বিষাদবিন্দু আনন্দসিন্ধু
(০২)
♦কালো♦
মানবর্দ্ধন পাল
আমাদের মত সাধারণের দৃষ্টিতে কালো একটি রঙের নাম। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, কালো কোনো রঙ নয়-- এমন কি সাদাও নয়। বিজ্ঞানের বিবেচনায় সাতটি মৌলিক রঙ-- সংক্ষেপে এর নাম বেনীআসহকলা। আমরা সবাই শৈশবে এসব জ্ঞানের কথা জেনেছি। বেগুনি, নীল, আকাশী,সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল-- এই সাতটি রঙের মধ্যে কিন্তু কালো এবং সাদা নেই। তাই বিজ্ঞান বলে, কালো ও সাদা কোনো রঙ নয়। মৌলিক সব রঙ গ্রাস করে বা লুকিয়ে ফেলে বলে কোনো রঙ যখন দেখা যায় না তখনই তা কালো। আর সাদা তখনই হয় যখন কোনো রঙই ধরে রাখতে পারে না। তবে বিজ্ঞানের এসব কথা মেনেও আমরা সাদা-কালোকে 'রঙ' বলেই বিবেচনা করি। রঙের অবশ্য প্রতীকী তাৎপর্যও আছে। লাল রঙকে আমরা বিপ্লব বা ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করি। তেমনই সবুজ জীবনের প্রতীক, আকাশী উদারতার, হলুদ মুমূর্ষুতার, সাদা শান্তির প্রতীক। আর কালোকে আমরা বলি শোকের প্রতীক। এজন্যই শোক দিবসে আমরা কালো ব্যাজ ধারণ করি।
বিজ্ঞান যা-ই বলুক না কেন, কালো রঙের মাহাত্ম্য অনেক-- গুণাগুণ প্রচুর! 'গুণাগুণ' মানে তো গুণ এবং অগুণ। ভালোমন্দ মিলিয়েই গুণাগুণ।কাক কালো, কোকিল কালো-- আমরা নিন্দা করি না! ছাতার কাপড় কালো, বিশেষ বাহিনীর পোশাক কালো-- খারাপ বলি না। তা চারিত্র্য লক্ষণ। কিন্তু আমাদের সমাজমনস্তত্ত্ব এমনই বিটকেলে যে গায়ের রঙটি কালো হলেই নাক সিঁটকাই-- প্রত্যক্ষে না-হলেও পরোক্ষে তো বটেই! কালো মানেই অসুন্দর, কুৎসিত আর সাদা বা মানেই সুন্দর। এমন বাজে ধারণা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেই প্রবল।কিন্তু গাত্রবর্ণের ওপর মানবীয় সৌন্দর্য নির্ভর করে না। সৌন্দর্য সামান্যই বহিরঙ্গের-- অধিকাংশই অন্তরের। অথচ গায়ের রঙটাই আমাদের চোখে পড়ে, অন্তরের সৌন্দর্য উপলব্ধি হয় না! মনের আলো ওপরের কালোকে ঢেকে দিয়ে উপচে পড়তে পারে, দূর করতে পারে চার পাশের অন্ধকার তা বুঝতে পারি না আমরা। এই ফর্সা-সুন্দরের ধারণাটি অনেকটাই ঔপনিবেশিক শাসনের কুফল! তা শিমূলফুলের মত রঙের চাকচিক্য আছে কিন্তু সুবাসের মনোহারিত্ব নেই।
কালো আর ফর্সা-- এই গাত্রবর্ণের জন্য ব্যক্তি-মানুষ দায়ী নয়। ব্যক্তি নিজে তা নিয়ন্ত্রণ করে না-- করতে পারেও না। কিন্তু ভেতরের সৌন্দর্য ব্যক্তি-মানুষের নিয়ন্ত্রিত এবং অর্জিত। অথচ রক্তক্ষয়ী বর্ণবাদ বিশ্বে কালো মানুষকে কত নির্যাতনই-না করেছে। রক্ত ঝরিয়েছ, প্রাণ কেড়েছে অসংখ্য মানুষের। অথচ মানুষের গায়ের রঙ কালো হয়। 'মেলানিনের' প্রভাবে। এর মাত্রা কম থাকলে গায়ের রঙ হয় সাদা আর একটু বেশি হলেই কালো। অথচ তা নিয়ে মানুষের মধ্যে কত কত বিভেদ, উন্মত্ততা ও হিংস্রতা! বাঙালিরা ইউরোপীয় এবং আমেরিকানদের মত বর্ণবাদী নয়। ওরা যেভাবে কালো মানুষ নিগ্রোদের ঘৃণা ও নির্যাতন করে আমরা তেমন নই। তবে কালো চামড়ার মানুষের প্রতি আমাদের নাক সিঁটকানো ভাব আছে!
এমন অমানবিক মানসিক দৈন্যের বিরুদ্ধেই লালন গেয়েছেন : "নানান বরণ গাভীরে ভাই/একই বরণ দুধ।/জগৎ ভ্রমিয়া দেখলাম/একই মায়ের পুত!" কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তও লিখেছেন : "কালো আর ধলো বাহিরে কেবল/ভিতরে সবার সমান রাঙা।" আর ভূপেন হাজারিকার সেই বর্ণবাদ-বিরোধী জনপ্রিয় মানবিক গানটি তো সবাই শুনেছেন : "আমায় একজন সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা/ আমায় একজন কালো মানুষ দাও যার রক্ত কালো। "
তবে আমাদের বাংলা সাহিত্যে কিন্তু কালো নিন্দনীয় নয়। বরং সেখানে কালোরই জয়জয়কার। বিভূতিভূষণের বিখ্যাত 'কবি' উপন্যাসের উক্তি : "কালো যদি এতই মন্দ, চুল পাকিলে কান্দ কেনে?" কবি জসীম উদদীন লিখেছেন, "কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি/কালো দোয়াতের কালি দিয়েই কেতাব-কোরান লেখি।" হেমন্তের জনপ্রিয় গানটি কে না শুনেছেন? -- "মেঘ কালো, আঁধার কালো আর কলঙ্ক যে কালো/যে কালিতে বিনোদিনী হারালো তার কুল/তার চেয়ে অধিক কালো কন্যা তোমার মাথার চুল!" কালোর প্রতিরূপ অন্ধকার। কথাসরিৎসাগর শরৎচন্দ্রই রাতে জাহাজে রেঙ্গুন যাত্রার কালে আবিষ্কার করেছিলেন, কোনোকিছুই রূপহীন কুৎসিত নয়-- আঁধারেরও রূপ আছে।
কালোর কথা বললেই মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথের কথা! কী কাব্যময় করে তিনি করেছেন কালো রূপের জয়গান! "কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি-- কালো, সে যতই কালো হোক/ দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।" কালোর গুণগান করতে গিয়ে এর মধ্যে দার্শনিক সত্যও তুলে ধরেছেন : "আলো বলে, 'অন্ধকার, তুই বড় কালো।/ 'অন্ধকার বলে, 'ভাই, তাই তুমি আলো।'" তাছাড়া কালোর প্রসঙ্গ এলেই মনে পড়ে যায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথা। তাঁর বিখ্যাত 'মেজাজ' কবিতাটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং আফ্রিকার কালো মানুষের পক্ষে কী চমৎকার প্রকাশ! সংসারে নির্যাতিতা একটি কালো বউয়ের স্বামীর সঙ্গে শয়নকক্ষের সংলাপ-- একটু পড়ুন : "বউ বলছে, 'একটা সুখবর আছে।/--- বলছে, 'ঠিক দেখো, আমার মতই হবে।'/--- 'কী নাম দেবো জানো?/ আফ্রিকা।/ কালো মানুষেরা কী কাণ্ডটাই-না করছে সেখানে।"
কালোর আরেক নাম কৃষ্ণবর্ণ। দেহের বর্ণ কালো শ্যামলা বলেই সনাতন ধর্মে দ্বাপর যুগের অবতারের নাম শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণ শব্দের অপভ্রংশ 'কানু'। কানুর সঙ্গে 'আই' প্রত্যয় যোগ করে 'কানাই' (কানু+আই)। তাই জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলিতে পাই : "পাসরিতে নারি কালা কানুর পিরীতি।" আর গিরিশ ঘোষের লেখায় পাই : আমি জপিনু চিকণ কালো/ আমার রাইয়ের রূপে ভুবন আলো।" শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবেসে কালাচাঁদ, কালিয়া, কালোশশী বলেও ডাকা হয়। তাই গিরিশের লেখায় আরও পাই : "বাসি হলো বনমালা দেখ ওলো প্রাণ সই।/ ধূসর গগনে শশী, কালশশী এলো কই!" আর মধ্যযুগে কবিগানের শিল্পী হরু ঠাকুরের রচনায় পাই : "ওগো চিনেছি চিনেছি, চরণ দেখে,/ ঐ বটে সেই কালিয়ে।" শ্রীকৃষ্ণ কালো ছিলেন বলেই গোপিনীদের যমুনার কালো জল এবং কালো তমালগাছ প্রিয়। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুও কৃষ্ণপ্রেমে মগ্ন হয়ে যমুনার কালো জলে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।
নৃবিজ্ঞান বলে বাঙালি সংকর জাতি।
'সংকর' মানে মিশ্র। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : "শক-হুনদল, মোগল-পাঠান এক দেহে হল লীন।" একারণে আমাদের গায়ের রঙ নিগ্রোদের মতো কালো নয় আবার ইংরেজদের মতো সাদাও নয়। দুধে-আলতায় গায়ের রঙ আমরা পাবো কোথায়! আর্য-অনার্যসহ বহু জাতি-গোষ্ঠীর মিশ্রণের ফলেই আমরা হয়েছি শ্যামলা-- ধুপছায়া রঙের। মনে পড়ে বিগত ষাট দশকের কবি কায়সুল হকের কথা। খুব মায়াময় তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থের নাম : "এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি।" কবির সঙ্গে দেখা হলে বলতাম-- আরে ভাই, কেবল শুনবো কেন? শ্যামল রঙ শিল্পিত রমণীদের হামেশাই দেখছি এদেশে! যত অভাবই থাকুক আমাদের-- পেছন ফিরে দ্বিতীয় বার দেখার মতো শ্যামল রঙ রমণীর কমতি নেই এদেশে। অনেকে আমাদের গায়ের রঙ 'তামাটে' বলেও উল্লেখ করেন। একালের কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার একটি কাব্যগ্রন্থের নাম : "আমরা তামাটে জাতি"। শ্যামলাই বলি কিংবা তামাটেই বলি-- এটা বাঙালি অহংকার। আমাদের পরিশ্রমের চিহ্ন নিখুঁতভাবে লেগে আছে এই গাত্রবর্ণে। এই চিহ্ন অক্ষয়, অমলিন। তাই প্রয়োজন নেই ফর্সা হওয়ার কোনো ক্রিমের। বেঁচে থাকুন কাজলাদিদিরা, কৃষ্ণাবোনেরা ও শ্যামলীআপুরা-- কালাদা এবং কানুভাইয়েরাও।
0 মন্তব্যসমূহ