নর একুশে যদি বাংলাদেশের ভ্রুণ হয় তবে সাত মার্চ, জন্মদিন না-হলেও, বাংলাদেশের প্রসববেদনার দিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ