অণুগল্প //নতুন বইয়ের গন্ধ // রাধা দত্ত।

অণুগল্প

নতুন বইয়ের গন্ধ // রাধা দত্ত।
     
বিকেল শেষ হয়ে আসছে, আকাশ জুড়ে লাল আভা ছড়িয়ে এইমাত্র সূর্য দেব অস্ত গেলেন। বইমেলায় ভীড় বাড়ছে ।চারদিকে লোকজন ঘোরাঘুরি করছে,ধুলো উড়ছে হাওয়ায়।ধূপকাঠির প‍্যাকেটগুলো নিয়ে সাহসে ভর করে মেলায় ঢুকে পড়ল দীপু , ইতিউতি ঘুরে যদি কিছু বিক্রি হয়। কিন্তু এখানে তেমন সুবিধা হবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং নিজেকে কেমন বেমানান লাগছে।সবাই কেমন ভালো জামাকাপড় পরে গম্ভীর মুখে বইয়ের দোকান গুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ভয় লাগছে ,তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ।আজ সারাদিন সে অনেক চেষ্টা করেও কিছুই রোজগার করতে পারেনি,তাই ভেবেছিল যদি মেলায় কিছু ধূপকাঠি বেচতে পারে। অবশ্য আরও একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল দীপুর, সেটা মনে চেপে রেখেছে অনেক দিন, একখান নতুন বই কেনার শখ , নতুন বইতে কি সুন্দর সুবাস থাকে! বস্তির মানিক আরো কয়েকজন বন্ধু ইস্কুলে যায় , ওদের কাছে নতুন বই দেখেছে দীপু। কিন্তু এখানে কি কেউ ওকে একটা বই ছুঁতে দেবে? নিজের নোংরা হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে ভাবে সে। হাঁটতে হাঁটতে খিদে পায় তার,কাল থেকে ভাত পড়ে নি পেটে। বাবুদের বাড়ী থেকে মা তার বরাদ্দের দুখানা রুটি আর তরকারি নিয়ে এসেছিল, তাই দুজনে ভাগাভাগি করে খেয়ে জল খেয়ে পেট ভরিয়েছে।মা রোজ দুবেলা বাবুদের বাড়িতে কতো কি রান্না করে,কি সুন্দর গন্ধ বের হয় সেসব খাবারের ! দীপু মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে যায়, বেশী রাত হলে মা একা ফিরতে ভয় পায়। কাল রাতে গিয়ছিল মাকে আনতে তখন ভাত রান্না করছিল মা ,কি সুন্দর গন্ধ বেরুচ্ছিল! ফেরার সময় মাকে সেকথা বলছিল
--"মা বাবুদের ভাতে কি সুবাস, আমাদের ভাতে এ‍্যামন হয় না ক‍্যান্"।"
বাবুর বুজি সুগন্দী ভাত খাওয়েনের ইচ্ছা হৈছে?"হেসে উঠেছিল মা। 
অভিমানে চুপ করে গিয়েছিল দীপু।তার তো কত কিছুই ইচ্ছে করে সেসব তো সে বলে না মাকে।তার চাইতে অনেক ছোট ছেলেরা যখন পিঠে ব‍্যাগ নিয়ে ইস্কুলে যায় তখন তার ও তো ইচ্ছে করে নতুন জামা পরে ইস্কুলে যেতে, মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলতে,পেট ভরে ভাত খেতে, তরকারি দিয়ে গরম ভাত ,কারণ ভাত কখনো জুটলেও তরকারি কখনো জোটে না তাদের ।বেশিরভাগ দিনই শুধু ভাতে ভাত খেতে হয়।সেসব কথা কিছুই মা'কে বলে না। ভাবতে ভাবতে কখন যে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে টের পায়নি দীপু,এই দোকানে কি সুন্দর সব ছবির বই সাজানো রয়েছে। অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ঢুকতে দেখে ওদের পিছু ঢুকে গেল ভেতরে। "এই তোর কি চাই এখানে? যা ভাগ্ ,যত সব চোর ছ‍্যাছড়ের দল"। অপমানে চোখে জল এসে যায় দীপুর, মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসে দোকান থেকে, লোকটা তাকে শুধু গায়ে হাত তুলতে বাকি রেখেছে। দীপু বলতে চেয়েছিল, চুরি করতে নয় শুধুমাত্র নতুন বইএর গন্ধ নিতে চেয়েছিল সে, যেমনটি বাবুদের রান্না ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ভাতের গন্ধ শোঁকে। 

আঁধার নেমে এসেছে , দীপু মেলা থেকে বেরিয়ে বস্তির পথে পা বাড়ায়, , দূর্বল শরীরে জোরে হাঁটতে পারছে না, একটা গাড়ি তার পাশ দিয়ে প্রচন্ড গতিতে ধুলো উড়িয়ে চলে যায়, টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় দীপু। খানিকটা সময় পড়ে থাকার পর ও আবার উঠে দাঁড়ালো। পা কেটে রক্ত ঝরছে,ধূপকাঠির প‍্যাকেট গুলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে যেন তার অপূর্ণ ইচ্ছে গুলো ।
। 
দীপু হামাগুড়ি দিয়ে প‍্যাকেটগুলো জড়ো করতে থাকে,কেউ মাড়িয়ে দেবার আগেই ওগুলো কে রক্ষা করতে হবে। প‍্যাকেটগুলো দুহাতে জড়িয়ে ধরে টলতে টলতে হাঁটতে থাকে দীপু যেমন করে তার স্বপ্নগুলোকে সযত্নে আগলে রেখেছে বুকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ