ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ(২১) ব্যঞ্জনবর্ণ ও বিদ্যাসাগর//মানবর্দ্ধন পাল

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                    (২১)
 ♦ব্যঞ্জনবর্ণ ও বিদ্যাসাগর♦



      বর্ণের অর্থ যেমন রঙের মেলা
      বর্ণ তেমনি স্বর-ব্যঞ্জনের খেলা।
      'ঈশ্বর' দিলেন তার শিল্পিত রূপ
      স্বর ও ব্যঞ্জন হল প্রকাশে স্বরূপ। 

আজ সবাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে। কারও মুখে শরতের সাদা মেঘের ছায়া নেই, হেমন্তের কুয়াশার আবছায়াও নেই! সবার মুখ যেন রোদ-ঝলমলে! মাঝপথে ভুলে-যাওয়া নজরুলের 'লিচুচোর' কবিতাটি শুভ আজ ভাল করে শিখে এসেছে। হিয়াও গুগলে সার্চ দিয়ে ভবানীপ্রসাদ  মজুমদারের 'বাংলাটা ঠিক আসে না" নামক বিখ্যাত ছড়াটি ডাউনলোড করে মুখস্থ করেছে। ওরা দুজনেই কবিতা দুটি আবৃত্তি করল। সবাই হাততালি দিয়ে ওদের প্রশংসা করল। দাদুভাই লক্ষ করলেন, ওদের উচ্চারণ এখন বেশ স্বচ্ছ ও শুদ্ধ হয়ে এসেছে! 

আবৃত্তির পর্ব শেষ হলে দাদুভাই ব্যঞ্জনের কথা শুরু করলেন,
---- তোমরা আগেই জেনেছ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সার্থক ভাষাশিল্পী। তাঁকে সাহিত্যের ইতিহাসবিদরা বলেন, বাংলা গদ্যের জনক।  তিনি সুচারুভাবে বাংলা স্বরবর্ণের সংস্কার করেছেন। আগে স্বরবর্ণের সংখ্যা ছিল ষোলটি। স্যার উইলিয়াম জোনস্-এর বাংলা বর্ণমালার বইয়ে (১৭৮৪), রামমোহন রায়ের 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ'-এ (১৮৩৩) এবং  মদনমোহন তর্কালঙ্কারের 'শিশুশিক্ষা'  
(১৮৪৯) বইয়ে ষোলোটি স্বরবর্ণই পাওয়া যায়। কিন্তু বিদ্যাসাগর বাংলা লেখায় অপ্রয়োজনীয় বলে দীর্ঘ ঋৃ ও দীর্ঘ ৯্৯ কে বাদ দেন। আর অং এবং অঃ-কে যুক্তিপূর্ণভাবে ব্যঞ্জনবর্ণে অনুস্বর (ং) ও বিসর্গ (ঃ) হিসেবে যুক্ত করেন। ফলে ঈশ্বরচন্দ্রের 'বর্ণপরিচয়' বইয়ে স্বরবর্ণ হয় বারোটি। এটি সুদীর্ঘ  শতাধিক বছর ধরে চলতে থাকে। পরে বাংলা লেখায় দরকার হয় না বলে লি-কে (৯) বাদ দেওয়া হয়। তাই বর্তমানে স্বরবর্ণের সংখ্যা এগারোটি। আজ থেকে ষাট বছর আগেও আমরা স্বরবর্ণমালায় লি (৯) বর্ণটি শিখেছি। তবে কখনও ৯পি (লিপি) ৯খিনি (লিখিনি) কিংবা ৯চৃও (লিচু) খাইনি!

বিদ্যাসাগরের সংস্কারের আগে বাংলা বর্ণমালায় ষোলোটি স্বরবর্ণ ও চৌত্রিশটি ব্যঞ্জন মিলে মোট পঞ্চাশটি বর্ণ ছিল। এখনও সংখ্যায় তা-ই আছে। তবে স্বরবর্ণ এগারো ও ব্যঞ্জন ঊনচল্লিশটি। বিদ্যাসাগর স্বরবর্ণে চারটি বাদ দিয়েছেন। কিন্তু ব্যঞ্জনে বিয়োগ ও যোগ দুইই করেছেন। তিনি ব্যঞ্জন থেকে বাদ দিয়েছেন-- ক্ষ। কারণ তিনি লক্ষ করেছেন ক্ষ একক ব্যঞ্জন নয়-- ওটি যুক্ত ব্যঞ্জন-- ক+ষ= ক্ষ। আমাদের শিশুকালে বর্ণমালার বইয়ে এই বর্ণটি ছিল কিন্তু এখন নেই। বিদ্যাসাগর লক্ষ করেছেন, এটি ব্যঞ্জন বর্ণমালায় রাখলে সব যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণই রাখতে হবে। তাতে ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা হয়ে যাবে আড়াই শয়ের বেশি। তাতে সবার জন্য শিক্ষা শিকেয় উঠবে। ভাষা হবে কঠিন ও জটিল। বর্ণমালা শিখতেই কেটে যাবে কয়েক বছর! তাই ওটি তিনি বাদ দিয়েছেন। 

বাংলা বর্ণমালা সংস্কার ও ভাষা সুন্দর করে প্রকাশ করার জন্য  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনেক অবদান। ড, ঢ, য-- আগে এই তিনটি বর্ণের দুই রকম উচ্চারণ ছিল। শব্দের শুরুতে থাকলে এগুলোর উচ্চারণ এখনকার মতই হত। কিন্তু শব্দের মাঝে বা শেষে থাকলে ড,ঢ,য-এর উচ্চারণ হত-- ড়, ঢ় এবং য়। যেমন-- দাঁড (দাঁড়), আষাঢ (আষাঢ়), বাযু (বায়ু)। এবিষয়টি লক্ষ করে বিদ্যাসাগর ড, ঢ ও য-এর নিচে একটি করে ফুটকি বা বিন্দু (.) বসিয়ে দিলেন। তাতে ড, ঢ, য হয়ে গেল-- ড়, ঢ়, য়।
একথা শুনে সবার চোখ চকচক করে উঠল। ঐশী আনন্দে বলে উঠল,
---- খুব মজার তো দাদুভাই!
---- শব্দের মধ্যে একই চেহারার বর্ণের জায়গা পরিবর্তন করলে অন্য রকম উচ্চারণ হয়-- তাতে বিদ্যাসাগরের খটকা লেগেছিল। তাই তিনি ড, ঢ এবং য বর্ণের নিচে বিন্দু বসিয়ে তিনটি নতুন বর্ণ সৃষ্টি করেন। তাই বলা যায়, ড, ঢ ও য-এর পেটে জন্ম হয় ড়, ঢ় ও য়-এর।
---- আচ্ছা দাদুভাই, বর্গীয় জ এবং অন্তস্থ য-- এদুটি বর্ণের চেহারায় কোনও মিল নেই কিন্তু উচ্চারণ একদম একইরকম। তাহলে দুটি জ-এর দরকার কী? 
হিয়া একটি যুৎসই প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিল।
---- চমৎকার প্রশ্ন করেছ তুমি! যার মনে যত প্রশ্ন তার জানার অাগ্রহ তত বেশি। তাই তোমাকে অভিনন্দন জানাই।
আসলে 'জ' একটিই-- শুধু্ বর্গীয় জ।
এবর্ণটি ঠিকঠিক (Ja) উচ্চারিত হয়--  বিকৃত হয় না। কিন্তু অন্তস্থ য-এর উচ্চারণের ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে এর উচ্চারণ এরকম ছিল না। তখন অন্তস্থ য ইংরেজি Y বা বাংলায় 'ইয়'-এর মত উচ্চারিত হত। এই আদি উচ্চারণ হিন্দি ভাষায় এখনও টিকে আছে। কিন্তু বাংলায় তা পরিবর্তন হয়ে বর্গীয় জ ও অন্তস্থ য এক হয়ে গেছে। তাই হিন্দিতে 'ইয়াদব' কিন্তু বাংলায় 'যাদব'। ঠিক এভাবে-- 'ইয়োবরাজ' থেকে 'যুবরাজ', 'ইয়ামিনী' থেকে 'যামিনী', 'ইয়মুনা' থেকে 'যমুনা'। তাই ইংরেজিতে এই শব্দগুলোর বানান সবই Y দিয়ে লেখা হয়। যেমন, Yadav, Yubaraj, Yamini, Yamuna।

 তোমরা জান, ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা বর্ণমালা এসেছে অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে। এই পরিবর্তন কেবল বর্ণের চেহারায় হয়নি-- উচ্চারণেও হয়েছে। বাংলায় অনেক বর্ণের উচ্চারণই আমাদের নিজস্ব। সংস্কৃত ভাষার উচ্চারণ আমরা তেমন গ্রহণ না-করে প্রাকৃত ভাষার উচ্চারণই গ্রহণ করেছি। তাই আমরা স্মৃতি, স্মরণ, বিস্ময়-- এই শব্দগুলোতে 'ম' উচ্চারণ করি না। বিশ্ব, অশ্ব, বিশ্বাস-- এগুলোতে 'ব' উচ্চারণ করি না।

এই মুহূর্তে আমার একটি সত্যিকারের গল্প মনে পড়ে গেল। বাংলা ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্ববিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ। তিনি ঠাট্টার ছলে একবার বলেছিলেন, আমার বয়স যখন পঞ্চাশ হবে তখন আমি ছাত্রদের 'তুমি' করে বলব এবং 'যাই'কে 'জাই' লিখব। এর মানে হল, অন্তস্থ জ নয়, বর্গীয় জ-এর সঠিক উচ্চারণ তিনি বানানে লিখতে চান!

তোমরা লক্ষ করবে 'ঢ়' ধ্বনিটির উচ্চারণও দেশি বা বাংলা শব্দে নেই। সংস্কৃত বা তৎসম যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় চালু আছে সেসব শব্দেই 'ঢ়' ধ্বনি উচ্চারিত হয়। যেমন, আষাঢ়, দৃঢ়, নবোঢ়া ইত্যাদি। হিন্দি ভাষায় এখনও 'পড়া'কে 'পঢ়াই' বলা হয়। 

একথা শুনে শুভ-কাব্যসহ হেসে সম্মতি জানাল। হিয়া তো একগাল হেসে বলেই ফেলল,
---- ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেলের বিভিন্ন সিরিয়ালে 'পঢ়াই' বলতে আমি অনেকবার শুনেছি।

দাদুভাই ব্যঞ্জনবর্ণের কথা বলতে গিয়ে আবার বিদ্যাসাগরের প্রসঙ্গ টেনে বললেন,
---- গত ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর আমরা সবাই মিলে ঘরোয়া আসরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের দুইশ' বছর পালন করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে কথা বলার জন্য আমরা অধ্যাপক জামিল ফোরকানকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। তাঁর কথাগুলো নিশ্চয়ই তোমাদের মনে আছে। তিনি খুব সুন্দর ও সহজ করে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সমাজকে সুন্দর করার জন্য বিদ্যাসাগরের অবদান বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর কী কী কথা তোমাদের মনে আছে? থাকলে কেউ বল তো?

দাদুভাইয়ের প্রশ্ন শুনে ঐশী বলল,
---- বিদ্যাসাগর বাংলা অনুস্বর (ং), বিসর্গ (ঃ) ও চন্দ্রবিন্দু (ঁ) যুক্ত করেছেন। মেয়েদের শিক্ষার জন্য কলকাতা শহরের আশেপাশে ও নিজের জন্মস্থান বীরসিংহ গ্রামে অনেক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন।  একথা বলে ঐশী একটু আমতা-আমতা করতে লাগল। তখন হিয়া বলল,
---- জামিলস্যার আরও বলেছেন, বিদ্যাসাগর সমাজের উন্নতির জন্যও অনেক কাজ করেছেন। তিনি গরিব-দুঃখিদের সাহায্য করতেন বলে সবাই তাঁকে দয়ারসাগর বলত। তিনি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে ও বাল্যবিধবাদের বিয়ে দিতে সংগ্রাম করেছেন।
---- জামিলস্যারের সেদিনের মূলকথা তোমরা বুঝেছ এবং মনে রাখতে পেরেছ। এটা খুবই আনন্দের কথা। তিনি একথা শুনলে খুব খুশি হবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ