ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ(১৭)চিনে রাখি : এ ঐ // মানবর্ন্ধন পাল

♥ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                    (১৭)
         ♦চিনে রাখি : এ ঐ♦

      আমরা হেথায় কেউ এখানে 
      পণ্ডিত বা জ্ঞানী নই
      মেঘ ও রোদের মতই আমরা
      নাতি কিংবা নাতনি হই।
      আজ আসরে বিস্তারিত 
      চিনে নেব এ আর ঐ।
     
দোতলা থেকে নামতে-নামতে দাদুভাইয়ের কথা মেঘদূতের কানে গেছে। সে ড্রইংরুমে ঢুকেই বলল, 
---- তোমরা এত বড় হয়েও এ ঐ চেনো না? দাদুভাই আজ তোমাদের ওগুলো শেখাচ্ছে কেন? আমি তো কবেই স্বরবর্ণ শিখে গেছি!
মেঘদূতের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। দাদুভাই ওকে হাত ধরে পাশে বসালেন। বললেন,
----- তোমার এই দাদা-দিদিরাও এসব জানে। তবে বড় হলে এসব বিষয়ে আরও ভাল করে, বেশি করে জানতে হয়। তুমিও দিদিদের মত বড় হয়ে সবকিছু জানবে। যাও, এবার রোদদূতকে নিয়ে খেল গে'। ঝগড়াঝাটি কোরো না কিন্তু!
একথা বলে মেঘদূতকে বিদায় দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন,
---- এগারোটি স্বরবর্ণের মধ্যে অষ্টম ও নবম বর্ণেরও কিন্তু নানান রূপ ও কার্যকরিতা আছে। সেকথাই আজ তোমাদের খানিকটা বলব।
    # এ #
স্বরবর্ণমালার আট নম্বর বর্ণ-- এ। দীর্ঘ-ঋৃ, লি(৯), দীর্ঘ-লি(৯্৯)-- প্রাচীন কালের এই তিনটি স্বরবর্ণের ব্যবহার বাংলায় নেই। বহু আগেই এগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই ওগুলো সম্পর্কে এখন আর কিছু বলার দরকার নেই-- 'এ' প্রসঙ্গেই বলি।

জিহ্বার মধ্যভাগ তালুতে লেগে এই ধ্বনি উচ্চারিত হয়। 'এ' বর্ণ ব্যঞ্জন বা যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে এ-কার (ে) হিসেবে যোগ হয়। এ-কার সবসময় ব্যঞ্জনের বামে বসে। মনে রাখতে হবে, এই ধ্বনিটি সবসময় এক রকম উচ্চারণ হয় না।  বাংলায় 'এ' স্বরধ্বনিটির স্বাভাবিক উচ্চারণ যেমন আছে তেমনি এর বিকৃত উচ্চারণও। মাঝেমধ্যে 'এ' ধ্বনিটি 'অ্যা' উচ্চারিত হয়। তাই এটিকে বলা হয় বাঁকা 'এ'। যেমন--
একটি, কিন্তু একা (অ্যাকা), বেল, কিন্তু দেখা (দ্যাখা), এলাকা, কিন্তু খেলা (খ্যালা)। একা, দেখা, খেলা ইত্যাদি শব্দগুলো উচ্চারণে 'অ্যা' বা বাঁকা 'এ' হয়। বাংলায় বাঁকা 'এ'-ও এ বা এ-কার (ে) দিয়েই লেখা হয়। 
ছাপার হরফ বা কম্পিউটারে এ-কারের ক্ষেত্রে দুরকম লক্ষ করা যায়। একটি মাত্রা ছাড়া এ-কার (ে) এবং  মাত্রা দেওয়া এ-কার (ে)। অনেকে বলেন, মাত্রা দেওয়া এ-কারের উচ্চারণ 'অ্যা' আর মাত্রা ছাড়া এ-কারের উচ্চারণ স্বাভাবিক। এবিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। আমরা সেই পণ্ডিতি আলোচনায় যেতে চাই না।

একথা শুনে ঐশী ও হিয়া বোকার মত তাকিয়ে রইল। হিয়া বলল,
---- এ-আবার কী কথা শোনালে দাদুভাই! এ-কার আবার দুরকম আছে নাকি-- মাত্রা ছাড়া ও মাত্রা দেওয়া? 
দাদুভাই হিয়ার প্রশ্নে আর কথা না-বাড়িয়ে ল্যাবটপটি এনে কী-বোর্ড চেপে দুরকম এ-কার দেখালেন। ওরা অবাক চোখে দুয়ের তফাৎ দেখল। দাদুভাই অভিধান থেকে শব্দ বের করে দেখিয়ে বললেন,
---- এই দেখ, শব্দের বানানে শুরুর এ-কার মাত্রা ছাড়া হয় কিন্তু মাঝের এ-কার হয় মাত্রা দেওয়া। যেকোনও বইয়ে শব্দের বানান লক্ষ করলেই তোমরা বিষয়টি বুঝতে পারবে। 
 তারপর দাদুভাই আবার মূলকথায় ফিরে গিয়ে বললেন,
---- বাংলা ভাষার উচ্চারণে এ-কারের কেরামতি আরও আছে। যেমন, ব্যঞ্জন বর্ণের সঙ্গে য-ফলা (্য) থাকলে স্বাভাবিক 'এ' উচ্চারিত হয় : ব্যয় (বেয়), ব্যক্তি (বেক্তি), ব্যতীত (বেতিতো)।
'এ' বর্ণটি নামের পরিবর্তে সর্বনামপদ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। 'ইহা' বা 'এটা' অর্থে ব্যক্তি বস্তু প্রাণী বা বিষয়ের পরিবর্তে সর্বনামরূপে 'এ' ব্যবহৃত হয়। যেমন-- এ কে? এ গোরু, না ছাগল? এ-কলমটি ভাল। তাই বোঝা যায়, "ইহা এটা এই" অর্থে 'এ' বর্ণটি প্রয়োগ করা হয়। সংস্কৃত 'এতদ্' শব্দের পরিবর্তিত রূপ এটি-- এতদ্>এত>এঅ>এ।
এই 'এ' বর্ণটি কাউকে ডাকতে গিয়ে সম্বোধন পদ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। হে, ওহে, ওলো ইত্যাদি সম্বোধন পদের পরিবর্তে 'এ' প্রয়োগ হয়। তাই মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতে পাই : "এ সখি, হামারি দুঃখের নাহি ওর।" অর্থাৎ হে সখি, আমার দুঃখের সীমা নেই।
---- কারক নির্ণয় করার সময় তো শব্দবিভক্তির চিহ্ন হিসেবেও আমরা 'এ' বর্ণটি পাই। ঐশী দাদুভাইয়ের কথার ফাঁকে একথা বলল।
---- তুমি ঠিকই বলেছ ঐশী। কারক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সপ্তমীর বিভক্তির যে তিনটি চিহ্ন (এ য় তে) আছে তার মধ্যে অন্যতম 'এ' (ে) বিভক্তি।
আমরা স্কুলজীবনে বিশিষ্ট বৈয়াকরণ অধ্যাপক হরলাল রায়ের ব্যাকরণ বই পড়েছি। তা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা! তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। এখন তিনি নেই-- তাঁর বইও পাওয়া যায় না! সেই বইয়ে সকল কারকে সপ্তমী বিভক্তির উদাহরণ মনে রাখার জন্য তিনি একটি ফর্মুলা দিয়েছিলেন : "পাগুটা দীপতি"। এটি মনে রাখলে সব কারকে সপ্তমী বিভক্তির উদাহরণ  সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়! আমরা এটি মনে রেখে সকল কারকে সপ্তমী বিভক্তির উদাহরণ লিখতাম এভাবে :
★ পা= পাগলে কী না-বলে। (কর্তৃ)
★ গু= গুণিজনে কর নতি। (কর্ম)
★ টা= টানে এক আঁক বক। (করণ)
★ দী= দীনে দয়া কর। (সম্প্রদান)
★ প= পরাজয়ে ডরে না বীর। (অপাদান) 
★ তি= তিলে তেল আছে। (অধিকরণ)
একথা শুনে হিয়া এবং ঐশী আনন্দে যেন লাফিয়ে উঠল। বলল,
---- বাহ্! খুব মজার তো! এই ফর্মুলা আর জীবনেও ভুলব না! উদাহরণ আর মুখস্থ করতে হবে না।
---- শোন, ব্যাকরণ হল অংকের মত। মুখস্থ করে মনে রাখা যায় না। নিয়ম বুঝে মনে রাখতে হয়। 
আরেকটি কথা জেনে রাখ। ১৯ থেকে  ৩২ পর্যন্ত মাসের তারিখ বোঝাতেও আমরা 'এ' বিভক্তি যুক্ত করি। উনিশে আষাঢ়, বিশে বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বাইশে ভাদ্র, ছাব্বিশে মার্চ এরকম।
বাংলা সাধু ভাষা থেকে চলতি ভাষায় অসমাপিকা ক্রিয়াপদ গঠনে 'ইয়া' থেকে 'এ' হয়। √কর্+ইয়া= করিয়া> করে; √ধর্+ইয়া= ধরিয়া> ধরে।


# ঐ #
বাংলা স্বরবর্ণের নয় নম্বর বর্ণ ঐ। আমরা জানি, ঐ স্বরবর্ণটি 'ওই/অই স্বরধ্বনির লিখিত রূপ বা প্রতীক। এটির 'কার'-কে ঐ-কার (ৈ) বলে। এই কারটি ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হলে বাম পাশে বসে। চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ এরকম। এসব তোমরা জান। দুটি স্বরধ্বনি যুক্ত হয়ে এ-ধ্বনিটির সৃষ্টি বলে ধ্বনি বিজ্ঞানে এটিকে যৌগিক স্বর বা দ্বিস্বর বলে। অ+ই= অই/ ও+ই= ওই> ঐ> ৈ। এটিও মাত্রাহীন স্বরধ্বনি। 
'ঐ'-কে ওই বা অই হিসেবেও লেখা যায়। কবি-লেখকেরা এক্ষেত্রে তাঁদের ইচ্ছেমত বানান লেখেন। আমরা শৈশবে পড়েছি : ওই দেখা যায় তাল গাছ/ ওই আমাদের গাঁ। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন : পাখী ডেকে ওঠে ওই গো ওই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে।
ঐ/ওই দূরের কোনও কিছু বোঝাতে আমরা ব্যবহার করি। কাছে বা নিকটে বোঝাতে ব্যবহার করি 'এ' বা 'এই'। এ বা এই-এর বিপরীত হল ঐ বা ওই। এ/এই বইটি রাখ, ঐ/ওই  বইটি আন। এদিকে এস, ওদিকে বস।  কবি জসীম উদদীন 'কবর' কবিতায় লিখেছেন : এইখানে তোর তোর দাদীর কবর ডালিমগাছের তলে। রবীন্দ্রনাথের গানে পাই : ঐ শুনি যেন কার চরণধ্বনি রে।
কোনওকিছুর নামের বদলে এই পদ বসে বলে বাংলা ব্যাকরণে এগুলোকে সর্বনাম পদ বলে। যে সর্বনাম পদগুলো দিয়ে কাছে বা নিকটে বোঝায় সেগুলো সামীপ্যবাচক সর্বনাম। 'সমীপে' সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ। এর মানে কাছে-- সমীপ+ষ্ণ্য= সামীপ্য।  আর দূরে বোঝালে তাকে দূরত্ববাচক সর্বনাম বলে।
এপর্যন্ত বলে দাদুভাই আজকের মত বর্ণমালার গল্পের আসর শেষ করতে গিয়ে বললেন,
---- স্কুলের ছুটি তো আবার বাড়ল। আসছে শীত। দেখা দিয়েছে করোনা বৃদ্ধির আশংকা! অপ্রয়োজনে মোটেই বাইরে যাবে না। ঠিকভাবে মানবে স্বাস্থ্যবিধি। মাস্ক ছাড়া আর কিন্তু এমুখো হয়ো না!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ