রুমা সরকার -এর একগুচ্ছ কবিতা
রুমা সরকার। সরকারি কলেজে সহকারি অধ্যাপক। আবৃত্তি সংগঠন উচ্চারণ আকাদেমি'র প্রতিষ্টাতা ও সভাপতি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন নিয়মিত আবৃত্তিশিল্পী। বাংলাদেশ বেতারের সংবাদপাঠক। এ পর্যন্ত তিনটি কবিতার বই ও অন্যান্য একাডেমিক বই প্রকাশিত। ২০১০ সালে আবৃত্তির এলবাস 'মহাবিচারপতি' বেরোয়।
১। যদি তুমি চাও
যদি তুমি সকলের ভালোবাসা পেতে চাও
আগে খুব করে সকলকে ভালবাসো।
যদি তুমি চাও
কেউ কেউ তোমায় ভালবাসুক
তুমি কাউকে কাউকে প্রাণভরে ভালবাসো
যদি চাও
একজন কেউ তোমাকে খু্ব ভালোবাসুক
সবার আগে তুমি তাকে ভীষণ করে ভালোবাসো,
বুকে জড়িয়ে শক্ত করে আগলে রাখো।
যদি তুমি চাও
তোমার মতো করে কেউ তোমাকে জানুক
তবে তুমি সত্যকে জানো
মিথ্যার অনেক রকম হয়;
সত্য দেখতে হুবহু সত্যেরই মতো হয়
সুতরাং তুমি অবিকল সত্যের মতো হও
যদি তুমি চাও
তোমার বিশ্বাসকে কেউ অবিশ্বাস না করুক
তবে তুমিও
কারও বিশ্বাসে আঘাত করো না
তুমি যদি বড় হতে চাও;
কাউকেই ছোট ভেবো না
যদি চাও
কেউ তোমাকে অবহেলা না করুক
তবে তৃণকেও হেলা করে দূরে ঠেলে দিও না।
যদি চাও
তোমায় সকলে আদর্শ মানুক
তবে সবার আগে মানবিক হও,
পৃথিবীতে মানুষের অ-নে-ক রঙ;
বর্ণহীন, গোত্রহীন শুধু মানবতা।
১লা ডিসেম্বর ২০২০,ঢাকা
২। যোগ-বিয়োগ
প্রিয়! বলতে চেয়েছো
খুঁজিনি তোমার নিরবতার মানে!
ভিনদেশ নয়, নয় বহুদূরের অন্যকোন গ্রহে;
জড়িয়ে আছো, জুড়ে আছো সকল সময়
খুব কাছে, ভীষণ সহজ সে পাঠ,
অবোধ হৃদয় শুধু জানে।
প্রিয়! নির্ঘুম গহনরাত করি অশ্রুপাত
আমার হয়েছে অঘটন বারোমাস।
দেখতে চাওনি তব এ মুখ!
দূরে সরে গেলেই তোমার যত সুখ।
বরং আড়ালেই থেকো
যুগের পর যুগ
যোগই হলো না;
তবুও বিয়োগ,,,
২৯/১১/২০২০,ঢাকা।
৩। তোমার উৎসব
সাপের ছলমের মতো একদিন খোলস ছেড়ে
চলে যাব দূর সমুদ্রপাড়ের গহীন বনে
আকাশে আকাশে বিস্তারিব জীবনসংসার
তবু ভাল বিনে মন্দ হোক, চাই না দেশমাতৃকার।
জীবনের সঙ্গে বেঁধে নেবো তোমায়
ঠিক যেন মায়ের আঁচলে গাথা চাবির ছড়া;
প্রিয় স্বদেশ আমার,
অঙ্গে জড়ায়ে নেবো একমুঠো ধূলিকণা
আর দু'মুঠো ছাই
কোন অঘটনে সরে না যেতে পারে
স্বার্থবাদী মন!
খোলাবুকে ভরে নেবো লাল-সবুজ,
অসাম্প্রদায়িক মানব মুক্তির রঙ।
প্রয়োজনে সেইখানে ফিরে যাব
টেনে নিয়ে ঘড়ির কাটা, যেখানে
অগ্নিদগ্ধ আঁখিতে স্বপ্ন নয় সত্যি মেখে নেয় বীরমাতা
তাঁর নয়নের দুইখানি পাতা।
আবারও মাথার 'পরে দাঁড়াবেন মুজিব
তাজউদ্দিন -কামারুজ্জামান- সৈয়দ নজরুল
প্রিয় স্বদেশ জেনে রেখো,
আমার মৃত্যুতে যদি হয় তোমার উৎসব
স্বাধীনতার জন্য দিয়ে যাব ভিটেমাটি সব।
৪। গোলপোস্টে কেউ নেই
মানুষের ভেতরে মন্যুষত্ব নেই আর
সাম্প্রদায়িকতা হাডুডু খেলে,
এ এক নতুন হাডুডু খেলা;
যেখানে মানুষকে ছোঁওয়া পাপ!
ধর্মের বেড়াজালে
ধর্মান্ধকে টেনে লয় দলে।
অসাম্প্রদায়িকতার টিমে
ইতস্তত সব পায়ের কাঁপন!
গোলপোস্টে কেউ নেই
একপেশে গোল খেয়ে
হেরে যায় মানবতা।
ধর্মান্ধঝড়ে উড়ে গেছে
স্ট্যাম্পগুলো।
খেলাও এখন আর নয় মনোরঞ্জন শুধু
সেখানে একে একে ধান খায় স্বার্থের ঘুঘু।
বিজয় স্তম্ভের বুকে শোনা যায়
বিজয়ীর প্রেত উল্লাস!
শোনে না কেউ
বিজিত আর পরাজিতের বিলাপ।
গোলপোস্টে কেউ নেই
একপেশে গোল খেয়ে হেরে যায় মানবতা,
কাপ হাতে বাড়ি ফিরে ধর্মান্ধতা।
১৭/১১/২০২০, ঢাকা।
৫। প্রেমহীন তোমাকে জেনেছি
একসময় একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে হাপিত্যেশ ছিলাম
চাতক পাখির মতো চেয়ে চেয়ে দেয়ালঘড়িটার সবগুলো কাঁটাকে ঘুরতে দেখেছি
একসময় একটু ভালোবাসার জন্যে অনেকটা পথ একাই হেঁটেছি,,,
আর ভেবে নিয়েছি আমি একা নই, কখনই
আজ সকলের মাঝে দাঁড়িয়েও নিজেকে একা দেখতে শিখেছি
একসময় আঁড়চোখে তাকালেই প্রেম ভাবতাম
আজ প্রেমের সাগরে ডুব দিয়েও প্রেমহীন তোমাকে জেনেছি
একসময় সময়ই আমাকে নিঃসঙ্গ করে দিতো
আজ সময় কোথায় সময়কে সঙ্গ দেবার!
একসময় আকাশে মেঘকে ডাকতে দেখলে দৌঁড়ে ঘরে যেতাম
আজ যেমনই হোক একখণ্ড খোলা আকাশ দেখতে হন্যে হয়ে যাই
একসময় মনে হতো তুমিই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন
আজ দেখি আমার মৃত্যুও ঘটবে না, কেবল আমাকে ছাড়া,,,
২৭/১০/২০১৯ঢাকা
৬। বিরজা
বিচ্ছিন্ন হবার পথে গোলাপ হাতে দাঁড়ালেই বন্ধু ভেবে নেব, অতটা বোকা আমি নই
ঔদাসিন্য আর নির্লীপ্ততা দেখেই স্বার্থহীন তোমাকে চিনে নেব তাও নই আমি আজ
ভালবাসা উবে গেছে কতরাত!
ওসব খেরোখাতায় ফেলে আসা সময়ের হিসাব
হাত কেটে গেলে স্যেভলন-তুলোয় চেপে ধরা যায়!
হৃদয়! বড্ড বেয়ারা, একবার ছুটেছেতো
দৌঁড় দৌঁড় আর দৌঁড় ; বকনা বাছুর যেন!
সামনের সবুজ ধানক্ষেতও তাকে আর থামাতে পারে না কোন।
অথচ, বাধাবন্ধে কত খুঁটি টানাটানি
একমুখ ঘাস ছুঁবে বলে!
স্বাধীনতায় কতটা স্বাধীন দেখো-
ক্ষেত আর ক্ষেত, মাঠ আর মাঠ, সরু আইল, প্রশস্থ রাস্তা
কিছুই আটকাতে পারে না তাকে।
আমিতো সামান্য নারী!
একবার বেঁধে দিলে সে মায়ার জাল ছিঁড়তে চায় না মন,
নষ্ট সময়ের মত শরীর খুবলে নিলেও মনটাকে বাঁচাই
তোমারই মনের গহীনে ডুব দেবো বলে!
আমাকে অসামান্যা বলে বলে আমার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেহটাকে আরও মলিন মোলায়েম করে দিয়েছ দিনের পর দিন
আমাকে কোমল হতে বলে বলে মলিনতর করেছো কেবল
অথচ, আমার ভেতরেও আশৈশব একটা আদ্যোপান্ত শামুক হবার স্বপ্ন ছিল
আমার ভেতরেও হরিণির ছন্দ ছিল
একটা ছলাৎ নদী ছিল; জলের শরীর
সাঁতার কেটে কেটে আমাকে আঁচড়ে উতলা করে উল্টেপাল্টে পড়তে চেয়েছো দিনরাত
জানোতো! তোমাকে ঠিক পড়তে পারিনি আমি,
আমার চোখ কান নাক মুখ রুদ্ধ করে ভোগের প্রসাদ গ্রহণে ব্যস্ত রেখেছিলে তুমি!
যেন আলাদা করে কোন আয়নার প্রয়োজন থাকতে নেই আমার,
যেন আলাদা করে কোন পৃথিবীর
কোন ভুবনের, কোন ঘর অথবা বাড়ি,
কিংবা কোন ঠিকানা নেই আমার
নেই সাধ একান্তে বাঁচবার
অধিকার নেই আমার আলাদা অস্তিত্বের।
তোমার দেহ থেকে জীবন চলে যাবার সাথে সাথেই নিভিয়ে দিয়েছিলে আমার যৌবন;
"ঐং হ্রীং শ্রীং ক্লীং কালিকে ক্লীং শ্রীং হ্রীং ঐং শ্রীমৎ শ্মশানকালিকায়ৈ স্বাহা ইতি মন্ত্রেণ সাজ্যবিল্বপত্রৈরিয়ৎসংখ্যক হোমমহং করিষ্যে।" প্রভৃতি নানা স্তুতিমন্ত্রে সেদিন
জীবিত আমাকে তুলে দিয়েছিলে সতীত্বের জ্বলন্ত চিতায়!
বাসন্তী দেহে জড়িয়েছিলে বর্ণহীন আবরণ,
কেড়ে নিয়েছিলে সকল আভরণ আর জিহ্বার আস্বাদ।
দীঘল চুলের অঞ্জলিতে ভুলিয়েছিলে যাবতীয় পৌরুষ্য-স্মৃতি !
আজ! আমিও পূর্বনারীর চিতাভস্ম মুখে নিয়েই উঠে এসেছি
পুড়ে পুড়ে কোমল থেকে ক্রমশ পরিণত
এক কঠিন অবয়বে আদ্যোপান্ত গড়েছি নিজস্ব শরীর।
তুমি পুরুষ!
আমি জেনেছি তোমায় পৃথিবীর নষ্ট নক্ষত্রের ভিড়ে,
তুমি মাড়াবে বিশ্বভুবন, নারী অজপাড়া গাঁ!
তোমায় চিনেই জগত চিনি, চিনেছি ভগবান-বিধাতা?
বাহ্! নারী বাহ্!
পুরুষ তোমাকে বেশ্যা বলে তুমি কুঁকড়ে ওঠো
সমাজ তোমাকে পতিতা বানায় তুমি লুকিয়ে বাঁচো
রাষ্ট্র তোমার দায় নেবে না তুমিও মেনে নিয়ে দিব্যি আছো!
বাহ্! নারী বাহ!
তুমিও সাধুর মুখোশ চেন তাহলে?
খুলে দাও মুখোশ
কে তোমার কেড়েছে সম্ভ্রম!
কে প্রথম ছুঁয়েছে শরীর, ভেঙ্গেছে অবযব শুভ্র বালিকার !
সে-ই পুরুষ-বেশ্যা তুমি নও নারী
সে-ই পতিত তুমি নও পতিতা
কেন পারবে না
ঐ সমাজ, পরিবার আর রাষ্ট্রের গলে
তার লাম্পট্যের তিলক এঁকে দিতে?
সেকি শুধুই ব্যর্থতা আর অসহায়ত্ব নারীত্বের?
নাকি ইচ্ছেমৌন আর বশ্যতার শেকল পড়েছো গলায়!
তুমিও ভাঙবে না স্বেচ্ছাঘুম ভোগলিপ্সায়?
তা নাহলে চীৎকার করে বাঁচো
ত্রিভুবন কাঁপিয়ে জানাও, যে ছুঁয়েছে শরীর অনিচ্ছেয়;
সে-ই পতিত, পুরুষ-বেশ্যা বলো তাকে,
চীৎকার করো মেয়ে।
রুমা সরকার। সরকারি কলেজে সহকারি অধ্যাপক। আবৃত্তি সংগঠন উচ্চারণ আকাদেমি'র প্রতিষ্টাতা ও সভাপতি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন নিয়মিত আবৃত্তিশিল্পী। বাংলাদেশ বেতারের সংবাদপাঠক। এ পর্যন্ত তিনটি কবিতার বই ও অন্যান্য একাডেমিক বই প্রকাশিত। ২০১০ সালে আবৃত্তির এলবাস 'মহাবিচারপতি' বেরোয়।
0 মন্তব্যসমূহ