বিষাদবিন্দু_আনন্দসিন্ধু (০১)তালাচাবি:মানবর্দ্ধন পাল
♠#বিষাদবিন্দু_আনন্দসিন্ধু (০১)♦তালাচাবি♦
চাবি হারাননি কিংবা ভুলক্রমে চাবি ফেলে আসেননি এমন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তা একেবারেই আনুবীক্ষণিক। প্রয়োজনের চাবিটি হাতে না-থাকলে যেমন বিড়ম্বনা তেমনি হাতে থাকলেও বিপদ! হয়তো পথেঘাটে খোয়া গেছে, অফিসে ফেলে এসেছেন। টিপতালার সমস্যা আরো বেশি-- হয়তো চাবি ঘরে রেখেই অন্যমনস্ক হয়ে তালায় টিপ দিয়ে ফেলেছেন! এমন ঘটনা কদাচিৎ একালে কারোর জীবনে না-ঘটার কথা নয়! দরকারি চাবিটা হয়তো ভুলক্রমে আপনার পকেটেই ছিল কিংবা দরজাখোলার অস্ত্রসম চাবিটি ফেলেই আপনি চলে এসেছেন শতেক কিলোমিটার দূরে! এমন অবস্থায় অন্যের যেমন অপার অসুবিধা তেমনই আপনারও সমূহ বিপদ! অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিপর্যয়কে বিপদ না-বলে বরং 'আপদ' বলাই সঠিক। এমন আপদবালাই হরহামেশা না-হলেও মাঝেমধ্যে ঘটে! তখন "কই গেল, কোথায় রাখলাম" বলতেবলতে মাথা ফোরটি নাইন! অবশেষে ফুটপাতে বসে-থাকা তালাচাবির ইঞ্জিনিয়ারকে ডাকো নয়তো ভাঙো তালা, ভাঙো কয়রা বা হেজবুল!
তালা একটি যন্ত্রেরই নাম আর চাবি এটি বন্ধ বা খোলার অস্ত্র-- একথা সবারই জানা। তালা কে আবিষ্কার করেছেন তা জানি না। তবে দরজা বা দরকারি কিছু আবদ্ধ করে রাখার যন্ত্রের প্রচলিত নাম তালা। শব্দটি সংস্কৃত 'তলক' থেকে এসেছে। এর অন্য নাম 'কুলুপ'। তবে বহুতল-বিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের প্রতিটি স্তরকেও আমরা 'তালা' বলি-- যা আসলে তলা। "কানে তালা লাগা" বললে আবার অন্য অর্থ বোঝায়। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচনায় পাই : "দারুণ প্রহার তার উদরের জ্বালা।/ঘন শ্বাস বহে তার কানে লাগে তালা।"
দ্বার বন্ধ করার যন্ত্র হিসেবে তালা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস। এই তালা নিরাপত্তার প্রতীক। চোর যাতে সহজে মূল্যবান জিনিস অপহরণ করতে না-পারে। আগে ছিল সিঁদকাটা ও বেড়াকাটা চোর। কালের আবর্তে ওরা এখন কেউ পকেটকাটা, গ্রিলকাটা ও তালাকাটা চোরে রূপান্তরিত হয়েছে। তালা নিরাপত্তার প্রতীক ঠিকই তবে তা ভদ্রলোকের জন্য-- নিশিকুটুম্বের জন্য নয়। পাকা চোরের জন্য যত দামি তালাই হোক সবই পানিভাত-- তা ডিজিটাল তালাই হোক বা আঙুলের ছাপযুক্ত তালাই হোক।
'চাবি' পুর্তুগিজ শব্দ। তালা খোলার শলাকা বা কাঠি। কোনো কল বা যন্ত্রপাতি চালু বা বন্ধ করার বিশেষ কাঠির নামই চাবি। চাবিকে অনেকে 'কুঞ্জি' বলে। সংস্কৃত 'কুঞ্জিকা' থেকে 'কুঞ্জি'। গ্রামবাংলায় চাবিকে বলে ছোড়ান্ বা ছোড়ানি। চাবির আকৃতি শলাকার মত বলে এর সঙ্গে 'কাঠি' শব্দ জুড়ে দিয়ে বলা হয় 'চাবিকাঠি'। কোনোকিছুর মূল চালিকাশক্তি বা প্রধান নিয়ন্ত্রককেই বলা হয় চাবিকাঠি। সম্প্রতি প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের কাব্যপ্রতিভা সম্পর্কে ড. আকবর আলি খানের একটি চমৎকার বইয়ের শিরোনাম "চাবিকাঠির খোঁজে"। 'প্রধান' অর্থেও 'চাবি' শব্দটির ব্যবহার হতে পারে-- চাবিশব্দ, চাবিব্যক্তিত্ব, চাবিকবিতা। তাই বলা যায়, আমাদের স্বাধীনতার চাবিব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু কিংবা " দুই বিঘা জমি" রবীন্দ্রদর্শনের চাবিকবিতা। কাব্য করে রূপক অর্থেও চাবি শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তাই কবি দেবেন্দ্রনাথ সেনের 'অশোকগুচ্ছ' কাব্যগ্রন্থে পাই : "হল না রে ঘুরাইতে, প্রেমচাবি না ছুঁইতে, বাজে কেন সোহাগের কল।"
তালা এবং চাবি দুই জিনিস হলেও চাবি শব্দটি তালার বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অনেক অঞ্চলে তালা অর্থেই চাবি শব্দটির প্রয়োগ হয়। চাবিমারা বা চাবিখোলা মানে তো তালাবদ্ধ বা মুক্ত করার প্রসঙ্গেই বলা হয়। এই তালাচাবি নিতান্ত বৈষয়িক বস্তু হলেও বাংলা কবিতায় কিন্তু এর অবস্থান গৌণ নয়! সলিল চৌধুরী এবং শঙ্খ ঘোষের দুটি বিখ্যাত কবিতা আছে 'চাবি' শিরোনামে। নজরুল পরাধীনতা ও বন্দিত্বের প্রতীক হিসেবে তালাভাঙাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বলেছেন : "লাথি মার ভাঙরে তালা/ যত সব বন্দীশালা/ আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা। " একালের কবি নির্মলেন্দু গুণও লিখেছেন : "চাবি দিয়ে তালা খোলা দেখিয়াছি,/এবার তালা দিয়ে খোল দেখি চাবি?" কলের পুতুল চাবি দিলেই নড়ে এবং ঘোরে। আগের দিনের ঘড়িতে সময় বেঁধে চাবি দেওয়া হতো। এবিষয়টি বাংলার লোককবি ও বাউলরা তাদের গানে রূপকার্থে ব্যবহার করেছেন : "একবার চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া/জনম ভইরা ঘুরতে আছে।" এই চাবি তো মানবজনমের প্রাণসত্তা ও জীবনযাপনের পরিক্রমা। এর নিহিতার্থ ব্যাপক।
বাঙালির বাস্তব সংসারজীবনে এক গোছা চাবির গুরুত্ব অনেক। চাবির গোছাটি যে-নারীর আঁচলে বাঁধা থাকে তিনিই সংসারের কর্ত্রী। তার আদেশনির্দেশই সর্বমান্য। তিনিই গৃহস্থালির পরিচালক।জমিদার-গিন্নি বা সামন্ত-পত্নীর আঁচলের চাবির গোছা আসলে ক্ষমতা ও প্রাচুর্যেরই প্রতীক। শাশুড়িরা আঁচলে চাবির গোছা বেঁধে পুত্রবধুদের পরিচালনা করেন। বাংলা নাটক-সিনেমা এবং উপন্যাসে এধরনের চরিত্র অনেক লক্ষ করা যায়। এই চাবিগুচ্ছের দখল নিয়েও হয় ব্যাপক দ্বন্দ্ব-সংঘাত। একাধিক পুত্রবধুর মধ্যে সেই চাবিগুচ্ছের দখল নিয়ে শুরু হয় মন কালাকালি, ঝুটঝামেলা এবং অবশেষে যৌথ সংসারের ভাঙন ও বিভক্তি।
চাবি যার হাতে থাকে তিনিই কি-ম্যান--দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ভেবে দেখুন জহির রায়হানের "জীবন থেকে নেয়া" সিনেমাটির কথা! সেখানে এক গোছা চাবি হয়ে উঠেছিল স্বাধিকার ও স্বাধীনতার প্রতীক। স্বৈরাচারের কবল থেকে চাবির গোছাটি জনতার হস্তগত করতে কত কৌশল, কূটনীতি এবং আন্দোলন-সংগ্রাম! তাই চাবির অধিকার আদায় ও সংরক্ষণ মূলত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতারই প্রতীক।
রবীন্দ্রনাথ 'চাবি' শব্দটি তাঁর গানে নতুন চেতনায় প্রতীকায়িত করেছেন। তাঁর বাউলাঙ্গের একটি বহুশ্রুত গান : "ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে-- ও বন্ধু আমার!" গানের এই লাইনটি নিয়ে সাধারণের মনে অনেক প্রশ্ন! তালাভাঙার কথা না-বলে তিনি চাবিভাঙার কথা বললেন কেন? শব্দপ্রয়োগে কি ভুল করেছেন তিনি? তা তো হওয়ার কথা নয়! তিনি তো রবীন্দ্রনাথ। যদিও "রবীন্দ্রকাব্যে ভুল" শিরোনামে প্রমথনাথ বিশীর একটি বই আছে। এবিষয়টি তেমন নয়। একথা সত্যি যে, সাঁওতালসহ পশ্চিমবঙ্গের কোনো-কোনো অঞ্চলে তালা ও চাবি সমার্থক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই চাবিভাঙার বিষয়টি বস্তুগত অর্থে ব্যবহার হয়নি। এর ভেতরে আছে রবীন্দ্রদর্শনের নিগূঢ় তত্ত্ব। বিশ্বলোকের যে আহ্বান রবীন্দ্রনাথ অন্তর্লোকে ধারণ করেছেন এবং বাউলতত্ত্বের যে সর্বমানবিক বোধ লালন করেছেন আত্মায় তাতে সকল প্রকার বন্দিত্বই তিনি অস্বীকার করেছেন। তাই বিশ্বলোকের অনন্ত যাত্রায় তিনি এমন চিরন্তন পরিব্রাজক হতে চান যাতে কেউ তাঁকে আর গৃহবন্দী করতে না-পারে! তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ঘরের চাবি ভাঙা মানে, মুক্ত জীবন থেকে কেউ যেন আর বদ্ধ ঘরে প্রবেশ করাতে না-পারে। ঘরের চাবি ভেঙে ফেলা তো চিরদিনের মুক্ত জীবন। বন্ধন ও শৃংখলে আবদ্ধ না-হওয়ার চিরন্তন মানবীয় বাসনাই সেখানে ব্যক্ত হয়েছে।
0 মন্তব্যসমূহ