প্রতিদিন বাংলাভাষা.স্রোত
ত্রিপুরার নদ-নদী বিষয়ক কবিতা সংখ্যা
১২:১২:২০২০
দিলীপ দাস
ক্রমশ নদীর দিকে
আগে জন্মদিন এলে মনে খুব আনন্দ হত । এখন আপশোস হয় । তখন দিনগুলো ছিল অঢেল । একটি ফুরিয়ে গেলেও , অনেক থেকে যেত । এখন গোনাগুনতি দিন । একটি চলে গেলেই মনে হয় জীবনের আরও একটি দিন কমে গেল ।
সব নদীরই নিজস্ব খাতে বয়ে যাবার পবিত্র অহংকার থাকে । আমারও ছিল । এটি পিতৃদত্ত অহংকার । এই অহংকার কোনও দিন হারাতে চাই নি । মনে হয় এটি হারালে আমার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না । নিজেকে ফতুর মনে হবে । নদী যখন নিজস্ব খাত ভুলে যায় , তখনই তার বিপথে যাত্রা শুরু হয় । তখনই বিভিন্ন রকমের বেনো জলের উপদ্রব বাড়ে ।
যত দিন যাচ্ছে , আমি বোধহয় ততই পেশাদার নিরাশাবাদী হয়ে উঠছি । চারিদিকে ক্ষয়ের চিহ্ন প্রকট হয়ে উঠছে । ব্যক্তি মানুষের উপর আগের মতো বিশ্বাস রাখতে পারছি না । দেখছি , আজকাল শেয়ার বাজার আর ব্যক্তির মেরুদণ্ড বিক্রির বাজারের মধ্যে খুব পার্থক্য নেই । দুটোই সস্তা দরে বিক্রি হচ্ছে । আদর্শ নয় , মূল্যবোধ নয় , পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতি নয় , শুধু লাভ লোকসানের হাওয়া বুঝে পাল ওড়ানো ।
আজকের পৃথিবীতে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় । আমার চারদিকের পৃথিবী কী দ্রুত সকলকে নিয়ে অতল খাদের দিকে সটান হেঁটে যাচ্ছে । যেন কোনও পিছুটান নেই । পিছুটান ছিল না কখনও । যেন কারও প্রতি দায় নেই , প্রীতির কোনও অবশিষ্ট আকৃতি নেই । সবখানে , সর্বত্র , পণ্যপৃথিবী তার কালো ছায়া মেলে ধরেছে । বহুদিন ধরে দেখছি , মানুষ প্রতারিত হতে বড় ভালোবাসে । প্রতারকদের দখলেই সকল কিছু । প্রতিশ্রুতির উদ্দাম আলো যখন প্রয়োজন ফুরোলে দপ করে নিভে যায় , তখনও মানুষ কী রকম আত্মউদাসীন ! তখনও নতুন আলেয়া তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে । আসলে , এ-ও বোধহয় এক ধরনের আত্মমোহ । লোভের দৈত্য অঙ্কুশ হাতে আজকের মানুষকে যেভাবে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরের দিকে , তা এর আগের কোনও যুগ দেখেনি ।
দিন দিন মানুষ সহিষ্ণুতা হারিয়ে হিংস্রতার কাছে আত্মসমর্পণ করছে । প্রতিদিন মানুষ অন্যের মুখ ম্লান করে দিয়ে নিজের স্বার্থপথ উজ্জ্বল করতে চাইছে । প্রতিদিন মানুষ ছলচাতুরী ও প্রতারণার খেলায় দক্ষ হয়ে উঠছে । প্রতিদিন মানুষের অবলম্বনের সেতুপথ ধ্বংসের প্রহর গুনছে । তবু, একথা ভাবতে এখনও ভালো লাগে , প্রতিটি মানুষের উপলব্ধির গভীরে রয়েছে অনন্ত ছায়াপথ । সেই ছায়াপথের দূরবর্তী আলো একদিন হয়তো পৃথিবীকে , পৃথিবীর মানুষকে , আলোকিত করবে । হয়তো সেজন্য অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে ।
আজ , কাছের এবং দূরের সকল মানুষকে বৃষ্টিধোয়া ভালোবাসা , আনত প্রণাম । প্রতিটি নদীকে আলিঙ্গন , প্রতিটি লতা-গুল্ম-বৃক্ষকে আভূমি প্রণিপাত ।।
------ দিলীপ দাস
নোঙর
08-07-2019
অলৌকিক নদী
----------------------------
সুনীতি দেবনাথ
বুকের মাঝে প্রবাহিত রুদ্ধ নদী শুয়ে আছে
ভাঙ্গছে ঢেউ ভাঙ্গছে তীর বুকের পাঁজর।
সন্দেহ হয় ঐ নদীটি নদী নাকি ক্রুদ্ধ সাগর
জীবন দেখে যাপন দেখে ভ্রষ্ট কালের ছল দেখে
লাভাস্রোতে জমছে কেবল আগুন রাশি রাশি
জমে জমে নদী হলো ফুলে ফোঁসে কাল সমুদ্র।
এই নদীটি পাগল পারা চলছে ছুটে
দুইপারে তার জীবন হাসে জীবন কাঁদে।
নিক্তি দিয়ে মাপলে পরে দুঃখের পাল্লা ভারি হবে।
তাই বলে কি থেমে যাবো পথের পাশে শুয়ে যাবো?
তাই জেনে কি বিশাল বিশ্ব ছন্দ ভুলে যাবেই থেমে?
দুঃখ বুকে ঐ নদীটি সুখের ঢেউ ভাঙ্গবে গড়বে।
কাজরী,
১৪ মার্চ, ২০১৬
ও নদী রে!
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
নদী রে! তোর সাথে ভাব করবার জন্যে ছুটছি জীবনভর ৷ তুই পালাচ্ছিস আর পালাচ্ছিস ৷ এতো চটুল তোর চলন ৷ এতো প্রগলভতা কেন? নদীকে ভালোবেসেছে তো আমার পূর্বপুরুষ ৷ আমার পিতামহ ৷ নদীর পাড়েই ছিল তাদের প্রসূতিসদন ৷ নদীর ঘাটেই পরপারের খেয়া ৷ সেদিন ভালোবেসে নদী তুই জল দিয়েছিস সবারে ৷ পুষ্ট করেছিস গোলাঘর ৷ হাটের বিকিকিনি সব তোকে ঘিরেই ৷ তোর বুক বেয়েই কোনো তরুণী বউ তার গাঁঘরের প্রেমিকের বুক ভেঙে চলে গেছে উজান দেশে নতুন ঘর করতে ৷ নবীন গাঁয়ে যখনই নয়া পুরুষটির ভেতর অমানুষ জেগে ওঠে, তোর বুকেই চোখের জলে চিঠি লিখে ভাটির দেশে পাঠায় ৷
এতো ভালোবাসার নদী, সর্বংসহা ৷ আজ তোরে আজ কাছে পাইনা আমি ৷ তোর বুকের ভেতর থেকে আজ আর জেগে ওঠেনা উদ্দাম স্রোত আর উচ্ছলতার গান ৷ ভিখারি শরীর নিয়ে তুই ছুটছিস ৷ পালাতে চাইছিস ৷ সে কী আমার পাপে? নদী রে?
চরাচর
রামেশ্বর ভট্টাচার্য
একদিন নদীও সরে যাবে বহুদূর
জেগে উঠবে চরাচর।একদল
মানুষ আরেক দল মানুষের দিকে তাকিয়ে
তাক করে আছে রাইফেল,মাঝখানে
উড়বে বিবর্ণ পতাকা,এই বৃষ্টিহীন
রাতে জেগে দুই কবি,তারা জানে
বর্ণমালার মেঘ নেমে আসবে
মুহুরী নদীর তটে
মানুষের জটলা থেকে নদীর
দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে
বিছানায় ফেলে গেছে চুলপর কাঁটা
আয়নায় লেগে আছে লাল টিপ
এখানে নদী ও নারী কাছাকাছি ছিল সারারাত।
প্রতিধ্বনি
দেবাশ্রিতা চৌধুরী
আমার নদীটির একপারে বৃষ্টি
আমার নদীটির অন্যপারে ঝকঝকে রোদ।
আমার নদীটির এপাশে হাতছানি দেয় সুখ
আমার নদীটির ওপাশে
আদরে কাছে ডাকে মৃত্যু।
রোদেলা পারে ভাত উথলানো টগবগে গন্ধে জীবন ছড়ায়
আলো ,আর কাছে ডাকে ।
আঁধার পারে ঝাপসা হয়ে আসে আমার মুখ দেহ লকলকে আগুন গন্ধে দু'হাতে
আকুল ডাকে।
আমি মৃত্যুকে ডাকি এপারে
এসো বসো খানিক জিরোও
এতো তাড়াহুড়ো করলে জীবন যাবে উদ্বেগের যাপনে,
জীবনকে নিয়ে যাই ওপারে
তুমি ও একটু বসো বাপু
শান্ত হও স্থিতধী হও,তারপর
ভাবতে শেখো, হাত ধরাধরি করে চলতে শেখো...….
দেবাশ্রিতা চৌধুরী
শুভ্রশংকর দাশ
শৌখিন
______
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে
বাড়িটাকে ধাক্কা দিতে দিতে , গুহার ভেতরে ঢুকিয়েছ।
এই ঢপের দুনিয়ায় , এই অমোঘ সত্যটা
কে বিশ্বাস করবে বলো ?
হয়তো কোনদিন কোনো হিউয়েনসাং
খুঁজে পাবে, হায়েরোগ্লাফিতে লেখা
অন্তর্হিত
স্মৃতির
এস্রাজ ;
ঝাড়বাতির নিচে পড়ে থাকা ডায়েরিতে
পাবে... তোমার হাতের কার্বনকপি ।
তোমার হাত খুব সহজ অথচ দৃঢ়ভাবেই
আমার চুলের নিচে
মৌচাকে থাকা মাছিদের
উস্কে দিতে পারে;
খুব সহজেই
দেয়াল থেকে খসে পড়ে পোলিও মুক্ত ভারত,
আর নতুন জার্সি হাতে ছুটে আসে
এক পাল টেইলার।
শুধুমাত্র নতুন জার্সির লোভে, কিছু লোক
পুরানো সেলাইজীবীর কলার চেপে ধরে,
পিঠে কিল দিয়ে বের করে আনে
শ্বাসনালীতে আটকে থাকা সংশয় ।
#
প্লাস্টার উঠে গেলে
বাড়ির বালকবেলার অবসান ঘটে;
মনে হয়, কোনো বাজিগর , হুট করে ঢেলে গেছে এশিয়ান পেইন্টস...
#
দুটি নকল কলার আর তিন তিনটি চশমা আছে বলে, আমাকে শৌখিন ভেবো না;
#
শুকনো নদীকেও
আমি বাঁক নেয়ার সিগন্যাল দিয়েছি
ভায়োলেট
এক'ই নামে থাকতে পারে
নদী ও মাছ
#
হঠাৎ ধনী হয়ে গরীব সকাল
হারাতে পারে সানফ্রান্সিসকোতে
#
এত উঁচুতে কোনো সভ্যতা নেই
ধ্বংসাবশেষ আছে
এত উঁচুতে যে ফুল ফোটে
তার নাম ভায়োলেট
#
বুনো হাঁসের পায়ের মত লাল
বোঁটাতে শুয়ে
পোকারা ভেবে নেয়
পৃথিবী একটি সুগন্ধি ভায়োলেট ফুল
#
এক'ই নামে থেকে যায়
নদী মাছ ও বাঁধ
নদীকে নিয়ে পদ্য
মৃণালকান্তি দেবনাথ
ঘড়ির কাঁটার আগে ছুটে যায় ডলু নদীর জল।স্রোতের সকাল পেরিয়ে বারোমাস নামজারি চালু থাকে স্কুলে।দূরে দূরে পাহাড়ের ঢালে বৃষ্টি নামে রোজ।অ্যামেচার বাংলা স্যর গান গান প্রতিটা অ্যানুয়াল ফাংশনে।সেসব গান ঘিরে রাখে প্ররোচনাময় কৈশোরকে নিশ্চিত শস্যের আশ্বাসে।নিদ্রাবিরল রাতে ডেকে চলে আদিম পাখি স্কুলের আনাচ কানাচে।বয়স্ক হাসি নিয়ে কোন উদাসীন মাঝি নেই নদীর খেয়াঘাটে।নৌকাহীন নদীজুড়ে শুধু বয়ে চলে অবিরল সুরের খেয়াল।এলাচের বন শিহরিত হয় স্নানের রোমাঞ্চে।এসব অনেক আগের কথা।
জলপ্রকল্পের স্বচ্ছলতায় ডলুছড়া এখন বিধবা নদীখাত।অবিলম্বেই এই বিষয়ে পাহাড় আর সাগরের মৌ সাক্ষরিত হওয়া দরকার।বৃষ্টি ও লোভের অস্ত্রবিরতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা কোথাও। নীরবতা দিবসের শর্ত মেনে নিয়ে প্রতিবাদহীন এই বেঁচে থাকার কোন চুক্তিপত্র নেই ঠিক।নদীহীন হয়েও এখন ঘুম আসছে রাতে।মাঝে মাঝে বৃষ্টি আসে।দিন শেষে নামে রাত।মোবাইলবন্ধ ঘুমে শুনি সেই স্রোত ও সুরের বিলাপ...
জন্মান্তরে এক নদী
নবীনকিশোর রায়
মাটিময় মগ্ন শরীর,
অন্তর্সলিলে সে এক নদী বয়,
পাল তোলে মন মাঝি
কখনো উজানে, কখনো ভাটির টানে,
ডুবায় ভাসায়...
মাটি ভাঙে, স্রোত আঁচড়ে দেয় পাথরে
বাঁকে বাঁকে জমে পলি চরে।
বহিরঙ্গে আরও কত কত নদী
এসে মিশে, উৎস-কথা নেই
অভিমুখ ভাসায় না
কাদাজল ঢালে, চৈতন্য ভাঙে---
ভূমি-মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।
পাহাড়ের জঙ্ঘা থেকে সানুদেশে
বয়ে নিয়ে যায়,
মায়ময় যাপন এপার ওপার---
তোর গর্ভগৃহে জন্ম আমার।
অবলীলায় রূপান্তর হয়
নদীর পুনর্জন্ম...
একটা নদী একটা চাঁদ
সুমনা রায়
একটি নদীকে ভাঁজ করে গুটিয়ে রাখি
রাতের বালিশের তলায়, আমার স্বপ্নের সীমানা
একটু একটু পেরিয়ে যায় সমস্ত দৃশ্যজীবন
অন্ধকার এখন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে
শর্তবিহীন ভালোবাসায় -
ভুল ইঙ্গিতে দু’একটি পাখি
হঠাৎ করেই ডেকে ওঠে
অস্তিত্বে মিশে থাকা সব একাকিত্ব -
জীবনের সব রঙ আর রঙহীনতা
এসে মিলে যায় এক সরলরেখায়
একটা নাগরিক চাঁদ
তখনও ঝুলে থাকে দূর আকাশে
গোমতী আমার মায়ের নাম
সুমিতা বর্ধন
গোমতী আমার মায়ের নাম
তোমার মায়ের নাম?
জানতে চাই না আমি।
হবে হয়তো,
পদ্মা,মেঘনা,যমুনা বা গঙ্গা।
আজো রহিম চাচা চোখে-
জল নিয়ে তিতাসের গল্প বলে,
খোয়াই নদীর তীরে বসে
রুক্মিনী আজো অপেক্ষা করে
তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের জন্য,
আর, কেউ একজন বলেছিল
আমার জন্যই নাকি
আজো বয়ে যায় গোমতী।
আসলে কি জানো,
পদ্মা,মেঘনা,যমুনা
গঙ্গা বা গোমতী
মায়ের কোল-ই
আমাদের প্রশ্রয়
আর, গল্প গাঁথার শেষ আশ্রয়।
স্নায়ুছেঁড়া
গোপালচন্দ্র দাস
শাখা বরাকের বুকে
ঘর বেঁধে আছে
ভূমি দস্যুর দল।
আটকে আছে জীবন নদী
আটকে আছে জীবন শ্বাস
জল চোখে তাকিয়ে থাকে অপলক
নির্ঘুম তীরে কলহ কোলাহল।
ভাঙ্গা পাঁজড়ে খিল খিল হাসে নদী
তিক্ত স্বাদে ছবি আঁকে শতদ্রোণ।
রাত গভীর হলে নদীর
আদ্র চোখ থেকে
ভূমি দস্যুরা কুড়িয়ে নেয়
অভিশপ্ত বিদ্বেশ চুম্বন।
যতদূর দৃষ্টি যায়
শাখা বরাকের ত্রি-সীমানায়
ভূমি দস্যু দাঁপিয়ে বেড়ায়
ওদের রক্ত নালীতে বৃশ্চিক দল।
শ্রাবণ মেঘের মত
রাজনীতির আগুন ঝড়ে
স্নায়ুছেঁড়া শাখাবরাকের তীরে
নিঃশব্দে নদীপ্রেত হাসে খলখল।
নদী
সংগীতা নাথ
নদী আজ বড়ই শান্ত:
ধীর লয়ে বইছে;
যেন বড়ই ক্লান্ত।
সদ্য সন্তান প্রসব করা
পল্লীমায়ের মত শ্রান্ত।
নেই জলোচ্ছ্বাস ;নেই বাঁধনহারা
রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত মায়ের মত;
ক্ষীণকায়া নদী চলেছে নীরবে;সাথে নেই কেউ।
তবু একেলা চলতে হবে তাকে;
সাগরের ডাকে।
করে যেতে হবে প্রতীক্ষা ;
কখন বর্ষা এসে সাজাবে তাকে।
নদী কথা
সঞ্জীব দে
কাঁটাতার মানে না আমার ফেণী কিংবা মুহুরী
মানে না কোন আইন সীমানা প্রাচীর
আমার গোমতী হাওরা, মনু কিংবা দেও।
এরা নিজেকে বিলিয়ে দিতে জানে মহা সমুদ্রের
ভেদহীন উত্তাল তরঙ্গে।
এরা সব জাতের গন্ধ বুকে ধারণ করে শুধু
অবিরাম বয়ে যেতে জানে।
পঁচা গরুর লাশ যেমন নদীর বুক দিয়ে
বয়ে যায় তেমনি চন্দন কাঠও।
আবার শ্মশান ঘাট থেকে সোজা চলে যাওয়া লক্ষ
লক্ষ মৃত মানুষের ছাঁই বুকে আগলে ধরে পৌঁছে
দেয় মহাসাগরে।
ওরা বুঝেনা কে বৌদ্ধ কে খৃস্টান কে মুসলিম
কে ত্রিপুরী, বুঝে শুধু মিলন ,হ্যাঁ মহাসামুদ্রিক
মিলন।
মহা সরোবরে ঢেউর ভাঁজে ভাঁজে সংগোপনে ওরা
জমা করে রাখে
পৃথিবীর সুখ দুঃখ জয় পরাজয়ের অগণিত ইতিহাস ।
নদীই বুঝে সব ,শুধু বুঝেনা মানুষ!
নদীর জল রঙে আঁকা শাড়ি
চৈতন্য ফকির
তুমি নদীর মতো জল হয়ে নিচের দিকে গড়াও।
নক্সী কাঁথার নিচে চলে এসো জলের তুমি।
প্রেমিকা নদী হয়ে আসে হাত ধরে নিয়ে যায় ঘরে।
সকল ভালোবাসা তার কাছে জলের চিঠিতে লিখি।
নদীর জলের মতো তুমি কেমন সকাল হয়ে আসো।
বাসীরাত তখনো লেগে আছে নীল শাড়ির ভাঁজে।
এমন সকাল কতদিন আসেনি তুমি জল রঙা শাড়ি
আমি শাড়ির জমিন জুড়ে লেপ্টে থাকা চোরকাঁটা।
১০:০৫:২০১৮
সকাল:০৮:১০মি
কুমারঘাট।
নদীমাতৃক
গোবিন্দ ধর
আমার ছোটবেলার নদী জুরি
বয়ঃসন্ধির নদী মনু
ভাটি বয়সের নদী দেও।
আমার স্কুলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো যে ছোটনদী তার নাম রাতাছড়া।
মহিষ চরাতে গিয়ে পেয়েছি
ডিগবাজীতে তিড়িংবিড়িং
একটি ছোট খাল
যার নাম আনোয়ারা।
এরকম নদী ছড়া আর খাল মিলেই
প্রতি রাতে জলোচ্ছ্বাস উঠে বিছানায়।
ছোটবেলায় বন্যা এলে উঠোনে মাছ আসতো।
ভাটি বয়সেও বন্যা শিয়রে আসে
লাফালাফি করে বুকের ভেতর শিং মাছ।
মনের জলাশয়ে খলবল খলবল বেড়ে গেলে
দিনগুলো নদীমাতৃক হয়ে যায়।
১৩:১০:২০১৯
ভোর:০৮:২৫মি
কুমারঘাট।
দিব্যেন্দু নাথ
শূন্যতা
কাছের মানুষ অচেনা হলে
ভেঙে যায় নামতার ঘর।
সব গুনিতকের ফাঁকা ঘর
ভরে ওঠে শুণ্যতায়।
নদী বুক খনন করে যায়
চোরাবালির চালান।
ভেট-ফুল
বন্যস্নাত গ্রীষ্মের দেওতটে
ঝলসানো এক বনস্পতি
ডহর থেকে ঝাঁকে--উড়ছে বুদবুদ
অকূলে একচিলতে কর্দমাক্ত খন্দপুকর
একঝাঁক শালিক এসে- হয়ে যায় আকুল
ফুটতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেট-ফুল!
[11/11/2019, 12:21 pm] GOBINDA DHAR: দেও সিরিজ
পদ্মশ্রী মজুমদার
@
১)
দেওনদীর ওপার থেকে/
ছুটে আসছে মেঘেরা/
এপারে বাড়িতে আছড়ে পড়ল/
ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্/
মুহূর্তে ধুয়ে গেল সব সম্পর্কের রঙ/
আমরা সবাই একেকটা/
সাদা-কালো মানুষ হয়ে গেলাম।
@
২)
আজ আশ্বিনের সংক্রান্তি/
শ্রীহট্টীয় ভাষায় 'আট-আনাজের সংক্রান্তি'/
দেওনদী শহরের শ্রীহট্টীয় মানুষ/
আরও একবার খুঁজবে শেখড়/
দেওনদীর দু-তীর জুড়ে /
ধান আর সবজি ক্ষেতে/
চালতা পাতার'টগা'আর /
কৃষক গিন্নিদের উলুধ্বনিতে/
বসুন্ধরা আজ গর্ভবতী।/
দেওনদী এভাবেই প্রবাহিত হোক/
সমস্ত লোকাচার নিয়ে/
আমাদের শিরায় শিরায়/
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
@
৩)
বিকেলের গোধুলি রঙে/
সেজেছে বাড়ি/
পশ্চিমের আকাশে/
মুহুর্মুহু বদলে যাচ্ছে রঙ/
এত রঙ !রঙের ছটায়/
দেওনদীতে ডুবে যাচ্ছে সূর্য।
@
৪)
বর্ষা যাচ্ছে,আসছে শরৎ/
একই সঙ্গে দেওনদীর বুকে ঘোলাজল/
তীরে কাশফুল /
মহালয়ার তর্পন আর দশমীর বিশর্জন নিতে /
তৈরী সে--নির্বিকার /
তবু,আমরা ---দেওনদীর শহরের লোকেরা/
নিতে পারিনা/
শুরু আর শেষের এই সহজপাঠ/
[11/11/2019, 3:15 pm] GOBINDA DHAR: আমরা কেউ নদীটির কথা ভাবি না
শচী চৌধুরী
ওই যে হাওড়াকে দেখছ—
একদিন সে নদী ছিল
পার ছুঁই-ছুঁই জল ছিল
নৌকো ছিল, ঘাটের মাঝি ছিল
আর ছিল কুলুকুলু গান ;
ছিল বারুণীর জল ডুব ডুব স্নানের মেলা
বাঁশের সাঁকো ছিল, বাবার হাত ছিল
অধরা কেমন ছিল এপার-ওপার !
এখন আমরা কাকে দোষ দিয়ে যাই—
হাওড়া মরেছে, কারা মেরে ফেলেছে ।
নিজের কাঁধে কেউ দোষ নিই না ,
একবার দেখি না ভেবে
দোষী আমিও, দোষ আমারও ।
হায় অজ্ঞানতা !
ভাবি , বদলেছে যুগ
বদলেছে মানুষ ;
একবার কেউ ভেবে দেখি না
আমারই বদল হচ্ছে শুধু স্বার্থ ঔদাস্যে
একটু একটু করে অযত্নে, হেলায় !
আমরা কেউ নদীটির কথা ভাবি না ।
আমরা কেউ হৃদয়ের কথা ভাবি না ।
[11/11/2019, 3:47 pm] GOBINDA DHAR: ** নদী // শচী চৌধুরী
তোর সাথে দেখা হবে উজ্জ্বল আগামীতে /
তাই আর সখ করে বাঁধিনি সাঁকো /
পাহাড়ি পিযূষস্নিগ্ধা হনুমতী নদী /
আর কত দূরে বল লেঙুড় নাচাবি /
এখানে এ পথ দিয়ে গান গেয়ে গেয়ে /
কত ঘরে দীপ দিবি এ জলের তেলে /
এদিকে সোনালি দু-কূল হরিৎ উচ্ছ্বাসে /
কেদারা বিছিয়ে কী যে আলাপ জুড়েছে /
বাতাসও নেড়েছে জিভ কুলুকুলু জলে /
হাফ ছেড়ে শ্বাস নেয় , হাসে সে খানিক /
হারায়ে সকল স্রোত গানের বীণা /
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ক্লান্ত জলরাশি /
অনন্ত মালিকানা জলে বিপুল উৎসাহে /
ভিড়ে গেল তীরে এসে অমর মৈত্রী /
তোর সাথে দেখা হবে সাগর-কীর্তনে /
তাই নদী রাখি নাই এ প্রমাদ-সেতু । /
[11/11/2019, 3:48 pm] GOBINDA DHAR: ছবিমুড়ার পথে
চিরশ্রী দেবনাথ
পশ্চিমবাহিনী গোমতী নদী
সকালের সূর্য নারীর মতো মিশে যাচ্ছে জলে
এই জলপথে ছবিমুড়া যাওয়া যায়
কোন সে যুগ, আদিমতর, নিভৃত গুহাপ্রাসাদ
কেমন ছিলেন রাজা চিচিং হা
রাণীর প্রসাধনে নাগকেশরের সুগন্ধি পাহাড় খুঁজে আনা,
হাতির দাঁতের শ্বেত মাদুলি যেন তামাটে নগ্ন গ্রীবায় লালিত বৃংহণ।
যেসব দিনে কালবৈশাখী উঠত, ছুট লাগাতো ডিঙি নৌকোর দল,
জোড়া ভৃঙ্গরাজ পাখির বিপন্ন ডাকে, টালমাটাল বিকেল
...আর দুজন জুমঘ্রাণ লাগা তরুণতরুণী,
যারা বৈভব দেখেনি কোনদিন,
বজ্রবিদ্যুত আর বৃষ্টিকে রত্নরাজি মনে করে দেহে মেখে নেয় শুধু
তাদের বুকে দ্রোহের জন্ম এভাবেই... মাংসল, নরম আমিষ অন্নের মতো
দেবী চাকরাকমা হাসতেন, সাপের মুকুটে প্রশ্রয়ের অঙ্গরাগ, খসখসে তলপেট, কঠিন স্তন।
সন্তানকে জড়াতে শেখেননি, দিয়েছেন শুধু যুদ্ধে ঠেলে শতকের পর শতকে
এখন রাজা নেই, রাণী নেই।
ছমছমে গুহাটি আছে, সাপুড়ের লোভী বিন্, রহস্যের বাতায়ন।
দুদিকের পাহাড়ে অন্ধ দেবমূর্তি, গ্রামের জমাতিয়া বধূূর মতোই তারা হলুদবরণ, চুপচাপ,
নিবিড় দারিদ্র্য, মীন আর বাঁশকরুলের মশলাহীন যাপন শুধু সন্ধ্যা ডেকে আনে ।
গোকুল রাগ বাজছে তবু, শামুকচী পক্ষী চলেছে অভিসারে, গোমতীর তীরে একটি দুটি গাইরিং ... সবুুুজের হৃদয়ে জলন্ত পলাশ ,
আসছে গড়িয়া পুজো
পাহাড়ের গায়ে জুমের ক্ষত হবে, বনমুরগী পোড়া গন্ধে ফসলের আহ্বান ।
এই নির্জন পর্যটনে জনজাতি বৃদ্ধের সারেঙ্গীর সুুুর,
আমাদের দিয়ে যাচ্ছে শ্লেষের আবহসংগীত ...টাক্কলের ধারালো হাসি
এখনও তাকে দেখলে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক নর,
সভ্যতা তার কাছ থেকে অনেক দূরে কেবলি পালিয়ে যায় শূকরীর মতো থপথপে পায়ে
[11/11/2019, 3:51 pm] GOBINDA DHAR: চিরশ্রী দেবনাথ
চিরশ্রী দেবনাথ
মাতৃসমা
জুরী আর কাঁকরি দুটো রক্তশূন্য নদীর তীরে আমার দ্বিতীয় আশ্রয়
সরকারের কাছে বলি প্রাণ দাও তাদের
বুক খুঁড়ে বের করে আনো স্তনধারা
সরকারের অনেক কাজ, অনেক প্রকল্প, গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান
অখ্যাত দুটো জলপ্রবাহ শুকিয়ে গেলে বিশাল ভারতবর্ষের কি হয়?
ছোট্ট শীর্ণ শরীর দিয়ে তারা আমার দিকে আঙুল তোলে
আমি আরামসে বসে কিছু লিখে সম্পাদককে দিই
তাতে নদীর জলভাঙা, ঋতুদাগ, দুগ্ধের সরস কথা থাকে
কিন্তু গর্ভসঞ্চার নেই, বলিষ্ঠ কোন খননকারী নেই
নিজের দিকে তাকিয়ে মেধা পাটেকরের কথা মনে হয়
হাতে রক্ত না লাগা এক মেয়ে কবি তোর জন্ম বৃথা
তবুও
মৃত্যুর পর আমার ভস্মটুকু বয়ে নিতে জুরী নদীর কিছু
দায় তো থেকেই যায়...মাতৃসমা যে!
[11/11/2019, 7:34 pm] GOBINDA DHAR: নদী মাতৃক
নিয়তি রায় বর্মন
নদী নামে
ওপর থেকে
পর্বতের বুক চিরে।
খরস্রোতে
পাথর মাটি
গড়িয়ে চলে নীরে।
উজান থেকে
মধ্য গতি
শেষ হয় মোহনায়।
কত নগর
কত জনপদ
জাগিয়ে তুলে লহমায়।
নদী মাতৃক
শস্য শ্যামল
উত্তর থেকে দক্ষিণ।
স্নেহ সিক্ত
করে রাখে
না না রঙে রঙ্গিন।
নদীর জলে
ধন্য সবাই
সারা বৎসর প্রাপ্তি।
শুখা মরসুমে
জলের যোগান
কৃষিতে তাই ব্যাপ্তি।
অতি বৃষ্টিতে
জল জমে
মাঠে ঘাটে প্লাবন।
সতী সাধ্বী
সীতার সামনে
ভয়ঙ্কর রাবণ।
কখনো ছড়া
কখনো ঝর্ণা
আবার নদ নদী।
যত নামই
হোক তার
বয়ে চলে নিরবধি।
প্রাণ সৃজনে
জীবন রক্ষায়
জলের তুলনা ভারি।
বালুর যোগান
নির্মাণ কাজে
বালুর ঘাটে গাড়ি।
এমন দেশ
নেই জগতে
যেথায় নেই নদী।
নদী মাহাত্ম্য
সবার জানা
নদীই মাতাদি।
ও নদী রে!
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
নদী রে! তোর সাথে ভাব করবার জন্যে ছুটছি জীবনভর ৷ তুই পালাচ্ছিস আর পালাচ্ছিস ৷ এতো চটুল তোর চলন ৷ এতো প্রগলভতা কেন? নদীকে ভালোবেসেছে তো আমার পূর্বপুরুষ ৷ আমার পিতামহ ৷ নদীর পাড়েই ছিল তাদের প্রসূতিসদন ৷ নদীর ঘাটেই পরপারের খেয়া ৷ সেদিন ভালোবেসে নদী তুই জল দিয়েছিস সবারে ৷ পুষ্ট করেছিস গোলাঘর ৷ হাটের বিকিকিনি সব তোকে ঘিরেই ৷ তোর বুক বেয়েই কোনো তরুণী বউ তার গাঁঘরের প্রেমিকের বুক ভেঙে চলে গেছে উজান দেশে নতুন ঘর করতে ৷ নবীন গাঁয়ে যখনই নয়া পুরুষটির ভেতর অমানুষ জেগে ওঠে, তোর বুকেই চোখের জলে চিঠি লিখে ভাটির দেশে পাঠায় ৷
এতো ভালোবাসার নদী, সর্বংসহা ৷ আজ তোরে আজ কাছে পাইনা আমি ৷ তোর বুকের ভেতর থেকে আজ আর জেগে ওঠেনা উদ্দাম স্রোত আর উচ্ছলতার গান ৷ ভিখারি শরীর নিয়ে তুই ছুটছিস ৷ পালাতে চাইছিস ৷ সে কী আমার পাপে? নদী রে?
মনু আমার মা
বিজন বোস
অনন্ত জলরাশির টানে
লক্ষ কোটি বারিধারা
বয়ে নিয়ে চলে ,
বর্ষায় প্লাবিত দুকূল
শীতে শান্ত-স্নিগ্ধ পবিত্র
সৃষ্টির নব উচ্ছাসে আমোদিত
সবুজ আবেশে বিভোর ।
সেখানে তপ্ত দুপুরে
জলকেলিরত নব কিশোরের হিল্লোল ,
বিজন সন্ধ্যায় মহুয়া ফুলের গন্ধে
মাতাল সূর্য ঘুমিয়ে পড়ে মগ পাড়ায় ।
মনু আমার মা
মাকে আমি মা-ই বলি , কখনো গঙ্গা ।
দুদিক থেকে পুষ্ট করেছে দুটি জল বেণী ,
রূপাই আর চালিতাছড়া ।
চুঁইয়ে পড়া স্ফটিক স্বচ্ছ জল
ধুয়ে দেয় বিবস্ত্র যৌবন ।
সন্ত্রাসী সময়ের কাছ থেকে
কেড়ে নেয় হিংসা
জাগায় শান্তি আর নব সৃষ্টির আবেশ ....
অনন্ত সাগরে মিশবে বলে
নিজেকে সঁপেছে ফেনীতে ।
ওদিকে পরমানন্দে স্নিগ্ধ দুপুরে
অশ্বত্থের সুশীতল ছায়াতলে
ত্রিপুরী মায়ের রূপ রস গন্ধে বিভোর
কপোত কপোতী
জলপান শেষে উঁচু টিলায় গামিনী হরিণীর
ফেলে যাওয়া পথে নিস্পলক চোখ
স্বপ্ন বুনে আগামীর ....
কেমন তরো হলো
সাচী রাম মানিক
খোকন সোনা মিষ্টি সোনা খামখেয়ালী টা ছাড়ো
বারুণী মেলা জমবে কোথায় তার কী খবর রাখো ?
কানটি ধরে চোখটি খুলে ম্যাপটা একটু দেখো
সাতটি বোনের একটি বোন ত্রিপুরা যে জেনো ।
খোকন সোনা মিষ্টি সোনা এবার একটু বলো
রূপসী বোনের প্রথমা কন্যা আমলীঘাট টি কেমন
করে ভুলো ?
সন্ন্যাসী টিলার শিব মন্দিরের ফেনী নদীটির পাড়ে
বারুণী মেলা জমে ভালো লোকে লোকারণ্যের ভীড়ে।
পুন্যার্থীরা ভীড় করে পুন্যস্নানের তরে
তর্পণ আর পিণ্ড দানে স্মরণ করে পূর্ব পুরুষেরে।
যুবক যুবতীরা সাঁতার কাটে মনের খেয়ালে
উদাস প্রানে তৃপ্ত হচ্ছে আর চোখে চোখ চেয়ে।
জমজমাট মেলা জমে ক্রেতা বিক্রেতার ভীড়ে
বিকেল বেলার ঠেলা ঠেলি প্রবীন রা যায় তেড়ে।
একশ পাঁচ সিড়ি বেয়ে শিবমন্দিরে উঠা নামা
লোমহর্ষক শিহরণ অদর্শনে যে ফাঁকা ।
মেলায় কেহ আসে প্রিয় মিলনে কেহ বা নায়ক সেজে
কেহ শিল্প সৌন্দর্য অথবা অতীত ইতিহাসের খোঁজে ।
হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধে মিলন মেলা চলে
হাজার কন্ঠে গুন গুন যে রব ঐক্যতানে মিলে ।
খোকন সোনা মিষ্টি সোনা কেমন তরো হলো
মিলন মুখর এই মেলাটি ভুললে বুঝি ভালো ?
মাধুরী লোধ
নদী
কুল কুল রবে বয়ে চলে নদী
দুর থেকে দুরান্তরে
শপথ নিয়েছে ভরিয়ে দেবে
জলের ডালি সাগরে।
দুর্নিবার গতি মানে না বাঁধা
বয়ে চলে চোখ নয় ধাঁধা
সাগর যেন মহাজন
নদীর দেনা তাঁর কাছে
জল দেবে তার প্রতি দান।
বিনিময়ে কিছু পায় না নদী
খালি বর্ষার অফুরন্ত জলধারা ক্ষুদ্র স্রোত পারে না টানতে
তাই দুকুল ছাপায় বাণ বা বন্যা
গৃহস্থ গালি দেয় নদীকে
তবু মৌন ভাবেই থাকে
বয়ে চলে জলধারা।
মানব সভ্যতার দুর্নিবার গতি
ছুটে চলে কাল থেকে কালান্তরে
সময় নেই নেই অবকাশ
প্রতি যোগী তার পালায়।
পেটের কাছে মানুষ যে বাঁধা।
পেটের তুষ্টি তে মানুষ ছুটে
অনেক ঘৃণ্য কাজে ।নয়তো
উপবাসী হয়ে হবে দিশাহারা।
সাগরের পূর্ণতা আনে নদী
মানুষ ছোটে রুজির তাগিদে
নদী বা সমুদ্র মাছ ধরা বা পারাপারে
এটাই চলে অনন্ত কাল ধরে
নদী নীরবে দেখে জল আর মানুষ
খেলছে বিচিত্র সব খেলা।
শান্তিপুর
মাধুরী লোধ
নদীর নাম ঠাম্মা বলতেন চঞ্চলা।
আবর্জনা ছু মন্তর
মাটিতে তিলক
স্নান এ সুদ্ধ অশৌচ নাভিমূলে ঔষধি সপ্ত রজঃ তম
জীবনের ঘ্রাণ দুপাশে।
টারবাইন ঘোরে জীবিত পৃথিবী
যান্ত্রিক কলকব্জা
চুড়ি পড়ায় বুদ্ধি দীপ্ত মস্তিষ্কে
এখন অতি আধুনিক যুগ
আমি দেখেছি ধার করে সবাই
নদীর তরঙ্গ।
নদীতে পাল তোলা পানসী আমার
বুকে গাঁথা তাজমহল
একটা নিমন্ত্রণ পত্র ওপাড়ের
ওতে মৃগনাভির সুগন্ধ। গঙ্গা পদ্মা গোমতী মুহুরী মায়ের ভুমিকায়
দু দন্ড জিরোতে চাই বালির বিছানায়।
মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে
এ ঘাট ও ঘাট চল বহুদুরে
খুলে দেব মনের দুয়ার জানালা
লুটে নেবে প্রেম ভালোবাসার সুর
গলা ছেড়ে গাইবো হেইয়্যা হেইয়্যা।মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারি না।
বর্ষায় নদীর নাম মা রাখেন রাক্ষুসী
শুখা মরশুমে বাবা রাখেন বালুধুম।
দাদু বললেন চিতার চাই ধুয়ে নেন এ স্রোতস্বিনী মা ।তাই আমি নাম দিলাম শান্তি পুর।
নদীর আয়ু অবধি
বিশ্বনাথ চক্রবর্তী
ভেবেছিলাম একটা বিরল শব্দ হয়ে ফুঁটে থাকবে
যেদিন নদীর কলতান এ হৃদয় আকুল করে দেবে
সেদিন থেকে নদীর কূলে কূলে...
জলঘাস ঝোপজঙ্গল ও সাদা কাশের তুলো মেখে লজ্জাবতীর কাঁটা অবধি
খুঁজবো, তোমার শব্দহীন ফুঁটে থাকা
এমনভাবে খুঁজবো যেন কাউকে এভাবে খুঁজিনি
এমনভাবে খুঁজবো, যেন খোঁজ
নদীর আয়ু অবধি হাঁটতে থাকে
তবুও এটুকু খোঁজ যেন বড় কম--
বড় ছোট এ দিনযাপন!
কিন্তু জলের উপর তো কোন জোর চলেনা
জল ভুলে যায় বলেই নদী মরে যায়
তাই বড় আক্ষেপ
নদীর আয়ু পেরিয়ে তোমাকে খোঁজার কোন উপায় নেই
ধলাই, যদি হতে...
মৌমিতা চক্রবর্তী
ধলাই
তুমি যদি হতে মায়ের কচি ধানরঙা শাড়ি ,সবুজ পেখম আঁকতাম ভাঁজে ভাঁজে। মুঠো ভরে এনে দিতাম জোৎস্না। আলোয় আলোয় ভরে যেত দুর্ভিক্ষের একচালা।
ধলাই
তুমি যদি বড়দির উচ্ছিষ্ট সং-সার হতে,ভেঙেচুরে দলা করে দিতাম সব অবাধ্য ইচ্ছেদের।ফলের ঝুড়ি শোভা বাড়াতো না মাথার। কাঠফাটা রোদ্দুরে ভুল করতো না কাকেরা- স্বজাতি বলে।
ধলাই
তুমি যদি বাবার কারখানার শিরোমণি হতে, আগুন দাউ-দাউ করতো না পাঁচের পেটে।কড়িকাঠে চুমু খেতো না বাবা। চিতার তাপে তপ্ত হয়ে উঠতো না তোমার শীতলতা।
ধলাই
তুমি যদি ভাইয়ের অঙ্ক খাতায় আরেকটু মরমী হতে,চুরির দায়ে তল্লাট ভুলতে হতো না।বাউন্ডুলে পোশাক পড়তো না ঘরকুনো ব্যাঙ। পথে পথে পথের পাঁচালী আওড়াতে শুকিয়ে গেছে গলা। তবুও মেধাবী বেঁচে থাকা।
ধলাই
তুমি যদি আমার যাপনে নির্মোহী হতে, গারদে বসে গুণতে হতো না অপরাধের ফ্যাকাশে পাতা।অপরাধ অপরাধী বটে,হেতু রক্ষা করে পবিত্রতা!আসরের আজানে আমার দোয়া,সুখে থেকো অসুখের কারণ যারা।
সরযূ
সংহিতা সিনহা
বড় জানতে ইচ্ছে করে
যে সরযূর কাছে একদা রাম চন্দ্র তাঁর সকল দুঃখের ভার রেখেছিলেন
সেই সরযূ আজ কেমন আছে?
সরযূ কি সেদিন কেঁদেছিলো তাঁর সাথে?
আজ যখন এতো শিরোনাম
এতো ক্যামেরার ঝলকানি এতো উল্লাস
তখন একমাত্র সরযূ তার বুকে বয়ে নিয়ে চলেছে
এক নীরব ব্যাথার গাঁথা।
হয়তো পৃথিবীর কিছু লোক জানেনা
খুব কষ্ট হলে মন্দিরে নয়
নদীর কাছে বসতে হয়।
********
সংহিতা সিনহা
আগরতলা
২৪/১১/২০১৯ ইং
দেও আজ ফিরে গেছে ঘরে
অমলকান্তি চন্দ
দেও আজ ফিরে গেছে ঘরে পাহাড়ের পথে
হলুদ ধানের শিষে রঙ মেখে কিছু স্নেহ ঘ্রাণ ।
কচি ঘাসে শিশির ছড়িয়ে দুচোখে আবীর খেলা
দেও আজ ফিরে গেছে ঘরে সন্ধ্যা বেলা।
মন খারাপের যত গান ঝরা পালকের দিনে
তারাদের টোল পড়া গালে আঁধারি চুম্বন মাখা
বাতাসেরা নেচে নেচে ছুঁয়ে গেছে এলো চুলে
দেও আজ ফিরে গেছে ঘরে তোমাকেই ভুলে ।
কত ব্যাথা জমা বুকে ফেলে আসা স্মৃতি ঘোর
কাঁকেদের পাখায় লুকিয়ে দেখে গেছে কেউ
আমার সমাধি জুড়ে ঝরা পাতা, রাঙ্গা ফুল
দেও আজ ফিরে গেছে ঘরে হারানো বকুল।
হারাধন বৈরাগী
উষ্ণতা
নদীর এপারের উষ্ণতা ওপারে
আছড়ে পড়লো সারারাত
জ্বলে উঠলো জঙ্গল
জ্বলে উঠলো অন্ধকার
তবু মুখ দেখা যাচ্ছে না কারোর।
রাইমা-সাইমা
যার আত্মহত্যার পর
ভালোবাসার বেদীমূলে খুমপুই বৃষ্টি হয়
তার নাম রাইমা।
যাকে ভালোবাসার পর
গ্রহন ও বর্জনের কোন দাগ পড়ে না
তার নাম সাইমা।
রাইমা সাধিকা
সাইমা সংসারী
তারা সহোদরা
বংশলতিকা ঘেঁটে জেনেছি
একই পিতার ঔরসজাত।
কুহক
নদী থেকে উঠে আসছে
শব্দের কুহক।
ফেনি নদী
সাব্রুম রামগড় দ্বিখণ্ডিত
করে চলেছে যে নদীটি
লোকে-ফেনি নদী বলে।
ফেনি থেকে ফণাও আঁচ করি
ফেনি থেকে ফেনাও
ফেনি থেকে নারীও বুঝি
ফেনি থেকে শ্রাবনীও--!
ফেনি ও ফণার মাঝদরিয়ায়
এই নদীই কিরাত জমানায়
ফেনিয়ে ফেনিয়ে চলে
এই নদীতেই পূর্ণচন্দ্রে
নারীর মতো জোয়ারভাটা হয়।
দেওনদী
শাখানপাহাড়ের কুহক
ঝাঁপিয়ে পড়ছে উপত্যকা উপর
হামতারায়ের হাতে ঝুলছে
ক্রোশের মতো খোদিত টাক্কল
পায়ের ভারে কাঁপছে মাটি
এক অনালোকিত ইঙ্গিতে ভাঙছে
দেওনদী-ভাঙাতীরের ভাঁজ বরাবর ।
নদী
নদীকে কত নামে ডাকছি
দেও মনু গোমতি দেলুয়াই কসমতি--
দেওনদী
এপারে ওপারে জঙ্গলের ঢেউ
পুবাকাশ ফুঁড়ে নীলাভ জম্পুই
ধাপে ধাপে গাইরিঙ জুম
পাতার মর্মর বীজের ওম
মাঝে মাঝে শিকড়ের উত্তাপ
গান গায় নদী- অভয়মুদ্রার।
জুড়িন্দা
এই পারে আমার নাও
ওই পারে তোমার
নাওয়ে নাওয়ে জুড়িন্দা
নদী হবো পার।
হারমোনিয়াম
অভীককুমার দে
একটি হারমোনিয়াম হলেই গাইতে পারি গান,
সুরের চাবিকাঠি বাক্সবন্দী বলেই--
হাওয়াঘর জানে ভেতরের গোপনীয়তা,
শিল্পী নিজেও বোঝেন, এক হাতের আঙুল ঘাটে ঘাটে
তাল খুঁজে পেলেই প্রজাপতি পাখনা মেলে
চোখেমুখে রঙ ছড়ায়
বুকের উঠোনে ওঠে সুর এবং
অন্য হাতের আবেদনময়ী আঙুল একতালে
বাতাস ডেকে নিলেই নদী।
এই যন্ত্রের সাদা কালো ঘাট
ছন্দ শেখায়, আঙুলের চলন শেখায় এবং
তিনি প্রেমিক শ্রোতা হৃদয় ছুঁতে জানেন।
বাক্সবন্দী নদীটির ভেতর অন্ধকার, বাইরে ঘাট
মিলেমিশে একাগ্র হলেই গাইতে পারি গান।
উৎস থেকে মোহনা
গীতশ্রী ভৌমিক
এক.
উৎস থেকে মোহনা..
এই বুঝি তোর ঠিকানা?
আজীবন ছুটে চলিস, নুতন প্রানের কথা বলিস...
তুই যে কল্লোলিনী নদী...।
সংগে নিয়ে আবর্জনা
ক্লান্তি তবু কেন আসেনা
কতো আর ধুয়ে যাবি এই পাপ?
মানুষ কতো অবগাহনে
শরীর মনে শান্তি আনে..
তুই তবুও কল্লোলিনী নিষ্পাপ।।
দুই.
স্রোতস্বিনী কল্লোলিনী..
কতো নামে তোরে ডাকি...
পাহাড়ঘেরায় ঝর্ণা ধারায়..
কতো ছবি তোর যে আঁকি।
নদী তোর অন্তত বোঝা বাকি!
অন্তরে তোর আছে কি যে নদী
বয়ে চলিস আমৃত্যু নিরবধি..
শুধুই সাগরে মেশা?
এটাই কি তোর নেশা?
মিশে সাগরে নিজের নাম ভুলে
একাত্ম হয়ে চলা
আত্মকাহিনী বলা।
তিন.
নদী.. তুই সাগরে আর মিশিস না
তোর মিঠা পানির জলে আবার
খারা পানি ঢালিস না
সাগরে আর মিশিস না।
কেন নদী তীরের বেগে মৃত্যুর পানে ধায়?
জানে মোহনায় হারিয়ে যাবে
তবুও ফিরে না তাকায়।
এর নাম বধহয় ভালোবাসা
সাগর বুকেই বাঁধিস বাসা।
তাইতো ছুটিস দুকূল ছাপিয়ে
যৌবনবতী নদী..
আমিই শুধু কাঁদি..
তীরে বসে বাঁধি..
বালোয়াড়ির এই খেলাঘর।
চার.
নদীর চরে আমার ঘর.. কূল ভাসিলে ভাসে..
জোৎস্না রাতের চাঁদের আলোয়
খিলখিলিয়ে হাসে।
কূল ছাপিয়ে সন্ধ্যা আসে
চাঁদের ছায়া জলে ভাসে
কুলকুল সেই বয়ে যাওয়া
মৃদুমন্দ চলছে হাওয়া..
সে এক আজব অনুভূতি!
নদী বিষয়ক কবিতা
উপমা
নিশীথরঞ্জন পাল
পাড় ভাঙ্গে পাড় গড়ে
সেই নদীটি আজ ও
বয়ে চলছে ছল্ ছল্ কলকল্ ---
দু পাড়ে জনবসতি
সেই কুড়ে ঘর এখন টিনের চালা
কিংবা দালান বাড়ি
পাড় ভাঙ্গে পাড় গড়ে
সেই নদীটি জীবনের উপ
ঋণ
নদী কেন্দ্রিক এই সভ্যতা
আজ অবধি মানুষ
নদীর কাছেই ঋণী ।
সেই প্রাগঐতিহাসিক যুগ থেকে
সভ্যতার উষালগ্ন থেকে
নদী জুগিয়েছে আমাদের
প্রাণ ধারনের জল
সেই নদী গঙ্গা পদ্মা হহোয়াংহু
ধলাই গোমতি কিংবা
আমার জন্ম গ্রামের বিলাস ।
হুমকি
সভ্যতার উত্থানে
নদী আজ নিষ্প্রাণ ।
জল বিদ্যুতের আলোর ছটা
বুকভরা দূষিত বর্জ্য পদার্থ
কীট নাশকের হলাহলে
দম আটকে যাচ্ছে নদীর ।
জল প্রাণীরা হারিয়ে ফেলছে
স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা ।
হুমকিরসম্মুখীন আজ
তাদের জীবন ও জীবিকা
এবং আমাদের সভ্যতা ও ।
পূর্বাভাস
প্রগতির ছোঁয়া লেগেছে
আজ বন পাহাড় সর্বত্র ।
গড়ে উঠেছে সুউচ্চ প্রাসাদ
নতুন নতুন বসত ইমারত ।
ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বন বাদড়
পাহাড় জঙ্গল গাছ পালা পশুপাখি ।
প্রকৃতি হারিয়ে ফেলছে তার
স্বাভাবিক ধারন ক্ষমতা ভারসাম্য ।
নদী হারিয়ে ফেলছে তার গতি
স্রোতে তার শীতের জড়তা ।
আর শিয়রে ধ্বংসের দ্বীপ জ্বেলে
নিশ্চিতে ঘুমিয়ে আছি আমরা
আত্মঘাতী মানুষ ।
উপসংহার
যাকে আশ্রয় করে
আমাদের এই সভ্যতা
সেই নদী আজ ম্লান ও বিবর্ণ
যেন সেই কিশোরী মেয়েটি
আজ বুড়ি হয়ে গেছে ।
ইচ্ছেনদী
গৈরিকা ধর
নদীর তীরে বালু নিয়ে খেলছি
হঠাৎ বৃষ্টি এল ঝমঝম
নদীর কাছে বসে দেখছি।
ব্যাঙেরা আনন্দে নাচছে
মাছেরা আনন্দে সাঁতার কাটছে
কত মজা তাদের
ইচ্ছে করে তাদের নিয়ে
নদীর সাথে খেলি।
0 মন্তব্যসমূহ