প্রতিদিন বাংলাভাষা ডট স্রোত /লিটন শব্দকর সংখ্যা :১০:০১:২০২১



প্রতিদিন বাংলাভাষা.স্রোত 
লিটন শব্দকর সংখ্যা :১০:০১:২০২১




কেন লিখি,অনুভব গদ্য

কথা হয় নক্ষত্রের বারান্দায় 
তারায় তারায় নামে রাত
অথবা শ্রান্ত বৃষ্টির জলে।
খবরের জাহাজঘাটায় তুমিও সেদিনের অচেনা,
মরমের জানালায় প্রতি বিকেলে
ঠিক এক কাপ ধুয়ো ওঠা চা,
আর এরকম ম্যাগনোলিয়া ফোটে কিনা কোথাও!
একশোবছর পর শ্রাবণশেষে
কূর্তিতে পাগলঘ্রাণটা মেখে নিয়ে
ডেকো আমায় বোধের বারান্দায়।

যখনই যা কিছু লিখেছি,লিখছি,সেগুলিক্র কবিতা হিসেবে ধরা যায় কিনা জানিনা,তবু মনে হয় লিখেছি,লিখেছি শব্দ,শব্দের পর শব্দ বসিয়ে টুকরো টুকরো কিছু লাইন এবং এইসব লিখে যেতেই হবে আমাকে।
কলম হাতে নিয়ে বিরাট দায়িত্ব পালন করার মতো চেতনা,অথবা কোনো মঙ্গল সাধনের মহৎ উদ্দেশ্য থেকে খানিকটা তফাতে অকবিস্বত্তাবিশেষ হয়ে থেকেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সমস্যা,বিদ্বেষ,সংঘাত,টানাপোড়েন এবং অসুন্দরের বিষময় ফেনায়িত সমুদ্রে ফিটকিরির মতোই শুধু এই টুকরো টুকরো লেখা,শব্দের পর শব্দ রাখতে পারি অথচ একে কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য বলে ধরে নিতে পারবো না,বরং বলতে পারি এসব না করলে ভালো থাকবো না।
             মানুষের সাথে মানুষের
              সারাদিনের কথা বলা 
       অথবা না বলাগুলোই কবিতা

মাঝে মাঝেই নিজের মধ্যে কাব্যিকতার-মুন্সীয়ানার অভাব তবুও অনুরণিত হয়ে হয়ে আসা চিন্তা-ভাবনা-কল্পনা-কথা কবিতার ছাঁচ এঁকে দেয়,তখনই মনে হয় যতটুকু রোদের আদর ও উত্তাপ,যতটুকু মেঘ ডানার আড়াল দেয় ও তুলে নেয়,যেটুকু কুয়াশা চাদরের মতো আনাগোনা করে হিমেল ঋতুর দিনে,যতটুকু শিশিরের ফোটা টুপটাপ ছন্দে রাত থেকে ভোর মাকড়সার জাল অথবা ঘাসের ডগায় জমে তারাই যেন বলে-কাগজের উপর আমাদের একটি বাড়ি তৈরি হলে বেশ হয়।এই আনন্দকল্পকে সখ্যতায় রূপ দিতে সমর্পণ করে দিই 'কবিতা' নামক এক এবং অনন্য সাহিত্যসৃজনীর কাছে।Wordsworth এর ভাষায়-"Poetry is the spontaneous over flow of powerful feelings"

                       কাগজের উপর কলম চলার সময়টুকুর মধ্যেই কখনো নিজের মতো সমস্ত ভাবনার হেটে চলা এবং কবিতাকে কবিতার জন্য-কবিতার নিজের মতো চলতে দেওয়া এ দু'য়ের পারস্পরিক নির্ভরতায় যেন অনূদিত হয়ে যায় লিখতে চাওয়া নিজস্ব ছটফটানি,নিজের চোখে দেখতে পাওয়া-অনুভবে আসা অন্য কারো বেদনা,ক্ষোভের বহিপ্রকাশ,জীবনযাত্রা,ওঠা পড়া,লিখতে চাওয়া প্রকৃতি-ফুল-পাতা-প্রজাপতি-পাখি-নদীর ভাষা।

এই সমস্ত ব্যাপারটাই যেন একটা পথ এবং এই পথেই হাঁটা ছাড়া যেন অধরাই থেকে যায় প্রথমদিনের কলমের খুচখাচ শুরু ও শেষ, তাই এসব কবিতা অথবা ছাইপাশ লিখছি,এবং লিখে যেতেই হবে।

ক|বি|তা

অরণ্যলিপি-১

সন্ধ্যের পর একা একা হেঁটে গেছি
অড়বড়ইয়ের বনপথ ধরে,
তিথি চেয়ে আছে কাছাকাছি যতটা দেখা যায় 
সে'কটাই তারার ঘরে।
কে যেন বাঁধলো সাধ
কেড়ে নিতে শিশিরের প্রেম,
তারও আগে সাঁকো গড়তে
ঝড়জল-ছবিখোলা ফ্রেম।
পূর্ণিমা চলে গেলে তারার ছাইরেণুতে
ক্লান্ত হেমন্তের রাত বৃষ্টির ভেতর,
কালিবক পানডুবির সুখী ঘুমে ধ্রুবতারা এঁকে
চূর্ণ হবে রোজকার পথের পাথর।

অরণ্যলিপি-২
                       
এই নির্জন সবুজ শ্যাওলা জমা
জংলা জলার মাঠে
ফিরে যাই সন্ধ্যে হলে,
সারারাত দেখি সবুজ ব্যাঙের
গলার নরম পর্দা নড়ে
ঘাসফড়িং গিলে গিলে।
আহা এই রাতগুলিও তো আগে
এমনি করে ডাকেনি কখনো
অড়বড়ইয়ের উস্কু খুস্কু পাতায়,
কার্তিক রাতে বৃষ্টি ঝেপে এলে
বিড়ম্বনায় ডুবি দিশাহারা হই
শহরের বিষন্ন প্রথায়।
তারপর ছিটেফোঁটা মেঘে
ছন্দোময় অঘ্রাণ আড়াল
সব ঘুড়ি হেসে দিয়েছে নীলে ডুব,
আবারও সন্ধ্যে হলে 
জোনাকীর ঝাঁক খুঁজে খুঁজে
একলা হবো খুব।       


ডানালিপি-১
                  
আকাশে বালিহাঁসের চঞ্চল মানচিত্র
সারাদিন হ্রদ থেকে ঝিল;
একছিটে হিসেবী রোদ লাগেনি ডানায়,
বড়জোর দৈনিক হাজিরার
খু্ঁটোখুঁটি আয়োজনের শেষে
কয়েকটি ঝুঁটশালিক উড়ে যায়।

ডানালিপি-২

পঁচিশটি বছর এখানে কোনো দম্পতির বাস,
লালচে টিনের চাল ছুঁয়ে উড়ে যায় মোহনচূড়া
কেউ হয়তো দেখে, এখন অবাক হয়না কেউ,
তাদেরও পাড়া বাজার কেনাকাটায় এসে লাগে
নিয়মস্রষ্টা শহরের ভালোমন্দের ঢেউ।

      
খেলাঘর-১
                
এই যে পৃথিবীর সাথে তোমার প্রতিদিন
আমাকে আমার জায়গা স্মরণ করিয়ে দেবার ধারাবাহিকতা
তাও আমি আচমন করি আহ্নিক ভেবে
এইতো বোধের ঘরে প্রবেশের ধ্যান ও সাধনা,
সেখানেই পাখিদের কূজন কখনও
গোশালিক,বনবাটান অথবা কিছু পাখি অজানা।
বাতাসের সাথে ছলনায় অশরীরী ডাকে
কাছেপিঠে কোথায় মৃত্যু লুকিয়ে বেড়ায়,
আলোকবর্ষের একপাশে দাঁড়িয়ে দেখা যেন
কাঁচা কৌশলে আজও কারা মগজপ্রেম শেখায়।

খেলাঘর-২

কেমন অকারণ সবকিছু
হেসে খেলে মুক্তি
সূর্যেরই গ্রহণ পেরিয়ে যায় একবেলা শেষে,
জীবন তো ভালোরাখার অর্থ লিখে রাখে পরতে পরতে।
কবিতা জলছবি নয়,একটা আত্মীয় রামধনু
যেখানে বহুদিন যায়
-ঠিকানা নেই কোনো তুমি'র
 ঠিকানা নেই কোনো আমি!
শুধু বৃষ্টির পর সুখি আকাশ সুখি বাতাসের মুখ,
শহরে কিছু নিশ্বাস ধরে রাখে নামধাম
বাকি হাঁটাপথই বেনামী।            


নিবিড়ে-১

থাকি নাহয় আমি একটু দিশেহারা
পলকগুলি একটু বেশিই
কলাপাতায় খিচুড়ির দুপুর ভরা;
তুমি দেখেছো-তাই সহজ বাড়িতে,
শুধুই অর্কিডের যত্ন তোমার হাতে।
ধুলোখাম থেকে চারাগাছ তারপর
ঝুরি নামতে গিয়ে যদি জং ধরে আসে,
থাকুক তবু হাতধরা ছায়াটুকুই
আমার পথের পাশে।
বাতাস থেকে চা ভর্তি মেহগনি কাঠের কাপ নামিয়ে
সন্ধ্যের সঙ্গ রাখো,
উড়ো লেফাফা লুকোনোর অভ্যাসে
প্রিয় ঋতু জানালার কাঁচেই লেখো।

নিবিড়ে-২

রাতগুলির মর্ম যেখানে নিবিড়
পুরনো কোনো গাছের শরীরে
দুটো লতা জড়াজড়ি করে
দুদিকের দুটো দেওয়ালকে আঁকড়ে ধরে,
চোখের বাইরে ব্রহ্মাণ্ডে নিয়মের নতুনত্ব
সেখানে পাখিদের স্নায়ু ক্ষয়ে গেলে নামমাত্র ভোর
আবার পাখিদের নাম ধরে ডাকে নিবিড়ে।
           
 
জোনাকি-১

ইতিহাসের কাছাকাছি 
কুয়াশার গুড়োমাখা সন্ধ্যা
পৃথিবী সবুজতর হবে ভেবে 
জোনাকীর দিনভর তন্দ্রা।
অনেক নগর সমুদ্রের ফেনায় সেজে
 আয়নায় ফেলেছে নীল,
মনে হয় বহুদিন সৈকত জুড়ে
তেমনি বাড়ে সহস্র প্রাণের অমিল।
সানগ্লাসের উপর প্রণয় শেষে 
প্রিয় ঋতুরা বড়ো গোবেচারা,
তবু এখনো রয়ে গেছে এখানে
জোনাকী আর প্রাচীন গাছেরা।

জোনাকি-২

ঝিঝিপোকা ডেকে গেছে
নিস্তব্ধ গলির জোনাকী আঁধারে,
বহুদিন দেখেছি মায়াভূমি
চেনা অচিন অনেক নদীর ধারে।
এমন শূন্য নীলাভ স্বর্গ 
দিনশুরুর মাঠ ফেলে বহুদূরে আসা,
খেলাঘরে কতো খাঁচা দূর্বোধ্য যেন
মৃত্যুর স্বাদ পেতে ভালোবাসা।
হৃদ পুষে গেছে শুধু কিছু সন্ধ্যা
জোনাকীর আলোয় ভরা, 
সকল সেতুই রয়েছে নিয়ত অদৃশ্য
জানালায় অভিমানী অ্যালোভেরা।


লিটন শব্দকর : পরিচিতি 

লিটন শব্দকরের জন্ম ১৯৯৩,২০অক্টোবর বর্তমান ঊনকোটি জেলার ফটিকরায় গ্রামে মামারবাড়িতে।পিতা ধীরেন্দ্রকুমার শব্দকর,রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী-সমবায় দপ্তর।মাতা আরতী শব্দকর। 
ঠিকানা বর্তমান আবাস ধর্মনগর,উত্তর ত্রিপুরা।শিক্ষা বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর(এম.এ), বি.এড শিক্ষারত।বয়স সাতাশ
কবিতা লেখা শুরু-অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরত থাকাকালে
।ভালোলাগা ও অন্যান্য চর্চার বিষয় রবীন্দ্রসঙ্গীত,বাউলগীতি,
প্রিয় বাদ্যযন্ত্র দোতারা,গীটার
অন্যান্য একতারা,স্টেনার ব্যাঞ্জো,খমক প্রিয় উপন্যাস আরণ্যক,পথের পাঁচালী,গোরা,পদ্মানদীর মাঝি।
প্রিয় গল্প সংকলন গল্পগুচ্ছ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
প্রিয় কাব্যগ্রন্থ রূপসী বাংলা।
প্রিয় কবি-জীবনানন্দ দাশ,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।



আমন্ত্রণ রইলো ত্রিপুরা বরাকের সকল সৃজন সহযোোোদ্ধাদে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ