হারাধন বৈরাগী কবিতা সংখ্যা


হারাধন বৈরাগী কবিতা সংখ্যা 


হারাধন বৈরাগী

উজানমাছমারা রিজার্ভফরেস্ট 

সময় সব কিছু খেয়ে ফেলে যেনো করোনার মতো। একদিন এখানেই ছিল আমার ঘর হাতেকড়ি।মাবাবা পরিবার পরিজন। এখানেই ছিল আমার বাসর।আজ কেউ নেই এখানে।অনেকেই বিদায় নিয়েছেন।কেউ কেউ রাজ্যান্তরে।সব যেন ধূ ধূ বালু স্মৃতি।এখানেই কেটেছে আমার শৈশব কৈশোর যৌবন।এখানেই বাঁদিকে গিয়ে টিলার নীচে একটি আওয়াল গাছের গোড়ায় আমার মাত্র চারবছর বয়সে দাদার এক বন্ধু পাখি শিকার করতে এসে নিজের অজান্তেই গাদাবন্দুকের গুলিতে ফালাফালা করেছিল আমাকে।বাবা মাফ করে দিয়েছিলেন তাকে বিনাশর্তে।তার সাথে আমার এখনও মাঝে মাঝে দেখা হয়। দেখা হলে আমাকে কুশল জিজ্ঞাসা করে। আজ বাবা নেই।বাবাকে মনে পড়ে। ভাবি এখন এমন বাবা ক'জনার আছে যে মাসুম ছেলের আতাতায়ীরূপীকে অপূরণীয় ক্ষতি সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারে! 
আমার তখনই ঠাঁই হওয়ার কথা ছিল গোরস্থানে।বেঁচে যাই, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালের ডাক্তার নামক ভগবানদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।। সেই ক্ষতচিহ্ন  ধারণ করেই আজও বেঁচে আছি।এখন করোনা কাল।এমন কালেও ডাক্তার বাবুরাই আমাদের কাণ্ডারী।এ যেনো সকলের বুকে জাগ্রত থাকে।সবাই যেনো সর্বদা ডাক্তারবাবুদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। সময়ের করাল থাবায় আজ ভিটেখানা আগাছায় ভরে গেছে।এখানে আজও মাঝেমধ্যে যখন গিয়ে দাঁড়াই  বুকটা কান্নায় ভরে ওঠে।কাঁদতে ইচ্ছে করে হাউমাউ করে।

উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্ট

পাহাড় দিন দিন পাহাড় হতে চলেছে
সমতল দিন দিন সমতল---

পাহাড়ের সাথে সমতলের বিবাহ হলে 
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!

একটা ধর্ম দিন দিন নীল হতে চলেছে
একটা ধর্ম দিন দিন লাল---
একটা ধর্মের সাথে আরেকটা ধর্মের বিবাহ হলে
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!

একটা জঙ্গল একটা সমতলকে 
রক্ত দিলে সমতল বেঁচে ওঠে
একটা সমতল একটা জঙ্গলকে রক্ত দিলে 
জঙ্গল জেগে ওঠে 
একটা জাত আরেকটা জাতকে রক্তদিলে
জন্ম নেয় হোমোস্যাপিয়েন্স!

এক বাড়ির ক্রোমজোমের সাথে আরেক বাড়ির ক্রোমজোম চুম্বন খেলে জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স

বিজ্ঞানের এই সরলতত্ত্ব একবিংশ শতাব্দীর একজন বরকিনী জানে
জানে একবিংশ শতকের একজন বরক!

অতপর 
একজন বরকিনী চলছে নারীর দিকে
একজন বরক চলছে পুরুষের দিকে 

একজন পুরুষবাদীর সাথে একজন
নারীবাদীর বিবাহ হলে জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!

একটা দেশ চলছে দেশের দিকে
একটা পৃথিবী চলছে পৃথিবীর দিকে
একটা দেশের সাথে পৃথিবীর বিবাহ হলে 
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!

একজন নারী চলছে নারীর দিকে
একজন পুরুষ চলছে পুরুষের দিকে
একটা ধর্ম চলছে ধর্মের দিকে
একটা পাহাড় পাহাড়ের দিকে
একটা সমতল সমতলের দিকে

কিছু বরক মানুষের দিকে
কিছু অবরক অমানুষের দিকে
কিছু উন্মাদ উন্মাদের দিকে

কিছু আত্মা প্রেতাত্মার দিকে
কিছু প্রেতাত্মা আত্মার দিকে
কিছু মানুষ অমানুষের দিকে
কিছু অমানুষ মানুষের দিকে

মানুষ অমানুষ কিংবা বরক অবরক
আত্মা প্রেতাত্মার বিবাহ হলে
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স!

হোমোস্যাপিয়েন্সের গর্ভেই 
জন্ম নেবে হোমোস্যাপিয়েন্স
একথা বিশ্বাস হোক 

বিশ্বাস হোক 
মানুষের ভ্রমণ মানুষের কাছে
বরকের ভ্রমণ বরকের কাছে
পৃথিবীর ভ্রমণ পৃথিবীর কাছে

পৃথিবী ও মানুষের কিংবা 
পৃথিবী ও বরকের মিলন হোক
মিলন হোক মানুষ ও বরকের 
জন্ম নিক হোমোস্যাপিয়েন্স!

একথা বিশ্বাস হোক
কেউই চায়না-
একজন মানুষ নিঃসঙ্গ হারিয়ে যাক মঙ্গল গ্রহে
একজন মানুষ হয়ে যাক নিঃসঙ্গ ফরেস্টার
একজন বরক-উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্ট।

উজানমাছমারা-রিজার্ভ-ফরেস্ট-২

ছন কাটতে গিয়েছিল 
জঙ্গলমায়া তাকে টেনে নিয়ে গেল
লাশ আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

ছিল ,তার কেউ ছিল না
অভুক্ত সন্তানেররা কোথায় হারিয়ে গেল
কেউ খবর রাখলো না।

জানা গেল,রাজা আর সমুদ্রপুত্রদের
শোষণ নিপীড়নে খাওয়াখাদ্য অনটনে
মায়াগুলো ধীরে ধীরে মানুষখেকো--!

এতোই দূর্বল হয়ে পড়েছে যে 
একা একা শিকার সম্ভব নয়
তাই তারা যৌথ নেমেছে শিকারে
দিনে গা-ডাকা দেয় জঙ্গলে 
রাতে খাবারের সন্ধানে হন্যে হয়ে
ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকালয়ে

পরের ইতিহাস সকলের জানা
শুরু হল মায়াদাঙ্গা বা মানুষবন্যা
যেমন প্রতিবছর মাছবন্যা হয় গণ্ডাছড়ায়!

জঙ্গল ভুলে গেল পাখিদের কথা
পাখিরা মরে হয়ে গেল ভূত

মঙ্গল ভুলে গেল মায়াগাঁথা

রাজা,পাট ছেড়ে কবিরাজ বনে গেল
আর এমন এক মোদক বানালো
মায়া মরলো ছিটেফোঁটা 
মানুষ হল মান্দাই ফোটামাটি পাতিছড়া
কিছুমায়া গাঢাকা দিল আরেক জঙ্গলে
কিছুমায়া কালচার করলো সুযোগসন্ধানীরা
নিয়ে আসা হল লঙ্গরখানায়, আসলে-নকলে
রাজার লঙ্গর বলে কথা
আর লেহ্য পেয়ো খেয়ে--

ফুলে ফেঁপে উঠলো

ফুলে ফেঁপে উঠলো
সুযোগসন্ধানীরাও!

লোকালয় কানাঘোষা করলো শুধু
চিনতে পারলেও 
প্রকাশ্য কিছু বলতে পারলো না কেউ

মায়ারা ধীরে ধীরে বৈষ্ণব হয়ে গেল
অবশ্য গুরুর নির্দেশ মতো 
মাঝে মাঝে ওঙ্কার দিতো

বৈষ্ণব হয়ে গেলে সব‌ই ঈশ্বরময় 
অনেকদিন প্রায়- জঙ্গলে আর 
ওঙ্কার শোনা গেলো না

ইদানিং ফের শোনা যেতে লাগলো --
মঙ্গল থেকে জঙ্গলে
প্রভারাম পাড়া থেকে মালদাপাড়ায়
চারজন নিখোঁজ হয়েছে

বিশেষজ্ঞরা বলবেন 
নিশাজঙ্গলে এখন তো আর মায়া নেই
তবে এ-কোথা থেকে এলো

বলছি অবগতি--
এবার মায়া এসেছে জাদুঘর থেকে 
যেখানে কোরবানি করা হয়েছিল 
গুরু রতনমণিকে!

অনেকদিন ধরে 
জাদুঘরে রাখার পরিকল্পনা ছিল
একমাত্র পিস 
হলেই যে হস্তিসম
এতো শত্রুও জানে !

কেউ কেউ বলছে মায়া একলা নয় 
সাথে অবশ্যই মায়াবী কিংবা মায়াবিনী আছে
খুব দূরে নয়, কাছেই কোথাও ওৎপেতে--

কেউ-- জোর গলায় বলছে, দূরে হোক
আর কাছে -সে অবশ্যই সমুদ্রপুত্র 
কিংবা সমুদ্রপুত্রী হলেও হতে পারে!

গুরুভাই !ভূমিপুত্র!
বাঘ সবেমাত্র জঙ্গলে প্রবেশ করেছে 
খুব দূরে নয়-উজানমাছমারা রিজার্ভফরেস্ট!

মাফ করবেন,ভুল করে বলে ফেলেছি
ভূমি কিংবা স্থল নয়,তুমিও-সমুদ্রপুত্র!

উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্ট-৩

দিকে দিকে সোরগোল উঠেছে
ভেসে উঠেছে সকল রিজার্ভ-ফরেস্ট
বাতি আছে বাতি নেই
বৃক্ষ আছে বৃক্ষ নেই
জানালা আছে জানালা নেই
কিছুই বুঝা যায় না!

এবার পুরজন জ্যোতিশী নগরনারী 
সকলের কপালে চাঁদোয়ার ফুটেজ!

অসম্ভব বন্যাকবলিত এই রাজধানী শহর
এবার থেকে আর গোঙানির পরিভাষা নেই !

উজানমাছমারা রিজার্ভ-ফরেস্ট 
আর ঘোলাটে নেই-পনচোখা ছড়া
মং হেংগরঙ শিঙা সারেন্দার নেশা 
ডুঙ্গুরের নারকেলকুঞ্জ নিয়নের জোসনা।

রাজধানীর ব্রুইফাংগুলি ছাঁটা হয়েছে
হরিগঙ্গা বসাক রোডে আর মেলা নেই
আগের কোন আলোআঁধারি নেই
চকচক করছে সব আলোর বন্যা!

বটতলার পুরোনো ব্রুইফাঙের
মাথার উপর সাটানো হয়েছে রাজছত্র
পুরোনো অন্ধকারের‌ আর ঢাকনা নেই
যেখানে ঢেকে রাখা হতো সকল উন্মাদনা।

রাজছত্রের উপর দিয়ে উড়তে উড়তে
এখন অনায়াসেই যাওয়া যায়
দেখা যায় কিরাতের  সকল উদরপ্রদেশ
শিকার করতে একটা তীর‌ই যথেষ্ট!

ফকফকা দেখা যায় সব
পূর্ণিমার জঙ্গলের মতো
তিলকপাড়া থেকে পিলাকছড়া
নুনছড়া থেকে ভালুকছড়া
ডাক্তার-দুয়ার থেকে আন্দারছড়া
খয়েরপুর থেকে কমলাপুর--

প্রজারা তুলতুলে বুকের উপর 
ইচ্ছে মতো চলাফেরা করতে পারে
কোথাও অতিমারী নেই!

পথের সকল জঙ্গল ন্যাচারেল-পার্ক
আগের মতো আড়াল নেই
সিপাহীজলা ছাড়া বাঘ নেই 
পোষমানা হয়ে গেছে সকল রিপু।

আবছায়া-আলিঙ্গন নেই কোথাও 
ভয়ডরের দুপাশেই ঘরবাড়ি,নদী ও নারী
কোন ভ্রমণেই আর নেই কোন মানা !

প্রদেশজুড়ে এতো এতো সিগনাল-পোস্ট
তবে নদী বেয়ে দিবারাত্রি 
নেমে আসছে কেন এতো ঘুম
চোখের উপর নেমে আসছে 
দুর্ভেদ্য পর্দার পর পর্দা--

এতো আইম্মানি উঠছে কেন
রিজার্ভ থেকে পাড়া 
সীমানা থেকে অন্তঃপুর--

পোষমানা মায়ারা ফিরে যাচ্ছে
মিয়ানী রিজার্ভের দিকে
ফরেস্ট থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে
অন্তঃকোষীয় মূর্চনা।

এতো সব স্বর-গ্রাম!
জঠরে অমিমাংসিত আগুন নিয়ে  
হরিগঙ্গা বসাকের বুকে 
লুটিয়ে পড়েছে কিরাতের জ্ঞানমা!

অথচ সঙ্গম থেকে নীরব দূরে
জঙ্গল থেকে ,পাড়া থেকে,শহর থেকে
সিঁথিম‌উড়ের মতো রেখে আসছে 
কেউ কেউ হিমায়িত উষ্ণতার বস্তা।


উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট-৬

উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে
দূরে ন‌ও তুমি
দোলকের গান থেকে পদাবলী থেকে
অনেক যোজন-তোমার অপার অবয়ব

চকিত হরিণী,চামল-রিঠার জঙ্গলে
উড়াও রোজ সুন্দিফুল।

পরিযায়ী যুবকের অঙ্কশায়িনী থেকে
কোন ছুৎমার্গ নেই কখনও
গরীমা নেই সতীচ্ছদ নিয়ে
গর্ভ‌-কেশরে ধারণ করো কাঙ্ক্ষিত বকুল 

ধর্ষণ নেই তবু জিনলিপির ভেতরে
আগাছা নেই,পতনের বুদবুদ নেই 
বারংবার তাই ঘুরে ফিরে আসি 
তোমার‌ই কাছে
ঘন্টাপাখির মতো লাভডাব ওঠে
সমগ্র রেংদিল জুড়ে

আর সমর্পণ করি  
আমার যা কিছু মুক্ত-বন্ধ অহম
বাসন্তি ,তোমার‌ই ঔরসে ।


হারাধন বৈরাগীর গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা

খুমপুই

-সেলিম মুস্তাফা 


খুম মানে ফুল । পুই মানে সম্ভবত শ্রেষ্ঠ ।
আর এটা হয়ত দোলনচাঁপারই আরেক নাম ! শুভ্র নিশিপ্রিয়া, কোমল মদালসা কিন্তু তীব্র !
এমনি এক কবিপ্রিয়ার নাম হাসমতি । হাসমতি ত্রিপুরা

‘পরমা প্রকৃতি
 তোমাকে নিয়েই আজকের কবিতা

চিত্রা ছড়ার জলে উদোম
স্নান করে হাসমতি ত্রিপুরা
ধর্মবোন আমার, লক্ষ্মী মেয়ে
সাইমার জলে সেই কবে

ধুয়ে ফেলেছে আফিমের মৌতাত ।’ 
(হাসমতি ত্রিপুরা-আট)

১৯৮০ সালের নভেম্বরে কাঞ্চনপুরে চাকুরীতে ঢুকলাম গ্রামীণ ব্যাঙ্কে । কিছুদিন পর সেখানে বদলি হয়ে এলেন দেবব্রত দেব । পরিচয় নিষ্প্রয়োজন । সকলেই চেনেন বিশিষ্ট গল্পকার ও ‘মুখাবয়ব’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে । আমাদের আরেক কলিগ শিবেন্দ্র দাশগুপ্ত । সাহিত্য করেন না, কিন্তু হাতের লেখা খুব সুন্দর । ব্যস্‌, হয়ে গেল । আমরা সাইক্লোস্টাইল করে কবিতার কাগজ করলাম “এই বনভূমি” । সম্পাদক হোমিও ডাক্তার সত্যেন্দ্র দেবনাথ । ইনিও কবি, আমাদের মনের আশ্রয় আর শরীরের চিকিৎসক । এখনো দৈনিক সংবাদে মাঝে মাঝে লেখেন । আছেন আগরতলা জয়নগর ।

এই বনভূমি” কাঞ্চনপুরের প্রথম কাগজ । দ্বিতীয় কাগজ “মন্বন্তর” । এটা প্রেসে ছাপা । ধর্মনগর থেকে ছাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম । আর এটাও কাঞ্চনপুরের ইতিহাসে প্রথম কোন ছাপানো কাগজ । এটার পেছনের পৃষ্ঠায় কাঞ্চনপুরের অসমাপ্ত ব্রীজ নিয়ে একটা মন্তব্য ছিল “কাঞ্চনপুরের দুঃখ” শিরোনামে । এটা পড়ে ব্রীজ কোম্পানীর ইঞ্জিনীয়াররা খুব ক্ষেপে গিয়েছিল আমাদের ওপর ।

বহু বছর পরে কাঞ্চনপুর থেকে ধর্মনগরে আমার বাসায় উপস্থিত বঙ্কিম দেবনাথ নামে এক ভদ্রলোক । হাতে একটা কবিতার কাগজ । “এই বনভূমি” । এটা প্রেসে ছাপানো । বললেন সব কথা । আমাদের কাগজটাই এঁরা নতুনভাবে করেছেন । আমি অভিভূত ।

এই বঙ্কিম দেবনাথই ‘হাসমতি ত্রিপুরা’র কবি । হ্যাঁ, ইনিই আজকের সুকবি “হারাধন বৈরাগী” । ইনি গণ্ডাছড়ায় বদলি হয়ে আরেকটা কাগজ করেন “বনতট” নামে ।

অভিশাপ কখনো আশীর্বাদ হয়ে যায় । দুর্গম জায়গায় বদলি হয়ে আমাদের জন্য কবিতার ভাণ্ডার খুলে দিলেন বঙ্কিম দেবনাথ ওরফে কবি “হারাধন বৈরাগী” । গণ্ডাছড়ার জগবন্ধু পাড়াকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে কবি হারাধন বৈরাগী ত্রিপুরার এই সুবিশাল অরণ্যজগতকে যেভাবে উদভাসিত করলেন এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে আমাদের একেবারে হৃদয়ের কাছে, এর মূল্য এখন বোঝা না-গেলেও একদিন ভবিষ্যৎ তাঁকে তাঁর যোগ্য সম্মান দিতে বাধ্য হবে, এটা  অবধারিত । কারণ ওখানে যদি কোন হৃদয়বানকে যেতে হয়, সেই অনুমতি নিতে হবে হারাধন বৈরাগীর কাছ থেকেই । আর না-হলে, সে-যাওয়াকে যাওয়া বলা যাবে না । এই অঞ্চল নিয়ে তাঁর একটি গদ্যগ্রন্থও আছে, যার নাম “খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই”। এটাতে রয়েছে কথা উপকথার জীবনমালা—খুমবতাং—খুমপুই ফুলেরই যেন এক মালা, যার তীব্র মাদক সুবাস আমাদের বিবশ করে টেনে নিয়ে যায় গহীন থেকে গহীনের দিকে । “খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই” একটি সম্পদ । ত্রিপুরার সম্পদ । আগামী পৃথিবীর মানুষের সম্পদ । একে ডিঙিয়ে যাওয়া যাবে না । এর ভেতর দিয়েই যেতে হবে । কারণ, হারাধন বৈরাগীই এই বনানীর প্রথম ‘রোয়াজা’ । প্রথম ‘অচাই’ ।

এবার বইটি পড়ে মনে হল লেখক খুব দ্রুত নোট ডাউন করেছেন, যখন যেখানে গল্প আর ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন । ফলে প্রায় একই ধরণের বাক-বিন্যাস  এবং কিছু পুনরাবৃত্তি রয়ে গেছে । গোটা বইটি পুনর্লিখিত হলে আরও সুখপাঠ্য হবে । লেখকের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, ঘরে বসে বসে শুধু কাহিনি শুনে লিখে যাননি, প্রতিটি জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখে এসেছেন । মূলত ভ্রমণই তাঁর লক্ষ্য আর সে সঙ্গে অপার কৌতুহল ।

তাঁর কবিতার বই তিনটি । “হাসমতি ত্রিপুরা”, “হৃদি চংপ্রেঙ” এবং “খুমপুইপাড়ায়” । প্রথম গ্রন্থে তাকে যেভাবে পাই, পরের দুটিতে একটু সতর্ক মনে হল । যেন শহুরে বাতাস বিনাশ করতে লেগেছে কবির কৌমার্য ! এমন না-ও হতে পারে, তবু মনে হল আমার । আগে কিছু কবিতা পড়া যাক ।
আলোচনা বা সমালোচনা মূলত সাহিত্যপাঠেরই রূপভেদ মাত্র । যার কাছে যেমন ।

‘চিঙ্কারা রাত্রির মতো
তুমি, অধরাই থেকে গেছো
হাসমতি, নিঃস্তব্ধ সুন্দিবন

করুই গামাই উদালের ছায়ায় 
বাঁশ, বেত, ছন্‌ আর
গাইরিঙের তামাটে মায়ায় 

দশদিগন্ত ঘুরে ফিরে
তোমার কাছেই থমকে দাঁড়াই !’ 
(হাসমতি ত্রিপুরা-নয়)

কিংবা
‘...পোড়া জুমের টিলায়
পদ্মগোখড়োর মতো রিয়ার ফণায়
হাসমতি আমার রোদ আলগায় ।’    
(হাসমতি ত্রিপুরা-পঞ্চান্ন)

চিরন্তন প্রেমের কথাই । তেরে জ্যয়সা কোই নেহি । কিন্তু এখানে পরিবেশটা অন্যরকম তাই হাসমতিও অন্যরকম, প্রকৃতির সঙ্গে একাকার এবং অধরা । 
লক্ষ্যণীয়, কবির ভাষা সংকোচন । প্রয়োজনের অধিক কিছু নেই । তাঁর পরবর্তীকালের রচনাগুলোতেও এই শব্দ নির্বাচন ও মিতাচার একটা বিশেষ মাত্রা নিয়ে এসেছে, যা অনেক কবির মধ্যেই তেমন দেখা যায় না । শব্দের ওপর বিশ্বাস আর ভরসা দেখা না গেলে ধরে নিতে হয় কবি শব্দের ওজনই বুঝতে পারেননি । অনেক  কবি ব্যস্ত হয়ে পড়েন এই ভেবে যে, পাঠককে হয়ত বোঝানো গেল না । ফলে আরও বিশেষণ আরও ব্যাখ্যাবহুলতার দিকে ঝুঁকে পড়েন, এবং রচনাটি কবিতা না হয়ে অন্য কোথাও চলে যায় । কোন ম্যাগাজিন বা ফেসবুক খুললেই ডেইলি-কবিদের এমন রচনা আমাদের চোখে পড়ে ।

কবির বনবাস কবিকে সমৃদ্ধ করেছে বলাই বাহুল্য ।

‘বড়দিনের বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে
ছিন্নমূল লাফাইতি রিয়াঙের খড়ের চাল

শুকনো লাকড়ির আঁটির ভেতরে 
ফেঁসে আছে সান্তাক্লজের দাড়ি...’
(হাসমতি ত্রিপুরা-চব্বিশ)

ধর্মের দাড়িও ত্রিশঙ্কু হয়ে আছে । রঙ পাল্টায় অবস্থা পাল্টায় না । তোমার পৃথিবী তোমারই ! কোন দেবদূত আসে না আঁধার বিমোচনে । কারণ—

‘...জঙ্গলের কোন দুয়ার নেই
চোখ নেই বসতবাড়ির মতো...’ 
 (হাসমতি ত্রিপুরা-ঊনত্রিশ)
 
তবু কবিই বলতে পারেন—  ‘...আক্রান্ত হই যেন তোমার অসুখে ।’ (ঐ)

হারাধন বৈরাগী প্রকৃত অর্থেই মিশে গেছেন একটি আদি জনগোষ্ঠির আত্মায় । তাই তার কবিতা পড়লেই মনে হয়, একটা দায় যেন প্রচ্ছন্ন রয়েছে, যা প্রকৃত অর্থেই মানুষের বিবশতা আর অসহায়তার প্রতি, ব্যক্তি বিশেষ বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গোষ্ঠিবিশেষের প্রতি নয় । এই কবির কবিতার পকড়-টা এখানেই।

একজন জুমিয়া বরক(মানুষ) হয়ে কবি বলেন—

‘...আমার ছাইয়ের ভেতর থাকে না
কপালের অস্থি কিংবা নাভিকুণ্ডল
থাকে দাঁত ও নখ যা দিয়ে জারি রাখে
সন্তান, লড়াই আন্দোলন ।’               
 (হাসমতি ত্রিপুরা-ঊনত্রিশ)

এবং এটাই চলতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম । অ-সভ্যতা, সভ্যতারই বাই-প্রোডাক্ট যেন । শহরে যা ঘটছে, জঙ্গলেও তাই । হাওয়া । হাওয়া কেউ বাঁধতে পারে না । একটা পুরো কবিতাই পড়া যাক—

‘গাইরিঙে কেউ এসেছিল
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে আতকরাই

মাচাঙে পড়ে আছে রিসা
আলুথালু থালা হাঁড়ি কলস লোটা...!

ইয়াক্লির মুখে রক্তের দু’চারটে ফোঁটা
ফসলের শিষে শিষে থমথমে ভাষা ।

নিঃস্পন্দ পড়ে আছে খোঁপার প্রণয়কাঁটা

ঝরে পড়ছে খড়ের চালা হতে
টুকরো টুকরো তামাটে বেদনা ।’      
 (হাসমতি ত্রিপুরা-পঁয়ত্রিশ)

হয়ত একটি ধর্ষণের কাহিনি । 
হয়ত একটি বিষাদবিধুর ব্যর্থ প্রণয়কাহিনি । 
রাইমা সাইমার সেই মিথকাহিনির একটা ইঙ্গিতও রয়েছে যেন এখানে । 
গাইরিঙ হচ্ছে জুম পাহারার অস্থায়ী আবাস, আতকরাই হল জুমের ধান খাবার জন্য আসা পাখি, রিসা হচ্ছে নারীর বক্ষবন্ধনী, আর ইয়াক্লি হচ্ছে সেই জুমঘরে প্রবেশের সিঁড়ি । শুধু বর্ণনাই । এর বেশি বলা একজন কবির বলা নয় । এই উল্লেখটুকুই প্রতিবাদ । প্রতিবাদ সময়ের বিরুদ্ধে, চিরকালীন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে, পাঠকের বিরুদ্ধে, এমনকি, স্বয়ং কবির নিজের বিরুদ্ধেও !

কবির বলার কৌশলে নিঃশব্দ চিত্র বাঙ্ময় হয়ে ওঠে । বস্তা বস্তা কথা না-বলার এই রীতি, দুর্লভ না-হলেও খুব কম রচয়িতার মধ্যেই লক্ষ করা যায়—

‘...আউলা খোঁপায় খুম্পুই ফুলের থোকা ।

দুপুর দু’ফালা করে রাইমার তীর ধরে
হেঁটে যাচ্ছে হাসমতি ত্রিপুরা

মণি নড়ছে, চোখ নড়ছে না
পা মাটি স্পর্শ করছে, নাকি মাটি পা
বোঝা যাচ্ছে না

কথা হচ্ছে, শব্দ হচ্ছে না—’           
 (হাসমতি ত্রিপুরা-ছত্রিশ)

দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে, বাস্তব থেকে পরাবাস্তব বা অধিবাস্তবে তার গমনাগমন সহজ, শান্ত এবং অলক্ষ্য । সেলাই দেখা যায় না । একজন কবির শব্দ-দক্ষতা আর ভাষাশৈলী যখন তার  নিরহংকার অস্তিত্ব থেকে উৎসারিত হয়, তখন তাঁর অজান্তেই কবিতা রচিত হয় । নদী থেকে নারী, নাকি নারী থেকে নদী;  পা আর মাটি কে কাকে স্পর্শ করছে, এই অতিসাধারণ বাস্তবও এক কুহকের জন্ম দেয় । এ সবই হয়ত একজনের জীবন ‘দেখা’র ফল । চোখের দেখা আর মনের দেখা একাকার হয়ে পাঠককে বিবশ করে তোলে ।

‘...চোরাচাঁদ
ফোকর গলে ঢুকে পড়েছে মাচাঙের উপর
পাশ ফিরে শুয়ে রয়েছে কেউ নৈশ নদীর বাঁকের মতো...
...বটের কোটরে কেঁদে চলেছে অবোধ লক্ষ্মীপেঁচা
আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়েছি আমি...’      (হাসমতি ত্রিপুরা-তেতাল্লিশ)

রাতকে বিড়ির মতো ফুঁকছে দুজনে
মোঙ্গলীয় রাতমায়া জড়িয়ে থাকে নৌকোর গলুই
মোহিনী শ্বাসে টান ওঠে, উথালপাতাল ঢেউ
হাসমতি খেলছো তুমি জলের অতলে ।’   
(হাসমতি ত্রিপুরা-চুয়াল্লিশ)

শুধু দৃশ্যের সেটিং করে, রঙের বিন্যাসে, খুবই স্বল্পব্যয়ের কবিতা তুলে আনছে কেরোসিন ফুরিয়ে যাওয়া চিরকালীন সেই মোঙ্গলীয় রাত যেন, যা আমাদের কাছে খুলে দেয় গোটা লংতরাই উপত্যকা— সেই আদিম আফ্রিকা যেন !

‘ঢাকনা খুলে রেখেছে রাত
খড়ের চালে উপুড় হয়ে পড়েছে আকাশ ।

আলো নেই, নেই অন্ধকার ।

কাত হয়ে আছি মাচাঙের উপর
মাঝে মাঝে গাড়ির হেডলাইট সূচের মতো
বিঁধছে বাঁশের ফোকর ।

আলো জ্বলছে—
আলো নিভছে—’                        
(হাসমতি ত্রিপুরা-বাহান্ন)

কবি অত্যন্ত সিগনিফিকেণ্ট হয়ে ওঠেন যখন তাঁর উচ্চারণ শুনি—

‘লুকা জ্বলছে
জঙ্গল লাস্যময়ী রমণীর মতো
খুলে ফেলছে রিগনাই, রিসা—
খুলে ফেলছে রাংবতাং, ওয়াখুম, তয়া
বেংকি, ছুরুং, মাথিয়া—

লুকা জ্বলছে, বাবা গড়িয়া ঈশ্বরের মতো
চলেছেন, জঙ্গল থেকে গীর্জার দিকে ।

লুকা জ্বলছে
হাসমতি, ইকোপার্কের মতো
তুমিও খুলছো, তোমার
যা কিছু অহম অলংকার ।’         
(হাসমতি ত্রিপুরা-আটান্ন)

আর উদাহরণ বাড়াচ্ছি না । তাঁর পরবর্তী গ্রন্থগুলো হচ্ছে “খুমপুইপাড়ায়” আর “হৃদি চংপ্রেঙ” । সেগুলোতে কবিকে আরও আঁটোসাঁটো হতে দেখা যায়, একই সঙ্গে ককবরক ভাষার বাহুল্য এমনভাবে ঘটেছে, যা কবিতাকে তথ্যকেন্দ্রিক করে তুলেছে । কবিতায় তাঁর তন্ময়তা যেন কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হয়েছে । হয়ত স্থানিকতার চিহ্নায়ন কবির কাছে জরুরী ঠেকেছে ।

স্থানিকতা প্রদর্শন জরুরী নয় সর্বক্ষেত্রে মনে হয়, কারণ এটা স্বতই আসে । স্থানিকতা এড়িয়ে যাওয়াই বরং কঠিন । স্থানিক শব্দ ব্যবহার বারবারই বিঘ্নিত করেছে কবিতার রসাস্বাদন । এত ফুটনোট কবিতার কী কাজে লাগে ? বরং আমরা দেখেছি কবিতা লেখাই হয় এমনভাবে যে, যেকোন অপরিচিত শব্দও তার অর্থ প্রকাশ করতে বাধ্য হয় । কবির পরবর্তী গ্রন্থগুলিতে কবিতার এই চর্মরোগ অত্যন্ত প্রকট । পাঠককে কবিতা কিছু বোঝাতে চায় বলে মনে হয় না আমার, বরং অন্য একটা জগতে নিয়ে যায় শব্দের অগোচরে, এমনকি কবিরও অজান্তে, যেখানে কবি ছিলেন লেখার সময়ে, ঠিক সেখানে । এই ব্যাপারটা কবি ব্যাহত করেছেন নিজেই । তবু কবিতা কবিতাই ।
তিনটি কবিতার বইয়েরই প্রচ্ছদ করেছেন চিত্রশিল্পী ও কবি বাপ্পা চক্রবর্তী । আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে খুম্পুইপাড়ায়’এর প্রচ্ছদটি । গদ্যগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন চিত্রশিল্পী অমিত কুমার নাথ । রাইমা সাইমা ও নাগরাজের সমাহারে জঙ্গলি চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত উপত্যকা । সুন্দর ।
কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের জন্য উৎসুক রইলাম ।

কবির ফোন নাম্বার >৯৮৬২৬৪৬৮৯৬ / ৭০৮৫৭১৩০৯৩ ।

পরবর্তী রচনা উপন্যাস 

হৃদয়ে রাইমা 
স্রোত প্রকাশনা 


তাঁর গ্রন্থগুলোর প্রকাশক—
হাসমতি ত্রিপুরা (কাব্যগ্রন্থ) / হৃদি চংপ্রেঙ(কাব্যগ্রন্থ) / খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই(গদ্যগ্রন্থ) > স্রোত প্রকাশনা, কুমারঘাট ।
খুমপুইপাড়ায় (কাব্যগ্রন্থ)>তুলসী পাবলিশিং হাউস, আগরতলা ।



খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই

আলোচনা :জহর দেবনাথ 

পার্বত্য রাজ্য ত্রিপুরার বরক জনজাতিদের জীবন যাত্রা, তাদের পারিবারিক বা সামাজিক জীবনের বিচিত্র রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান বিশ্বাস কিংবা লৌকিক অলৌকিক কথা বা কাহিনী জানার মতো দারুণ একটি গদ্য গ্রন্থ  - খুমপুই থেকে সিকামুনকতাই । খুমপুই বিখ্যাত একটি পাহাড়ী ফুল ।আর এই ফুলের নামেই গন্ডাছড়া মহকুমার জগবন্ধু পাড়া থেকে পূর্ব দিকে প্রায় কুড়ি বাইশ কিলোমিটার পূর্ব দিকে লংতরাই পর্বতে গভীর জঙ্গলে ঘেরা বরক জনজাতি দের রহস্যময় এক জনপদ ।এখান থেকেই কাহিনীর শুরু ।লেখক বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক হারাধন বৈরাগী ।

আমরা জানি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষদের বিভিন্ন গোষ্ঠী উপগোষ্ঠির জীবন যাত্রা, তাদের জীবিকা তাদের কৃষ্টি সংস্কৃতি সব কিছুই ভিন্ন ভিন্ন ।তেমনি আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যের বরক জনজাতিদের জীবন মূলত পাহাড় এবং জুম ভিত্তিক ।আর পাহাড় মানেই সেই আদি কাল থেকেই গভীর রহস্যে ঘেরা ।পাহাড়ের কোলে বসবাস কারী নর নারী দের জীবন যাত্রা ও ভীষণ ভাবেই রহস্যাবৃত ।আর সেই রহস্যে ঘেরা বরক জনজাতিদের রহস্যময় ব্যক্তি জীবন থেকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অসংখ্য ঘটনাবলীর চিত্র কাহিনী কার হারাধন বাবু নিখুঁত ভাবে চিত্রায়িত করেছেন এই গ্রন্থে ।নিঃসন্দেহে এই গ্রন্থটি একটি সমৃদ্ধ দলিল হয়ে থাকবে আগামী দিনের জ্ঞান পিপাষু এবং গবেষকদের কাছে ।যারা মানব জীবনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর নর নারী দের রহস্যময় কাহিনী জানতে চান ।

আর এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে বইটি একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে থামতে পারবেন না ।মনে হবে যেন লেখকের প্রিয় মোটরবাইক এর পেছনে বসে আপনি ও ছুটে চলছেন আজানা রহস্যের সন্ধানে ।আর এ রহস্যের টান এমনই যে তাকে কোন ভাবেই উপেক্ষা করা যায় না ।
তবে একজন পাঠক হিসেবে বলতেই হচ্ছে যে লেখার শব্দ চয়ন এবং বাক্য গঠনে আরো একটু শৈল্পিক হওয়ার সুযোগ লেখক হাত ছাড়া করেছেন ।

সবার প্রতি আহ্বান রইল বইটি একবার পড়ে দেখুন, সত্যি দারুণ একটা অ্যাডভ্যাঞ্চার ও হয়ে যাবে আবার নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডার ও যথেষ্ট সমৃদ্ধ হবে ।
আমরা অধির আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম কথাকার হারাধন বাবুর পরবর্তী রহস্যময় কথা জানতে ।
প্রচ্ছদ শিল্পী অমিত কুমার নাথ এই বইয়ের প্রচ্ছদ কে বেশ রহস্যময় করে এঁকেছেন ।




পেশায় শিক্ষক। কবিতা গল্প ও গদ্যে সাবলীল বিচরণ।হাসমতি ত্রিপুরা, হৃদি চম্প্রেঙ খুমপুই পাড়ায়, ব্যতিক্রমী কাব্যগ্রন্থ।খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই ত্রিপুরার জনজাতিজীবনের আদিহৃদিমালা একটি ব্যতিক্রমী গদ্যগ্রন্থ।সমকালীন ত্রিপুরার পনেরজন কবির কবিতা । নির্বাচিত ত্রিপুরার তরুণ কবিদের কবিতা(যৌথসংকলন)।ত্রিপুরার সাহিত্যে নদ-নদী ও গোবিন্দ ধরসহ
অণুগল্প-৫৪জন গল্পকারের ২১৬টি অণুগল্প ।হৃদয়ে রাইমা  একটি প্রকাশিতব্য উপন্যাসপম জঙ্গলের কুহকময় হৃদিকথা। নিয়মিত লিখে চলেছেন এপার ওপার বেপারের সমসাময়িক বিবিধ পত্রসাহিত্য ও লিটলম‍্যাগাজিনে।অসম্ভব জঙ্গলআউলিয়া। ভালোবাসা-জঙ্গল - জনজাতিজীবন-জুমজীবন-জীবনের জুম।স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বইগুলো দিয়েই হারাধন বৈরাগীর পরিচয় বাংলাসাহিত্যে ক্রমশ উন্মিলীত হয়ে চলেছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ