♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (২২) ♦ব্যঞ্জন : ফুলমালঞ্চ♦মানবর্দ্ধন পাল

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                    (২২)
          ♦ব্যঞ্জন : ফুলমালঞ্চ♦মানবর্দ্ধন পাল


        ব্যঞ্জন যেন ফুলের মালা
         শত বর্ণের রঙিন ফুল।
        ভাষ্-বাগানে ফুটল কুসুম 
        সাজসজ্জার নেই-যে তুল।

বাংলা আমাদের ভাষা-মা। এই ভাষা-মায়ের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হল পঞ্চাশটি বর্ণ। শব্দ এবং বাক্য ভাষা-মায়েরই রক্ত-মাংস। ধ্বনি, বর্ণ, শব্দ, বাক্য, অর্থ-- সব মিলিয়ে ভাষা-মায়ের পূর্ণাঙ্গ রূপ। এদের দিয়ে গড়ে তুলেছি আমাদের ভাষার ভুবন, শব্দের সংসার, ভাবপ্রকাশের বিশ্ব ও কথার পৃথিবী। 
---- আচ্ছা দাদুভাই, তুমি বারবার ভাষার সঙ্গে 'মা' বলছ কেন? আমাদের সবার মা তো একজন করেই-- যার পেট থেকে আমরা জন্মেছি। ভাষা আবার মা হয় কেমন করে? 
হিয়া দাদুভাইযের কথার মধ্যে ফোঁড়ন  দিয়ে মৃদু আপত্তি জানাল।
---- তোমার কথা সাদা চোখে ঠিকই আছে। তুমি ছোটদের মতই কথাটি বলেছ। আমাদের গর্ভধারিণী মা একজনই-- যে জননীর উদরে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হিসেবে আমাদের আরও দুই মা আছে-- দেশ-মা ও ভাষা-মা। এই দুই মা-ও কিন্তু আমাদের জন্মদাত্রী মায়ের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে-দেশে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি, যে-দেশের আলো-বাতাসে বড় হচ্ছি, যে-মাটির ফলে-ফসলে গড়ে উঠছে আমাদের রক্ত-মাংস ও মেধা-- সে-দেশের মাটি কি মা নয়? আর যে-ভাষা আমাকে শিখিয়েছে মধুর 'মা' ডাক, যে-ভাষা আমার ভাবনা-চিন্তা, আবেগ-অনুভূতি এবং ভাবনা-ভালবাসা প্রকাশের শক্তি যুগিয়েছে তা-ও কি আমার 'মা' নয়! তাই সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে-- "জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।" অর্থাৎ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও পবিত্র। একবার ভাবো তো আমাদের প্রাণের জাতীয় সঙ্গীতের কথা! যেখানে রবীন্দ্রনাথ দেশকে মা ডেকে বলেছেন-- "মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়নজলে ভাসি।।"  কিংবা নজরুল যখন বলেন-- এ কি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লিজননী।/ ফুলে ও ফসলে কাদামাটিজলে ঝলমল করে লাবণী।" এসব বন্দনা-গান তো দেশ-মাকে লক্ষ্য করেই। তাই মা
আমাদের তিনজনই। জন্মদাত্রীর সঙ্গে   দেশ-মা এবং ভাষা-মাও সমান মর্যাদার। এই মায়েদের সম্মান রক্ষার জন্য আমরা কত আন্দোলন-সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছি। রক্ত দিয়েছি এক সাগর, জীবন দিয়েছি তিরিশ লক্ষ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন তো জন্মদায়িনীকে 'মা' বলে ডাকার এবং দেশ-মা ও ভাষা-মায়ের অধিকার রক্ষার জন্যই।
---- আমরা ভাল করেই বুঝতে পেরেছি দাদুভাই। মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে মায়ের মতই শ্রদ্ধা করতে এবং ভালবাসতে হবে।
ঐশী একথা বলে দাদুভাইকে আশ্বস্ত করল। তারপরও দাদুভাই বললেন,
---- শেষ কথাটি শুনে রাখ। মাতৃভূমি কিন্তু মামার বাড়ি নয়, কেবল দেশের মাটিও নয়! মাটির সঙ্গে মানুষ এবং প্রকৃতি-পরিবেশও আছে। সব মিলিয়েই দেশ-মা। আর  মাতৃভাষাও কিন্তু কেবল মায়ের মুখের বুলি নয়। ভাষার নিয়ম-কানুন, ইতিহাস, উচ্চারণ, গতিপ্রকৃতি এবং শুদ্ধাশুদ্ধিসহ এর অন্দরমহলের সবকিছু মিলিয়েই মাতৃভাষা। দেশ-মা ও ভাষা-মাসহ  তিনজন মাকে আমরা পরিপূর্ণভাবে ভালবাসতে পারলেই প্রকৃত মানুষ হব এবং সত্যিকারের বাঙালি হব।

---- মঞ্চের লেকচার বাদ দিয়ে এবার একটু আসল কথায় আস-না দাদুভাই! একবার শুরু করলে তুমি শুধু কথার ডালপালা ছড়াও। থামতেই চাও না! বছর তো প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে! আমাদের পাঠ্য ব্যাকরণের কথা বলবে কবে?
---- আমার কী দোষ! তোমরাই তো জিজ্ঞেস করলে! প্রশ্ন করলে উত্তর না-দেওয়া তো অভদ্রতা! তা-ই না?  যাক, এবার একটু মূল কথায় আসি-- ব্যঞ্জনবর্ণের গল্পকথায়।

ব্যঞ্জনবর্ণের কথা বলতে গেলে শুরুতেই এগুলোর সাজানোর কথা বলতে হয়। পৃথিবীর আর কোনও ভাষার বর্ণমালা বোধ করি এমন সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়নি। নিয়ম অনুসারে এবং অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণ সাজানো হয়েছে। যেন পরিকল্পিতভাবে বহুবর্ণের ফুলগাছ দিয়ে  সুসজ্জিত একটি বাগান। অন্য ভাষার বর্ণমালার কথা বলার দরকার নেই। আমাদের সুপরিচিত ইংরেজি ভাষার বর্ণমালার কথাই যদি ধরি তবে দেখবে, সেখানে স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ একসঙ্গে জগাখিচুরি হয়ে আছে! সেখানে ইংরেজি Vowel A E I O U-এর আলাদা কোনও অবস্থান নেই। ব্যঞ্জনের ভেতর সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে! না-চিনিয়ে দিলে তা বোঝার উপায় নেই! কিন্তু বাংলায় স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ সম্পূর্ণ আলাদা। তা বর্ণমালার শৃঙ্খলারই প্রতীক। তাই  শিশুদের শেখানোর জন্য খুব উপযোগী। 

ইংরেজি বর্ণমালা লাইন অনুযায়ী লেখার সুনির্দিষ্ট কোনও নিয়ম নেই।তুমি ইচ্ছেমত সংখ্যার বর্ণ দিয়ে লাইন সাজাতে পার। তাতে দোষ হবে না। কিন্তু বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণমালা লিখতে হলে পাঁচটি করে বর্ণ দিয়ে লাইন সাজাতে হবে। নইলে শুদ্ধ হবে না। খাতায় জায়গা থাকলে ইংরেজি বর্ণমালা  A থেকে Z পর্যন্ত এক লাইনেও লিখতে পার। শিশুশিক্ষার যেকোনও বইয়ে তুমি দেখবে, জায়গা খালি থাকলেও পাঁচটির বেশি বর্ণ এক লাইনে দেওয়া হয়নি। বাড়তি স্থানে ফুল-লতা এঁকে দেওয়া হয়েছে। দেখলে মনে হবে স্কুলের গার্লগাইড যেন কুচকাওয়াজ করছে। অবশ্য এভাবে সাজানোর বৈজ্ঞানিক কারণও আছে। 

তোমাদের ব্যাকরণ বইয়ে আছে এবং তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ-- ব্যঞ্জনের প্রথম পাঁচটি সারিতে আছে পঁচিশটি বর্ণ। এগুলোকে পাঁচটি বর্গে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সারির প্রথম বর্ণটি হল লিডার বা নেতা। এই নেতারা হল-- ক চ ট ত প। এই লিডারদের নামেই বর্গের নাম-- ক-বর্গ, চ-বর্গ, ট-বর্গ, ত-বর্গ এবং প-বর্গ। ব্যাকরণবিদরা এগুলোকে নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করে থাকেন। যেমন, ক-বর্গের প্রথম বর্ণ ক, দ্বিতীয় বর্ণ খ, তৃতীয় বর্ণ গ, চতুর্থ বর্ণ ঘ, এবং পঞ্চম বর্ণ ঙ। এভাবে প্রতিটি বর্গের বর্ণকে চিহ্নিত করা হয়। এটা ঠিক ক্লাসের রোল নম্বরের মত। নাম না-বলে রোল নম্বর দিয়ে ক্লাসের সবাইকে যেমন এক দুই তিন বলে চিহ্নিত করা হয়।
---- তা তো বুঝলাম, দাদুভাই। কিন্তু পাঁচটি করে বর্ণকে বর্গে ভাগ করা হল কেন? ঐশী জানতে চাইল। 
---- এরও যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। তাই তো বলেছি, বাংলা ব্যঞ্জন বর্ণ পরিকল্পিতভাবে সুসজ্জিত ফুলের বাগান। এর কারণটা মন দিয়ে শোন। এর মূল কারণ হল, উচ্চারণস্থান ও উচ্চারণরীতি অনুসারে একরকম ধ্বনিগুলোকে এক সারিতে রাখা হয়েছে। এর মানে হল, যে ধ্বনিগুলো মুখের ভেতরের একই জায়গা থেকে ও প্রায় এক রকম নিয়মে উচ্চারিত হয়  সেগুলোকে ভাষাবিজ্ঞানীরা এক লাইনে সাজিয়েছেন। বিভিন্ন ধ্বনি উচ্চারণের সুনির্দিষ্ট স্থান ও রীতি আছে। যেমন ক-বর্গের পাঁচটি ধ্বনি-- ক খ গ ঘ ঙ-- উচ্চারিত হয় কণ্ঠ বা গলার কাছাকাছি স্থান থেকে। এজন্য এগুলোকে বলা হয় 'কণ্ঠধ্বনি'। চ-বর্গের পাঁচটি ধ্বনি-- চ ছ জ ঝ ঞ-- সামনের দিকের জিহ্বা দিয়ে সামনের তালু স্পর্শ করে উচ্চারিত হয় বলে ওগুলোকে বলা হয়   'অগ্রতালব্য ধ্বনি'।
ট-বর্গের পাঁচটি ধ্বনি-- ট ঠ ড ঢ ণ-- জিহ্বার অগ্রভাগ উল্টিয়ে মুখের তালুর মধ্যভাগে লাগিয়ে উচ্চারণ করতে হয় বলে তাকে 'মূর্ধাধ্বনি' বা 'মধ্যতালুজাত ধ্বনি' বলে।
ত-বর্গের পাঁচটি ধ্বনি-- ত থ দ ধ ন-- জিহ্বার আগা দাঁতের গোড়ার সঙ্গে লাগিয়ে উচ্চারণ করতে হয় বলে তাকে 'দন্ত্যধ্বনি' বা 'দন্ত্যমূলীয় ধ্বনি' বলে। দাঁতই এই ধ্বনিগুলোর উচ্চারণের মূল সহায়। তাই ফোঁকলা দাঁতের বুড়োরা ত-বর্গের ধ্বনি সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে পারে না!
আর প-বর্গের পাঁচটি ধ্বনি-- প ফ ব ভ ম-- উচ্চারণ করতে প্রধানত লাগে দুটি ঠোঁট। তাই প-বর্গের ধ্বনি গুলোকে ভাষাবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'ওষ্ঠ্যধ্বনি'। এজন্য ঠোঁটকাটা প্রতিবন্ধীরা এই ধ্বনিগুলো ঠিকমত বলতে পারে না! কারণ তারা দুই ঠোঁট একত্র করতে পারে না। এমন কোনও বাপের বেটা সাদ্দাম নেই যে দুই ঠোঁট যুক্ত না-করে প-বর্গের ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারে! আমার কিংবা তোমাদের দাদারাও কেউ পারবে না। দুই ঠোঁট না-লাগিয়ে আমরা কেউ মা-বাবা কিংবা মামাকে ডাকতে পারব না।

দাদুভাইয়ে একথা শুনে ঐশী থেকে মেঘদূত পর্যন্ত সবাই ঠোঁট যুক্ত না-করে 'মা-বাবা' ও 'মামা' বলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সবার মুখ দিয়ে 'আ আ' শব্দই বেরুতে লাগল! আর একে অপরের বিকৃত আওয়াজ শুনে ঢলাঢলি করে হাসতে শুরু করল। সেকি সামান্য হাসির গমক! প্রাণখোলা উদ্বেলিত অবিরাম হাসিতে একেবারে পেটে খিল, চোখে জল! তবু বন্ধ হতে চায় না হাসির ফোয়ারা!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ