ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ//(১৯) যুগ্মস্বর : পেছন ফিরে দেখা// মানবর্দ্ধন পাল

#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                     (১৯)
♦যুগ্মস্বর : পেছন ফিরে দেখা♦


         স্বরধ্বনির মাঝে আছে
            অজানা আবেশ
         শেষ হয়েও এর কথা
            হল না যে শেষ।

---- দাদুভাই, এতদিনে তুমি শেষ করলে স্বরধ্বনির গল্প। তোমার কথায় এত বেশি ডালপালা গজায় যে, মূল কথায় আসার আগেই সময় ফুরিয়ে যায়! এগারোটা স্বরধ্বনি নিয়েই কাটিয়ে দিলে তিন মাসেও বেশি দিন। তাহলে ঊনচল্লিশটি ব্যঞ্জনবর্ণের কথা বলবে কখন আর ব্যাকরণই ধরবে কবে? তুমি তো মনে হচ্ছে একেবারে আরব দেশের রূপকথার মত সহস্র রজনীর গল্প শুরু করে দিলে!
মুখ গোমরা করে হিয়া বেশ কয়েকটি প্রশ্নের তীর ছুঁড়ে দিল দাদুভাইকে! ঐশী হিয়ার সব কথা নীরবে সমর্থন করে বলল,
---- তবু রক্ষা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আবার বাড়ল। করোনাও কমে না, স্কুলও খোলে না! বোঝা যাচ্ছে, এভাবে এই বছরই কেটে যাবে।
দুজনের কথা শুনে দাদুভাই মুচকি হেসে বললেন,
---- তোমরা ঠিকই বলেছ। মানুষের যত বয়স বাড়ে তত বেশি কথা বলে! অভিজ্ঞতার ঝুলি বড় হতে থাকে তো, তাই! কিন্তু দুুঃখের বিষয়, বয়স্কদের কথা শোনার সময় তখন কারও থাকে না! শিশুরাই হয় তখন বয়স্কদের বড় বন্ধু। যা-ই হোক, মানুষের মুখের ভাষা  এমন একটি বিস্ময়কর বিষয় যার কথা বলে শেষ করা যায় না। ভাষার এত শাখা-প্রশাখা এবং ডালপালা যে, এর মোটামুটি পরিচয় দিলেও সপ্ত কাণ্ড রামায়ণ হয়ে যাবে। মানুষের মগজের মত এর অনেককিছু এখনও অজানাই রয়ে গেছে। মানুষের কথার যেমন শেষ নেই তেমনই ভাষার গল্পও অন্তহীন। 
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, "কথায় কথা বাড়ে, মন্থনে বাড়ে ঘি।" তাই তো কথার পিঠে কথা চলে আসে-- এক প্রসঙ্গ টেনে আনে আরেকটিকে। যেমন কান টানলে মাথা আসে। কথা মুখে চলে এলে তা তো আর গিলে ফেলতে পারি না! গিলে ফেললেও তা হজম হয় না-- পেট মোচড়ায়। বেশি কথা বলার বদনাম আমার আছে। তা অনেকে বলে। তোমরাও তা বুঝে ফেলেছ।মাস্টাররা না কি বেশি কথা বলে-- বাংলার মাস্টাররা আরও বেশি।
 যা-ই  হোক, আজ গালগল্প অনেক হল এবার একটু কাজের কথা বলি। ভেবেছিলাম, স্বরের কথা শেষ করেছি এখন অল্পস্বল্প ব্যঞ্জনের গল্প করব। কিন্তু হঠাৎ মনে হল যুগ্ম স্বরধ্বনি নিয়ে  আরেকটু কথা বলা দরকার।
---- যুগ্ম স্বরধ্বনি তো আমরা অনেক আগেই চিনেছি, দাদুভাই। ঐ এবং ঔ-- এই দুটো হল যুগ্ম স্বরধ্বনি। দুটো  করে স্বরধ্বনি মিলে ঐ (অই/ওই) এবং ঔ-এর (অউ/ওউ) সৃষ্টি হয়েছে। যুগ্ম স্বরধ্বনিকে যৌগিক স্বর, সংযুক্ত  স্বরও বলা হয়। 
ঐশী বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই কথাগুলো বলল। দুয়েকটা কথা হিয়াও ঐশীকে মনে করিয়ে দিল। ওদের কথা শুনে দাদুভাই খুব খুশি হলেন এবং প্রশংসা করে বললেন,
---- বেশ-বেশ! খুব চমৎকার করে বলেছ-- যেন এখনই মাস্টারমশাই হয়ে গিয়েছ! তোমরা তো শ্রুতিধরের মত শুনেই বেশ মনে রাখতে পারছ!
---- ঠিক তা নয় দাদুভাই। তোমার এখান থেকে বাসায় গিয়েই আমরা দুজনে বসে তোমার  মূল কথাগুলো মনে করে খাতায় লিখে রাখি।
---- ভাল বুদ্ধি, ভাল বুদ্ধি! 
ওদের কথা কানে যেতেই মিনা-রাজুর কার্টুনছবির টিয়াপাখি মিঠুর মত মেঘদূত বলে উঠল। আর সবার মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। যতক্ষণ সম্ভব ওরা একে অন্যের গায়ে ঢলাঢলি করে হেসে নিল। পরে একঘেয়েমি কাটিয়ে পূর্ণ মনোযোগের আশায় দাদুভাই মুক্ত হাসির সুযোগ দিলেন। তারপর বললেন,
---- যুগ্ম স্বরধ্বনির আরেকটি নামও তোমরা মনে রাখবে-- সন্ধি-স্বর বা সন্ধ্যক্ষর।
দাদুভাইয়ের কথা কানের পর্দা ছুঁয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই কাব্য বলল,
---- কী বললে দাদুভাই? সন্ধ্যা অক্ষর? সন্ধ্যাকালের সঙ্গে আবার এর সম্পর্ক কী?
---- না না, সন্ধ্যা অক্ষর নয়-- সন্ধ্যক্ষর। সন্ধ্যাবেলার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। তোমরা সবাই মন দিয়ে বিষয়টি শোন। 
বাংলা ব্যাকরণে 'সন্ধি' নামে একটি অধ্যায় আছে। 'সন্ধি' মানে মিলন। তবে তা কিন্তু বিরোধপূর্ণ দু-পক্ষ বা দুই দেশের মধ্যে শান্তির চুক্তি নয়। এই 'সন্ধি' দুপক্ষের ঝগড়াঝাটি, মারামারি, বিরোধ বা যুদ্ধের মধ্যে দু-পক্ষের মিলন কিংবা বন্ধুত্বও নয়। এটি হল বর্ণে-বর্ণে বন্ধুত্ব বা মিলন। স্বরসন্ধিতে একটি নিয়ম আছে, হ্রস্ব-ই বা হ্রস্ব-ই-কারের (ি)কিংবা দীর্ঘ-ঈ বা দীর্ঘ-ঈ-কারের সঙ্গে 'অ' ধ্বনির সন্ধি হলে য-ফলা (্য) হয়। যেমন-- অতি+অন্ত= (ি+অ= ্য) অত্যন্ত। নদী+অম্বু= (ী+্অ= ্য) নদ্যম্বু। 'নদ্যম্বু' মানে নদীর জল। এই নিয়মে-- সন্ধি+অক্ষর= সন্ধ্যক্ষর। বুঝতে পেরেছ? যদি সময়-সুযোগ হয় তবে সন্ধির গল্পকথাও একদিন হবে। দুটো স্বরধ্বনির মধ্যে  সন্ধির ফলে ঐ এবং ঔ সৃষ্টি হয়েছে বলে এই নাম-- সন্ধি-স্বর বা সন্ধ্যক্ষর। এবার একটু চা খেয়ে আজকের বিষয়ে কয়েকটি কথা বলব।
---- এই দিদন, দাদুভাই চা খাবে। চা বানাও। দাঁড়াও, আমি চা নিয়ে আসছি।
গলা ফাটিয়ে একথা বলেই রোদদূত দিল ভু-দৌড়! 
রোদদূত ধীর পায়ে কাঁপা-কাঁপা হাতে চা নিয়ে এল। দাদুভাই চায়ে চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলেন,
---- তোমরা এত দিন জেনেছ যুগ্ম স্বর বা যৌগিক স্বরধ্বনি দুটি-- ঐ এবং ঔ। এ-দুটির আক্ষরিক রূপ বা বর্ণ আছে। কিন্তু এছাড়াও আরও পঁচিশটি
যৌগিক স্বর বাংলায় আছে। কোনও শব্দের মধ্যে পরপর একাধিক স্বরধ্বনি থাকলে দ্রুত উচ্চারণের সময় তা একাকার হয়ে যায়। ভাষাবিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, দুই বা তারও বেশি স্বরধ্বনি একত্র হয়ে এই মিশ্র স্বরগুলো সৃষ্টি হয়। এগুলোর কোনও বিশেষ বর্ণরূপ নেই। দুটি থেকে পাঁচটি স্বরধ্বনি একত্র হয়ে এধরণের মিশ্র স্বর তৈরি হতে পারে। 
সহজভাবে এগুলোকে পাঁচমিশালি স্বর বলা যেতে পারে। ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমারের ব্যাকরণ বই থেকে এধরণের পাঁচমিশালি স্বরধ্বনিগুলোর পরিচয় দেওয়া যায়।
দুটি করে উদাহরণ লক্ষ কর।
১# ইয়ে-- নিয়ে, গিয়ে 
২# ইয়া-- করিয়া, বলিয়া 
৩# ইও-- দিও, করিও
৪# ইউ-- পিউ, মিউ-মিউ
৫# এই-- নেই, খেই
৬# এয়া-- কেয়া, খেয়া
৭# এও-- চেয়ো, খেয়ো
৮# এউ-- কেউ, ঘেউ-ঘেউ
৯# এয়-- দেয়, নেয়
১০# আই-- খাই, নাই
১১# আয়-- খায়, যায়
১২# আও-- যাও, খাও
১৩# আউ-- লাউ, দাউ-দাউ
১৪# অয়-- হয়, নয়
১৫# অআ-- নয়া, গয়া
১৬# অও-- হও, কও
১৭# অই-- রই, কই
১৮# ওয়-- ধোয়
১৯# ওয়া-- ধোয়া, মোয়া
২০# অউ-- বউ, মউ
২১# উই-- দুই, উই
২২# উএ-- দুয়ে, ফুঁয়ে
২৩# উয়া-- কুয়া, জুয়া 
২৪# উও-- কুয়ো, দুয়ো
২৫# অ্যাও-- ম্যাও।
এরকমভাবে দুটি স্বরধ্বনি মিলেমিশে উচ্চারিত হলে তাকে দ্বিস্বরও বলা হয়।
এমনই করে তিনটি স্বর একত্র হলে ত্রিস্বর, চারটি একত্র হলে চতুঃস্বর এবং পাঁচটি হলে পঞ্চস্বর বলে। যেমন--
ত্রিস্বর : আউই-- হাউই, বাউই
চতুঃস্বর : আওয়াই : হাওয়াই, দাওয়াই
পঞ্চস্বর : আওয়াইয়া-- খাওয়াইয়া, ভাওয়াইয়া।
দাদুভাইয়ের কথা শেষ হতেই হিয়া হুট্ করে বলল,
---- বাহ্ কী মজা! 'ওয়াও'!
দাদুভাই ওর ত্রিস্বরের প্রয়োগ বুঝে হেসে জবাব দিলেন দ্বিস্বর ও চতুঃস্বরে--
---- রান্না ঘরে 'যাও'।
আবার চা 'খাওয়াও'!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ