ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ (২৫)
যুক্তবর্ণের গোলকধাঁধ:মানবর্দ্ধন পাল
একাধিক বর্ণ মিলে যুক্তবর্ণ হয়
পাওয়া সহজ নয় তার পরিচয়।
না-চিনলে যুক্তবর্ণের বিশাল ভুবন
অপূর্ণ থেকে যায় মাতৃভাষা-ধন।
এবার স্কুল-কলেজের সব ছাত্রছাত্রী করোনা-পাস করেছে। শুভ ও কাব্য সিক্সে এবং ঐশী ও হিয়া ক্লাস টেন-এ উঠেছে। দাদুভাই আজ ওদের ছয়টি শব্দের বানান লিখতে দিলেন-- বিজ্ঞ, খঞ্জ, তৃষ্ণা, মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণ এবং ব্রাহ্মণ। লিখল সবাই কিন্তু শুদ্ধ বানানে লিখল ঐশী এবং হিয়া। এবার দাদুভাই একে-একে সবাইকে শব্দগুলোর বানান জিজ্ঞেস করলেন। তখন কেউ বোবা হয়ে রইল। কেউ আমতা-আমতা করতে লাগল। কেউবা করতে থাকল তোতলামি! সবার এমন করুণ অবস্থা দেখে দাদুভাই মুচকি হেসে বললেন,
---- তা হলে বোঝা গেল সরল বর্ণমালা তোমরা সবাই চিনলেও অনেক যুক্তবর্ণই চেনো না।
---- বাংলা যুক্তবর্ণগুলো অনেক কঠিন ও প্যাঁচমারা। নিজের দোষ ঢাকতে কাব্য আস্তে করে বলল।
---- শোন কাব্য, এভাবে ভাষার দোষ দিয়ে লাভ নেই! হাজার বছর ধরে আমাদের চোদ্দ পুরুষ এই ভাষা শিখে আসছে। আজ তোমাদের কাছে তা জটিল হয়ে গেল। এটা ঠিক নয়। বর্ণমালা শেখার সময়ই অর্থাৎ বিসমিল্লাতেই তোমাদের গলদ রয়ে গেছে! এখনও সময় আছে, ভাল করে চেহারা ও চরিত্রে যুক্তবর্ণগুলো চিনে নাও। দাদুভাই বললেন।
---- তুমি যুক্তবর্ণগুলো ভেঙে একটু বুঝিয়ে দাও না দাদুভাই!
কাব্যর কণ্ঠে মিনতি।
---- সব যুক্তবর্ণ তো ভেঙে দেখান যাবে না! কারণ এর সংখ্যা অনেক-- বলা যায় অসংখ্য! এবিষয়ে ব্যাকরণবিদদের মধ্যে মতভেদও আছে। কারণ দুটি স্বরবর্ণ মিলে যুক্তবর্ণ হতে পারে-- যাকে আমরা যুগ্মস্বর বলেছি। যেমন ঔ ( অ+উ) এবং ঐ (অ+ই)। স্বর ও ব্যঞ্জন মিলেও যুক্তবর্ণ হতে পারে। যেমন কৈ (ক+ই), মৌ(ম+উ)। আবার দুটি বা তিনটি ব্যঞ্জন মিলেও যুক্তবর্ণ হতে পারে। যেমন দন্ত (ন+ত), দ্বন্দ্ব (দ+ব, ন+দ+ব)। একাধিক ব্যঞ্জন এবং স্বরবর্ণ মিলেও যুক্তবর্ণ হতে পারে। যেমন লক্ষ্মী (ক+ষ+ম+ঈ)।
তাই বাংলা ভাষার লক্ষলক্ষ শব্দের মধ্যে হাজার-হাজার যুক্তবর্ণের হিসেবে রাখা দুঃসাধ্য ব্যাপার। অবশ্য কোনও-কোনও ধ্বনিবিজ্ঞানী হিসেবে করে বলেছেন, বাংলায় ৯২৪৪টির মত যুক্তবর্ণ আছে। এই হিসেব একাধিক স্বর ও ব্যঞ্জনের সংযোগ মিলিয়ে। একথা শুনলে তোমাদের মত শিশুদের তো বটেই বড়দেরও মাথা নষ্ট হয়ে যাবে! তবে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা স্বরধ্বনির যুক্ততা বাদ দিয়ে কেবল ব্যঞ্জনধ্বনির যুক্ততা হিসেব করে বলেছেন, বাংলায় যুক্তবর্ণের সংখ্যা ২৫০টি। তবে তা-ও সব প্রকৃত যুক্তবর্ণ নয়। প্রকৃত যুক্তবর্ণ মাত্র ৩৬টি।
এপর্যন্ত শুনেই হিয়া আর ধৈর্য ধরতে পারল না। একজন বলেই ফেলল,
---- দাদুভাই, মাথা তো এখনই ভোঁ-ভোঁ করছে-- খারাপ হতে আর দেরি নেই! যুক্তবর্ণ তো যুক্তবর্ণই। তার আবার প্রকৃত-অপ্রকৃত কী? কোন্ পণ্ডিত-যে এসব বানালো! ইংরেজিই ভাল। এসব যুক্তবর্ণটর্ন নেই!
দাদুভাই বুঝতে পারলেন, ঐশীর মেজাজ তিরিক্ষি-- কণ্ঠে ক্ষুব্ধতার সুর। তাকে শান্ত করে দাদুভাই বললেন,
---- দেখ, এতে পণ্ডিতদের কোনও দোষ নেই। তাঁরা তো যুক্তবর্ণ তৈরি করেননি! তাঁরা কেবল বিষয়টি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সেই প্রাচীনকাল থেকেই যুক্তবর্ণ বাংলা ভাষায় ছিল। কিংবা বলা যায়, তারও আগে থেকে। পালি ভাষায় ছিল, প্রাকৃত ভাষায় ছিল। এমন কি বাংলা বর্ণমালার মা ব্রাহ্মীলিপিতেও ছিল। মাতৃভাষার সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে আমরা এখনও ধরে রেখেছি, মেনে চলছি। মাথা ঠাণ্ডা রেখে ধৈর্য ধরে একটু শোন-- সবই বুঝতে পারবে।
সবভাষায় যুক্তবর্ণ নেই-- এটা ঠিক। তবে অনেক উন্নত ভাষাতেই আছে। সে-বর্ণনা দিতে গেলে সাতকাহন হয়ে যাবে। তোমরা বলবে 'প্যাঁচাল'। তাই সেদিকে আর যাব না।
বাংলা ভাষার যুক্তবর্ণ একটু জটিল হলেও তা আমাদের বর্ণমালার বৈশিষ্ট্য এবং অহংকার। প্রকৃত ও অপ্রকৃত যুক্তবর্ণের কথা বলতেই তোমাদের মাথা ঘুরে গেল। তা কিন্তু কোনও জটিল ব্যাপার নয়। যে-যুক্তবর্ণ শব্দের শুরুতে থাকে সেগুলোই প্রকৃত বা আসল যুক্তবর্ণ। আর যে-যুক্তবর্ণ শব্দের মাঝে বা শেষে বসে সেগুলো অপ্রকৃত বা নকল যুক্তবর্ণ। ছদ্মবেশী যুক্তবর্ণও বলা যায়।
আসল ও নকল যুক্তবর্ণের চরিত্রও আলাদা। শব্দের শুরুতে যে আসল যুক্তবর্ণ থাকে তা ভেঙে উচ্চারণ করা যায় না। সেগুলো শ্বাসের একবারের চেষ্টায় উচ্চারণ করতে হয়। যেমন স্কন্ধ, স্পন্দন, স্তব্ধ। এতিনটি শব্দের উচ্চারণ করার আমরা দুবারে করছি-- স্কন্+ধ,স্পন্+দন্, স্তবধ। লক্ষ কর, উচ্চারণের সময় প্রথম যুক্তবর্ণটি ভাঙছে না কিন্তু শেষের বা মাঝের যুক্তবর্ণ ভেঙে যাচ্ছে। শেষের যুক্তবর্ণগুলো আমরা হসন্ত চিহ্ন দিয়ে এভাবেও লেখতে পারি : স্কনধ, স্পনদন্, স্তবধ। একারণে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা শব্দের শুরুর যুক্তবর্ণকে প্রকৃত বা আসল যুক্তবর্ণ বলেছেন। আর শব্দের মাঝের বা শেষের যুক্তবর্ণ উচ্চারণের সময় সর্বদা ভেঙে যায় বলে তা নকল বা অপ্রকৃত যুক্তবর্ণ। তাই ধ্বনিবিজ্ঞানীরা শব্দের শুরুতে থাকা ৩৬টি যুক্তবর্ণকে প্রকৃত যুক্তবর্ণ বলেছেন। প্রায় ২৫০টি যুক্তবর্ণের মধ্যে ৩৬টি বাদে বাকিগুলো অপ্রকৃত বা নকল যুক্তবর্ণ। আশা করি এবার তোমাদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে।
---- দাদুভাই, যুক্তবর্ণ সম্পর্কে তোমার কথা কি শেষ? ঐশী বলল।
---- কথা কি শেষ হয়? না কি শেষকথা বলে কিছু আছে! যুক্তবর্ণের সংজ্ঞাটাই তো বলা হয়নি! এতক্ষণ যা বললাম তার সার কথাটুকু বললেই তো সংজ্ঞা হয়ে যায়। তোমরা কি কেউ তা বলতে পারব?
একথা শুনে সবাই আমতা-আমতা করতে লাগল। অবশেষে সাহস করে ঐশী বলল,
---- কয়েকটি বর্ণ একত্র মিলে থাকলে তাকে যুক্তবর্ণ বলে।
---- তোমার ধারণা এবং এখনকার আলোচনা শুনে ভালই বলেছ। তবে বিষয়টি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। আরেকটু স্পষ্ট করে বলা যায়, পরপর দুটি কিংবা তার বেশি ব্যঞ্জনবর্ণ একসঙ্গে মিলিয়ে দিলে যুক্তবর্ণ হয়। যুক্তবর্ণ হল একাধিক ব্যঞ্জনের সংযুক্ত রূপ। কেবল ব্যঞ্জনের সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণ যোগ হলেই তাকে যুক্তবর্ণ বলে। এই যুক্তবর্ণকে 'সংযুক্তবর্ণ' বা 'যুক্তাক্ষর' বলাও হয়। দুটি ব্যঞ্জনের যুক্তবর্ণ হতে পারে আবার তিনটিরও হয়। যেমন 'ক্লান্ত' শব্দে দুটি করে ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্ত আছে (ক+ল, ন+ত) আবার 'চন্দ্র' শব্দের শেষাংশে তিনটি ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্ত (ন+দ+র-ফলা)। এসব তো তোমরা বোঝই।
তবে যুক্তবর্ণে আরও ঝামেলা আছে। অবশ্য 'ঝামেলা' না-বলে তাকে 'গোলকধাঁধা' বলাই ভাল। এই গোলকধাঁধার খপ্পরে পড়ে তোমাদের মত শিশুশিক্ষার্থীরা অনেক বানান ভুল করে। তাই যুক্তবর্ণ বা যুক্তাক্ষর ভালভাবে চিনে রাখা দরকার। কোন্ বর্ণের সঙ্গে কোন্ বর্ণটি যুক্ত, কোনটির পরে কোন্ বর্ণ আছে এবং যুক্ত হলে বর্ণের চেহারা কেমন হয় তা ভাল করে চিনে রাখা দরকার। একারণেই আজ আসরের শুরুতে যে ছয়টি শব্দ লিখতে দিয়েছিলাম তা লিখতে পারনি কিংবা লিখলেও বানান বলতে পারনি! তাই ক্ষ (ক+ষ), হ্ম (হ+ম), ক্র (ক+র), ত্রু (ত+র+উ), স্ক (স+ক), ক্স (ক+স), গ্ম (গ+ম), ঞ্জ (ঞ+জ), জ্ঞ (জ+ঞ), ঙ্গ (ঙ+গ), ঞ্চ (ঞ+চ), ক্ত (ক+ত), ষ্ণ (ষ+ণ), হ্ন (হ+ন), হ্ণ (হ+ণ), ভ্র (ভ+র) ইত্যাদি যুক্তবর্ণগুলো তোমাদের বিশেষভাবে চেনা দরকার।
---- ঠিকই বলেছ দাদুভাই। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশের চেহারা আমরা কিছুটা চিনলেও কোন্-কোন্ বর্ণ মিলে এর সৃষ্টি হয়েছে তা জানতাম না! সরল কথায় স্বীকার করল ঐশী।
---- দেখ, এই যুক্তবর্ণগুলো আসলে প্রাইমারি স্কুলে বর্ণমালা শেখার সময়ই চিনতে হয়। সেই শিশুকালের শিক্ষাতেই তোমাদের ফাঁক রয়ে গেছে। এর নামই গোড়ায় গলদ বা 'বিসমিল্লায় গলদ'।
দাদুভাইয়ের কথা শুনে শুভ ও কাব্য একটু হাসল আর ঐশী এবং হিয়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। তা লক্ষ করে দাদুভাই বললেন,
---- তোমাদের লজ্জা দেবার জন্য আমি এমন কথা বলছি না। বেশিরভাগ শিশুশিক্ষার্থীর অবস্থা এখন একই রকম! তাই এসব বিষয়ে তোমাদের সচেতন করতে চাচ্ছি।
যুক্তবর্ণ-বিষয়ে আরেকটি কথা জানা তোমাদের জন্য জরুরি। তা হল-- যুক্তবর্ণকে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন।
★ স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ : যে সংযুক্ত বর্ণগুলো দেখেই খুব সহজে চেনা যায় সেগুলো স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ। যেমন : ক্ক (ক+ক), চ্চ (চ+চ), ব্ব (ব+ব), ন্ন (ন+ন), ন্দ (ন+দ) ইত্যাদি।
★ অর্ধস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ : যে সংযুক্তবর্ণের কিছু অংশ বোঝা যায়, কিছুটা বোঝা যায় না তাকে অর্ধস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ বলে। যেমন : জ্ঞ (জ+ঞ), ত্ত (ত+ত), ঞ্ঝ (ঞ+ঝ) ষ্ট্য (ষ+ট+য) ইত্যাদি।
★অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ : এধরনের সংযুক্ত বর্ণের ভেতরে কোন্-কোন্ ব্যঞ্জনবর্ণ আছে তা দেখা যায় না। বর্ণগুলো মিলে নতুন রূপ ধারণ করে। তা-ই অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ। যেমন : ক্ষ (ক+ষ), হ্ম (হ+ম), ক্র (ক+র), ঙ্গ (ঙ+গ), ক্ত (ক+ত) ইত্যাদি।
তোমরা তো বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। তাই পদার্থের ভৌত মিশ্রণ ও রাসায়নিক মিশ্রণের কথা জান। পদার্থের যে মিশ্রণ সহজে আলাদা করা যায় তা ভৌত মিশ্রণ আর যে মিশ্রণের ফলে নতুন পদার্থ সৃষ্টি হয় এবং সহজে আলাদা করা যায় না তাকে রাসায়নিক মিশ্রণ বলে।
চালডাল মিশলে সহজে আলাদা করা যায়। পানির সঙ্গে লবণ মিশলেও অনায়াসে আলাদা করা যায়। কিন্তু পানির হাইড্রোজেন-অক্সিজেনকে বিজ্ঞানাগার ছাড়া আলাদা করা যায় না। ঠিক তেমনই স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ হল চালডালের মিশ্রণের মত। অর্ধস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ হল লবণপানির মিশ্রণের মত। আর অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ হল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক মিশ্রণের মত। এবার নিশ্চয়ই পরিষ্কার বুঝতে পেরেছ। তা-ই না?
কাব্য ছাড়া তোমাদের কারও নামের বানানেই যুক্তবর্ণ নেই কিন্তু আমার নামের বানানে আছে! মানবর্দ্ধন। র্দ্ধ (র+দ+ধ)। এটা অর্ধস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ। কী মজা! হা হা হা -----!
1 মন্তব্যসমূহ
ভাল লাগলো।
উত্তরমুছুন