ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ (১৬) খোঁজখবর : উ ঊ ঋ // মানবর্দ্ধন পাল

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                 (১৬)
   ♦ খোঁজখবর : উ ঊ ঋ ♦ 



     এসো বন্ধু, আরও একটু
     খোঁজ ও খবর করি।
     স্বরবর্ণে যাদের নাম
     হ্রস্ব-উ, দীর্ঘ-উ, ঋ।

মেঘদূত ও রোদদূত এসপ্তাহে আবার চলে এসেছে দাদুবাড়ি। ওদের বাবা কিংবা মায়ের যে সপ্তাহে করোনা হাসপাতালে ডিউটি থাকে তার দুয়েক দিন আগে ওরা চলে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ডিউটির পর পরীক্ষায় নিগেটিভ এলে আবার দুতিন সপ্তাহের জন্য চলে যায়। এভাবেই চলছে বিগত মাস-ছয়েক ধরে। আগে প্রাইভেট কার নিয়ে আসত-- যখন করোনার ভীতি ও সংক্রমণ ছিল বেশি। এবার ঢাকা থেকে কু-উ-উ ঝিক্-ঝিক্ করে ট্রেনেই চলে এসেছে। এবার মেঘ-রোদ বেশ কয়েকটি ছড়া ও ছবির বই নিয়ে এসেছে। দাদুভাইয়ের মুখে হ্রস্ব-উ দীর্ঘ-ঊ-র কথা শুনেই ওরা দুজন বইয়ের ব্যাগ নিয়ে এল। রোদ ওর ছবির বই বের করে বলল,
---- দাদুভাই, আমি হ্রস্ব-উ দীর্ঘ-ঊ চিনি। এই দেখ, এটা হ্রস্ব-উ, এটা দীর্ঘ-ঊ। হ্রস্ব-উ-তে 'উট' এবং দীর্ঘ-ঊ দিয়ে 'ঊষা' হয়। ওটা টিকিওয়ালা ছয়-এর মত। তবে একটির একটা লেজ আছে, আরেকটার দুইটা লেজ।
রোদের কথা শুনে সবাই হো-হো করে হেসে উঠল। আর মেঘদূত একটি ছড়ার বই খুলে বলল,
---- দাদুভাই, আমি এই বর্ণগুলো নিয়ে শামসুর রাহমানের ছোট্ট তিনটি ছড়া বলি : # উ #
     উট চলেছে উটকো চালে
     মরুভূমির বালুতে, 
     হুট্ করে ঐ সিসুম এলো
     ঢুকলো বালু তালুতে।
     # ঊ #
     উপরকে কেউ ঊর্ধ্ব বলে
     ভোরকে বলে ঊষা,
     ভোর আসে রোজ গায়ে চেপে
     সোনালি বেশভূষা। 
     # ঋ #
     ঋষিরা তো ঋণ করে না
     এমনি চলে দিন,
     সব ঋতুতেই ঋজু থেকে 
     নাচে তা ধিন্ ধিন্।
মেঘদূতের ছড়া শুনে সবাই সজোরে হাততালি দিল।

মেঘ-রোদ এসেছে জেনে আজ শুভ এবং কাব্যও এসে হাজির! অসমবয়সী হলেও মেঘ-রোদের সঙ্গে ওদের খুব ভাব। 
ছড়ার বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে মেঘদূত বলল,
---- আমিও জানি দাদুভাই। হ্রস্ব-উ থেকে হ্রস্ব-উ-কার ( ু) ,দীর্ঘ-উ থেকে দীর্ঘ-ঊ-কার ( ূ) এবং ঋ থেকে ঋ-কার ( ৃ) হয়।
মেঘের কথা শুনে দাদুভাই খুশি হয়ে বললেন, 
---- বাহ্ বাহ্, চমৎকার! মেঘদূতের দেখি সবকিছুই মনে  আছে। সে সব 'কার' ভালভাবে চিনে ফেলেছে।  এসব পুরনো কথা তোমরা যারা মেঘ-রোদের চেয়ে বড় তাদের নিশ্চয়ই আরও ভাল করে মনে আছে।
দাদুভাইয়ের কথার ফাঁকে কাব্য বলল,
---- দাদুভাই, হ্রস্ব-উ এবং দীর্ঘ-ঊ-এর মাত্রা আছে কিন্তু ঋ-এর মাত্রা নেই।
কাব্যের পিঠ চাপড়িয়ে দাদুভাই বললেন,
---- বেশ, বেশ! এ-ই তো চাই! সবার সবসময় তো সবকিছু মনে থাকে না! জানা কথাও আমরা অনেক সময় ভুলে যাই!  তাই একজন আরেক জনকে মনে করিয়ে দিলে ভাল হয়। তখন হিয়া সগর্বে বলল,
---- হ্রস্ব-উ, দীর্ঘ-ঊ এবং ঋ বাংলা স্বরবর্ণমালার পাঁচ, ছয় ও সাত নম্বর বর্ণ। এগুলোর 'কার' ব্যঞ্জন বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়।

ঐশী কম কথা বলে। জানলেও অনেক কিছু মুখ ফুটিয়ে বলে না! সে হাসেও কম। এবয়সের কিশোরীরা যেমন কারণে-অকারণে হাসে তেমন নয়! অনেকটা গম্ভীর প্রকৃতির। দাদুভাইয়ের কথায় ভরসা পেয়ে সে বলল,
---- দাদুভাই, এই তিনটি বর্ণের কারের মধ্যে আরেকটি মিল আছে। তিনটি 'কার'ই ব্যঞ্জনবর্ণের নিচে বসে। তোমার  কথায় "পায়ে ধরে ঝুলে থাকে।"
একথা বলে ঐশী মিষ্টি করে একটু হাসল। ওর মনোযোগ এবং মনে রাখার ক্ষমতায় দাদুভাই মনে-মনে খুশি হয়ে বললেন,
---- তোমাকে অভিনন্দন জানাই। শারদীয় দুর্গাপুজোর পর আবার আমরা সবাই আজ মিলিত হয়েছি। মনে হচ্ছে যেন চাঁদের হাট! এবার আমরা হ্রস্ব-উ, দীর্ঘ-ঊ এবং ঋ সম্পর্ক আরও নতুন কিছু কথা জানব।
হ্রস্ব-ই, দীর্ঘ-ঈ এবং এদের 'কার' সম্পর্কে যে-সব কথা আমরা আগে বলেছি তা কিন্তু হ্রস্ব-উ, দীর্ঘ-ঊ এবং এদের 'কার' বিষয়েও প্রযোজ্য। তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমরা বলেছি, উচ্চারণের সময় হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরের কোনও তফাৎ নেই কিন্তু বানানে ভিন্নতা আছে। তা অবশ্যই মানতে হবে। তাই লক্ষ কর : 
কুল (বংশ), কূল (তীর, কিনারা); পুত (পুত্র), পূত (পবিত্র); দুর্ (উপসর্গ বিশেষ), দূর (নিকট নয়); কুজন (খারাপ লোক), কূজন (পাখির ডাক)।
দেখ, এখানে বানান বা 'কার' ভিন্ন হওয়ার জন্য অর্থ আলাদা হয়ে গেল।

হ্রস্ব-উ বর্ণটি শব্দের মূল ও ক্রিয়ার মূলের শেষে প্রত্যয় হিসেবেও যুক্ত হয়। যেমন বিশেষণ পদ তৈরি করার সময়-- চাল+উ= চালু; ঢাল+উ= ঢালু; উঁচ+= উঁচু; দুষ্ট+উ= দুষ্টু।
আবার অনেক সময় ব্যক্তির নামকে সংক্ষিপ্ত করে আমরা শেষে 'উ' প্রত্যয় যুক্ত করি। আদর করে আমরা কানাইকে কানু, বলাইকে বলু, রাধাকে রাধু, বোনকে বোনু, দাদাকে দাদু, আব্বাকে আব্বু, আম্মাকে আম্মু, মামাকে মামু বলি। 
এরকমভাবে ক্রিয়ার মূল বা ধাতুর সঙ্গেও প্রত্যয় যুক্ত হতে পারে : √কট্+উ= কটু; √পিপাস্+উ = পিপাসু; √জিজ্ঞাস্+উ= জিজ্ঞাসু। 

হ্রস্ব বা দীর্ঘ যা-ই হোক 'উ' ধ্বনিটির উচ্চারণে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। ঠোঁট দুটি একেবারে গোলাকার করে এই ধ্বনি উচ্চারণ করতে হয়। বৃত্তের মত ঠোঁটের এমন গোল আকৃতি আর কোনও ধ্বনির উচ্চারণের সময় হয় না। ঠোঁট একেবারে সংকুচিত করে 'উ' বলতে হয়। এজন্য ভাষাবিদরা এই ধ্বনি দুটোকে বলেছেন, 'সংবৃত' স্বরধ্বনি। 

দীর্ঘ-ঊ-কারের (ূ) ক্ষেত্রে তোমাদের কেবল মনে রাখতে হবে-- কোনও বাংলা শব্দেই দীর্ঘ-ঊ-কার যুক্ত হয় না। শুধু তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের বানানে দীর্ঘ-ঊ-কার বসে।

একথা বলে দাদুভাই একটু থেমে বললেন,
---- এখন হেমন্তকাল। মেঘে জলকণা নেই তাই বৃষ্টিও নেই। আকাশে শরতের কাশফুলের মত সাদা মেঘ। এ-মেঘ সিংহের মত গর্জন করে না! শিশিরকণার সঙ্গে মিলেমিশে শীত আসি-আসি করছে। তাই রোদের তেজও কম। আর আমাদের মেঘ-রোদ তো অনেক আগেই চলে গেছে খেলতে। ওদের হইচইয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মুখে না-বললেও ভাবেভঙ্গিতে শুভ এবং কাব্যও যাই-যাই করছে। তোমরা দুজনও কি যেতে চাও?
---- না দাদুভাই। আমরা ঋ-এর বিস্তারিত কাহিনিটা জেনেই যাব। ওরা  চলে যাক। 
কাব্য ও শুভকে বিদায় দিয়ে দাদুভাই ঋ-এর খুটিনাটি বলতে শুরু করলেন।
---- স্বরবর্ণমালার এই সাত নম্বর বর্ণটির বাংলায় উচ্চারণ 'রি'। সংস্কৃত ভাষায় এই ধ্বনিটির উচ্চারণ অন্য রকম ছিল। বাংলায় তা পাল্টে যায়। র+ই= রি। উচ্চারণ শুনলে এটিকে বিশুদ্ধ  স্বরধ্বনি মনে হয় না। তবে সংস্কৃত ভাষায় এটি স্বরধ্বনি বলে ধরা হয়েছে। ঋ শব্দের সামনে  থাকলে সঠিক উচ্চারণটি বোঝা যায়। যেমন, ঋণ, ঋষি। এর 'কার'টি ঋ-কার (ৃ) হিসেবে এক বা একাধিক ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেমন, মৃত, ঘৃত, বৃথা স্মৃতি। এই শব্দগুলোর উচ্চারণ : ম্রিতো ঘ্রিতো, ব্রিথা,স্রিঁতি। 'কার' হিসেবে এই বর্ণটি সাধারণত ব্যঞ্জনের নিচে যুক্ত থাকে। কেবল 'হ' বর্ণটির সঙ্গে যুক্ত হলে তা পাশে হাতলের মত (হ+ঋ= হৃ) লেগে থাকে। তবে আজকাল নিচেই (ৃ) যুক্ত থাকছে। তবে উচ্চারণের সময় একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, ঋ-কারটি শব্দের মধ্যে থাকলে উচ্চারণ কখনও দ্বিত্ব বা দুই বার হবে না। যেমন, মাতৃ, অমৃত, অদৃশ্য, আবৃত্তি-- এই শব্দগুলো অনেকেই ভুলভাবে উচ্চারণ করেন। বলেন-- মাৎরি/মাৎত্রি; অমম্রিতো; অদদ্রিশশো; আবব্রিৎতি/ আবব্রিতি। এবিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে। এই শব্দগুলোর শুদ্ধ উচ্চারণ : মা-ত্রি, অ-ম্রিতো, অ-দ্রিশশো, আ-ব্রিৎতি। এব্যাপারে আমাদের সতর্ক ও সচেতন খাকতে হবে।

শুদ্ধ উচ্চারণ দু-চার দিনের চর্চায় হয় না! উচ্চারণের নিয়ম জানলেও হয় না। তা ক্রমাগত চেষ্টা এবং অনুশীলন করতে হয়। তোমাদের নিয়মিত অভ্যাস করার জন্য ছন্দেগাঁথা কয়েকটি ঋ-কার যুক্ত শব্দ ঋণ করে দিয়ে দিলাম।

     অমৃত-বৃষ্টি বিধৃত গগন
     নিভৃত পৃথিবী মৌনমগন
     তৃষিত সৃষ্টি বিধৃত প্রাণ
     প্রকৃতি-হৃদয়ে ধ্বনিত গান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ