ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ(২৭)♦বিন্দুবিসর্গ♦মানবর্ন্ধন পাল

ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ(২৭)
♦বিন্দুবিসর্গ♦
মানবর্ন্ধন পাল


   বিন্দুর মাঝে আছে গভীরতা সিন্ধুর
জ্যামিতি ও ব্যাকরণে দরকার বিন্দুর।
   বিসর্গের চেহারাতে শূন্য আছে দুটি 
  দুঃখ-ক্ষোভ-বেদনা তাতে ওঠে ফুটি।

আজ দাদুভাইয়ের বৈঠকখানা ও গল্পের আসরে একই সঙ্গে আনন্দের আলো এবং বিষাদের ছায়া পড়েছে।এই আলো-ছায়া দুঃখ-সুখে মাখা। একদিকে প্রকাশ্যে তাতাথৈথৈ অন্যদিকে গোপন ব্যথার উষ্ণ প্রস্রবণ। ঐশী ও হিয়া আজ এসেই জানালো,  ওরা দলবেঁধে আগামিকাল মামাবাড়ি যাচ্ছে। টিকিটকাটা হয়ে গেছে-- প্রস্তুতিও সম্পন্ন। ঐশীর মামার বাড়ি কুমিল্লা আর হিয়ার চট্টগ্রাম। দুই পরিবারের হলেও একই পথের যাত্রী ওরা। তাই মহানগর প্রভাতীতে ওরা যাবে। এদিকে মেঘ ও রোদের মা-ও এসেছে ওদের ঢাকা নিয়ে যাবে বলে। ওরা যাবে ফিরতি মহানগরে। সবাই কু-- উ-- উ-- উ ঝিকঝিকের দোলনায় দুলতে-দুলতে যাবে! তাই আনন্দের আর সীমা নেই! প্রায় একবছরের করোনাকালে সবাই হাঁপিয়ে উঠেছে। ছোটরা তো আরও বেশি! এই বন্দিত্ব থেকে মুক্তির আশাতেই ওদের আনন্দ আর ধরে না!
দাদুভাই মুখে অভিনয়ের হাসি এনে ওদের আনন্দে শরিক হলেন। কিন্তু বুকে তার বিষাদের ঢেউ। কিছুদিনের জন্য হলেও ওরা দাদুভাইকে নিঃস্ব করে চলে যাচ্ছে! কিছুদিন বন্ধ থাকবে ব্যাকরণের গল্পকথার আসর। তবুও তিনি মনকে স্থির করে সবার উদ্দেশ্যে  বললেন,
---- যাও সবাই। মামাবাড়ির শীতের পিঠাপুলি ও পায়েশ খাও। দাদু-দিদার সঙ্গে গল্প কর। আনন্দ-ফুর্তি কর। মামাবাড়ি তো মধুর হাঁড়ি! কিন্তু অযথা ঘোরাঘুরি কোরো না। সবসময়  স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে। মাঝেমধ্যে ফোন করে আমার খবর নিয়ো। তোমরা মামার বাড়ি যাচ্ছ আর মেঘ ও রোদ মামাবাড়ি থেকে নিজেদের বাসায় যাচ্ছে। সবারই মনভরা আনন্দ। আমারও কিন্তু আনন্দের খবর আছে। একথা বলে দাদুভাই বিভাস প্রকাশনের মালিক রামশংকর বাবুর পাঠানো নতুন বইয়ের একটি প্রচ্ছদ দেখালেন। কভার পেজটি দেখেই ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! পরক্ষণেই সবাই ''ওয়াও! দাদুভাইয়ের বই"-- বলে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। 
---- এটা কি ব্যাকরণের বই দাদুভাই? 
ঐশীর আগ্রহভরা প্রশ্ন।
---- না, এটা ঠিক ব্যাকরণ বই নয়। তবে বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে কিছু সহজ-সরল-সাধারণ কথাবার্তা  আছে, খোঁজখবর আছে । কিন্তু গল্পগুজব-আড্ডাই বেশি-- তোমাদের ভাষায় 'প্যাঁচাল'। অর্থাৎ আগাছা বেশি ফসল কম-- আলু বেশি গোস্ত কম!

দীর্ঘ ছ'মাস ধরে এই করোনাকালের অবসরে তোমাদের নিয়ে প্রতিসপ্তাহে  ব্যাকরণ নিয়ে যে অল্পস্বল্প  গল্প করেছি সেই গল্পকথাই এই বইয়ের বিষয়বস্তু।
---- এই বইয়ে কি আমাদের নামও আছে দাদুভাই? হিয়ার কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে দাদুভাই বললেন, 
---- হ্যাঁ, তোমাদের সবার নামই আছে।  শুধু নাম নয়; তোমরাই এ-বইয়ের প্রধান চরিত্র। এতদিন ধরে তোমাদের সঙ্গে যেসব কথাবার্তা হয়েছে তা আমি এনড্রয়েড ফোনে টেপ করে রেখেছিলাম। তা-ই এবইয়ে গল্পের মত ছাপা হয়েছে। -- একথা শুনে হিয়া বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলল,
---- তাহলে তো এ-বই আমাদের সংগ্রহ করতেই হবে। আমাদের নাম আছে, কথাবার্তা আছে-- এর চেয়ে আনন্দের আর কী! বন্ধুদের বলব বইটি কেনার জন্য। কয়েকটি বই আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আমি উপহারও দেব।
---- আচ্ছা দাদুভাই, তোমার বইয়ের শিরোনামের শেষে আছে 'বিন্দুবিসর্গ'। এর মানে কী? আজ না-হয় বিন্দু ও বিসর্গ সম্পর্কেই কিছু বল। 
হিয়ার চোখেমুখে প্রশ্নবোধক চিহ্নের কৌতূহল লক্ষ করে দাদুভাই বললেন, 
---- মন্দ বলনি। কথাটি আমার মনে ধরেছে। বিন্দু ও বিসর্গ সম্পর্কেও জানার অনেক কথা আছে। এদুটো ছোট্ট জিনিসও ভাষা এবং ব্যাকরণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শোন তাহলে বিন্দু ও বিসর্গের কথা।
(.)-- এই চিহ্নটাকেই বিন্দু বলে। বিন্দুর আরেক নাম ফুটকি। সত্যি, এই একটি বিন্দুর মধ্যে আছে সিন্ধুর গভীরতা। কিন্তু এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, আকার-আকৃতি, উচ্চতা-ভেদ কিছুই নেই। শুধু অবস্থান আছে। এই বিন্দু থেকে রেখা হয়, বৃত্ত হয়, কোণ হয়,ত্রিভুজ হয়-- আরও কত কী! জ্যামিতিতে এসব কথা আমরা সবাই পড়েছি। শিশুকালে আমরা যখন পেন্সিল ধরে আঁকিবুঁকি করতে শিখেছি তখন তো বিন্দু দিয়েই রেখার ঢেউ খেলেছি! ছবি এঁকেছি যেখানে-সেখানে-- বাড়ির রঙিন দেয়ালের গায়ে, সাদা খাতার পাতায়! কী আনন্দ ছিল তাতে!

ছোট্ট চেহারার এই বিন্দুটি জ্যামিতির প্রাণ। কেবল জ্যামিতি কেন-- যেকোনও ভাষার বর্ণমালা লিখতেই প্রথম বিন্দুর প্রয়োজন। এটি আছে উচ্চতর গণিতে, আছে ব্যাকরণে। ইংরেজি ভাষায় এই বিন্দু (.) বিরামচিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর নাম 'ফুলস্টপ'। বাংলা ভাষায় দাড়ির (।) যে-কাজ ইংরেজিতে একটি  বিন্দুর সেই কাজ। মানে কথা বলার ফাঁকে পূর্ণ বিশ্রাম।
বাংলা ব্যঞ্জনের পাঁচটি বর্ণ লেখতেও এই বিন্দু লাগে। এর মধ্যে চারটি থাকে বর্ণের নিচে আর একটি ওপরে। অন্তস্থ য-য়ে বিন্দু দিলে অন্তস্থ য়--  ব-য়ে বিন্দুতে র, ড-য়ে বিন্দুতে ড় এবং ঢ-য়ে বিন্দুতে ঢ় হয়। আর চন্দ্রবিন্দুর (ঁ) দ্বিতীয়ার বাঁকা চাঁদটির ওপরেও আছে একটি বিন্দু। মনে রাখতে হবে, এটি কিন্তু নিরেট বিন্দুই। অনেকে লেখার সময় এটিকে মাঝে ফাঁকযুক্ত শূন্য বানিয়ে ফেলে। এমন ভুল যেন তোমাদের কারও না-হয়। বর্ণমালা পড়ার সময় অনেকে বলে, ব-য়ে শূন্য র, ড-য়ে শূন্য ড়, ঢ-য়ে শূন্য ঢ়। এটা কিন্তু ঠিক নয়-- মারাত্মক ভুল। কারণ বিন্দু Solid-- এর মধ্যে কোনও ফাঁক নেই। কিন্তু শূন্যের মাঝে ফাঁক আছে। তাই লেখতে হবে নিচে বিন্দু দিয়ে। বলতে হবে, ব-য়ে বিন্দু র, ড-য়ে বিন্দু ড় এবং ঢ-য়ে বিন্দু ঢ়।

ইংরেজিতে এই বিন্দুকে 'ডট' চিহ্ন বলে। এই ডট শব্দ সংক্ষেপিত করার সময় ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত হয়। বাংলাতেও এই নিয়ম প্রচলন করা হয়েছে। যেমন : বি. (বিশেষ্য), বিণ. (বিশেষণ), ক্রি. (ক্রিয়া)। যেকোনও অভিধানে শব্দকে সংক্ষিপ্ত করার এমন প্রক্রিয়া লক্ষ করা যায়। বাংলা একাডেমির বানানবিধিতেও ডট চিহ্ন দিয়ে শব্দ ছোট করার কথা বলা হয়েছে। 
---- একটি বিন্দু নিয়েই এত কথা! এই ডট বা একবিন্দুর কি আর কোনও কাজ আছে? -- এতক্ষণ নীরবে কথা গিলে জানতে চাইল ঐশী। 
---- আছে, আছে!
"ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল
গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।"
বিন্দুর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব বোঝাতে গিয়েই কবি এমন কথা বলেছেন।
ডটচিহ্ন (.) দিয়ে যেমন শব্দসংক্ষেপ করা যায় তেমনি বাক্যও সংক্ষিপ্ত করা হয়। বাক্যের মধ্যে কোনও কথা যদি আমরা না-লেখতে চাই কিংবা বাদ দিতে চাই কোনও শব্দ বা বাক্যাংশ তবে সাধারণত তিনটি বিন্দু  দিযে তা করা হয়। যেমন : শিক্ষক ছাত্রের দুষ্টামি দেখে রাগ করে বললেন, "তুই এখনই ক্লাস থেকে বেরিয়ে যা...।" এখানে নিশ্চয়ই একটি  শব্দ ছিল যা বলা হয়নি। হয়তো ছিল পাজি/শয়তান/বেয়াদব-- এরকম কিছু-একটা শব্দ। অথবা "... সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা মেরে বিদেশ পালিয়েছে।" এখানে নামটি বলা হল না। কিংবা অন্যের কোনও লেখা আংশিক তুলে ধরলেও তিনটি ডটচিহ্ন দিতে হয়--
"ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখকথা/ নিতান্তই সহজ-সরল...।" পরীক্ষার খাতায় উদ্ধৃতি দিলেও এভাবেই দেওয়া উচিত।

 কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী এসব নিয়ম জানে না-- জানলেও মানে না! জানা-মানা তো দূরের কথা-- যা খুশি যেমন খুশি তা-ই লেখে! এটা যেন "যেমন খুশি তেমন সাজ" খেলার মত। ফলে বিপত্তি ঘটে অনেক। দুটি শূন্য বা গোলচিহ্ন ওপর-নিচ করে দিলে তা ব্যঞ্জনবর্ণমালার বিসর্গ (ঃ) হয়। 'ডট' হল ছেদচিহ্ন কিন্তু বিসর্গ ধ্বনি বা বর্ণ। সেটা আটত্রিশ নম্বর ব্যঞ্জন। আর যেকোনও বর্ণ মানেই তার কমবেশি উচ্চারণ আছে-- বিসর্গেরও আছে। বিসর্গের উচ্চারণ অনেকটা হ-ধ্বনির মত। আস্তে বা ছোট করে 'হ' উচ্চারণ করলে যেমন হয়। এজন্যই ধ্বনিবিদরা বিসর্গকে 'কোমল-হ' বলেন। 
পিঁপড়ায় কামড়ালে বা ইঞ্জেকশন নিলে আমরা সামান্য ব্যথায় 'উঃ' শব্দ করি। অর্থাৎ উ-এর সঙ্গে কোমল করে 'হ' উচ্চারণ করি। শব্দের শেষে বিসর্গ থাকলে এমন উচ্চারণ হয়। ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-জ্বালায় আমরা আঃ,ইঃ, উঃ উচ্চারণ করি; বিরক্তি-বিস্ময়ে এ্যাঃ বলি; লজ্জ-ঘৃণায় উচ্চারণ করি ছিঃ-- এসবই বিসর্গের কারিগরি! তাই এই 'চশমুদ্দিন' ক্ষুদ্র হলেও আবেগ প্রকাশের রাজা! কিন্তু শব্দের মাঝে বিসর্গ থাকলে বিসর্গের পরের ধ্বনিটি দ্বিত্ব বা দুবার উচ্চারণ হয়। যেমন-- দুঃখ (দুক্ খো), দুঃসাধ্য (দুস্ শাদ্ ধো)।

অথচ ওই শব্দসংক্ষেপণের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই ভুল করি-- একটি ডটচিহ্ন বা বিন্দুর (.) বদলে বিসর্গ (ঃ) লাগাই। এরকম ভুল খুব মজার ও হাস্যকর! দুয়েকটা উদাহরণ  দিই--
ডাক্তার, ডক্টর,ইঞ্জিনিয়ার, মাওলানা, এডভোকেট, লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল-- এরকম পদবির মানুষ তাদের মূল নামের আগে পদবিটা যুক্ত করে দেয়। তবে অধিকাংশ ব্যক্তিই সংক্ষেপে তা যুক্ত করে। তাই তারা লেখেন : ডাঃ, ডঃ, প্রকৌঃ/ইঞ্জিঃ, মাওঃ, এডঃ, লেঃ জেঃ, মেঃ জেঃ এরকম। এদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বী বেশিরভাগ মানুষের নামের আগে মোহাম্মদ, মুহাম্মদ, আবদুল, আবদুর, আবদুস যুক্ত আছে। তারা সংক্ষেপে লেখেন : মোঃ, মুঃ, আঃ। এভাবে শব্দসংক্ষেপ করা হয় না। এটি ব্যাকরণের নিয়মে মারাত্মক ভুল! এমন লেখলে তা পূর্ণ শব্দ হয়ে যায়। তখন তার উচ্চারণ হবে এরকম : ডাঃ (ডাহ্), ইঞ্জিঃ (ইঞ্জিহ্), মোঃ (মোহ্), মুঃ (মুহ্), আঃ (আহ্) ইত্যাদি। এসব শুদ্ধ করে লেখলে ডট/ফুটকি/বিন্দু দিতে হবে-- ডা. ড. এড. মো. মু. আ.-- এরকম। মনে রাখতে হবে বিসর্গ হল বর্ণ বা ধ্বনি কিন্তু বিন্দু ছেদচিহ্ন।

বাংলা বানান থেকে মহাত্মা গান্ধির গোলগোল চশমার মত বিসর্গ এখন প্রায় উঠেই গেছে। অনুস্বার (ং), বিসর্গ আর যুক্তবর্ণের ব্যাপক ব্যবহারের ভাষা হল সংস্কৃত। তাই আমরা শৈশবে মজা করে বলতাম-- অনুস্বার-বিসর্গ লাগালেইং সংস্কৃতঃ হয়ং। এখন ঠাকুরদাদার গোল চশমা ভাঙা কুলার মত বিসর্জন দিয়েছি ভাগাড়ে। নতুন নিয়ম বলছে,বাংলা শব্দের শেষে বিসর্গ বাদ দিতে হবে। কেবল ব্যতিক্রম বলে মাত্র দু-তিনটি শব্দে থাকবে-- পুনঃ, মুহুর্মুহুঃ ইত্যাদি। তবে ভুলে গেলে চলবে না-- শব্দের মাঝে বিসর্গ অবশ্যই থাকবে। যেমন : দুঃখ, অতঃপর, নিঃশব্দ, মনঃস্থির, অন্তঃপুর, শিরঃপীড়া, দুঃশাসন ইত্যাদি। তোমরা যে-ট্রেনে মামাবাড়ি যাবে সেটি কিন্তু আন্তঃনগর ট্রেন।
----তাই তো দাদুভাই, এতক্ষণে বুঝলাম, 'আন্তঃনগর' শব্দের মাঝেও বিসর্গ আছে! আচ্ছা, বিন্দু ও বিসর্গের ক্রিয়াকাণ্ড তো বুঝলাম। কিন্তু তোমার বইয়ের প্রচ্ছদে দেখলাম, তুমি তো শব্দ দুটি আলাদা রাখনি-- গায়ে গা-লাগিয়ে একশব্দ বানিয়ে দিয়েছে। শব্দ দুটির মাঝে কোনও ফাঁক নেই কেন? -- আবার ঐশীর জিজ্ঞাসা।
---- তোমার নজরের তারিফ করতে হয়! তুমি ঠিকই দেখেছ। ওটি যমজ ভাই-বোনের মত জোড়া শব্দ বানিয়ে লেখেছি। যমজ শব্দও বলতে পার। ব্যাকরণবিদরা এধরনের শব্দকে বলেন, সমস্তপদ বা সমাসবদ্ধপদ। শব্দটি অনেকভাবে ভেঙেও লেখা যেত। মাঝে ফাঁক দিয়ে ও, আর, এবং ইত্যাদি বসানো যেত। কিংবা মধ্যে হাইফেন (-) দিয়েও লেখা যেত। তা করিনি একারণে যে, তাতে নামটি বড় হয়ে যেত এবং মধুরতাও নষ্ট হত! তোমরা তো সমাস এখনও ভাল করে পড়নি। করোনায় প্রায় একবছর তো 'তাইরে নাইরে' এবং 'আজ আমাদের ছুটি ওভাই' করেই কেটে গেল! তোমাদের বেড়াতে যাবার আগে সমাসের গল্প শেষ বেলায় শুরু করেও লাভ নেই। অনেক সময় লাগবে। কথায় বলে : যার নাম সমাস/তা বুঝতে লাগে ছ'মাস! তোমরা নিরাপদে ঘুরে এলে তা পরে দেখা যাবে!
ওহ্! আরেকটি কথা বলতে ভুলেই গিয়েছি! আমাদের মাতৃভাষায় বিন্দু ও বিসর্গের গুরুত্ব এবং এর ব্যবহারিক দিকটি তোমরা নিশ্চয়ই বুঝেছ। তবে মজার ব্যাপার হল-- শব্দদুটি যখন গায়ে গা-লাগিয়ে বন্ধুর মত পাশে বসে তখন আর ব্যাকরণের অর্থ থাকে না! ওদের মধ্যে তো করোনা নেই যে, গা-ঘেষে বসা চলবে না; তিন ফুট দূরে থাকতে হবে! ওরা কোলাকুলি করে থাকলে অর্থ পাল্টে যায়। তখন মানে হয়--  অতিঅল্প, একটুখানি, যৎসামান্য, অল্পস্বল্প, কণামাত্র, লেশমাত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ কোনও কিছুর অতি সামান্য অংশ। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় : অনুর গলার হার খোয়া যাওয়ার বিষয়ে আমি বিন্দুবিসর্গও জানি না! কিংবা এই মামলার ব্যাপারে সে বিন্দুবিসর্গ জানে না।
তাই আমার বইয়ের এই নাম। এখানে ব্যাকরণের আলুনি কচকচি কম-- আড্ডা, গল্প, আনন্দ, গান, কবিতা এবং হাসিঠাট্টাই বেশি! তাই বলি-- দাদুভাইয়ের এ-আসরে আলু বেশি গোস্ত কম! এবার বুঝলে তো?
ঐশী ও হিয়া সমস্বরে সম্মতি জানিয়ে বলল,
---- এবার আমরা যাই, দাদুভাই! কাল সকালেই যাচ্ছি আমরা। তুমি ভাল থেকো। 
---- 'যাই' বলতে নেই। বল, 'আসি'। আবার তো দেখা হবে ক'দিন পরেই। ঠিক আছে-- আস। তবে তোমরা দুজন মিলে রবীন্দ্রনাথের "এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি-খেলায় আমি-যে গান গেয়েছিলাম,/জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়"-- গানটি শোনাও। ওরা গান ধরল।
               _____________

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ