কবি বিশ্বজিৎ দেব সংখ্যা
কেন লিখি,কেন লিখি এই ঘুনাক্ষরগুলি
................................................................
বিশ্বজিৎ দেব
আসলে প্রাণের কোন দায় নেই, কোন দ্বৈতও নেই। সামান্য আলোর ইশারাটুকু যখন চমকায়, রাত ক্ষনিকের তরে ফুটফুটে হয় নিজেকে মনে হয় কান্নাঠাসা একটি নিরেট আয়ুর ব্যারেল।
পুরনো পৃথিবীর শ্যাওলা থেকে ক্রমবিকশিত একটি মাংসপিন্ড আমি, বায়োফ্রেন্ডলি শ্বাসের প্যাকেজ, ফালা ফালা হয়ে পড়ে থাকা এদিক ওদিক।চারপাশে প্রতিদিন উত্থিত এক একটি জীবনহাউই, প্রতিটি রেলইস্টিশনে অসহায় পেতে রাখা আর্তনাদের ইস্পাত,
প্রতিদিন বাজার ফেরত এক একটি বিষন্ন পলিব্যাগ যারা জমা হচ্ছে শহরের কোনে হা করা ডাম্পিং জোনে, প্রতিদিন সরকারি বর্জ্য বোঝাই গাড়িগুলি যেখানে নিজেকে হাল্কা করে ফিরে যায় যেন সেখানেই আমাকেও হাল্কা করে ফিরে যাবে আচ্ছদিত বিনম্র শকট।
জানি সমস্ত উপমা বোঝাই কবিতার ক্যারাভান,ছান্দোগ্য বিলাপ আর স্ফুটনের বিন্দুগুলো একে একে শান্ত হবে হিমের ক্লিভেজে,আবার গান হবে ছলছল শ্যওলাপৃথিবীর...
আসলে প্রাণের কোন দায় নেই, আছে দাউ দাউ, আছে শুধু উড়ন্ত লেলিহান। এসবের পরও টের পাই কোথাও রোমাঞ্চ রয়েছে, রয়েছে বৃষ্টিঅরণ্য কোথাও! সেই-ই কি তবে প্রেরণা (inspiration)! যদি তাই হয় তবে তা কোন অনিকেত আবিস্কারের উল্লাস? পঙ্কতি আর অক্ষরের অবয়বে তাকেই কি ফিরে পাই আমি বার বার ফুরিয়ে যাবার আগে? যে অনন্ত অযুত চিন্তার বিন্দুগুলি এই ভূতস্রোতে বহমান তার নুড়ির ফাঁকে ফাঁকে বয়ে চলে আমারও প্রাণের জল, শ্যাওলাপৃথিবীর সজল। এছাড়া আমার কোন ঘর নেই। ঘরের বর্গফল ভেঙে ভেঙে যেটুকু দাঁড়ায় তার সবটুকু মাত্রা,যতি আর লুটিয়ে পড়ার বিরাম। তারপর এর রেশটুকুও থাকে না কোথাও....
তাই লিখি, লিখে যাই তাঁর বিন্দু বিন্দুতম।
শতবিভাজিত কোষকলাগুলি যাদের হাত পা ছড়ানো এই সব ছটফটে অমর্ত্য পঙ্কতিমালা....কার পাঠের অপেক্ষায় ঈশ্বরের মুখপানে চেয়ে থাকে আজও বুঝতে পারিনা। ফুরিয়ে যাওয়া রকেটের দাগ গুলিই কি তবে কবিতা কিংবা কবিতার মতো স্ফুটনের চিৎকার যা আমি লিখি নাকি আমাকেই লেখে কবি তথাগত!
টেনিসনের পঙ্কতিগুলি যেমন অকপটে বলে " and what am I....an infant crying in night.....an infant crying for the light..." শেষ হওয়া গীতিকার রেশ যেমন থেকে যায় রাতভর , নিভে যাওয়া ধিকিধিকিগুলি যেমন ছাই হয়ে ওড়ে, চলে গেলে যেরকম মনে হয় এসেছিলো কেউ -লেখাগুলি যেন তারই প্রতিরূপ আর কিছু নয়।
আসলে আমি নিজের উপমা খুঁজি, যে আমার চিৎকারের প্রতিধ্বনি বয়ে বেড়ায় সেই বাতাসের রেশ খুঁজি...কবিতাই লিখি কি না কে জানে! এই ফুরিয়ে যাওয়াই আসলে জ্বালানির আর্ত অন্বেষার উদ্যম।
পেছনে পেছনে খুঁট ধরে সাতসকালের আলো থেকে চোখ মুছে মুছে... যে এসেছে কাঙাল...লুটিয়ে পড়ার আগে কান্নার মতো অঝোর পবিত্র হয়ে...সেই-ই লিখে যাচ্ছে আকাশের ফাঁকি, মন্দাক্রান্তা লয়। সকল কাঠের ভেতর থেকে সেই-ই লিখে যাচ্ছে সব ঘুনাক্ষর,সব ফুরিয়ে যাওয়ার উল্লাস উর্ধপানে অপরিসীম লেলিহান...
আমি যেনো তাঁরই ছায়ার উপমা, ছটফটে মাসপিন্ডের হাহাকার, আমি যেনো তাঁর বর্তনের দাগ, উদাসীন বালিয়াড়ি... দুরের ওয়াচটাওয়ারের আলো, ফুলকি ফুলকি প্রাণ, শুভ্র সকালে ওড়া চিমনির ধোঁয়া যার অকুস্থলে অবিরাম রুটিবেকারীর ইন্ধন!
আসলে প্রাণ দাহ্য তাই তাঁর কোন দায় নেই
তবু প্রাণের দায়েই আমি লিখি, কবিতা লিখি কি-না কে জানে!
ক|বি|তা
শ্রাবন
..........................
বিশ্বজিৎ দেব
শ্রাবনের বিচ্ছেদের গান নিয়ে
সন্ধ্যের দাওয়ায় বসেছে
একটি সেলাই মেশিন,
খট খট আওয়াজের দিকে
নেমে আসছে সুতো
জুড়ে দিচ্ছে অঝোর সাটিন,
বাতাসে আর্দ্রতার তারতম্য অনুযায়ী
তার পাশে এসে বসে
এক নিরুপায় হাতপাখা
খানিকটা উপরিতল নিজের জন্য রেখে
এর দুদিকেই উপচে পড়ছে জলের মরশুম
শ্রাবনের বিচ্ছেদের টানে কে তাকে বিলিয়ে দিচ্ছে ঢালু,গোটা ভাটিদেশ ...
মাছভেরী আর জোয়ারের টান
একটি মা গাছ ও ছিন্নপত্রাবলীর ক্লোরোফিলগুলি
.....................................
বিশ্বজিৎ দেব
একটি মা বৃক্ষের সাথে কখনো কখনো আমার দেখা হয়। খোলা চুল, দুপুরের স্নান সেরে রোদের পীঠে দাঁড়িয়ে থাকে সে। পাতায় পাতায় শতরন্ধ্র রান্নাঘর প্রখর সূর্যতাপে সয়ে যাওয়া ...
গাছটিকে কখনো হাসতে দেখি না, কাঁদতেও দেখিনা প্রান খুলে। মাথানীচু সংসারে দুপুরের দাওয়ায় যেন চিরকাল হাতপাখা নিয়ে বসে থাকে সে, পাতার অক্সিজেনগুলি বাতাসে ছড়ায় ..
ঝড়ে ও বিদ্যুতে মা গাছটির কোন রা নেই।
ডালপালা ভাঙে,শব্দ হয়, ঝড় লাগে। তার কোন প্রতিবাদ নেই। দেনা পাওনার সংসারে চারপাশ থেকে সে কেবল টেনে নিচ্ছে নিকষ কার্বন। মাঝে মাঝে দুরের পাখিটি আসে। মগডালে বেঁধে রেখে যায় খড়কুটো, প্রনয়ের ডিম....
গত বৈশাখে সমূলে লুটিয়ে পড়েছে যে পুরুষ বৃক্ষটি তার কাছেও কোন অনুযোগ ছিলো না কোনদিন। বিচ্ছেদের বেদনায় ভরা ডালপালাগুলি আবার ছড়িয়ে দিয়েছে সে বৃষ্টির কাছে। বাচ্চা গাছগুলি এ নিয়েই লেপ্টে থাকে তেল চিটচিটে আঁচলের গায়ে...
শুধু সইয়ের বাড়ি থেকে যে দুরের পাখিটি আসে তার সাথে কথা বলে অচিন পাতাটি। দুজনের কতো কথা হয়! পরস্পরের কাছে যে যার গল্প ঢালে। মা গাছটির বুকের কার্বনগুলি এভাবেই হালকা হয় রোজ সন্ধ্যায়। ভোরবেলা খুলে যায় ছিন্নপত্রাবলীর ক্লোরোফিলগুলি .......
মেয়েটি
................
বিশ্বজিৎ দেব
ওই তো মেয়েটি আসে
যার পথ চেয়ে বসে থাকে
আমাদের ভাইরাল ফিবারের হাওয়া...
নবপত্রিকা
............................
বিশ্বজিৎ দেব
নতুন করে কান্না লেখো নতুন করে নদী
নতুন করে জন্ম লেখো নতুন করে হৃদি
অভিমান তার রয়ে গেছে যায় একা
শ্যাওলা জড়ানো তন্তুর পোকা
মরে গিয়ে যায় উড়ে তার পায়
যন্ত্রণা যতো বোকা
আমি তো তোমারই আকাশ
জানালায় দেখা অজানার রেখা
থেমে গেছে এসে বন্দর একা
বাতিঘর ঘীরে রাত নামে যার
অবয়ব ঘীরে সঙ, ঈশানের কোনে
লিখে যায় রেখে বিদ্যুৎ তার বাঁকা.....
নতুন করে সাগর লেখো
নতুন করে নোনাl
নতুন করে অতল লেখো
নতুন করে চেনা
অনুরাধা নক্ষত্রের জাতক ও তাঁর রনলেখাগুলি
...........................................................
বিশ্বজিৎ দেব
ক)
রেলব্রীজ হতে চেয়ে হাত পা ছুঁড়েছি আমিও, দুদিকে দোটানা। জীবন্ত ও শবের মাঝামাঝি চমকে উঠেছে নয়নতারার ঝিকি,একটি শুন্য পৃষ্ঠায় এসে আকাশ নেমেছে , মাটির যমজ-
একটি অসহায় হাতপাখা নিজে থেকেই নড়ে উঠেছে সামারের দীর্ঘ খুশিতে।
গান হয়ে বসে আছে একটি কাঠের হারমোনিয়াম।চারদিকে কি ভীষণ বিবাহতান্ডব!
খ)
চলো পালাই, শেষ ভূখণ্ডে যেখানে জমাট
বাঁধছে বরফ, জলের ব্যথার সাথে মিশে
যাচ্ছে মাটি। চলো তার প্রান্তিকে পা ঝুলিয়ে বসে মদ খেতে যাই, নীলের সফেন
থেকে ছেনে তুলি আকাশের ফাঁকি তারাদের নামে লিখে ফেলি
নভো সিরিয়াল,জঙ্গলে ঠাসা পৃথিবীর
ঘুনের কনসার্ট ....
খ)
আমাকে শায়িত রেখে সব বিচ্ছেদ জুড়ে দেবে বলে এভাবেই তৈরি হচ্ছে
টানা রেলব্রীজ,ঝমঝম অনুবাদ,আয়রনের ঘোর, মরচের সমুহ বিরাগ।
এসবই পূর্বসুচিত, দুদিকের বিপুল তফাত এঁকে রাখা জল, সাত সিঁড়ি সর্বনাম অস্থির ক্ষয়,আকাশ ডাকলে কবে দৌড়ে যাবে ব্ল্যাকহোল, আয় আয় খোঁকা
মাসিপিসি ঘুম!
গ)
কার যতিচিহ্ন অবধি আমিও লিখেছি তাঁর
রনলেখাগুলি, আমিও বেঁধেছি টানা ক্রেন
দুদিকের ভুল বোঝাবুঝি! তারাদের আলোকশুন্য রাতে কেউ জানতে পারেনা এই খুনোখুনি,লুটিয়ে পড়ার আগে কিরকম শ্বাস নিচ্ছে চিরপরাজিত ছৌ
কাঁপা কাঁপা রিখটার থেকে নেমে যাচ্ছে
হতাহত নক্ষত্রের ছাই....
ঘ)
এসবের থেকে দুরে
গ্রামের একমাত্র মানতের থানে লোকে জড়ো হয় এই বিস্ময়ে, স্তুপীকৃত জবামালা
ঘোর কৃষ্ণপক্ষ রাতে ঝরে পড়ে নিরক্ত রোশনাই!
কবি পরিচিতি
.............................
জন্ম-
1965/ 27 অক্টোবর
জন্মস্থান-
মনুভ্যালি চা বাগান, কৈলাসহর, ত্রিপুরা।
শিক্ষা-
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ।
পেশা-
তথ্য আধিকারিক (ত্রিপুরা সরকার)।
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ -
উনকথন , খন্ড পাড়ায় জলবার্ষিকী , ধর্মগোধূলী, নিরিবিলি সেন্ট আইটেমস, শ্রেষ্ঠ কবিতা
কবিতা লেখা শুরু সেই স্কুলে পড়ার বয়েস থেকে।
শ্রেষ্ঠ কবিতা
বিশ্বজিৎ দেব
মূল্য:১৫০টাকা
স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত
0 মন্তব্যসমূহ