প্রতিদিন বাংলাভাষা. স্রোত
শক্তিপদ ব্রহ্মচারী'র কবিতা
২৫:১২:২০২০
আমার বাবা শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর 'জলবন্দী ও অন্যান্য গদ্য' প্রকাশিত হয়েছিল, 'সাহিত্য' প্রকাশনী থেকে, তার ই একটি অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দিতে ইচ্ছে হল....
কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী
আমি বললাম, পটলমামা, খামোখা হিন্দুদের গালাগাল দিও না। ওই সব গালাগাল অ-হিন্দুদের জন্য তুলে রাখো। আর আমার অবশ্য ছোটমুখে বড় কথা মানায় না। আমাকে তো প্রায় নাস্তিকই বলতে পারো। কেবল দেবদেবীদের ভক্তদের ভয়ে যথাসাধ্য পকেট উজাড় করে পুজোর চাঁদা দিয়ে আসছি প্রতি বছর। এই পুণ্যের ফলেই হয়তো মরার পরে ভূত হয়ে তোমাদের ঘাড় মটকাতে আসব না। কিন্তু বলছিলাম কি, ইট দেবতার জন্য একটা ধ্যানের মন্ত্র নিজেরা বানিয়ে নিতে পারো না?
-- কে, কে বানাবে?
আমি বললাম, অভয় দিলে আমিও চেষ্টা করে দেখতে পারি। যেমন ধরো --
ওঁ রক্তবর্ণাং মহাইটং ষট্তলঞ্চ চতুষ্কোণং
বি-জে-পি শিবসেনাশ্চৈব ভক্তবৃন্দং সমাযুক্তং
রামশিলানবনাম ধারয়েৎ কৃতবাসসম
ইহা গচ্ছ ইহাগচ্ছ ত্বং হি রাম হনুমন্তঃ।।
মামার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, 'কার ভাগনে দেখতে হবে তো। যাক্, এখন আর শিলাপূজা অশাস্ত্রীয় হবে না। তোর রচিত ধ্যানমন্ত্রই চালিয়ে দেওয়া যাবে। অবশ্য আমিও একটা লিখেছিলাম। তোর রচনার চাইতে ঢের ভালো। তবে আমারটা আর চালাব না। তোর মতো একজন নাস্তিক কে তো দলে ফিরে পাবো। তাতেও কম লাভ হবে না। আমাদের সমস্যা হচ্ছে ভারতের সমস্ত হিন্দুকে সংঘবদ্ধ করা।তো এক এক করে সব হিন্দুকেই একদিন আমাদের হিন্দু মহাসংঘের কাছে আসতেই হবে।আজ তুই এসেছিস কাল আরেকজন আসবে। বললাম না, হিন্দুর হিন্দু ছাড়া গতি নেই।'
আমি একটু হেঁ হেঁ করে হাসলাম।
শক্তিপদ ব্রহ্মচারী'র একগুচ্ছ কবিতা
একেক জন্ম ভালোবাসার আরেক জন্ম গৃহস্থালির
----------------------------
আমি তোমার হাতের মুঠোয় ভালোবাসার তুচ্ছ নুড়ি
ছুঁড়ে ফেললেই অবগাহন সমুদ্রকে ডেকে বলব
আমায় তুমি শাসন করো রত্নগর্ভা অন্ধকারে
উথাল পাথাল শব্দে নাচাও পদাতিকের বিনয় ভালো
শব্দারোহী রথাশ্ব গজ হাজার কিলো দূরেই রাখি
শব্দ কি সাম্পানে আসে নাকি সেও স্বয়ংব্রজ
বালক তোমার হাতের ঘুড়ি অস্তিবাদ, না প্রকৃতিপ্রেম
একেক জন্ম ভালোবাসার আরেক জন্ম গৃহস্থালির।
কে আমাকে শাসন করে ঈশ্বরী না সেবাদাসী
পাতালে রাজকন্যা থাকে? সত্যিই কি সোপান বেয়ে
স্বর্গেও পৌঁছানো চলে! হাতের মুঠোয় বন্দিশিবির
ইচ্ছে হলে ভাঙবে দুয়ার পলায়ন কি সহজ হবে?
ছোঁড়া মানেই ছাড়া-পাওয়া? অন্তত প্রস্তুতিবিহীন
সন্ন্যাসে সন্দেহ আছে আবার ঘরেই ফিরে আসা
শব্দ তুমি ঘরের ভেতর ঘর ভাঙানো গেয়েছ গান
একেক জন্ম ভালোবাসার আরেক জন্ম গৃহস্থালির।
জমির মিঞার জবানবন্দি
জবর দুঃখের কথা , আফশোষে ফাটিছে কলিজা
মব্লক দেড় কুড়ি , খুচরা দুই উমরের ইজা
সাকুল্যে বত্রিশ হইল ,বের্থ হইল এমন জৈবন
না আইল কামিনী ঘরে , না পাইলাম একখানা কাঞ্চন ।
পিরের মুরশিদ হইয়া ভরমিলান দেশ দেশান্তরে
যার লাউগ্যা ভুগিলাম ছয়মাস সান্নিপাতি জ্বরে
পেটে হইল বিষ্কামড়ি চউখে ঘোর , বেজায় হলিমা
কোমরে লেঙ্টি আর গায়ে মাত্র ছিঁড়া-ভিড়া নিমা ।
খুরে দিয়া দণ্ডবৎ উঠিলাম আসাম-বেঙ্গলে
সবই লুইট্যা নিছে দেখি পড়িবেশি শিয়ালে হেঙ্গলে
আছিল যা নিজের কইতে , ভাঙা থাল এক কানা ঘটি
উপরে আছেন আল্লাহ্ , আর আছে কোমরে লেঙ্গটি ।
দুঃখের অবধি নাই , কি কইমু তোমারে বাপধন
বাবু ভাইয়া ভোগ করে পির্থিমির কামিনী কাঞ্চন
খুঁজি মাগি অন্ন খাই , মাইয়া দেখলে বাইয়া পড়ে নাল
কেউ না জিগার করে , আমি এক আকাট বাঙ্গাল ।
অলৌকিক অভিযান
ছোটবেলা যখন ঠাকুরমার কোলের কাছে বসে লোককথার গল্প শুনতাম , চোখের সামনে ভেসে উঠতো গল্পের রাজবাড়ি । ঠাকুরমা বলতেন , রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া , হাজার হাজার পাইক-বরকন্দাজ । এমন যে রাজবাড়ি , তা চাট্টিখানি ব্যাপার নয় । চোখে-দেখা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই রাজার বাড়ির তুলনা চলে না ।কিন্তু কেন জানিনা, ঠাকুর্মার মুখে রাজার ঐশ্বর্যপূর্ণ বর্ণনা শুনতে শুনতে যে বাড়িটার চেহারা আমার চোখের সামনে ফুটে উঠত , তা একেবারে শ্রীহীন , একান্ত দরিদ্র্ ব্যাপার ।দু’খানি খড়ের চালে মেটে ঘর , পড়ো-পড়ো জীর্ণ দশা । ঘর দু’টির সংস্থান , এক চিলতে উঠোন , ঘরের কোণের দিকে একটা ফুলগাছ এগুলো আমার চোখের সামনে ছবির মতো চলে আসত । আর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার ,এমন একটা বাড়ি , আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল । আর সে বাড়িটা ছিল আমাদের বাড়ি থেকে অল্প দূরে গ্রামের দতিদ্রতম নমঃশূদ্র , আমাদের বাল্যকালের ইন্দাই দাদীর ।বিরাট দশাশই চেহারার মানুষ সে ।কিন্তু তাঁর দু’টি পা-ই ছিল খোঁড়া, ভরা বর্ষায় নৌকায় চড়ে কোথাও পাড়ি দেওয়ার সময় গলুইয়ে বসে থাকা মাল্লা ইন্দাই দাদীকে দেখে , আমার কেবলি তাকে রাজা-রাজা মনে হতো ।
নৌকায় চড়ে মামার বাড়ি চলেছি ।খুব ছোট ছিলাম তখন । কত বয়স মনে নেই ।ছই-এর নীচে বাবা, মা ও আমি। মাঝে ছিল মনা । আমাদের বহু বছরের পুরোনো মাঝি । চারদিকে কেবল জল , আর জল , ধারে কাছে কোথাও কোনো জনপ্রানী নেই । কেবল বৈঠার একটা একটানা ছপছপ শব্দ শুনতে শুনতে আমরা যেন পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি । সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যে লাস্যময়ী আলো তাঁর রূপবর্ণনার ভাষা আমি জানিনা । আমার কেমন জানি মনে হচ্ছিল , এই অদ্ভুত আলোর স্পর্শ লেগে নৌকার চারটি প্রানীই যেন কেমন অ-মানুষ হয়ে যাচ্ছিলাম ।
হটাত একটা নৌকা দেখলাম আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে । নৌকাটির ছই-হীন পেট ভরতি ছিল শুকনো গাছের ডালে । আর এই ভয়াবহ নিঃশব্দতাকে ভেদ করেও নৌকার একমাত্র মানুষ , বৈঠা টানতে টানতে ভরা গলায় গান গাইছে । গানের কথা মনে নেই, সুরও না । কেমন এক ভয় ভয় চোখে ওকে দেখতে দেখতে আমার মনে হলো , এ লোকটি এ পৃথিবীর না । লোকটিখুব অল্প সময়ের মধ্যে একটা খাল ডিঙ্গিয়ে – অদৃশ্য হয়ে গেল । আমার মনে হলো , এই পথ আমাদের না । কারণ, ওর মামার বাড়ি নেই, নিজের বাড়িও না । ক্রমশ কী এক ধরণের অনুভব আমাকে দিচ্ছিল ।
আর সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার , যখন আমি ভাবছিলাম , আমরা চারটি প্রানীর একসঙ্গে অলৌকিকতার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া উচিত , তখুনি বাবা মাকে ঠাট্টার মতো কী-একটা কথা বলে ফিসফিসানির মত হেসে উঠলেন ।আমার বাল্যকালের অভিমান আজ অবধি ওদের ক্ষমা করতে পারেনি ।
(‘ডাউক’ ১৯৭১, ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত)
আমার বাবা শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর 'জলবন্দী ও অন্যান্য গদ্য' প্রকাশিত হয়েছিল, 'সাহিত্য' প্রকাশনী থেকে, তার ই একটি অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দিতে ইচ্ছে হল....
কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী
আমি বললাম, পটলমামা, খামোখা হিন্দুদের গালাগাল দিও না। ওই সব গালাগাল অ-হিন্দুদের জন্য তুলে রাখো। আর আমার অবশ্য ছোটমুখে বড় কথা মানায় না। আমাকে তো প্রায় নাস্তিকই বলতে পারো। কেবল দেবদেবীদের ভক্তদের ভয়ে যথাসাধ্য পকেট উজাড় করে পুজোর চাঁদা দিয়ে আসছি প্রতি বছর। এই পুণ্যের ফলেই হয়তো মরার পরে ভূত হয়ে তোমাদের ঘাড় মটকাতে আসব না। কিন্তু বলছিলাম কি, ইট দেবতার জন্য একটা ধ্যানের মন্ত্র নিজেরা বানিয়ে নিতে পারো না?
-- কে, কে বানাবে?
আমি বললাম, অভয় দিলে আমিও চেষ্টা করে দেখতে পারি। যেমন ধরো --
ওঁ রক্তবর্ণাং মহাইটং ষট্তলঞ্চ চতুষ্কোণং
বি-জে-পি শিবসেনাশ্চৈব ভক্তবৃন্দং সমাযুক্তং
রামশিলানবনাম ধারয়েৎ কৃতবাসসম
ইহা গচ্ছ ইহাগচ্ছ ত্বং হি রাম হনুমন্তঃ।।
মামার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, 'কার ভাগনে দেখতে হবে তো। যাক্, এখন আর শিলাপূজা অশাস্ত্রীয় হবে না। তোর রচিত ধ্যানমন্ত্রই চালিয়ে দেওয়া যাবে। অবশ্য আমিও একটা লিখেছিলাম। তোর রচনার চাইতে ঢের ভালো। তবে আমারটা আর চালাব না। তোর মতো একজন নাস্তিক কে তো দলে ফিরে পাবো। তাতেও কম লাভ হবে না। আমাদের সমস্যা হচ্ছে ভারতের সমস্ত হিন্দুকে সংঘবদ্ধ করা।তো এক এক করে সব হিন্দুকেই একদিন আমাদের হিন্দু মহাসংঘের কাছে আসতেই হবে।আজ তুই এসেছিস কাল আরেকজন আসবে। বললাম না, হিন্দুর হিন্দু ছাড়া গতি নেই।'
আমি একটু হেঁ হেঁ করে হাসলাম।
একেক জন্ম ভালোবাসার আরেক জন্ম গৃহস্থালির
শক্তিপদ ব্রহ্মচারী
----------------------------
আমি তোমার হাতের মুঠোয় ভালোবাসার তুচ্ছ নুড়ি
ছুঁড়ে ফেললেই অবগাহন সমুদ্রকে ডেকে বলব
আমায় তুমি শাসন করো রত্নগর্ভা অন্ধকারে
উথাল পাথাল শব্দে নাচাও পদাতিকের বিনয় ভালো
শব্দারোহী রথাশ্ব গজ হাজার কিলো দূরেই রাখি
শব্দ কি সাম্পানে আসে নাকি সেও স্বয়ংব্রজ
বালক তোমার হাতের ঘুড়ি অস্তিবাদ, না প্রকৃতিপ্রেম
একেক জন্ম ভালোবাসার আরেক জন্ম গৃহস্থালির।
কে আমাকে শাসন করে ঈশ্বরী না সেবাদাসী
পাতালে রাজকন্যা থাকে? সত্যিই কি সোপান বেয়ে
স্বর্গেও পৌঁছানো চলে! হাতের মুঠোয় বন্দিশিবির
ইচ্ছে হলে ভাঙবে দুয়ার পলায়ন কি সহজ হবে?
ছোঁড়া মানেই ছাড়া-পাওয়া? অন্তত প্রস্তুতিবিহীন
সন্ন্যাসে সন্দেহ আছে আবার ঘরেই ফিরে আসা
শব্দ তুমি ঘরের ভেতর ঘর ভাঙানো গেয়েছ গান
একেক জন্ম ভালোবাসার আরেক জন্ম গৃহস্থালির।
জমির মিঞার জবানবন্দি
জবর দুঃখের কথা , আফশোষে ফাটিছে কলিজা
মব্লক দেড় কুড়ি , খুচরা দুই উমরের ইজা
সাকুল্যে বত্রিশ হইল ,বের্থ হইল এমন জৈবন
না আইল কামিনী ঘরে , না পাইলাম একখানা কাঞ্চন ।
পিরের মুরশিদ হইয়া ভরমিলান দেশ দেশান্তরে
যার লাউগ্যা ভুগিলাম ছয়মাস সান্নিপাতি জ্বরে
পেটে হইল বিষ্কামড়ি চউখে ঘোর , বেজায় হলিমা
কোমরে লেঙ্টি আর গায়ে মাত্র ছিঁড়া-ভিড়া নিমা ।
খুরে দিয়া দণ্ডবৎ উঠিলাম আসাম-বেঙ্গলে
সবই লুইট্যা নিছে দেখি পড়িবেশি শিয়ালে হেঙ্গলে
আছিল যা নিজের কইতে , ভাঙা থাল এক কানা ঘটি
উপরে আছেন আল্লাহ্ , আর আছে কোমরে লেঙ্গটি ।
দুঃখের অবধি নাই , কি কইমু তোমারে বাপধন
বাবু ভাইয়া ভোগ করে পির্থিমির কামিনী কাঞ্চন
খুঁজি মাগি অন্ন খাই , মাইয়া দেখলে বাইয়া পড়ে নাল
কেউ না জিগার করে , আমি এক আকাট বাঙ্গাল ।
একটি গ্রামীণ পদ্য
আমাদের গ্রাম থেকে শহর ছিল পঁচিশ মাইল দূরে
আমরা স্বপ্নে ছাড়া ট্রেন ও মোটরগাড়ি দেখি নি বহুদিন
তিন বাঁক উজানের একজন হোমিওপ্যাথ
সাত ইঞ্চি শিশিতে করে শাদা জলের ওষুধ দিতেন আমাদের
আমাদের কোন ডাকঘর বা স্কুল ছিল না
ইতিহাসের পাতায় যাকে সভ্যতা বলে
তা অনেকদিন আমাদের জানা হয় নি
তবু এবং আশ্চর্য্য
মায়ের উপুড় করা স্নেহের মতো আমাদের মাথার উপর আজন্ম আকাশ ছিল
দিগন্ত-ছোঁয়া মাঠের মধ্যে সবুজ ও সোনালি ছিল আমাদের প্রিয় রঙ
আমরা কাকের ডাক শুনতে শুনতে টিয়াপাখির নাম মুখস্থ করতাম
এতসব অসুবিধার মধ্যেও আমাদের ত্রিসীমানায়
একটি নদী ছিল
এবং আপনারা বিশ্বাস না-করলে সত্যিই দুঃখ হবে
নদীটির নাম ছিল বিবিয়ানা
আকাশ ও নদীকে সাক্ষী রেখে রিফিউজি লতার মতো একটি মেয়ে
অনাদরে বেড়ে উঠেছিল আমাদের প্রতিবেশী বাড়িতে
আমরা ‘সুন্দর’ শব্দটিকে অভিজ্ঞতার মধ্যে টেনে আনছিলাম প্রতিদিন
আমাদের ঘ্রাণশক্তি সাবালক হবার মুহূর্তে টের পেয়েছিলাম
মেয়েটির শরীরে ছিল কচি ডুমুর পাতার গন্ধ
আমাদের নদীর নামটি যেমন উল্টোপাল্টা
সেজন্যই বোধহয় মেয়েটিকে কেউ ‘রঞ্জনা’ বলে ডাকত না
এবং উপসংহারে আমার একটিই বলার মতো কথা বাকী আছে
আমাদের গ্রামের নামটি ছিল খুবই অকাব্যিক , অনর্থক ও বিচ্ছিরি
এমন কি লিখতে লজ্জা করে ।
কিছুটা ফিরিয়ে নাও আজ
অ্যাতোটা ভালোবাসা তুমি দিয়েছিলে
কিছুটা ফিরিয়ে নাও আজ
আমি যেন পণ্যহীন রিক্ত এক বিষণ্ণ জাহাজ
বাণিজ্য-বলয় ছেড়ে অবসন্ন অপরাহ্ণে ভাবি
কোথায় হারিয়ে গেছে সিন্দুকের চাবি
পোর্টম্যান্টে পোকা কাটা শীতের বৈভব
কিছুই চাই না আজ,
ফিরিয়ে নাও সব ।
হাতে রাখো হাত
অ্যাতো ভালোবাসা কেন ,নক্ষত্রখচিত দীর্ঘ রাত !
( কাব্যগ্রন্থ : দ্বন্দ্ব অহর্নিশ )
মাতাল অবস্থায় আঠারো লাইন
ইচ্ছে করে নখের খোঁচায় চোখ দুটোকে অন্ধ করি
ইচ্ছে করে বুকের ভেতর জাপটে রাখি প্রানেশ্বরী
এ-পিঠ ও-পিঠ হাত ঘোরালাম ও কার শাড়ী হাওয়ায় ভাসে
বুক জুড়ে কার সানাই বাজে এই বেয়াদপ চৈত্রমাসে
ইচ্ছে করে রকেট চড়ে চন্দ্রে গিয়ে বস্তি গড়ি
কেবল যদি সঙ্গে থাকে লক্ষ্মীসোনা প্রানেশ্বরী ।
জিহ্বা মেলে তৃষ্ণা দেখায় ভুরু নাচায় ডবকা ছুঁড়ি
ভরন্ত এই দুপুর বেলায় বর্ষা হবে ইলশেগুঁড়ি
ধনুর মতো পিঠ ভেজাব ? কি হবে আর গণ্ডগোলে
এই ভালো আজ সন্ধি করি শপথ করি ইচ্ছে হলে
সিঁথির উপর সতীপনা আয় মুছে দিই শালগরামে
মৃত্যু শুধু খাঁটী কথা রাবণ মারুক কিংবা রামে ।
অনেক কিছু ইচ্ছে ছিল পোষা কুকুর হয়ে থাকি
কিংবা তোমার অশ্বশালায় চিকন সুরে চিঁহি ডাকি
ময়না হয়ে রোজ দুবেলা নাম শোনাব কৃষ্ণ-রাধা
কিংবা যদি ইচ্ছে কর হতে পারি ধোপার গাধা
ময়লা ঘেঁটে ধন্য হব মহাশয়া প্রণাম করি
একটু যদি মিষ্টি হাস হাতের মুঠোয় প্রানেশ্বরী ।
শ্মশানফলক
প্রচুর কবিতা লিখেছিলেন তিনি ।
এবং অবরে-সবরে সমাসবদ্ধ পদের
হাইফেনের মতো কিছু আলপটকা গদ্য ।
প্রাণকে যারা পাখির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন
তিনি তাদেরই ক্রমান্বিত উত্তরাধিকারী
অক্ষরের জাল দিয়ে তিনি এই ভবার্ণবে
মাছ ধরতে চেয়েছিলেন
তিনি জানতেন
মাছ ধরতে গিয়ে শামুক গুগলিও তোলে কেউ কেউ ।
ট্রেনের বাঁশি , স্টীমারের ভোঁ
এইসব রূপকথার মধ্যে তিনি একদিন ডুবে গেলেন
আমরা যারা এখনো প্রাণকে পাখি-পড়া করে
ঝুলিয়ে রেখেছি
সেই আমাদের তিনিই ছিলেন নিকটতম শত্রু ।
যজ্ঞডুমুরের পাশে
যজ্ঞডুমুরের পাশে পড়ে আছে একজন উদয়াস্ত কৃষকের ফাল্গুনী পার্বণ
ওরে মন
কোথা যাবি যা না
বে-টাল বেহদ্দ খেতে কর্ষণের অনন্ত বাহানা
যা পায় তা মুখে তোলে ,
এঁটেল মাটির মায়া সোঁদা গন্ধ বিষ
আলুনি আমিষ
আগুন-জিভের মতো লিকলিকে পথ হাঁটে বনের গভীরে
তূণ থেকে তিরে
যজ্ঞডুমুরের দিকে চলে যায় কাফেলা চিত্তির এক সাপের খোলস
কেউ ভালো ,আলাভোলা , কেউ পরবশ
ওরে মন
যজ্ঞডুমুরের দিকে উড়ে যায় কিছু স্বপ্ন স্থাপত্যপ্রবণ ।
শব্দ পেলেই হল
শব্দ পেলেই হল , আমার শব্দ পেলেই হল
নদী থেকে তুলে নিলাম শব্দ ছলাচ্ছলো
তোমার চোখের কাছে
কান্না ভেজা হাসির মতো শব্দ শুয়ে আছে
সেই বয়সের গাছ-পাথরের মান্ধাতারও আগে
শব্দ শোনায় সানাই আবার খামচে ধরে রাগে
মাটির নীচে শস্য পুঁতে দাঁড়িয়ে থাকে একা
গলির পথে হারিয়ে গিয়ে ঘরের মধ্যে দেখা
এক পশলা বৃষ্টি হল
মেঘকে বলি ঘোমটা খোলো
যেই না বলা , বৃহন্নলা বদরপুরের গাড়ি
এক নিমেষে পৌঁছে দিল কোন রূপসীর বাড়ি !
হঠাৎকোন হিরণ্ময়
চতুর্দিকে হল্লা করে মানুষ যাচ্ছে হাটে
আমি শুয়ে চিতপটাং খাটে
সরল রেখায় টেনে নামাই সামান্য বিন্দুকে
হাজার রকম নিন্দা করে হাজারটা নিন্দুকে
এটা গেল , ওটা রইল , জানিতো সবই-তা
তুই আমার কবিতা ।
কারা যেন বাড়ি করছে গগনচুম্বী আশায়
আমি তখন ব্যস্ত থাকি আরেক ভালোবাসায়
হঠযোগীর মতন আমি রাংতা করি সোনা
ভেতর জুড়ে ব্যস্ত আনাগোনা
রয়ে গেলাম অপেক্ষমাণ শ্যামা কিম্বা রামার
কবিতা তুই আমার ।
মহোৎসবের বাজনা বাজে মানুষ যেথায় থাকে
আমি কেবল দৈব দুর্বিপাকে
চতুর্দিকের ভয়-জাগানো হাজার রকম তাড়ায়
গোলকধাঁধায় ঘুরে মরছি ,ভট্টাচার্য পাড়ায়
হঠাত কোন হিরণ্ময় রহস্য আলোকে
পেয়ে গেলাম তোকে ।
হঠাৎ একটি কবিতার মতো
অনেকদিন আমি কবিতা লিখছি না
আজকাল আমি হাটুরে মানুষের মতো
জিনিসপত্রের দাম নিয়ে দর কষাকষি
এবং মাথা গরম করি।
অথচ কবিতা লিখব বলে হাটের খবর রাখব না
এমনও তো কথা ছিল না
কিন্তু, হাটও আমাকে হটাতে থাকবে কবিতার বাজার থেকে
এমনও কথা ছিল না ।
আসলে কথা কিছুই ছিল না
যখন যেমন হচ্ছে সেটাই হল কথা
এবং প্রকৃত বিচারে কোনো কথাই আমাদের নেই
আসলে সার কথাটা হল তাই।
যে মাঝি-দিগন্তে মেঘ দেখতে পেয়েছিল
লক্ষ্যে পৌঁছাবার আগে অন্ধকারকে ঠেলে রাখতে হবে
এই ছিল কথা
যার ডান হাত কাটা পড়েছে
বাঁ হাতকে আরো বেশি সাবলীল গড়ে তোলা
ছিল তার কথা
কিন্তু আসলে কিছুই কিছু নয়
আমাদের সময়ের পোশাকি নাম এখন দুঃসময়
গা বাঁচিয়ে আছি
এবং গা বাঁচিয়েই মরছি।
এখন বৃষ্টি হচ্ছে অঝোরে । মাসটাও শ্রাবণ । আর শ্রাবণ এলেই মনে পড়ে যায় এই কবিতাটি।
মনসা-মঙ্গল
সপ্তডিঙা মধুকর চারদিকে জল
শ্রাবণের অবিশ্রাম মনসা-মঙ্গল
পচা পাটে এঁদো ডোবা বিষধর ফণা
ছেঁড়া কাঁথা-কাণি আর বেহুলা - যন্ত্রণা
হু হু-করা কালসন্ধ্যা ভেসে আসা গানে
সায়ের ঝিয়ারি যায় অনন্ত ভাসানে ।
#
কোথায় নিছনি কোথা চম্পক - নগর
সাতনরী শিকা ঝোলে ঘরের ভিতর
কুপিলম্পে রাতকানা নিরক্ষরা বুড়ি
লখা'র মরণে কান্দে আছুড়ি - পিছুড়ি
জাল - টানা ছেলে আজ রাতে গেছে জলে
রেখো মা মনসা তার সর্বাঙ্গ কুশলে।
#
গাঙের গর্ভিনী সেই গন্ধ ভেসে আসে
শ্রাবণীর দিগম্বরা দখিনা বাতাসে
এখনো বুকের দ্বিজ বংশীদাস কহে
হেথা নয় , হেথা নয় , অন্য কালীদহে...
ডহরের ঘোর - লাগা গহনের টানে
সায়ের ঝিয়ারি যায় অনন্ত ভাসানে ।
কেন যে লিখি, তা কি আমি আর জানি! মনকে যদি আকাশ বলি, তো আমার ভাবনা চিন্তা গুলো হচ্ছে ছেঁড়া-খোঁড়া মেঘের মতো। তাও কবি ঈশ্বর গুপ্তকে মনে রেখে বলতে পারি, শরতের মিছে মেঘ। অনেক সময় তারো কেবল ডাক-ডাকাই সার। বর্ষণ আর হলো কৈ!
কবিতা যখন গদ্য হয়ে যায়
‘দুধপাতিল গ্রাম’ নিয়ে কবিতা লিখলেন শঙ্খ ঘোষ,
এটা আমার লেখার কথা ছিল ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন
হারাঙ্গাজাও স্টেশনের কথা
ওটা তোমার লেখার কথা ছিল।
আসলে আমরা সবাই একসঙ্গে
ভালোবাসার কথা বলেছি একসময়ে
আসলে আমরা সবাই
শত্রুতার কথা বলছি এখন।
আমাদের আঞ্চলিকতা ও বিশ্ববীক্ষা
হলুদপাতার মতো মিইয়ে আছে অনেকদিন
আমরা অনেক, অনেক দিন
কারো মুখের দিকেই
সোজাসুজি তাকাতে পারছি না ।
0 মন্তব্যসমূহ